📄 উলামায়েকেরামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা
উল্লিখিত হাদিসগুলো গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। এম সমস্ত হাদিসের ভিত্তিতেই এই উম্মতের আকাবিরে উলামা গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ‘যে গান গায় এবং যে গান শোনে উভয়েই অভিশপ্ত।’ হযরত ফুজাঈল ইবনে ইয়ায রহ. বলেন, ‘গান-বাজনা ব্যভিচারের মূল মন্ত্র।’ হযরত নাফে রহ. বলেন, ‘আমি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। তিনি বাঁশির আওয়াজ শুনে দুই কানে আঙ্গুল দিয়ে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করেন। এরপর বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এমন আওয়াজ শুনলে এমনই করতেন।”
দুরের মুখতার প্রণেতা আল্লামা হাসকাফী রহ. ফাতাওয়ায়া বাযাযিয়া থেকে বর্ণনা করেন : বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বিনোদনমূলক আওয়াজ শোনা হারাম। কারণ হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘খেল-তামাশার বাদ্য শ্রবণ করা গুনাহ। এমন মজলিসে বসা ও শুনাও গুনাহ এবং এর মাধ্যমে আত্মিক স্বাদ উপভোগ করা নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা। কারণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহের যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজে না লাগিয়ে তা অন্য কাজে তথা গুনাহের কাজে ব্যবহার করা কৃতজ্ঞতা নয়; বরং অকৃতজ্ঞতা।’ তাই আবশ্যক হলো এমন আওয়াজ শোনা থেকে বিরত থাকা। বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন আওয়াজ এলে কানে আঙ্গুল দিয়ে রাখতেন।
আফসোস বিষয় হলো, ইসলামী শরীয়ত যতটা কঠোরভাবে গান-বাজনার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বর্তমানে ততটাই উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মানুষ এই গুনাহে লিপ্ত হচ্ছে। প্রায় প্রতি ঘর থেকেই গানের আওয়াজ বের হয়। কর্মচারীদের মাঝে গান গাওয়ার অভ্যাস এত বেশি হয়েছে যে, গান ব্যতীত কাজের প্রতি তাদের মনোযোগ সৃষ্টি হয় না। ঘরবাড়িতে কুরআনে কারিমের আওয়াজের পরিবর্তে দিন-রাত মিউজিকের শব্দ শোনা যায়। শুধু এটুকুকেই নয় যে, কেউ একজন গান শুনে গুনাহগার হচ্ছে; বরং মিউজিকের আওয়াজ বাড়িয়ে পুরো মহল্লাবাসীকে গুনাহগার বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে যুবকসমাজের নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু হলো গান-বাজনা এবং চলচ্চিত্র। রাতদিন তারা এসব থেকে মুক্তির বিহনে মহামূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করার সাথে সাথে নিজেদের আখলাক চরিত্রও ধ্বংস করছে। অশ্লীলতার সরঞ্জামাদি—যেমন : টেলিভিশন, ভিসিআর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ব্যাপকতর হয়েছে এবং এসবের কারণে আমাদের কানের ও মনের হেফাযত ভীষণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
টিকাঃ
১৬৪. আবুল ইমান লিল হাইয়ামী, ৪/২৮৯।
১৩০৫. দুররে মুখতার, কিতাবু, ৬/৩৮১।
📄 প্রচলিত কাওয়ালীও হারাম
মানুষকে এই হারাম কাজে লিপ্ত করার জন্য কাওয়ালীর আকৃতিতে এই হারাম কাজকে জায়েয হিসেবে তুলে ধরা হয়। আজকাল তবলা, হারমোনিয়ামের সাহায্যে কাওয়ালী গাওয়া হয়। কাওয়ালীর মর্মার্থ যত চমৎকার ও বাস্তবসম্মত হোক না কেন, মিউজিক ও বাজনার সংমিশ্রণের কারণে তা হারাম। এতে কোনোরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না। মিউজিক সর্বাবস্থায় হারাম। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ আলেম আল্লামা শামী রহ. বলেন : বর্তমান যুগের সূফী সাধকরা যে কাজ করে, (কাওয়ালী গায়) তা হারাম। এমন মজলিসে যাওয়া ও অংশগ্রহণ করাও জায়েয নেই।
কিন্তু আফসোস! আজকাল কাওয়ালীকে স্বতন্ত্র ইবাদত মনে করে তা আত্মিক উন্নতির সাধনের মাধ্যম বিবেচনা করা হয়। পূর্ববর্তী যুগে কাওয়ালী সাধারণত বিবাহ অনুষ্ঠান ও মাজলিসে ইবাদত ছিল। কিন্তু যখন থেকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, মিউজিক সিস্টেম ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে, তখন থেকে কাওয়ালী গাওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, বাদ্যমিশ্রিত কাওয়ালী সাধারণ গানের চেয়েও জঘন্য। কারণ কাওয়ালীর মাঝে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম বাজনার তালে উচ্চারণ করা হয়, যা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার নামান্তর। নাউযুবিল্লাহ! এটা তো ঐ কাজের মতো, যেমন কোনো মিউজিকের সঙ্গে কুরআন ও হাদিস পাঠ করা হলো। মুসলমান মাত্রই এই কাজকে অপছন্দ করবে। অনুরূপ আল্লাহর প্রতি যথাযথ লজ্জার এবং ইসলামী মর্যাদাবোধের দাবি হলো, আমরা যেন অবৈধ আওয়াজের সঙ্গে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণকে কখনোই বরদাশত না করি।
টিকাঃ
১৩০৬. শামী, ৬/৩৮১।
📄 রমযানের অবমাননা
পবিত্র রমযান মাসে সবচেয়ে বেশি কাওয়ালী গাওয়া হয়। রমযান প্রতিটা মুহূর্ত অত্যন্ত বরকতময়। এ মাসে প্রতিটি আমলের সওয়াবও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এমন বরকতময় মুহূর্তগুলোকে কাওয়ালী শুনে নষ্ট করা নেহায়তও গুনাহের কাজ। আফসোস বিষয় হলো, পবিত্র রমযান মাসে বড় বড় শহরের হোটেল ও দোকানগুলোতে রাতভর কাওয়ালী বাজানো হয়। যার কারণে মহল্লাবাসীর জন্য ইবাদত করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। এতে আল্লাহ ও রাসূলের অবমাননার সাথে সাথে পবিত্র রমযানেরও অবমাননা হয়। মোটকথা, এক্ষেত্রে আমাদের অলসতা ও অবহেলা সংশোধনযোগ্য। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর প্রতি লজ্জা রাখি এবং আখেরাতে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার ভয় রাখি, তা হলে আমাদের সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত হতে হবে এবং আমাদের কানকে সকল খারাপ আওয়াজ শ্রবণ থেকে হেফাযত করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
📄 অন্যের গোপন কথা শ্রবণ করা
কানের সাহায্যে কৃত গুনাহের মাঝে একটি বড় গুনাহ হলো, অন্যের গোপন কথা শোনার চেষ্টা করা। বুখারী শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ صُبَّ فِي أُذُنِهِ الْأَنُكُ يَوْমَ الْقِيَامَةِ. যে ব্যক্তি অন্যের এমন কথা মন দিয়ে শোনে, যে কথা অন্যকে শোনাতে মানুষ অপছন্দ করে, কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে।
কুরআনে কারিমেও গুপ্তচরবৃত্তি করতে নিষেধ করা হয়েছে। অন্য এক হাদিসে এসেছে, إِنَّ أَتْبَعَتْ عَوْرَاتِ النَّاسِ أَفْسَدْتَهُمْ أَوْ كِدْتَ أَنْ تُفْسِدَهُمُ. যদি তুমি মানুষের গোপন ত্রুটি-বিচ্যুতির পেছনে লেগে থাকো, তবে তুমি তাদের মাঝে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেবে, অথবা তাদের গণ্ডগোলের দিকে নিয়ে যাবে।
টিকাঃ
১৩০৭. বুখারী, ২/১০৪২।
১৩০৮. আবু দাউদ, ২/৭০০।