📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 স্বামী-স্ত্রীও সতরের ব্যাপারে সচেতন থাকবে

📄 স্বামী-স্ত্রীও সতরের ব্যাপারে সচেতন থাকবে


ইসলামের শিক্ষা হলো, স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মাঝে একদম বেশরম হবে না; বরং যথাসাধ্য সতরের ব্যাপারে সচেতন থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণী নকল করেন যে, ‘إِذَا أَتَى أَحَدُكُمْ أَهْلَهُ فَلْيَسْتَتِرْ وَلَا يَتَجَرَّدَانِ تَجَرُّدَ الْعَيْرَيْنِ.’ তোমাদের কেউ সঙ্গমের জন্য যখন মিলিত হবে যথাসাধ্য সতর ঢেকে রাখবে। চতুষ্পদ প্রাণীর মতো সম্পূর্ণ উলঙ্গ হবে না। ১০৬ বোঝা গেল, লজ্জাশীলতার দাবি হলো, স্বামী-স্ত্রীও পরস্পর নিজেদের সতর দেখবে না। হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'সারা জীবনে না আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর দেখেছি, আর না তিনি আমার সতর দেখেছেন।' সুতরাং আমাদের এই বিষয়টির প্রতি পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে লজ্জাশীলতার পূর্ণ প্রমাণ দেওয়া উচিত। সন্তানদের উপর পিতামাতার কাজকর্ম ও আচার-ব্যবহারের প্রভাব অপরিসীম। যদি আমরা লজ্জাশীল হই, তা হলে আমাদের সন্তানসন্ততিও এই পবিত্র গুণে গুণান্বিত হবে। পক্ষান্তরে আমরা যদি লজ্জা-শরমের ধার না ধরি, তা হলে সন্তানদের মাঝেও লজ্জাহীনতার বীজ বপন হবে। বর্তমানে টিভির পর্দায় উলঙ্গ ও মানবতাবিরোধী দৃশ্যের যে চর্চা করা হয় এবং এ বিষয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র গুরুত্বারোপ করা হয় না যে, আমাদের রব, আমাদের সৃষ্টিকর্তা, আমাদের মালিক আমাদের গোপন আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফ। যদি তিনি লজ্জাহীনতা ও এমন জঘন্য অবস্থায় আমাদের দেখেন, তা হলে কীরূপ ক্ষুব্ধ হবেন? তাই আমাদের লজ্জাশীল হওয়া উচিত। লজ্জাশীল হওয়ার প্রেরণাই আমাদের এ জাতীয় মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
এগুলো ছাড়াও ফুকাহায়ে কেরাম সতর রক্ষার গুরুত্বহীনতার একটা ফিকিরি দিক সম্পর্কে লিখেছেন, 'সতর রক্ষা যদি না হয় তাহলে মানুষের স্ফূর্ত্তি লোপ পায়। প্রয়োজনীয় কাজ ও তার স্বতস্ফূর্ত্তি থাকে না।' আল্লামা শামী রহ. বলেন, 'যেসব কারণে মানুষের মেধা দুর্বল হয়, তন্মধ্যে একটি হলো, নিজের লজ্জাস্থান নিয়ে খেলা করা এবং লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করা।' ১০৬ মোটকথা, চোখের মাধ্যমে প্রকাশিত অপছন্দনীয় কাজসমূহের মধ্যে অনর্থক নিজের লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করাও অন্তর্ভুক্ত। এ থেকে দৃষ্টি হেফাযত করা উচিত।

টিকাঃ
১০৬. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৬০।
১০৬. শামী, ১/২২৫, কিতাবুত তাহারাত।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 স্বামী-স্ত্রী নিজেদের গোপন কথা প্রকাশ করবে না

📄 স্বামী-স্ত্রী নিজেদের গোপন কথা প্রকাশ করবে না


স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক কথাবার্তা প্রকাশ করা অত্যন্ত নির্লজ্জতা ও ঘৃণিত কাজ। এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘إِنَّ مِنْ شَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلُ، يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا.’ কিয়ামতৈর দিন আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে ঐ ব্যক্তি, যে স্ত্রীসহবাসের পর স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে; অথবা ঐ নারী, যে স্বামীসঙ্গমের পর স্বামীর গোপন কথা প্রকাশ করে। ১০৭ হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ রা. বলেন, একবার আমি একদল নারী ও পুরুষের সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, 'অনেক সময় স্বামী স্ত্রীদের মধ্যে অন্যের কথা বর্ণনা করে, আবার অনেক সময় স্ত্রীও স্বামীর কথা অন্যের কাছে বর্ণনা করে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথা শুনে সবাই নীরব রইল। আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কেউ কি এমন করতে পারে?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘فَلَا تَفْعَلُوْا فَإِنَّمَا مِثْلُ ذَلِكَ مِثْلُ شَيْطَانٍ لَقِيَ شَيْطَانَةً فَغَشِيَهَا وَالنَّاسُ يَنْظُرُوْنَ.’ তোমরা এমন করবে না। কারণ এটা এমন এক কাজ, যেমন কোনো শয়তান কোনো শয়তানীর সঙ্গে (প্রকাশ্যে) সহবাস করল। আর লোকজন তাদের এই কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করল। ১০৮
ইসলাম লজ্জাকর বিষয়াদি প্রকাশ্যে করা নিষেধ করে দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক গোপন কথা প্রকাশ করা জঘন্য পর্যায়ের নির্লজ্জতা এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জার পরিপন্থী। তাই আমাদের উচিত, এই জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকা। বিশেষত নবদম্পতিদের এই বিষয়ের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। এই জন্য যে, বর্তমান যুবকেরা সমাজে তাদের বাসর রাতের গোপন কথা প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। হাদিসের আলোকে জানা যায়, স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করা এবং তা প্রকাশ করতে বাধ্য করা, দুইটাই জঘন্য কাজ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এসব থেকে হেফাযত করুন। আমিন।

টিকাঃ
১০৭. মুসলিম, ১/৪৬৪; আবু দাউদ; আবু-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৬১।
১০৮. মুসনাদে আহমদ; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৬১।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 অন্যের ঘরে উঁকিঝুঁকি দেওয়া

📄 অন্যের ঘরে উঁকিঝুঁকি দেওয়া


চোখের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া গুনাহসমূহের মধ্যে অন্যতম গুনাহ হলো দরজা-জানালার ফাঁক দিয়ে অন্যের ঘরে উঁকি মারা। অথবা ঘরের দরজা খোলা থাকলে সরাসরি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো। কারণ ঘরে প্রবেশের পূর্বে ঘরের ভেতর তাকানো অনুমতি গ্রহণের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। এ বিষয়ে নিম্নে কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হলো:
১. একবার হযরত সাআদ ইবনে মুয়ায রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরার দরজার বরাবর দাঁড়িয়ে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দরজার এক প্রান্তে দাঁড়ানোর ইশারা করে ইরশাদ করেন, ‘হে মুয়ায, এভাবে একপাশে আড়ালে দাঁড়াবে। এই জন্য যে অনুমতিগ্রহণের বিধান প্রবর্তিত হওয়ার কারণ হলো, যাতে আগন্তুক ব্যক্তি ঘরের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য দেখে না ফেলে।’ ১০৯
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঁকি মারাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন। হযরত সাহল ইবনে সাআদ রা. বলেন, একবার এক ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো এক হুজরায় উঁকি মারল। তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটা মিদরা ছিল, যা দিয়ে তিনি মাথা চুলকাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন,
‘لَوْ أَعْلَمُ أَنَّكَ تُنْظُرُ لَطَعَنْتُ بِهِ فِي عَيْنِكَ، إِنَّمَا جُعِلَ الْإِسْتِئْذَانُ مِنْ أَجْلِ الْبَصَرِ.’
যদি আমি জানতাম যে, তুমি উঁকি মারবে, তা হলে এ দিয়ে তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। তাকানোর জন্যই অনুমতির বিধান দেওয়া হয়েছে। ১৪৯
বুখারী ও মুসলিম শরীফে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি বিনা অনুমতিতে ঘরের ভেতরে তাকাবে, ঘরবাসীর জন্য তার চোখ ফুঁড়ে দেওয়া জায়েয আছে। ১৫০
৩. হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. বলেন,
‘مَنْ مَلَأَ عَيْنَيْهِ مِنْ قَاعَةِ بَيْتٍ، قَبْلَ أَنْ يُؤْذَنَ لَهُ فَقَدْ فَسَقَ.’
যে ব্যক্তি বিনা অনুমতিতে ঘরের ভেতরাংশে চোখ ভরে দেখল, সে গুনাহের কাজ করল। ১৫১
কাজেই আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে নিষিদ্ধ বস্তু অবলোকন থেকে হেফাযত করা প্রকৃত অর্থে আল্লাহর প্রতি লজ্জা রাখার দাবি ও পূর্বশর্ত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
১০৯. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/৪৬৩, হাদিস নং-৮৮২৬।
১৪৯. বুখারী, ২/৯২২, হাদিস নং-৫৯৩৮।
১৫০. মুসলিম, ২/২১২।
১৫১. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৩/৪৪৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px