📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 কানের হেফাযত

📄 কানের হেফাযত


আল্লাহ তায়ালাকে লজ্জা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কান তথা শ্রবণ-শক্তিকে অবৈধ আওয়াজ ও শব্দ শোনা থেকে হেফাযত করা। অবৈধ আওয়াজ-সমূহের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত আওয়াজ হলো গানের আওয়াজ, যাকে অনর্থক খেল-তামাশা আখ্যা দেওয়া হয়েছে। নিম্নে বর্ণিত আয়াতসমূহের আলোকে গানের নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হয় :

১. আল্লাহ তায়ালা শয়তানের প্রবঞ্চনার উত্তর প্রদানকালে সতর্ক করে ইরশাদ করেন, وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ. তুই সাহায্য কর তাদের মধ্যে থেকে যাকে পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা। কোনো কোনো মুফাসসির এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন গানবাজনা দ্বারা।

২. সূরা লুকমানে ইরশাদ হয়েছে, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ মানুষের মাঝে কেউ কেউ অজ্ঞাতবশত আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথ নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। আলোচ্য আয়াতে ‘অসার বাক্য’ দ্বারা ঐ সকল বস্তু উদ্দেশ্য যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয়। যেমন : অনর্থক গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা, গান-বাজনা ইত্যাদি।

৩. وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ وَأَنْتُمْ سَامِدُونَ তোমরা হাসি-ঠাট্টা করছ, ক্রন্দন করছ না। তোমরা তো খেল-তামাশায় মগ্ন। কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে উক্ত আয়াতে খেল-তামাশা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গান-বাজনা।

টিকাঃ
১৫২. সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৬৪।
১৫৩. কুরতুবী, ৫/৬৬।
১৫৪. সূরা লুকমান, আয়াত : ৬।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাদিসের আলোকে গানের বিধান

📄 হাদিসের আলোকে গানের বিধান


কুরআনে কারিমের মতো হাদিস শরিফেও গান-বাজনার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু হাদিস প্রদত্ত হলো :

১. এক হাদিসে এসেছে, صَوْتَانِ مَلْعُونَانِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ: مِزْمَارُ عِنْدَ نِعْمَةٍ وَرَنَّةٌ عِنْدَ مُصِيبَةٍ. দুই ধরনের আওয়াজ দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত : ১. আনন্দঘন মুহূর্তে বাঁশির আওয়াজ, ২. বিপদপদে বিলাপরত আওয়াজ।

২. অন্য এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, مَنْ جَلَسَ إِلَى قَيْنَةٍ يَسْمَعُ مِنْهَا صُبَّ فِي أُذُنِهِ يَوْমَ الْقِيَامَةِ. যে ব্যক্তি নিজের বাদীর সঙ্গে বসে গান শুনবে, কিয়ামতের দিন তার কানে সীসা ঢেলে দেওয়া হবে।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক দীর্ঘ হাদিসে যেসব আলামত বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর পাওয়া গেলে মুসলিম জাতির মাঝে ভূমিধস ও ভূমিকম্পের মতো আযাব নেমে আসবে। তন্মধ্যে একটি আলামত হলো, وَظُهُورِ الْقَيْنَاتِ وَالْمَعَازِفِ. যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যাপক হবে।

৪. এক হাদিসে হযরত আয়েশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তি বর্ণনা করেন, مَنْ মَاتَ وَعِنْدَهُ جَارِيَةٌ مُغَنِّيَةٌ فَلَا تُصَلُّوا عَلَيْهِ. কারও অধীনে কোনো গায়িকা বাঁদি থাকাকালীন সে মারা গেলে তার জানাযার নামায পড়বে না।

৫. হযরত জাবের রা. হতে বর্ণিত, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, إِنَّ الْغِنَاءَ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِي الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الزَّرْعَ. গান অন্তরে নেফাকী সৃষ্টি করে। যেমন পানি শস্য উৎপাদন করে।

৬. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, لَيَشْرَبَنَّ أُنَاسٌ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا، وَيَضْرِبُونَ عَلَى رُؤُوسِهِمُ الْمَعَازِفَ، يُخْسَفُ اللَّهُ بِهِمُ الْأَرْضَ، وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ. আমার কতিপয় উম্মত অবশ্যই মদ পান করবে। কিন্তু তার নাম পাল্টে দেবে এবং তাদের সামনে গান বাজানো হবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের জমিনে ধসিয়ে দেবেন এবং তাদের কতিপয়কে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন।

টিকাঃ
১৫৫. কুরতুবী, ৭/৪৫০।
১৫৬. সূরা নাজম, আয়াত : ৫৮-৬০।
১৫৭. হাফিয়াছুল জামাআ, ৪/২৪০; তাফসির সাভী, ৮/২৬৬।
১৫৮. তারগিব ওয়াত তারহিব, ৪/১৩৪।
১৫৯. কুরতুবী, ৭/৫০; হাফিয়াছুল জামাআ, ২/৪৩।
১৬০. তিরমিযী, ২/৪৮; কুরতুবী, ৭/৫০।
১৬১. কুরতুবী, ৭/৫০।
১৬২. মিশকাত, ২/৪১১; ওয়াআবুল ঈমান লিল হাইয়ামী, ৪/২৯৪; হাদিস নং-৫১০০।
১৬৩. আবুল ইমান লিল হাইয়ামী, ৪/২৮৯, হাদিস নং-৫১১১।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 উলামায়েকেরামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা

📄 উলামায়েকেরামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা


উল্লিখিত হাদিসগুলো গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। এম সমস্ত হাদিসের ভিত্তিতেই এই উম্মতের আকাবিরে উলামা গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ‘যে গান গায় এবং যে গান শোনে উভয়েই অভিশপ্ত।’ হযরত ফুজাঈল ইবনে ইয়ায রহ. বলেন, ‘গান-বাজনা ব্যভিচারের মূল মন্ত্র।’ হযরত নাফে রহ. বলেন, ‘আমি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। তিনি বাঁশির আওয়াজ শুনে দুই কানে আঙ্গুল দিয়ে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করেন। এরপর বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এমন আওয়াজ শুনলে এমনই করতেন।”

দুরের মুখতার প্রণেতা আল্লামা হাসকাফী রহ. ফাতাওয়ায়া বাযাযিয়া থেকে বর্ণনা করেন : বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বিনোদনমূলক আওয়াজ শোনা হারাম। কারণ হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘খেল-তামাশার বাদ্য শ্রবণ করা গুনাহ। এমন মজলিসে বসা ও শুনাও গুনাহ এবং এর মাধ্যমে আত্মিক স্বাদ উপভোগ করা নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা। কারণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহের যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজে না লাগিয়ে তা অন্য কাজে তথা গুনাহের কাজে ব্যবহার করা কৃতজ্ঞতা নয়; বরং অকৃতজ্ঞতা।’ তাই আবশ্যক হলো এমন আওয়াজ শোনা থেকে বিরত থাকা। বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন আওয়াজ এলে কানে আঙ্গুল দিয়ে রাখতেন।

আফসোস বিষয় হলো, ইসলামী শরীয়ত যতটা কঠোরভাবে গান-বাজনার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বর্তমানে ততটাই উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মানুষ এই গুনাহে লিপ্ত হচ্ছে। প্রায় প্রতি ঘর থেকেই গানের আওয়াজ বের হয়। কর্মচারীদের মাঝে গান গাওয়ার অভ্যাস এত বেশি হয়েছে যে, গান ব্যতীত কাজের প্রতি তাদের মনোযোগ সৃষ্টি হয় না। ঘরবাড়িতে কুরআনে কারিমের আওয়াজের পরিবর্তে দিন-রাত মিউজিকের শব্দ শোনা যায়। শুধু এটুকুকেই নয় যে, কেউ একজন গান শুনে গুনাহগার হচ্ছে; বরং মিউজিকের আওয়াজ বাড়িয়ে পুরো মহল্লাবাসীকে গুনাহগার বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে যুবকসমাজের নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু হলো গান-বাজনা এবং চলচ্চিত্র। রাতদিন তারা এসব থেকে মুক্তির বিহনে মহামূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করার সাথে সাথে নিজেদের আখলাক চরিত্রও ধ্বংস করছে। অশ্লীলতার সরঞ্জামাদি—যেমন : টেলিভিশন, ভিসিআর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ব্যাপকতর হয়েছে এবং এসবের কারণে আমাদের কানের ও মনের হেফাযত ভীষণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

টিকাঃ
১৬৪. আবুল ইমান লিল হাইয়ামী, ৪/২৮৯।
১৩০৫. দুররে মুখতার, কিতাবু, ৬/৩৮১।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 প্রচলিত কাওয়ালীও হারাম

📄 প্রচলিত কাওয়ালীও হারাম


মানুষকে এই হারাম কাজে লিপ্ত করার জন্য কাওয়ালীর আকৃতিতে এই হারাম কাজকে জায়েয হিসেবে তুলে ধরা হয়। আজকাল তবলা, হারমোনিয়ামের সাহায্যে কাওয়ালী গাওয়া হয়। কাওয়ালীর মর্মার্থ যত চমৎকার ও বাস্তবসম্মত হোক না কেন, মিউজিক ও বাজনার সংমিশ্রণের কারণে তা হারাম। এতে কোনোরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না। মিউজিক সর্বাবস্থায় হারাম। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ আলেম আল্লামা শামী রহ. বলেন : বর্তমান যুগের সূফী সাধকরা যে কাজ করে, (কাওয়ালী গায়) তা হারাম। এমন মজলিসে যাওয়া ও অংশগ্রহণ করাও জায়েয নেই।

কিন্তু আফসোস! আজকাল কাওয়ালীকে স্বতন্ত্র ইবাদত মনে করে তা আত্মিক উন্নতির সাধনের মাধ্যম বিবেচনা করা হয়। পূর্ববর্তী যুগে কাওয়ালী সাধারণত বিবাহ অনুষ্ঠান ও মাজলিসে ইবাদত ছিল। কিন্তু যখন থেকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, মিউজিক সিস্টেম ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে, তখন থেকে কাওয়ালী গাওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, বাদ্যমিশ্রিত কাওয়ালী সাধারণ গানের চেয়েও জঘন্য। কারণ কাওয়ালীর মাঝে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম বাজনার তালে উচ্চারণ করা হয়, যা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার নামান্তর। নাউযুবিল্লাহ! এটা তো ঐ কাজের মতো, যেমন কোনো মিউজিকের সঙ্গে কুরআন ও হাদিস পাঠ করা হলো। মুসলমান মাত্রই এই কাজকে অপছন্দ করবে। অনুরূপ আল্লাহর প্রতি যথাযথ লজ্জার এবং ইসলামী মর্যাদাবোধের দাবি হলো, আমরা যেন অবৈধ আওয়াজের সঙ্গে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণকে কখনোই বরদাশত না করি।

টিকাঃ
১৩০৬. শামী, ৬/৩৮১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px