📄 চোখের হেফাযত
শরিয়তের দৃষ্টিতে মাথা হেফাযতের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চোখ তথা দৃষ্টিকে গুনাহ থেকে হেফাযত করা। চোখের একটু অসতর্কতা মানুষকে বড় বড় গুনাহে লিপ্ত করে দেয়। বর্তমান পৃথিবীতে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও নিলর্জ্জতার যে ছড়াছড়ি, এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, বদনজর বা কুদৃষ্টি। শয়তান মানুষের হাতে কুদৃষ্টির অস্ত্র তুলে দিয়ে ফুরফুরা মেজাজে রয়েছে। এখন মানুষের মাধ্যমে বড় বড় কুফরি কাজ করাতেও তার বেশি কষ্ট করতে হয় না। কুদৃষ্টিই শয়তানের মনোবাসনা পরিপূর্ণরূপে আনজাম দেওয়ার কাজ করে। দৃষ্টি হেফাযতের ক্ষেত্রে অবহেলে নির্লজ্জতার মূল ভিত্তি, সকল ফিতনা-ফাসাদ এবং গুনাহ ও অপকর্মের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে সহজেই অনুমান করা যায়, বর্তমান পৃথিবীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শতকরা ৯০ ভাগ এ কারণেই সংগঠিত হয় যে, এখন নোংরামি সিনেমা হল, টিভি প্রোগ্রাম ও ভিডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে লালনপালন করা হয়। এসব চিত্তাকর্ষক শয়তানী বস্তু মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে লজ্জাশীলতার অস্তিত্ব মুছে ফেলেছে, মর্যাদাবান লোকদের মান-মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে ফেলেছে, দীনদার লোকদের সুখ্যাতি কালিমামুক্ত করেছে। এই কুদৃষ্টির কারণেই মানুষের তাকওয়া-পরহেজগারীর সুদৃঢ় মিনারে ফাটল ধরে এবং একটু অসতর্কতার কারণে সারা জীবনের নেক কাজগুলো ভস্ম হয়ে যায়।
ইসলাম কুদৃষ্টি নামক এই জঘন্য গুনাহের অশুভ পরিণাম ও ভয়াবহতার কথা ব্যক্ত করে কুদৃষ্টির সকল পথ বন্ধ করার জোর নির্দেশ দিয়েছে। কুরআনে কারিম ও হাদিস শরিফের নির্দেশনা এ বিষয়ে আমাদের সঠিক পথের দিশা দেয়। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
‘قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ’
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। ১২৮
এমন নির্দেশ মুসলিম নারীদেরকেও বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, তারা যেন নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে, যা আপনিই প্রকাশ পায় তা ছাড়া। ১২৯
এ ছাড়া সূরা আহযাবে পর্দার যে বিধান দেওয়া হয়েছে, তা-ও কুদৃষ্টির পথ রুখে দেওয়ার ভূমিকা পালন করে। ইসলাম এ সকল বিধানকে ওয়াজিবের স্তর দান করার মাধ্যমে দীন ইসলামকে একটি সমৃদ্ধশীল ও সত্যিকার অর্থে আমলযোগ্য ধর্মরূপে প্রকাশ করেছে। তাই এই বেহায়াপনা ও অশ্লীলতাকে মূল থেকে উপড়ে ফেলতে ইসলাম বদ্ধপরিকর। ইসলাম বর্তমান পৃথিবীর খ্যাতনামা সব সুশীল সমাজের মতো নয়, যারা অশ্লীলতা রোধে কেবল রেওয়াজ, রেওয়াজ করে; বরং নিজেরাই অপার্থিব নোংরামিতে ভরে আছে। কুরআন ও হাদিস অশ্লীলতার মূল ভিত্তি (যেখান থেকে এই ব্যাধি শিকড় গেড়ে বসে) তথা অসতর্ক দৃষ্টিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দিয়েছে। এটা এমন মৌলিক বিষয়, যদি কেবল কুদৃষ্টিকে পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে পৃথিবী থেকে সকল নির্লজ্জতার অপসারণ ঘটবে।
টিকাঃ
১২৮. সূরা নূর, আয়াত : ৩০।
১২৯. সূরা নূর, আয়াত : ৩১।
📄 নজর হেফাযত সংক্রান্ত কতিপয় হাদিস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুদৃষ্টিকে শয়তানের বিষাক্ত তীর সাব্যস্ত করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘الْنَّظْرَةُ سَهُمْ مِّنْ سِهَامِ الشَّيْطَانِ فَمَنْ تَرَكَهَا مَخَافَتِي غَفَرْتُهُ’ কুদৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীর। যে ব্যক্তি আমার ভয়ে তা বর্জন করবে, আমি এর পরিবর্তে তাকে এমন ঈমান দান করব, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করবে। ১৩০
অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুদৃষ্টি সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হযরত আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
১. তোমরা নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখো এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করবে। অন্যথায় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারার নূর ছিনিয়ে নেবেন। ১০১
২. কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, ‘যদি হঠাৎ কোনো বেগানা নারীর ওপর চোখ পড়ে যায়, তা হলে আমি কী করব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, ‘তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবে।’ ১০২
৩. হযরত আলী রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উপদেশ দিয়েছিলেন যে, একবার অনিচ্ছায় দৃষ্টিপাত হলে দ্বিতীয়বার দেখার ইচ্ছা করবে না। কারণ প্রথমবার (অনিচ্ছায়) চোখ পড়ার কারণে তা মাফ হয়ে যায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখার কোনো সুযোগ নেই। ১০৩
৪. হযরত হাসান বসরী রহ. সাহাবীর নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহর লানত, যে স্বেচ্ছায় (কোনো গোপন অঙ্গ বা কোনো বেগানা নারীর প্রতি) দৃষ্টিপাত করল। এবং ঐ ব্যক্তিও অভিশপ্ত, যাকে (ওজরহীন) বেপর্দা দেখা যায়। ১০৪
এসকল আয়াত ও হাদিস থেকে সহজেই অনুমিত হয়, নজর হেফাযতের ব্যাপারে শরীয়ত কতটা গুরুত্বারোপ করেছে।
টিকাঃ
১৩০. আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, ৩/২০।
১০১. আদ-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/২৮।
১০২. মিশকাত, ২/২৬৮।
১০৩. মিশকাত, ২/২৬৮।
১০৪. মিশকাত, ২/২৬০।
📄 পর্দার বিধিবিধান
ইসলামী আইনশাস্ত্রে পর্দার বিধানাবলি সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে মানুষ তা পাঠ করে সর্বতোভাবে নিজের দৃষ্টিকে জাহান্নামের ইন্ধন হওয়া থেকে হেফাযত করতে পারে। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. ‘ইসলাম ও পর্দার কসম’ কিতাবে পর্দার বিধানাবলির সারমর্ম উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে তা নিম্নে প্রদত্ত হলো:
* পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত আবৃত রাখা ফরজ। নারী-পুরুষের সম্মুখে তা খোলা জায়েয নেই। তবে নিজের স্ত্রীর সামনে খুলতে পারবে। তার সামনে কোনো অঙ্গ ঢাকা জরুরি নয়। তবে তাকেও অপ্রয়োজনে সতর দেখানো অনুত্তম।
* মহিলাদের জন্য অপর (মুসলমি) মহিলার সামনে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত খোলা জায়েয নেই। এ থেকে জানা যায়, কতিপয় মহিলা (বিশেষত গ্রামীণ মহিলারা) যে অন্যান্য মহিলার সামনে বিবস্ত্র হয়ে বসে থাকে, তা ভয়ংকর গুনাহ।
* শরয়ী মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ চিরকালের জন্য হারাম) পুরুষের সামনে মহিলার নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ও কোমর ও পিঠ খোলা হারাম। তার মাথা, মুখমণ্ডল, বাহু ও পায়ের গোছা খুললে গুনাহ হবে না। তবে অপ্রয়োজনে কোনো কোনো অঙ্গ খোলাও উচিত নয়। শরয়ী মাহরাম ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সারা জীবনে কোনোভাবেই জায়েয নেই। যেমন : বাবা, ছেলে, আপন ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই (সৎ-মার গর্ভজাত সন্তান), বৈপিত্রেয় ভাই (একই মায়ের গর্ভে সৎ-বাবার ঔরসজাত সন্তান), এসকল ভাইয়ের সন্তান, ভাগিনা এ ধরনের তিন প্রকারের সন্তান; মোটকথা এমন আত্মীয় যার সঙ্গে চিরদিনের জন্য বিবাহ হারাম। আর যার সঙ্গে জীবনে কখনও না কখনও বিবাহ বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাকে শরয়ী মাহরাম বলা হয় না; বরং সে গায়রে মাহরাম। শরীয়তে পরপুরুষের যে বিধান, গায়রে মাহরামেরও একই বিধান। যদিও তার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। যেমন : চাচাত ভাই, ফুফাত ভাই, খালাত ভাই, মামাত ভাই, দেবর, ননদের স্বামী ইত্যাদি। এদের সঙ্গে গায়রে মাহরামের মতোই চলতে হবে। বরং যেহেতু এসব ক্ষেত্রে ফিতনায় পতীত হওয়ার আশঙ্কা বেশি, তাই এ ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
* যে ব্যক্তি শরীয়ত অনুযায়ী গায়রে মাহরাম, তার সামনে মাথা, বাহু, পায়ের গোছা ইত্যাদি অঙ্গ খোলা হারাম। একান্ত বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে—যেমন, প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য ঘর থেকে বের হওয়া, ঘরে কোনো আত্মীয়ের অধিক আগমনের সময় অঙ্গসত্তার কারণে সর্বদা পর্দা করা কঠিন হওয়া ইত্যাদি—শুধু চেহারা, কবজি পর্যন্ত হাত এবং টাখনু পর্যন্ত পা খোলা যাবে। তাই এসব মহিলার উচিতও ভালোভাবে ঢাকা, বড় হাতাওয়ালা জামা পরা, টাইট পাজামা না পরা এবং কবজি ও টাখনু না খোলা।
* যেসব অঙ্গ খোলা জায়েয নেই (যার বিস্তারিত বিবরণ এই মাত্র বর্ণনা করা হয়েছে), সাধারণত তা দেখাও হারাম, যদিও এর দ্বারা কোনো কামভাবের আশঙ্কা না থাকে। আর যেসব অঙ্গ দেখা জায়েয, সে ক্ষেত্রে শর্ত হলো, কামভাবের আশঙ্কা না থাকা। যদি কুৎসিত সামান্য ভয়ও থাকে, সেক্ষেত্রেও তা দেখা হারাম। একটু ভেবে দেখুন, বৃদ্ধ মহিলা, যার প্রতি সাধারণত আকৃষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না, তার চেহারা দেখা তো জায়েয। তবে মাথা, বাহু ও অন্যান্য অঙ্গ দেখা জায়েয নেই। এই সমস্ত মহিলা ঘরোয়া পরিবেশে এসব বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয় না এবং গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে মাথা ও বাহু খুলে বসে থাকে। এর দরুন নিজেও গুনাহগার হয় এবং পুরুষদেরও গুনাহের তগিদ দেয়।
* যেসব অঙ্গ দেখা হারাম, চিকিৎসার প্রয়োজনে তা দেখা জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, সে স্থানের বাইরে দৃষ্টিপাত করবে না।
* নারীদের জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে নির্জন পরিবেশে একাকী অবস্থান হারাম। এমনকি যদি একা না হয়, বরং অপর মহিলা উপস্থিত থাকেও, কিন্তু সেও পুরুষের গায়রে মাহরাম হয়, তা হলেও উক্ত পুরুষের জন্য এমন স্থানে থাকা জায়েয হবে না। হ্যাঁ, তবে যদি সেই মহিলার কোনো মাহরাম পুরুষ বা স্বামী অথবা সেই পুরুষের কোনো মাহরাম নারী বা স্ত্রী উপস্থিত থাকে, তা হলে কোনো সমস্যা নেই। (তবে এক্ষেত্রেও শর্ত হলো ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা।)
* অপ্রয়োজনে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের পরস্পর কথা বলা নিষেধ। আবার প্রয়োজনের সময়ও অতিরিক্ত কথা বলবে না, হাসাহাসি করবে না, মোলায়েমভাবে কথা বলবে না এবং কণ্ঠস্বরকে কোমলও করবে না।
* পুরুষের গানের আওয়াজ এবং পরনারীর গানের আওয়াজ পুরুষের শোনা নিষেধ।
* ফুকাহায়েকেরাম গায়রে মাহরাম যুবতী মেয়েকে সালাম দেওয়া এবং তার সালামের উত্তর দেওয়াও নিষেধ করেছেন।
* যদি অন্তরে স্বাদ অনুভূত হয়, তবে গায়রে মাহরাম মেয়ের উচ্ছিষ্ট পুরুষের জন্য এবং গায়রে মাহরাম পুরুষের উচ্ছিষ্ট নারীর জন্য খাওয়া মাকরূহ।
* যদি গায়রে মাহরামের পোশাক দেখে মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তবে তা-ও দেখা হারাম।
* এমন নাবালেগ মেয়ে, যাকে দেখে মনে কুপ্রবৃত্তি জাগ্রত হয়, তার হুকুম সাবালেগ মেয়ের মতোই।
* যেভাবে খারাপ উদ্দেশ্যে গায়রে মাহরামের দিকে তাকানো, তার আওয়াজ শোনা, তার সঙ্গে কথা বলা, তার সঙ্গে চলাফেরা করা নাজায়েয, অনুরূপ মনে মনে তাকেও ভাবাও হারাম। এটা অন্তরের যিনা।
* অনুরূপ গায়রে মাহরামের আলোচনা করা, আলোচনা শ্রবণ করা, ছবি দেখা, তার কাছে চিঠি পাঠানো নাজায়েয। মোটকথা, এমন সব কাজ হারাম, যা অন্তরে নষ্ট চিন্তা উদিত করে।
* যেভাবে অপ্রয়োজনে গায়রে মাহরাম মেয়েকে দেখা পুরুষের জন্য জায়েয নেই, অনুরূপ মহিলার জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষকে চুপিসারে দেখা জায়েয নেই। এ থেকে বুঝা যায়, মহিলাদের জন্য পর্দার আড়াল থেকে চুপিসারে পুরুষদের দেখা এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে এরূপ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাও নাজায়েয।
* এমন মিহি কাপড়, যা পরলে শারীরিক সৌন্দর্য বেড়ে যায়, তা নগ্নতার নামান্তর। হাদিস শরিফে এ কাজকে অত্যন্ত জঘন্য ও নিন্দনীয় আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
* যেসব অলংকার শব্দ গায়রে মাহরাম পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছায় অথবা এমন সুঘ্রাণ যা গায়রে মাহরামের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তা ব্যবহার করা মহিলাদের জন্য জায়েয নেই। এটাও বেপর্দার অন্তর্ভুক্ত। আর যেসব অলংকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজে না, বরং অন্য কিছুর সহযোগিতায় বাজে, তা থেকে বাঁচাও ওয়াজিব। এমন অলংকার পায়ে দিলে মাটিতে আছড়ে রাখবে।
* ছোট্ট বাচ্চাকেও আওয়াজ করে এমন অলংকার পরাবে না।
* গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে বেপর্দা হওয়া হারাম।
* দাড়িবিহীন সুদর্শন ছেলেরা কতিপয় ফুকাহায়ে কিরামের ক্ষেত্রে বেগানা নারীর মতো। অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তির আশঙ্কা থাকলে তার দিকে দৃষ্টিপাত করা, মুসাফাহা-মুআনাকা করা, নির্জনে তার সঙ্গে বসা, তার কণ্ঠে গান শোনা, তার সামনে গান গাওয়ানো, তার দ্বারা শরীর ম্যাসাজ করা এবং তার সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা হারাম।
* মহিলাদের জন্য মাহরাম পুরুষ ব্যতীত সফর করা হারাম।
* কেউ কেউ যুবতী বা যুবতীপ্রায় মেয়েদের অন্ধ বা দৃষ্টিসম্পন্ন পুরুষদের কাছে বেপর্দার সাথে পড়ানো হয়। এটা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী কাজ। ১০৫
এসকল মাসআলায় কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বক্তব্য থেকে উদ্ঘাটিত ‘ইসলাম ও পর্দার কসম’ কিতাবের টিকায় এগুলোর ফিকহী হাওয়ালা (বরাত) উল্লেখ রয়েছে। এর প্রত্যেকটি মাসআলা পাঠ করে আমাদের ভাবা উচিত, আমাদের ঘরে এর কতগুলোর উপর আমল করা হয় আর কতগুলোর বিরুদ্ধে আমল করা হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের শরীয়তের উপর পূর্ণরূপে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১০৫. ইসলাম ও পর্দা, ৫৬-৫৭ (কিছুটা পরিবর্তনসহ)।
📄 পাতলা ও আঁটসাঁট কাপড় পরাও নিষেধ
পর্দার আরেকটি বিধান হলো পুরুষ বা মহিলা এমন কোনো পোশাক পরিধান করবে না, যার মাধ্যমে শরীরের গোপন অঙ্গসমূহ আবৃত হওয়ার পরিবর্তে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ফুটে ওঠে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় জাহান্নামী মহিলার এই অপরাধ বর্ণনা করেছেন যে, তারা পোশাক পরিধান করেও উলঙ্গ থাকত। ১০৬
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসিনে কেরাম বলেন, ‘এই ধরনের কাপড় দ্বারা হয়তো এমন কাপড় উদ্দেশ্য, যা শরীরের আকার-আকৃতি গোপন করতে পারে না।’ ১০৭ তাবারানী শরীফে প্রসিদ্ধ সাহাবী জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর নিম্নোক্ত বাণী বর্ণনা করা হয়েছে যে,
‘الرَّجُلُ لَيْسَ وَهُوَ عارٍ يَعْنِي الثِّيابُ الرِّقاقُ’
মানুষ এমন কাপড় পরিধান করে, যে কাপড় পরলেও সে উলঙ্গ থাকে। ১০৮
বর্তমানে আধুনিক ফ্যাশনে এই উভয় বিষয়ই সমহারে বিদ্যমান। হয়তো এমন পাতলা কাপড় পরিধান করে, যাতে শরীর আরও আকর্ষণীয় হয়; অথবা এমন আঁটসাঁট (টাইট) কাপড় পরে, যা শরীরের গোপনীয় অংশ প্রকাশ করে দেয়। এ ধরনের পোশাক নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য লজ্জাকর এবং সুস্থ রুচিবোধের পরিপন্থী। জিন্স ও টি শার্টের ফ্যাশন ব্যাপক হওয়ার পর থেকে রুচির এই বিপর্যয় আরও ব্যাপক হয়ে গেছে। যুবক-যুবতীরা জনসম্মুখে এ ধরনের পোশাক পরে নির্লজ্জতার মহড়া দিচ্ছে। কিন্তু তা আমাদের অনুভূতিতে একটুও আঘাত করে না। অথচ আল্লাহ তায়ালার প্রতি প্রকৃত লজ্জার দাবি হলো, আমরা নিজেরা এ ধরনের নির্লজ্জতা থেকে বিরত থাকব এবং পরিবারের সদস্যদেরও এ থেকে বাঁচাব।
টিকাঃ
১০৬. মুসলিম, ২/২০৯।
১০৭. শরহে মুসলিম লিন নববী, ২/২০৯।
১০৮. আল-লিবাস ওযায মিনাতি মুহাম্মাদ মুহাজরা, ৪৬।