📄 উলামায়েকেরামের গিবত
উলামায়েকেরাম তথা দীনের কাজারি ব্যক্তিবর্গের গিবত করা সাধারণ লোকের গিবতের তুলনায় অধিক জঘন্য ও নিকৃষ্ট। এর কারণ হলো, উলামায়েকেরাম আল্লাহ তায়ালার নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাই তাদের বেইজ্জত ও অসম্মান করাকেও আল্লাহ তায়ালা অধিক অপছন্দ করেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ. যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করি। ১০০ অনুরূপ একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে, لحُوْমُ الْعُلَمَاءِ مَسْمُوْمَةٌ. উলামায়েকেরামের গোশত বিষাক্ত। উলামায়েকেরামের গিবত করলে মানুষ চরম শাস্তির সম্মুখীন হয়। উলামায়ে-কেরামের সমালোচনা ও নিন্দা করা এমন অপরাধ, যার শাস্তি আল্লাহ তায়ালা শুধু আখেরাতেই নয়, দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন। যারা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকে, তারা কুদরতীভাবে অপদস্থ হয় এবং চরম হতভাগ্য হয়। কাজেই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, নিজেকে আল্লাহ তায়ালার আযাব থেকে বাঁচানো এবং আল্লাহর ওলী ও বিশেষ বান্দাদের গিবত করে নিজেদের ধ্বংস না করা এবং এমন কোনো মজলিস-মাহফিলে শরিক না হওয়া, যেখানে অন্যের গিবত করা হয়।
টিকাঃ
১০০. বুখারী, ২/৯৬২।
📄 চোগলখোরী
চোগলখোরী মূলত গিবতের উচ্চস্তরের নাম। এর অর্থ হলো, বিপর্যয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কারও গোপন বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা। ১০১ কুরআনে কারিমে একাধিক স্থানে চোগলখোরদের অভিশাপ দেওয়া হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোগলখোর সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। মুসলিম শরিফের এক হাদীসে এসেছে, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ. চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ১০২ অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কবরের অধিকাংশ আযাব চোগলখোরী ও পেশাবের ছিটা থেকে না বাঁচার কারণে হয়। ১০৩ এজন্য যবান হেফাজতের একটি অন্যতম দিক হলো, আমরা যবানকে চোগলখোরীর দুর্গন্ধ থেকে হেফাযত করব।
টিকাঃ
১০১. 'বিপর্যায় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে'—শব্দটি যুক্ত করার কারণ হলো, যদি কোনো ব্যক্তির গোপন বিষয় প্রকাশের পেছনে কোনো শরয়ী কল্যাণ থাকে, তবে তা প্রকাশ করাকে কোনো সমস্যা নেই। বরং ক্ষেত্রবিশেষে এমনটা করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। শরহে মুসলিম লিন নববী রহ., ৯/৭৫।
১০২. মুসলিম, ১/৭৬।
১০৩. আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩২৩।
📄 পরনিন্দা বা গিবত শুনলে করণীয়
সাধারণত মানুষের অভ্যাস হলো, কেউ তার সামনে গিবত করলে, হয়তো তার কথার সুর সুন্ন মেলায় অথবা নীরব থাকে। অথচ এই দুইটার কোনোটা ই শরীয়তসম্মতও পন্থা নয়। হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, مَنْ أَغْتِيْبَ عِنْدَهُ أَخُوْهُ الْمُسْلِمُ وَهُوَ يَسْتَطِيْعُ نَصْرَهُ فَنَصَرَهُ، نَصَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ. যদি কারও সামনে মুসলমান ভাইয়ের গিবত করা হয় এবং সে গিবতকৃত মুসলমান ভাইয়ের সহযোগিতা করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তাকে সহযোগিতা না করে, তবে এই গুনাহ তাকে দুনিয়া-আখেরাতে উভয় স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ১০৪ আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায়, গিবত শোনার পর নীরব থাকাও গুনাহ। যথাসাধ্য নিজের মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সুধারণা পোষণ করে তার নিষ্কলুষতা বর্ণনা করা উচিত। এটা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের সাধ্যমতে গিবতকৃত ব্যক্তির পক্ষ অবলম্বন করবে, দুনিয়া-আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা তাকে সহায়তা করেন। ১০৫
ইমাম গাযালী রহ. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম এ লিখেছেন, 'কারও গিবত বা নিন্দা শুনলে ছয়টি কাজ করবে : ১. চোগলখোরের কথা কখনও বিশ্বাস করবে না। কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে সে ফাসেক। ২. চোগলখোরকে তার হীন কর্মের জন্য সতর্ক করবে এবং লজ্জা দেবে। ৩. চোগলখোরের কাজকে মন থেকে ঘৃণা করবে এবং এই ঘৃণার প্রকাশ ঘটাবে। ৪. যার চোগলখোরী করা হয়েছে তার ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করবে না। ৫. চোগলখোরের কথার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাবে না এবং তার কথার সত্যতা যাচাই করবে না। ৬. চোগলখোরের এই কাজকে অন্যত্র বর্ণনা করবে না। অন্যথায় নিজেই চোগলখোর হয়ে যাবে। ১০৬
টিকাঃ
১০৪. আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৬৪।
১০৫. আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৩২।
১০৬. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম, ৩/৬৪।
📄 হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর অভ্যাস
হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর অভ্যাস ছিল, তিনি কারও অভিযোগ শুনতেন না এবং কারও সম্পর্কে খারাপ ধারণাও পোষণ করতেন না। যদি কেউ কারও সম্পর্কে কিছু বলত, তা হলে তিনি তাকে ধমক দিয়ে বলতেন, 'তুমি ভুল বলছ, সে এমন নয়।' ১০৭
একবার খানেকানে অবস্থানকালে এক ব্যক্তি তাঁকে এসে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি আপনার সম্পর্কে এসব উল্টা-পাল্টা কথা বলেছে।' হাজী সাহেব রহ. তাকে উত্তর দিয়ে বলেন, 'সে তো আমার পেছনে আমার নিন্দা করেছিল। আর তুমি তো আমার সামনে আমার নিন্দা করলে। কাজেই তুমি তার চেয়ে খারাপ কাজ করলে।' হযরতের এই উত্তর সে ব্যক্তির মাঝে এতটা প্রভাব সৃষ্টি করেছিল যে, পরবর্তী সময়ে সে আর কারও ব্যাপারে অভিযোগ করার ধৃষ্টতা দেখায়নি। ১০৮ হায়! যদি আমরাও এই পদ্ধতি অবলম্বন করতাম, তা হলে আমরা নিজেদের এই কঠিন গুনাহ থেকে সহজেই বাঁচাতে পারতাম এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জার পরিপূর্ণ হক আদায় করতে পারতাম।
টিকাঃ
১০৭. মাআরেফে ইমদাদিয়া, ৪৬।
১০৮. মাআরেফে ইমদাদিয়া, ১১৬।