📄 নজর হেফাযত সংক্রান্ত কতিপয় হাদিস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুদৃষ্টিকে শয়তানের বিষাক্ত তীর সাব্যস্ত করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘الْنَّظْرَةُ سَهُمْ مِّنْ سِهَامِ الشَّيْطَانِ فَمَنْ تَرَكَهَا مَخَافَتِي غَفَرْتُهُ’ কুদৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীর। যে ব্যক্তি আমার ভয়ে তা বর্জন করবে, আমি এর পরিবর্তে তাকে এমন ঈমান দান করব, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করবে। ১৩০
অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুদৃষ্টি সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হযরত আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
১. তোমরা নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখো এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করবে। অন্যথায় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারার নূর ছিনিয়ে নেবেন। ১০১
২. কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, ‘যদি হঠাৎ কোনো বেগানা নারীর ওপর চোখ পড়ে যায়, তা হলে আমি কী করব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, ‘তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবে।’ ১০২
৩. হযরত আলী রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উপদেশ দিয়েছিলেন যে, একবার অনিচ্ছায় দৃষ্টিপাত হলে দ্বিতীয়বার দেখার ইচ্ছা করবে না। কারণ প্রথমবার (অনিচ্ছায়) চোখ পড়ার কারণে তা মাফ হয়ে যায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখার কোনো সুযোগ নেই। ১০৩
৪. হযরত হাসান বসরী রহ. সাহাবীর নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহর লানত, যে স্বেচ্ছায় (কোনো গোপন অঙ্গ বা কোনো বেগানা নারীর প্রতি) দৃষ্টিপাত করল। এবং ঐ ব্যক্তিও অভিশপ্ত, যাকে (ওজরহীন) বেপর্দা দেখা যায়। ১০৪
এসকল আয়াত ও হাদিস থেকে সহজেই অনুমিত হয়, নজর হেফাযতের ব্যাপারে শরীয়ত কতটা গুরুত্বারোপ করেছে।
টিকাঃ
১৩০. আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, ৩/২০।
১০১. আদ-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/২৮।
১০২. মিশকাত, ২/২৬৮।
১০৩. মিশকাত, ২/২৬৮।
১০৪. মিশকাত, ২/২৬০।
📄 পর্দার বিধিবিধান
ইসলামী আইনশাস্ত্রে পর্দার বিধানাবলি সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে মানুষ তা পাঠ করে সর্বতোভাবে নিজের দৃষ্টিকে জাহান্নামের ইন্ধন হওয়া থেকে হেফাযত করতে পারে। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. ‘ইসলাম ও পর্দার কসম’ কিতাবে পর্দার বিধানাবলির সারমর্ম উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে তা নিম্নে প্রদত্ত হলো:
* পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত আবৃত রাখা ফরজ। নারী-পুরুষের সম্মুখে তা খোলা জায়েয নেই। তবে নিজের স্ত্রীর সামনে খুলতে পারবে। তার সামনে কোনো অঙ্গ ঢাকা জরুরি নয়। তবে তাকেও অপ্রয়োজনে সতর দেখানো অনুত্তম।
* মহিলাদের জন্য অপর (মুসলমি) মহিলার সামনে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত খোলা জায়েয নেই। এ থেকে জানা যায়, কতিপয় মহিলা (বিশেষত গ্রামীণ মহিলারা) যে অন্যান্য মহিলার সামনে বিবস্ত্র হয়ে বসে থাকে, তা ভয়ংকর গুনাহ।
* শরয়ী মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ চিরকালের জন্য হারাম) পুরুষের সামনে মহিলার নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ও কোমর ও পিঠ খোলা হারাম। তার মাথা, মুখমণ্ডল, বাহু ও পায়ের গোছা খুললে গুনাহ হবে না। তবে অপ্রয়োজনে কোনো কোনো অঙ্গ খোলাও উচিত নয়। শরয়ী মাহরাম ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সারা জীবনে কোনোভাবেই জায়েয নেই। যেমন : বাবা, ছেলে, আপন ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই (সৎ-মার গর্ভজাত সন্তান), বৈপিত্রেয় ভাই (একই মায়ের গর্ভে সৎ-বাবার ঔরসজাত সন্তান), এসকল ভাইয়ের সন্তান, ভাগিনা এ ধরনের তিন প্রকারের সন্তান; মোটকথা এমন আত্মীয় যার সঙ্গে চিরদিনের জন্য বিবাহ হারাম। আর যার সঙ্গে জীবনে কখনও না কখনও বিবাহ বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাকে শরয়ী মাহরাম বলা হয় না; বরং সে গায়রে মাহরাম। শরীয়তে পরপুরুষের যে বিধান, গায়রে মাহরামেরও একই বিধান। যদিও তার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। যেমন : চাচাত ভাই, ফুফাত ভাই, খালাত ভাই, মামাত ভাই, দেবর, ননদের স্বামী ইত্যাদি। এদের সঙ্গে গায়রে মাহরামের মতোই চলতে হবে। বরং যেহেতু এসব ক্ষেত্রে ফিতনায় পতীত হওয়ার আশঙ্কা বেশি, তাই এ ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
* যে ব্যক্তি শরীয়ত অনুযায়ী গায়রে মাহরাম, তার সামনে মাথা, বাহু, পায়ের গোছা ইত্যাদি অঙ্গ খোলা হারাম। একান্ত বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে—যেমন, প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য ঘর থেকে বের হওয়া, ঘরে কোনো আত্মীয়ের অধিক আগমনের সময় অঙ্গসত্তার কারণে সর্বদা পর্দা করা কঠিন হওয়া ইত্যাদি—শুধু চেহারা, কবজি পর্যন্ত হাত এবং টাখনু পর্যন্ত পা খোলা যাবে। তাই এসব মহিলার উচিতও ভালোভাবে ঢাকা, বড় হাতাওয়ালা জামা পরা, টাইট পাজামা না পরা এবং কবজি ও টাখনু না খোলা।
* যেসব অঙ্গ খোলা জায়েয নেই (যার বিস্তারিত বিবরণ এই মাত্র বর্ণনা করা হয়েছে), সাধারণত তা দেখাও হারাম, যদিও এর দ্বারা কোনো কামভাবের আশঙ্কা না থাকে। আর যেসব অঙ্গ দেখা জায়েয, সে ক্ষেত্রে শর্ত হলো, কামভাবের আশঙ্কা না থাকা। যদি কুৎসিত সামান্য ভয়ও থাকে, সেক্ষেত্রেও তা দেখা হারাম। একটু ভেবে দেখুন, বৃদ্ধ মহিলা, যার প্রতি সাধারণত আকৃষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না, তার চেহারা দেখা তো জায়েয। তবে মাথা, বাহু ও অন্যান্য অঙ্গ দেখা জায়েয নেই। এই সমস্ত মহিলা ঘরোয়া পরিবেশে এসব বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয় না এবং গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে মাথা ও বাহু খুলে বসে থাকে। এর দরুন নিজেও গুনাহগার হয় এবং পুরুষদেরও গুনাহের তগিদ দেয়।
* যেসব অঙ্গ দেখা হারাম, চিকিৎসার প্রয়োজনে তা দেখা জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, সে স্থানের বাইরে দৃষ্টিপাত করবে না।
* নারীদের জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে নির্জন পরিবেশে একাকী অবস্থান হারাম। এমনকি যদি একা না হয়, বরং অপর মহিলা উপস্থিত থাকেও, কিন্তু সেও পুরুষের গায়রে মাহরাম হয়, তা হলেও উক্ত পুরুষের জন্য এমন স্থানে থাকা জায়েয হবে না। হ্যাঁ, তবে যদি সেই মহিলার কোনো মাহরাম পুরুষ বা স্বামী অথবা সেই পুরুষের কোনো মাহরাম নারী বা স্ত্রী উপস্থিত থাকে, তা হলে কোনো সমস্যা নেই। (তবে এক্ষেত্রেও শর্ত হলো ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা।)
* অপ্রয়োজনে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের পরস্পর কথা বলা নিষেধ। আবার প্রয়োজনের সময়ও অতিরিক্ত কথা বলবে না, হাসাহাসি করবে না, মোলায়েমভাবে কথা বলবে না এবং কণ্ঠস্বরকে কোমলও করবে না।
* পুরুষের গানের আওয়াজ এবং পরনারীর গানের আওয়াজ পুরুষের শোনা নিষেধ।
* ফুকাহায়েকেরাম গায়রে মাহরাম যুবতী মেয়েকে সালাম দেওয়া এবং তার সালামের উত্তর দেওয়াও নিষেধ করেছেন।
* যদি অন্তরে স্বাদ অনুভূত হয়, তবে গায়রে মাহরাম মেয়ের উচ্ছিষ্ট পুরুষের জন্য এবং গায়রে মাহরাম পুরুষের উচ্ছিষ্ট নারীর জন্য খাওয়া মাকরূহ।
* যদি গায়রে মাহরামের পোশাক দেখে মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তবে তা-ও দেখা হারাম।
* এমন নাবালেগ মেয়ে, যাকে দেখে মনে কুপ্রবৃত্তি জাগ্রত হয়, তার হুকুম সাবালেগ মেয়ের মতোই।
* যেভাবে খারাপ উদ্দেশ্যে গায়রে মাহরামের দিকে তাকানো, তার আওয়াজ শোনা, তার সঙ্গে কথা বলা, তার সঙ্গে চলাফেরা করা নাজায়েয, অনুরূপ মনে মনে তাকেও ভাবাও হারাম। এটা অন্তরের যিনা।
* অনুরূপ গায়রে মাহরামের আলোচনা করা, আলোচনা শ্রবণ করা, ছবি দেখা, তার কাছে চিঠি পাঠানো নাজায়েয। মোটকথা, এমন সব কাজ হারাম, যা অন্তরে নষ্ট চিন্তা উদিত করে।
* যেভাবে অপ্রয়োজনে গায়রে মাহরাম মেয়েকে দেখা পুরুষের জন্য জায়েয নেই, অনুরূপ মহিলার জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষকে চুপিসারে দেখা জায়েয নেই। এ থেকে বুঝা যায়, মহিলাদের জন্য পর্দার আড়াল থেকে চুপিসারে পুরুষদের দেখা এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে এরূপ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাও নাজায়েয।
* এমন মিহি কাপড়, যা পরলে শারীরিক সৌন্দর্য বেড়ে যায়, তা নগ্নতার নামান্তর। হাদিস শরিফে এ কাজকে অত্যন্ত জঘন্য ও নিন্দনীয় আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
* যেসব অলংকার শব্দ গায়রে মাহরাম পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছায় অথবা এমন সুঘ্রাণ যা গায়রে মাহরামের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তা ব্যবহার করা মহিলাদের জন্য জায়েয নেই। এটাও বেপর্দার অন্তর্ভুক্ত। আর যেসব অলংকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজে না, বরং অন্য কিছুর সহযোগিতায় বাজে, তা থেকে বাঁচাও ওয়াজিব। এমন অলংকার পায়ে দিলে মাটিতে আছড়ে রাখবে।
* ছোট্ট বাচ্চাকেও আওয়াজ করে এমন অলংকার পরাবে না।
* গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে বেপর্দা হওয়া হারাম।
* দাড়িবিহীন সুদর্শন ছেলেরা কতিপয় ফুকাহায়ে কিরামের ক্ষেত্রে বেগানা নারীর মতো। অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তির আশঙ্কা থাকলে তার দিকে দৃষ্টিপাত করা, মুসাফাহা-মুআনাকা করা, নির্জনে তার সঙ্গে বসা, তার কণ্ঠে গান শোনা, তার সামনে গান গাওয়ানো, তার দ্বারা শরীর ম্যাসাজ করা এবং তার সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা হারাম।
* মহিলাদের জন্য মাহরাম পুরুষ ব্যতীত সফর করা হারাম।
* কেউ কেউ যুবতী বা যুবতীপ্রায় মেয়েদের অন্ধ বা দৃষ্টিসম্পন্ন পুরুষদের কাছে বেপর্দার সাথে পড়ানো হয়। এটা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী কাজ। ১০৫
এসকল মাসআলায় কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বক্তব্য থেকে উদ্ঘাটিত ‘ইসলাম ও পর্দার কসম’ কিতাবের টিকায় এগুলোর ফিকহী হাওয়ালা (বরাত) উল্লেখ রয়েছে। এর প্রত্যেকটি মাসআলা পাঠ করে আমাদের ভাবা উচিত, আমাদের ঘরে এর কতগুলোর উপর আমল করা হয় আর কতগুলোর বিরুদ্ধে আমল করা হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের শরীয়তের উপর পূর্ণরূপে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১০৫. ইসলাম ও পর্দা, ৫৬-৫৭ (কিছুটা পরিবর্তনসহ)।
📄 পাতলা ও আঁটসাঁট কাপড় পরাও নিষেধ
পর্দার আরেকটি বিধান হলো পুরুষ বা মহিলা এমন কোনো পোশাক পরিধান করবে না, যার মাধ্যমে শরীরের গোপন অঙ্গসমূহ আবৃত হওয়ার পরিবর্তে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ফুটে ওঠে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় জাহান্নামী মহিলার এই অপরাধ বর্ণনা করেছেন যে, তারা পোশাক পরিধান করেও উলঙ্গ থাকত। ১০৬
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসিনে কেরাম বলেন, ‘এই ধরনের কাপড় দ্বারা হয়তো এমন কাপড় উদ্দেশ্য, যা শরীরের আকার-আকৃতি গোপন করতে পারে না।’ ১০৭ তাবারানী শরীফে প্রসিদ্ধ সাহাবী জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর নিম্নোক্ত বাণী বর্ণনা করা হয়েছে যে,
‘الرَّجُلُ لَيْسَ وَهُوَ عارٍ يَعْنِي الثِّيابُ الرِّقاقُ’
মানুষ এমন কাপড় পরিধান করে, যে কাপড় পরলেও সে উলঙ্গ থাকে। ১০৮
বর্তমানে আধুনিক ফ্যাশনে এই উভয় বিষয়ই সমহারে বিদ্যমান। হয়তো এমন পাতলা কাপড় পরিধান করে, যাতে শরীর আরও আকর্ষণীয় হয়; অথবা এমন আঁটসাঁট (টাইট) কাপড় পরে, যা শরীরের গোপনীয় অংশ প্রকাশ করে দেয়। এ ধরনের পোশাক নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য লজ্জাকর এবং সুস্থ রুচিবোধের পরিপন্থী। জিন্স ও টি শার্টের ফ্যাশন ব্যাপক হওয়ার পর থেকে রুচির এই বিপর্যয় আরও ব্যাপক হয়ে গেছে। যুবক-যুবতীরা জনসম্মুখে এ ধরনের পোশাক পরে নির্লজ্জতার মহড়া দিচ্ছে। কিন্তু তা আমাদের অনুভূতিতে একটুও আঘাত করে না। অথচ আল্লাহ তায়ালার প্রতি প্রকৃত লজ্জার দাবি হলো, আমরা নিজেরা এ ধরনের নির্লজ্জতা থেকে বিরত থাকব এবং পরিবারের সদস্যদেরও এ থেকে বাঁচাব।
টিকাঃ
১০৬. মুসলিম, ২/২০৯।
১০৭. শরহে মুসলিম লিন নববী, ২/২০৯।
১০৮. আল-লিবাস ওযায মিনাতি মুহাম্মাদ মুহাজরা, ৪৬।
📄 নির্জনেও প্রয়োজন ছাড়া সতর খুলবে না
আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জার দাবি হলো, আমরা নির্জনেও (একাকী থাকা অবস্থায়ও) যথাসাধ্য নিজের সতর ঢেকে রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকব।
১. হযরত বাহয ইবনে হাকিম নিজের দাদার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা কার সামনে সতর রক্ষা করব আর কার সামনে রক্ষা করব না?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'স্ত্রী ও বাঁদি ব্যতীত অন্যান্য সবার সামনে সতর রক্ষা করবে।' অতঃপর উক্ত সাহাবী আরও জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, যদি আমাদের সঙ্গে অন্য লোক থাকে, তা হলে আমরা কী করব?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, 'নিজের সতর রক্ষার ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। কারণ দৃষ্টি যেন তোমার সতরের উপর না পড়ে।' অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'একাকী অবস্থায় কী করব?' এর জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, فَاللهُ أَحَقُّ أَنْ يُسْتَحْيَا مِنْهُ মানুষের চেয়ে আল্লাহ তায়ালা এই বিষয়ের অধিক হকদার যে, তাকে লজ্জা করা হবে। ১০১ ইমাম বাইহাকী রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, 'এই বিষয়ে লজ্জা করা উচিত যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের যেন এমন অবস্থায় না দেখেন, যখন আমরা লজ্জাহীনের দিকে দৃষ্টিপাত করি। কারণ কোনো বস্তু কোনো কোনো স্থানে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ থেকে গোপন নয়। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে বলা যায়, সতরের গোপনীয়তা রক্ষার প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া যেন আল্লাহর সম্মুখে নির্লজ্জ হওয়া। পক্ষান্তরে সতর হেফাযতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়াই পরিপূর্ণ লজ্জা। ১০২
২. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. একবার বক্তৃতাকালে এই উপদেশ প্রদান করেন: ‘يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ، اسْتَحْيُوْا مِنَ اللهِ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنِّي لَأَظَلُّ حِينَ أَذْهَبُ إِلَى الْغَائِطِ فِي الْفَلَاءِ مُتَقَنِّعًا بِثَوْبِي اسْتِحْيَاءً مِنْ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ.’ হে মুসলমানগণ, আল্লাহকে লজ্জা করো। ঐ সত্তার শপথ, যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ, আমি পায়খানায় গমনের পর থেকে প্রয়োজন পূর্ণ করা পর্যন্ত আল্লাহর লজ্জায় কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখি। ১০৩ অর্থাৎ সতর রক্ষার ব্যাপারে যথাসাধ্য গুরুত্বারোপ করবে।
৩. হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন, প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবু মূসা আশআরী রা. ঘুমোর সময় (লুঙ্গির নিচে) অন্য কিছু পরে ঘুমাতেন। যাতে কোনো অবস্থাতেই সতর খুলে না যায়। ১০৪
৪. এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতকে এই নির্দেশনা দিয়েছেন যে, ‘إِنَّ اللَّهَ حَيٌّ سِتِّيرٌ، فَإِذَا أَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يَغْتَسِلَ فَلْيَتَوارَ بِشَيْءٍ’ আল্লাহ তায়ালা লজ্জাশীল। এবং সতর আবৃত থাকাকে তিনি ভালোবাসেন। সুতরাং তোমাদের কেউ গোসলের ইচ্ছা করলে কোনো কিছুর মাধ্যমে নিজেকে আড়াল করবে। ১০৫
আজকাল সাধারণত একাকী অবস্থায় সতর ঢেকে রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এমনকি ঘরের বাইরে রাস্তার ধারে খাল-বিল ও পানির ট্যাঙ্কিকেও বয়স্ক লোকদের সতরের ব্যাপারে উদাসীন অবস্থায় গোসল করতে দেখা যায়। নদীর তীরে ও সমুদ্র সৈকতেও এরূপ নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার দৃশ্য সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয়। একটু ভেবে দেখুন, শরিয়ত যেখানে একাকী অবস্থায়ও প্রয়োজন ছাড়া সতর খুলতে নিষেধ করেছে, তা হলে প্রকাশ্যে এ ধরনের নির্লজ্জতা কীভাবে অনুমোদন পেতে পারে?!
টিকাঃ
১০১. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৬০।
১০২. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৬১।
১০৩. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৬২।
১০৪. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৬১।
১০৫. মুসনাদে আহমদ, ১৭৯৭০; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৬১।