📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 পরনিন্দা বা গিবত শুনলে করণীয়

📄 পরনিন্দা বা গিবত শুনলে করণীয়


সাধারণত মানুষের অভ্যাস হলো, কেউ তার সামনে গিবত করলে, হয়তো তার কথার সুর সুন্ন মেলায় অথবা নীরব থাকে। অথচ এই দুইটার কোনোটা ই শরীয়তসম্মতও পন্থা নয়। হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, مَنْ أَغْتِيْبَ عِنْدَهُ أَخُوْهُ الْمُسْلِمُ وَهُوَ يَسْتَطِيْعُ نَصْرَهُ فَنَصَرَهُ، نَصَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ. যদি কারও সামনে মুসলমান ভাইয়ের গিবত করা হয় এবং সে গিবতকৃত মুসলমান ভাইয়ের সহযোগিতা করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তাকে সহযোগিতা না করে, তবে এই গুনাহ তাকে দুনিয়া-আখেরাতে উভয় স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ১০৪ আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায়, গিবত শোনার পর নীরব থাকাও গুনাহ। যথাসাধ্য নিজের মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সুধারণা পোষণ করে তার নিষ্কলুষতা বর্ণনা করা উচিত। এটা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের সাধ্যমতে গিবতকৃত ব্যক্তির পক্ষ অবলম্বন করবে, দুনিয়া-আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা তাকে সহায়তা করেন। ১০৫

ইমাম গাযালী রহ. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম এ লিখেছেন, 'কারও গিবত বা নিন্দা শুনলে ছয়টি কাজ করবে : ১. চোগলখোরের কথা কখনও বিশ্বাস করবে না। কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে সে ফাসেক। ২. চোগলখোরকে তার হীন কর্মের জন্য সতর্ক করবে এবং লজ্জা দেবে। ৩. চোগলখোরের কাজকে মন থেকে ঘৃণা করবে এবং এই ঘৃণার প্রকাশ ঘটাবে। ৪. যার চোগলখোরী করা হয়েছে তার ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করবে না। ৫. চোগলখোরের কথার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাবে না এবং তার কথার সত্যতা যাচাই করবে না। ৬. চোগলখোরের এই কাজকে অন্যত্র বর্ণনা করবে না। অন্যথায় নিজেই চোগলখোর হয়ে যাবে। ১০৬

টিকাঃ
১০৪. আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৬৪।
১০৫. আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৩২।
১০৬. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম, ৩/৬৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর অভ্যাস

📄 হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর অভ্যাস


হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর অভ্যাস ছিল, তিনি কারও অভিযোগ শুনতেন না এবং কারও সম্পর্কে খারাপ ধারণাও পোষণ করতেন না। যদি কেউ কারও সম্পর্কে কিছু বলত, তা হলে তিনি তাকে ধমক দিয়ে বলতেন, 'তুমি ভুল বলছ, সে এমন নয়।' ১০৭

একবার খানেকানে অবস্থানকালে এক ব্যক্তি তাঁকে এসে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি আপনার সম্পর্কে এসব উল্টা-পাল্টা কথা বলেছে।' হাজী সাহেব রহ. তাকে উত্তর দিয়ে বলেন, 'সে তো আমার পেছনে আমার নিন্দা করেছিল। আর তুমি তো আমার সামনে আমার নিন্দা করলে। কাজেই তুমি তার চেয়ে খারাপ কাজ করলে।' হযরতের এই উত্তর সে ব্যক্তির মাঝে এতটা প্রভাব সৃষ্টি করেছিল যে, পরবর্তী সময়ে সে আর কারও ব্যাপারে অভিযোগ করার ধৃষ্টতা দেখায়নি। ১০৮ হায়! যদি আমরাও এই পদ্ধতি অবলম্বন করতাম, তা হলে আমরা নিজেদের এই কঠিন গুনাহ থেকে সহজেই বাঁচাতে পারতাম এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জার পরিপূর্ণ হক আদায় করতে পারতাম।

টিকাঃ
১০৭. মাআরেফে ইমদাদিয়া, ৪৬।
১০৮. মাআরেফে ইমদাদিয়া, ১১৬।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 কতিপয় বুযুর্গানে দীনের উক্তি ও ঘটনা

📄 কতিপয় বুযুর্গানে দীনের উক্তি ও ঘটনা


* হযরত কাতাদা রহ. বলেন, 'কবরের আযাবের তিনটা ভাগ রয়েছে : ১. এক ভাগ গিবতের কারণে হয়। ২. এক ভাগ চোগলখোরীর কারণে হয়। ৩. আর এক ভাগ পেশাব থেকে না বাঁচার কারণে হয়।'
* হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, 'গিবত ক্যান্সার রোগের চেয়েও ভয়াবহ। ক্যান্সার যেমন সারা শরীরকে ধ্বংস করে দেয়, অনুরূপ গিবত মুসলমানের দীনদারীকে ধ্বংস করে দেয়, দীন থেকে সরিয়ে দেয়।'
* বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি হযরত আলী যাইনুল আবেদীন রহ.-এর সামনে কারও গিবত করলে তিনি বললেন, 'খবরদার! গিবত করবে না। গিবত ঐসব লোকের খাদ্য, যারা মানুষরূপী কুকুর।'
* এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরী রহ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি শুনেছি, আপনি আমার গিবত করেন?' হযরত হাসান বসরী রহ. উত্তর দেন, 'আমার দৃষ্টিতে তুমি এতটা মানানসই নও যে, বিনামূল্যে আমি আমার নেকি তোমাকে দিয়ে দেব।'
* অনুরূপ আরেকটি ঘটনা বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত হাসান বসরী রহ. সংবাদ পেলেন, অমুক ব্যক্তি তাঁর গিবত করে। তিনি গিবতকারীর নিকট কিছু তাজা খেজুর পাঠিয়ে বলেন, 'আপনি আপনার নেকি থেকে হাদীয়ারুপ কিছু আমাকে দান করছেন। আমি এই অনুগ্রহের বিনিময়ে কিছু খেজুর হাদিয়া পাঠালাম। যদিও এটি আপনার অনুগ্রহের পূর্ব বিনিময় হতে পারে না। তাই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।' ১০০
* বুযুর্গ মায়মুন ইবনে মায়রান রহ. বলেন, "একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার সামনে এক হাবশীর লাশ। আর কেউ আমাকে নির্দেশ দিয়ে বলছে, "এই লাশ খাও।" আমি বললাম, "হে আল্লাহর বান্দা, এটাকে আমি কেন খাব?" লোকটি বলল, "এই জন্য যে, তুমি অমুক ব্যক্তির হাবশী গোলামের গিবত করেছ।" আমি বললাম, "আল্লাহর কসম! আমি তার সম্পর্কে ভালো-মন্দ কিছুই বলিনি।" আমার কথা শুনে ঐ ব্যক্তি বলল, "কিন্তু তুমি তো তার গিবত শুনেছ এবং নীরবতা অবলম্বন করে সম্মতি প্রকাশ করেছ।" বর্ণনাকারী বলেন, "এরপর থেকে হযরত মায়মুন রহ.-এর অবস্থা এই হয়েছিল যে, তিনি না নিজে কারও গিবত করতেন, আর না মজলিসে গিবত হতে দিতেন।" ১০১
* হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. বলেন, "الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا তথা গিবত যিনার চেয়ে জঘন্যতর হওয়ার কারণ, যিনা গুনাহে বাহ্যী তথা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় প্রকাশ পায়। আর গিবত হলো জাহাঁই তথা অহংকার-বশত প্রকাশ পায়। যিনার পর নিজের মাঝে নমনীয়তা সৃষ্টি হয়। যিনাকারীর মনে একবার উদ্রেক হয় যে, হায়! আমি একটা জঘন্য কাজ করলাম। যদি তাওবার তাওফীক হতো! পক্ষান্তরে গিবত করার পর মানুষ লজ্জিত হয় না (এবং তাওবা থেকে বঞ্চিত হয়, একারণে গিবতকে যিনার চেয়ে নিকৃষ্ট ও জঘন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে)।" ১০২

টিকাঃ
১০০. মায়াজুল আরেফিন সংক্ষিপ্ত তরজমা ইহইয়াউল উলূম।
১০১. ফায়যানে মদীনা, বাইরুত, ৪/৬৭৪।
১০২. মাআরেফে ইমদাদিয়া, ১৪১।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 একটি ঘটনা

📄 একটি ঘটনা


চোগলখোরী তথা পরনিন্দার ক্ষতিকর দিকগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম গাযালী রহ.-একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঘটনাটি হলো, জনৈক ব্যক্তি গোলাম ক্রয়ের জন্য বাজারে গেল। বিক্রেতা বলল, "এই গোলামের মাঝে কোনো ত্রুটি নেই। তবে এতটুকু ত্রুটি রয়েছে যে, এর পরনিন্দার অভ্যাস আছে।' ক্রেতা সব দেখে শুনে রাজি হয়ে গোলামটি ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে এলো। আরও কিছুদিন অতিবাহিত হতে না-হতেই গোলাম পরনিন্দার অভ্যাসে প্ররোচিত হয়ে মনিবের স্ত্রীকে গোপনে গিয়ে বলল, 'আপনার স্বামী আপনার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। তিনি বাঁদি রাখার ইচ্ছা করেছেন। তিনি রাতে ঘরে ফিরলে তার মাথার কয়েকটি চুল কেটে আমাকে দেবেন। আমি জাদুবিদ্যার সাহায্যে আপনার মনে পুনরায় মহব্বত সৃষ্টির ব্যবস্থা করব।' স্ত্রী গোলামের কথামত চুল কাটার জন্য ব্যবস্থা করল। অন্যদিকে গোলাম মনিবের কাছে গিয়ে বলল, 'মনিব, আপনার স্ত্রীর পরপুরুষের সঙ্গে ভাব রয়েছে। সে আপনাকে হত্যা করতে চায়। সুতরাং সাবধানে থাকবেন।' মনিব রাতে স্ত্রীর কাছে গিয়ে তার হাতে কাঁচি দেখে বুঝল যে, গোলামের সংবাদ যথাযথ সত্য। তাই স্ত্রী তার চুল কাটার পূর্বে মনিব স্ত্রীকে তরবারী দিয়ে শেষ করে দিল। একদিকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেয়েকে হত্যা করার খবর শুনে মনিবকে হত্যা করে ফেলল। এভাবেই এক চোগলখোর গোলামের কারণে দুটি পবিত্র পরিবারের মাঝে রক্তপাতের ঘটনা ঘটল। ১১২

মোটকথা, গিবত এবং চোগলখোরী এমন জঘন্যতম ব্যাধি, যার কারণে সমাজ বিপর্যয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ঘরে ঘরে লড়াই সৃষ্টি হয়, অন্তরে ঘৃণা জন্ম নেয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়, বংশে আগুন লেগে যায় এবং দাম্পত্যজীবন বিষময় হয়ে ওঠে। এমন কোনো বিষয়ে উদাসীনতা এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জাহীনতার কারণে এ সমস্ত কাজ হয়ে থাকে। এ কারণেই উল্লেখিত হাদিস `اسْتَحْيُوا مِنَ اللَّهِ حَقَّ الْحَيَاءِ` (আল্লাহকে লজ্জা করো)-এ বলা হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনকে যথাযথ লজ্জা করা সম্ভব নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হেফাযতের ব্যাপারে গুরুত্ব না দেওয়া হবে। মাথার সাথে যুক্ত সকল অঙ্গের মধ্যে যবান একটি বিশেষ অঙ্গ। তাই আমাদের উচিত, যবান হেফাযতের ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টা করা।

টিকাঃ
১১২. ইহইয়াউল উলুম, ৩/৩২৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px