📄 গিবতও এক ধরনের নির্লজ্জতা
যবান দ্বারা যেসকল গুনাহ প্রকাশিত হয় এবং যেগুলোর কারণে স্পষ্টত আল্লাহর সঙ্গে নির্লজ্জতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তন্মধ্যে একটা গুনাহের নাম হলো গিবত। গিবত নামক ব্যাধি আজকাল চায়ের দোকান থেকে শুরু করে দরবারাদির মোবারক মাহফিল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এখন আর গিবত ছাড়া মজলিস জমে না। আলোচনা চটকদার করার জন্য সাধারণত গিবতের সাহায্য নেওয়া হয়। এই ব্যাধি এত ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, তা গুনাহ ও অন্যায় হওয়ার অনুভূতিও অন্তর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সমাজের এই অনুপস্থিত অবস্থা এত হতাশার নয়, বরং রীতিমতো ভয়াবহ। গিবত থেকে বিরত থাকার জজবা তখনই জাগ্রত হতে পারে, যখন উল্লিখিত হাদিস (وَمَا رَعَى الْحِفْظُ الرَّأْسُ وَمَا وَعَى) -এর বিষয়বস্তু সর্বদা মাথায় থাকবে এবং সর্বদা আল্লাহ তায়ালাকে লজ্জা করার চেষ্টা করতে থাকবে। পাশাপাশি এই ভয়াবহ ও জঘন্য আত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সর্বদা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে বিনয়াবনত হয়ে দোয়া করতে থাকবে। বর্তমানে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত ব্যতীত এই ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব।
📄 গিবত করা আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার নামান্তর
কুরআনে কারিমে গিবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং গিবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ থেকে গিবতের নিকৃষ্টতা ও কদর্যতা অনুমান করা যায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ একে অন্যের গিবত করবে না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? এটাকে তো তোমরা ঘৃণা করে থাকো। ৮০
এ কথা স্পষ্ট যে, কেউ কখনও কোনো মৃত ব্যক্তির গোশত খাওয়ার কল্পনাও করতে পারে না, আপন ভাইয়ের গোশত খাওয়া তো দূরের কথা। কুরআনে কারিম আমাদের এই বিষয়টি পৌঁছে দিতে চায় যে, মানবীয় স্বভাব যেমন মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে অরুচি, অনুরূপ ভাইয়ের নিন্দা করা থেকেও পূর্ণরূপে বিরত থাকা উচিত। কারণ গিবত করা অনেকটা যেন গিবতকৃত ব্যক্তির ইজ্জত-সম্মান বিক্রি করে খাওয়ার মতো, যা তার গোশত খাওয়ার মতই অপছন্দনীয়।
টিকাঃ
৮০. সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১২।
📄 গিবত কাকে বলে?
কাউকে গিবত সম্পর্কে সতর্ক করলে তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, ‘কী হয়েছে? আমি তো বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করেছি।’ যেন বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করা জায়েয। অথচ এটা খাম-খেয়ালি বৈ কিছু নয়। হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ ؟ قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ ؟ قَالَ : إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدْ بَهَتَّهُ. তোমরা কি জানো, গিবত কাকে বলে? সাহাবায়েকেরাম সমস্বরে বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (গিবত হলো) নিজের ভাইয়ের এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। একথা শুনে জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, উক্ত দোষটি যদি আমার ভাইয়ের মাঝে বিদ্যমান থাকে (তবুও কি তা গিবত হবে)? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, দোষটা যদি তার মাঝে বিদ্যমান থাকে, তবেই তো গিবত হবে। আর যদি সেই দোষ তার মাঝে না থাকে, তবে তো তুমি তাকে অপবাদ দিলে (যা গিবতের চেয়েও ভয়াবহ)। ৮১
আলোচ্য হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কারও মাঝে বিদ্যমান দোষ নিয়ে আলোচনা করাও গিবত। গিবতের মধ্যে যেসব দোষ-ত্রুটি অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর কারণে যার গিবত করা হয়েছে তার সম্মানহানি হয়। যেমন: দুনিয়াবী দোষ, দীনি দোষ, শারীরিক দোষ, চারিত্রিক দোষ, পরিবার-পরিজনের দোষ কিংবা চাকর-বাকরের দোষ ইত্যাদি। মোটকথা, যে বস্তুর আলোচনায় কারও সম্মানহানি হয়, তা প্রকাশ করাই গিবত। ৮২
টিকাঃ
৮১. মুসলিম, ২/৫২২।
৮২. রুহুল মা'আনী, ২/১৪৮।
📄 সম্মুখে সমালোচনা করাও গুনাহ
উলামায়েকেরাম লেখেন, যেভাবে কারও অগোচরে দোষচর্চা করা গিবত, অনুরূপ কারও সম্মুখ-সমালোচনা করা ও ত্রুটি বর্ণনা করাও গিবতের মতো, বরং গিবতের চেয়েও জঘন্য। কুরআনে কারিমে এমন কার্যকলাপকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর হাদিসে গিবতকে সহজ দ্বারা এমনটাই প্রতিভাত হয়। আল্লামা আলূসী রহ. তাফসিরে রুহুল মা'আনীতে বর্ণনা করেন, فِي الْفَرْقِ بَيْنَ أَن تَكُونَ فِي الْغِيبَةِ مِنَ الْغِتَابِ أَو بِحَضْرَتِهِ هُوَ الْمُعْتَمَدُ. মাওয়াজের কিতাবে লিখিত আছে, ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে গিবত করার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এটাই নির্ভরযোগ্য অভিমত। ৮৩
সাধারণত গিবতের এই ব্যাখ্যা করা হয় যে, আমি তো এ কথা তার মুখের উপর বলে দিয়েছি। অর্থাৎ গিবতের অর্থ প্রচলিত আছে যে, কারও অনুপস্থিতিতে দোষ চর্চা করা গিবত। পক্ষান্তরে কারও মুখের উপর অপমান করলে বা দোষ বর্ণনা করলে তা গিবত নয়। অথচ মুফাসসিরিনে কেরামের ব্যাখ্যা থেকে এ কথা স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, কারও সম্মুখে এমন কথা বলা, যা তার মনোকষ্টের কারণ হয় এবং যার কারণে তার মানহানি হয়, এমন সকল প্রকার কর্মকাণ্ড গিবতের মতো শাস্তির উপযুক্ত। এসব বিষয় থেকে পূর্ণরূপে পরহেজ করা জরুরি। তবে গিবতের মাধ্যমে যদি কাউকে হেয় করা না হয়, কারও মানহানি উদ্দেশ্য না থাকে; বরং গিবতকৃত ব্যক্তির সংশোধন বা অন্যকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো উদ্দেশ্য হয়, তবে তা প্রয়োজনসাপেক্ষে বা বাধ্যবাধকতার আওতাভুক্ত হবে। যেমনটি সামনে এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। ৮৭
টিকাঃ
৮৩. রুহুল মা'আনী, ২৬/১৫৮; কিতাবুল ফাওয়াজের, ১/৯৯।
৮৭. আল্লামগীরী, ৫/৩৫২; মাআরেফুল কুরআন, ৮/১২৩। আল্লামা শামী রহ. ১২টি সূরত উল্লেখ করেছেন, যেসব সূরতে কারও নিন্দা করলেও তা গিবতের আওতায় পড়ে না: ১. আফসোস প্রকাশ করার জন্য দোষ বর্ণনা করা। ২. ব্যক্তি নির্দিষ্টকরণ ব্যতীত ব্যাপকাকারে কোনো সমাজ বা গোত্রের সমালোচনা করা। ৩. ব্যাপকাকারে মন্দকাজের নিন্দা করা। ৪. সাধারণ মানুষের সর্তকতার জন্য খারাপ আকিদা পোষণকারী ব্যক্তির আকিদা প্রকাশ করা। ৫. বিচারের সম্মুখে ন্যায় বিচারের জন্য জালেম ব্যক্তির জুলুম বর্ণনা করা। ৬. প্রতিবিধান বা সংশোধন করার সক্ষম এমন ব্যক্তির সম্মুখে অন্যের অপকর্ম তুলে ধরা (যেমন : বাবার সামনে ছেলের অথবা মালিকের সামনে খাদেমের ত্রুটি বর্ণনা করা)। ৭. বিবাহাদি তথা আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করা। ৮. ফাতওয়া গ্রহণের মানসে মুফতি সাহেবের সামনে সঠিক অবস্থা তুলে ধরা। ৯. ক্রেতাকে গোলামের (পণ্যের) দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা। ১০. শুধু পরিচিতি জন কর্তৃক অন্ধ বা ন্যাংড়া বলা। ১১. হাদীস বর্ণনাকারী বা কিতাব রচয়িতাদের অবস্থা বর্ণনা করা। উল্লিখিত সুরসমূহে গিবত অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে শর্ত হলো, উল্লিখিত পদ্ধতিতে মুসলমান ব্যক্তিকে অবমাননার ইচ্ছা না থাকা চাই। শামী (করাচি), ৫/৪০৯; শামী, ৯/৫০৩-৫০৪।