📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 গালিগালাজ এবং অশ্লীল কথাবার্তা

📄 গালিগালাজ এবং অশ্লীল কথাবার্তা


যবান থেকে প্রকাশিত জঘন্য গুনাহের মধ্যে অশ্লীল কথাবার্তা ও গালিগালাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অশ্লীল কথা কোনো মুমিন ব্যক্তির শোভা পায় না। যবানের সাহায্যে যারা অপরকে কষ্ট দেয়, কুরআন কারিমে তাদের কঠিন গুনাহে লিপ্ত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন,
‘وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَ الْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا’
যারা মুমিন নর-নারীদের বিনা অপরাধে কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে। ১১৪ অপরদিকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গালিগালাজ ও অশ্লীল কথাবার্তার ব্যাপারে ভীষণ ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। নিম্নে এ বিষয়ে কতিপয় হাদিস উল্লেখ করা হলো—
১. ‘لَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ’ মুমিন ব্যক্তিকে অভিশাপ দেওয়া তাকে হত্যা করার নামান্তর। ১১৫
২. ‘لَا يَنْبَغِي لِصِدِّيقٍ أَنْ يَكُوْنَ لَعَّانًا’ কথায় কথায় লানত দেওয়া কোনো সত্যবাদীর শোভা পায় না। ১১৬
৩. ‘لَا يَكُوْنُ اللَّعَّانُونَ شُفَعَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ’ অভিশাপকারীরা কিয়ামতের দিন কারও জন্য না সুপারিশ করতে পারবে, আর না কারও পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারবে। ১১৭
৪. ‘لَا تَلَاعَنُوا بِلَعْنَةِ اللَّهِ، وَلَا بِغَضَبِ اللَّهِ، وَلَا بِجَهَنَّمَ.’ আল্লাহর লানত, গযব এবং জাহান্নাম দ্বারা তোমরা একে অপরকে লানত দিয়ো না। ১১৮
৫. ‘سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ.’ মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকী। ১১৯
৬. ‘لَا يَكُوْنُ الْمُؤْمِنُ لَعَّانًا.’ প্রকৃত মুমিন বান্দা কথায় কথায় লানত দিতে পারে না। ১২০
৭. ‘لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ.’ প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি দোষারোপকারী, লানতকারী, অশ্লীল কর্ম সম্পাদনকারী ও নির্লজ্জ হতে পারে না। ১২১
৮. ‘إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ فَتُغْلَقُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ دُوْنَهَا، ثُمَّ تَهْبِطُ إِلَى الْأَرْضِ فَتُغْلَقُ أَبْوَابُهَا دُوْনَهَا، ثُمَّ تَأْخُذُ يَمِينًا وَشَمَالًا، فَإِذَا لَمْ تَجِدْ مَسَاغًا رَجَعَتْ إِلَى الَّذِي لُعِنَ، فَإِنْ كَانَ لِأَهْلٍ أَهْلًا وَإِلَّا رَجَعَتْ إِلَى قَائِلِهَا.’ যখন কেউ কাউকে লানত করে, প্রথমে সে লানত আসমানের দিকে ওঠে। তার জন্য আসমানের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা আসমানের উপর উঠতে না পেরে জমিনে নেমে আসে। জমিনের অভ্যন্তরের রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ডানবামে রাস্তা খুঁজতে থাকে। কোথাও কোনো রাস্তা না পেয়ে লানতকৃত ব্যক্তির দিকে ফিরে। যদি লানতকৃত ব্যক্তি সেই লানতের উপযুক্ত হয়, তা হলে লানতটি তার উপর প্রয়োগ হয়। অন্যথায় লানতকারীর দিকে ফিরে আসে। ১২২
৯. ‘الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ.’ প্রকৃত মুসলমান ঐ ব্যক্তি যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে। ১২৩
১০. ইহুদিরা কখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে এসে আত্মিক অপরিচ্ছন্নতার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'আসসালামু আলাইকুম' না বলে 'আস-সামু আলাইকুম' বলত। যার অর্থ হলো, 'আপনার উপর মৃত্যু আসুক'। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জবাবে 'ওয়ালাইকুম' বলে চুপ থাকতেন। অর্থাৎ তাদের বদ্দোয়া তাদের ফিরিয়ে দিতেন। কিন্তু আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. তাদের এই কার্যকলাপ দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উলটো তাদেরও লানত ও বদ্দোয়া করতেন। হযরত আয়েশা রা.-এর এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘مَهْلًا يَا عَائِشَةُ، عَلَيْكِ بِالرِّفْقِ، وَإِيَّاكِ وَالْعُنْفَ وَالْفُحْشَ.’ হে আয়েশা, তুমি একটু থামো, নম্রতা অবলম্বন করা তোমার দায়িত্ব। রূঢ় ব্যবহার ও অশ্লীল আচরণ পরিহার করো। ১২৩ অর্থাৎ রুঢ়তা ও অশালীন কথা না বললেও মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। কারণ, তাদের বদদোয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে কবুল হবে না। অন্যদিকে তাদের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদদোয়া অবশ্যই কবুল হবে।

টিকাঃ
১১৪. সূরা আহযাব, আয়াত : ৫৮।
১১৫. মুসলিম, ১/৫২।
১১৬. মুসলিম, ৬৪।
১১৭. মুসলিম, ৬৪।
১১৮. তিরমিযী, ১৯৫৮।
১১৯. তিরমিযী, ২১৫৭।
১২০. তিরমিযী, ২১৫৮।
১২১. তিরমিযী, ২১৬৯।
১২২. তিরমিযী, ১৯৯৯; আবু দাউদ, ৪৪০৫।
১২৩. বুখারী, ১০।
১২৩. বুখারী, ২/১০১১।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 নিজের সম্মান নিজের কাছে

📄 নিজের সম্মান নিজের কাছে


গালিগালাজ ও অশ্লীল কথাবাতার মাধ্যমে মানুষের মান মর্যাদা ইজ্জত-সম্মান মাটিতে মিশে যায়, মুখের খারাপ ভাষার কারণে সে মানুষের দৃষ্টিতে তুচ্ছ হয়ে যায়; চাই সে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন হোক বা বড় কোনো পদের অধিকারী হোক। একারণেই নিজের ইজ্জত-সম্মান ও মান-মর্যাদা হেফাযত করার জন্যও জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অশ্লীল কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আজকাল আমাদের মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে এ দেখে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় যে, আমাদের এখানে গালিগালাজ যেন কথাবাতার ভূমিকা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। অত্যন্ত অশ্লীল ও নোংরা কথাবাতা এমনভাবে লোকদের মুখে লেগে থাকে যে, এসব কথা উচ্চারণ করার সময় এগুলোর খারাপ হওয়ার ব্যাপারে বিন্দু পরিমাণ অনুভূতিও কাজ করে না। বর্তমান প্রজন্মের শুধু চালচলনই এ অবস্থা নয়; বরং অশ্লীল কথাবাতা ও গালিগালাজে ছোট্ট শিশুরাও বড়দের ছাড়িয়ে। আমাদের উচিত, নিজেদের ইসলামের রঙে রঙিন করা এবং যবানকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহ তায়ালার প্রতি যথাযথ লজ্জার সাক্ষ্য দেওয়া। যাতে আমরা সমাজে মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সম্মানের সাথে জীবন অতিবাহিত করতে পারে।
সারকথা হলো, আমাদের জিহবাকে মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরী, অশালীন কথাবাতা, অভিশাপ এবং সেসব গুনাহ থেকে হেফাযত করা উচিত, যা জিহ্বা থেকে প্রকাশ পেতে পারে। তবে আমরা সত্যিকার অর্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, وَمَا وَعَىٰ فَلْيَحْفَظْ الرَّأْسُ এর পরিপূর্ণ অনুসারী হতে পারব।
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশিষ্ট খাদেম হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, لَمْ يَكُن رَّسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاحِشًا وَلَا لَعَّانًا وَلَا سَبَّابًا كَانَ يَقُولُ عِنْدَ الْمَعْتَبَةِ: مَالَهُ تَرِبَ جَبِينُهُ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গালিগালাজকারী, অশালীন ও অভিশাপদাতা ছিলেন না। তিনি আমাদের কারও উপর নারাজ হলে কেবল এতটুকু বলতেন, 'তার কী হলো? তার কপাল ধুলায় হোক'। ১১৪
২. একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া কবিরা গুনাহ। সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এটা কী করে সম্ভব যে, কেউ নিজের পিতামাতাকে গালি দেবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, نَعَمْ يَسُبُّ أَبَا الرَّجُلِ فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ. হ্যাঁ, (এটা এভাবে সম্ভব যে,) সে কোনো ব্যক্তির বাবাকে গালি দিলো। অতঃপর সে ব্যক্তি উল্টো তার বাবাকে গালি দিল। অনুরূপ সে কোনো ব্যক্তি তার মাকে গালি দিল। অতঃপর সে ব্যক্তি তার মাকে গালি দিল। (এভাবে এই গালিদাতা নিজের বাবা-মাকে গালি দেওয়ানোর মাধ্যম হলো।) ১১৭
৩. হযরত জাবের ইবনে সালিম রা. প্রথমবারের মতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলেন। সালাম ও পরিচয়পর্ব শেষে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু নসিহতের জন্য আবেদন করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কয়েকটি নসিহত করলেন। তন্মধ্যে একটি নসিহত ছিল, لَا تَسُبَّنَّ أَحَدًا অর্থাৎ কাউকে গালি দেবে না। ১১৯
হযরত জাবের ইবনে সালিম রা. এই উপদেশের উপর এতটা দৃঢ়তার সঙ্গে আমল করলেন যে, মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ তো দূরের কথা, কোনো প্রাণীকেও তিনি গালি দেননি।
৪. একবার নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে কয়েকজন সাহাবীকে মশা কামড়ালে তারা মশাকে যা তা বলে গালি দিতে শুরু করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিষেধ করে বলেন, لَا تَسُبُّوهَا، فَإِنَّهَا أَيْقَظَتْكُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ. মশাকে গালিগালাজ করো না। কারণ সে উত্তম প্রাণী। সে তোমাদের আল্লাহর যিকিরের জন্য জাগ্রত করে। ১২৭
অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোরগকে গালি দিতেও নিষেধ করেছেন। ১২৭
একটু ভেবে দেখুন, যেখানে পশুপাখীকে গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে কীভাবে মানুষকে গালি দেওয়া যেতে পারে?!

টিকাঃ
১১৪. বুখারী, ২/৮৮১।
১১৭. মুসলিম, ২/৮৮।
১১৯. আবু দাউদ, ৪/০৯২।
১২৭. আবু দাউদ, ৪/০৯৫।
১২৭. আবু দাউদ, ৪/০৯৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px