📄 আমাদের অভ্যাস
বর্তমানকালে সাধারণত দোকানদার নিজ মাল বিক্রির জন্য বিভিন্ন রকম মিথ্যার আশ্রয় নেয়। নিন্মে কিছু উদাহরণ প্রদত্ত হলো :
১. নিন্মমানের পণ্যকে উন্নত বলো।
২. মূল্যের ক্ষেত্রে বেধড়ক মিথ্যা কথা বলা। এইভাবে বলে যে, এই দামে তো আমি কিনতে পারিনি, যাতে গ্রাহক প্রভাবিত হয়ে অধিক মূল্যে ক্রয় করে।
৩. গ্রাহক যদি নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানি পণ্য চায়। আর তা দোকানদারের কাছে না থাকে। তা হলে দোকানদার এ কথা বলে না যে, আমার কাছে এই কোম্পানি পণ্য নেই। আপনি অন্য দোকান থেকে নিন, বরং নিজের পণ্য চালিয়ে দেওয়ার জন্য এ কথা বলে গ্রাহককে ধোঁকা দেয় যে, আপনি যেই কোম্পানি পণ্য চাচ্ছেন, তা এখন বাজারে পাওয়া যায় না। অন্য কোম্পানিটা নিন।
৪. পুরাতন পণ্যের গায়ে নতুন মোড়েল বা স্টিকার লাগিয়ে দেয়।
৫. পণ্যের প্রশংসায় আসমান-জমিন এক করে ফেলে।
মোটকথা, এমন পদ্ধতি অবলম্বন করে, যাতে গ্রাহক বা ক্রেতা পণ্য ক্রয় বাবেধ্য হয় এবং ব্যবসায়ী এতেই নিজেকে সফল মনে করে।
এটা দীনী আমলের প্রতি অনাগ্রহ ও উপেক্ষার প্রমাণ। মিথ্যা সর্বদাই মিথ্যা। মিথ্যা যে সময়ই বলা হোক, যে অবস্থায় বলা হোক, গুনাহ হবেই।
📄 মিথ্যা প্রশংসা
শয়তান এই যুগে মিথ্যার ব্যাপক প্রচলনের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে রেখেছে। তন্মধ্যে একটি পদ্ধতি হলো মিথ্যা প্রশংসা করা এবং ভিত্তিহীন উপাধি প্রয়োগ করা। বর্তমানে তো আলেমগণও এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে না। ওয়াজ-মাহফিলের প্রারম্ভের সময় মিথ্যা প্রশংসার ছড়াছড়ি ঘটে। এমনকি সাধারণ এক লোকের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ এক লাইনব্যাপী উপাধি লাগিয়ে মিথ্যার মহড়া দেখা শোনা হয়। অনুরূপ বড়দের পরিচয় ও প্রশংসাতেও বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু আফসোস! এটাকে মিথ্যা মনে করা হয় না। অথচ আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে তা ভীষণ অপছন্দনীয় কাজ। বিশেষত যখন কোনো অযোগ্য, ফাসেক বা পাপী ব্যক্তির প্রশংসা করা হয় (যেমন আজকাল সমাজের মোড়ল ও নেতাদের প্রশংসা করা হয়), তখন আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।
এক হাদিসে এসেছে, হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِذَا مُدِحَ الْفَاسِقُ غَضِبَ الرَّبُّ وَاهْتَزَّ الْعَرْشُ.
যখন ফাসেক ব্যক্তির প্রশংসা করা হয়, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ক্রোধাম্বিত হন এবং এ কারণে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। ৭৮
যারা বিত্তবান, নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও ফাসেক লোকদের প্রশংসা করে, তাদের আলোচ্য হাদিস থেকে শিক্ষা হাসিল করা উচিত এবং এ কথা ভাবা উচিতও যে, তারা এই গুনাহে লিপ্ত হয়ে এর পরিমাণ নির্লজ্জতার পরিচয় দিচ্ছে?
টিকাঃ
৭৮. মিশকাত, ২/৪৩৪।
📄 প্রশংসা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা
যেহেতু প্রশংসা করার দরুণ প্রশংসিত ব্যক্তির অহংকার ও আত্মপ্রীতিয়তা জন্ম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এজন্য সামান্য-সামান্য প্রশংসা করার ব্যাপারে শরিয়তের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে এবং অনর্থক প্রশংসা করার ব্যাপারে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে যবান হেফাযতের পাশাপাশি মুসলমান ভাইয়ের কল্যাণও কামনা করা হয়।
প্রশংসা তিন ধরনের: ১. কারও সামনে প্রশংসা করা। ২. ব্যক্তির অগোচরে প্রশংসা করা এই নিয়তে যে, যার প্রশংসা করা হচ্ছে সে যেন এই প্রশংসা শোনে। এই দুই ধরনের প্রশংসা নিষেধ। ৩. যার প্রশংসা করা হচ্ছে সে জানুক বা না জানুক, এই দৃষ্টান্তে পেছনে প্রশংসা করা। এই ধরনের প্রশংসা জায়েজ। ৭৯
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে অন্য ব্যক্তির প্রশংসা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
লَقَدْ أَهْلَكْتُمْ أَوْ قَطَعْتُمْ ظَهْرَ الرَّجُلِ.
তোমরা তাকে ধ্বংস করে ফেলেছ। অথবা বলেছ, তোমরা তার কোমর ভেঙে ফেলেছ। ৮০
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
وَيْلَكَ قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ قَالَهَا ثَلَاثًا ثُمَّ قَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ كَانَ أَحَدُكُمْ مَادِحًا لَا মَحَالَةَ فَلْيَقُلْ أَحْسَبُ عَلَيْهِ وَاللَّهُ حَسِيبُهُ وَلَا أُزَكِّي عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَحَدًا.
তুমি ধ্বংস হও। তুমি তো তোমার সাথির গলা কেটে ফেলেছ। এ কথা তিনি কয়েকবার বললেন। (তারপর বললেন,) যদি তোমাদের কারও প্রশংসা করতেই হয়, তবে সে যেন বলে, আমি অমুকের সম্পর্কে এমন ধারণা রাখি; যদিও প্রশংসিত ব্যক্তিকে বাস্তবে সে এরূপ মনে করে। আল্লাহই প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত। আর আল্লাহর সামনে কেউ কারও পবিত্রতা বর্ণনা করবে না। ৬৮
অনুরূপ আরেক হাদিসে সম্মুখে প্রশংসাকারীকে এভাবে জবাব প্রদানের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِينَ فَاحْثُوا فِي وُجُوهِهِمُ التُّرَابَ. যখন তোমরা প্রশংসাকারীদের দেখবে, তাদের মুখের উপর মাটি নিক্ষেপ করবে। ৬৯
উল্লিখিত হাদিসের মর্মার্থ হলো, এমন প্রশংসাকারীর প্রশংসা কানে নেবে না এবং তারা যে পার্থিব স্বার্থে প্রশংসা করছে, তা পূরণ করবে না। যাতে ভবিষ্যতে তারা এভাবে প্রশংসা করার সাহস না দেখায়। মোটকথা, আল্লাহর প্রতি যথাযথ লজ্জাজ্ঞানও হওয়ার দাবি হলো, আমরা নিজেদের যবানকে প্রত্যেক ঐ বস্তু থেকে হেফাযত রাখব, যা মিথ্যা বা অবাস্তব হওয়ার শঙ্কা থাকে। আল্লাহর প্রতি লজ্জার বিষয়টি যথাসম্ভব খেয়াল করা দরকার।
টিকাঃ
৭৯. বাযযার হ, ৪/৮৬।
৮০. বুখারী, ৩/৮৬; মুসলিম, ২/৪৩৪।
৬৮. বুখারী, ২/৮৮৫; মুসলিম, ২/৪১৪; মিশকাত, ২/৪২১।
৬৯. মুসলিম, ২/৪১৪; মিশকাত, ২/৪২১।