📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 সত্যেই মুক্তি

📄 সত্যেই মুক্তি


আল্লাহ তায়ালার নেকট্যশীল হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো প্রত্যেক কাজে সততা অবলম্বন ও মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা। এই গুণের অসিলায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে লজ্জা করার প্রবণতা জাগ্রত হয় এবং সৎ কাজের তাওফীক পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে মিথ্যা কথা বলার কারণে চরম ক্ষতি ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়। মিথ্যা বলে হয়তো সামরিক দুনিয়াবী ফায়দা হয়, কিন্তু পরিণাম-বিবেচনায় তা মুক্তির মাধ্যমে হতে পারে না। অন্যদিকে অনেক সময় সত্য বলার কারণে সামরিক ক্ষতি হলেও সত্যের পরিণাম খুবই কল্যাণকর ও উপকারী হয়। হযরত মনসুর ইবনে মুআমির রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

تَحَرَّوْا الصِّدْقَ وَإِنْ রَأَيْتُمْ أَنَّ الْهَلَكَةَ فِيْهِ، فَإِنَّ فِيْهِ النَّجَاةَ.

সর্বদা সত্য অনুসন্ধানে মগ্ন থাকবে, যদিও তোমরা এতেও বাহ্যত ক্ষতি দেখতে পাও। বস্তুত এতে মুক্তি নিহিত। ৫৯

তাবুক যুদ্ধ কোনো কারণ ছাড়াই অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা তিনজন মুখলিস সাহাবীর নাম ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। তাঁরা হলেন : ১. হযরত কাব ইবনে মালেক, ২. হযরত মুরারা ইবনে রাবী এবং ৩. হযরত হেলাল ইবনে উমাইয়া রা.। তাঁরা সত্যকে অবলম্বন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ঠিক ঠিক কারণ বলে দিয়েছিলেন। যদিও এর জন্য তারা ৫০ দিনের বয়কট নিষ্পত্তিত হন। কিন্তু শেষ অবধি তাদের তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদস্বরূপ কুরআনে পাকের আয়াতও (الَّذِينَ خَلَفُوا إِلَخُ) وَعَلَى الثَّلَاثَةِ নাযিল হয় এবং সত্যকথনের কারণে মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তাদের রহমত ও মাগফিরাতের (দয়া ও ফমার) সুসংবাদ দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে সেসব মুনাফিক মিথ্যা ওজ্বর পেশ করে বাহ্যত শাস্তি থেকে সাময়িকভাবে নিস্কদের রক্ষা করেছিল, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে তাদের জাহান্নামী বলে ঘোষণা দেন। ৬০

অভিজ্ঞতার আলোকেও এ কথা প্রমাণিত যে, মিথ্যুককে মানুষ ভালো চোখে দেখে না এবং তার উপর ভরসা করে না। সাহাবায়েকেরাম বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মিথ্যাচার চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় আর কিছু ছিল না। ৭১

টিকাঃ
৫৯. তাফসীরে তাওয়ারিখ, ৩/৩৬১।
৬০. বুখারী, ২/৩৬১।
৭১. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮৭।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 এটাও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত

📄 এটাও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত


হযরত আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, মুমিন ব্যক্তির মাঝে সব ধরনের দোষ থাকতে পারে, তবে সে মিথ্যুক হতে পারে না (অর্থাৎ যদি মুমিন মিথ্যা কথা বলে, তা হলে তার ঈমানের চিহ্ন থাকবে)।

হযরত উমর ফারুক রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী বর্ণনা করেন যে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত হাসি-তামাশাতেও মিথ্যা ছেড়ে না দেয় এবং ঝগড়া-বিবাদে ত্যাগ না করে; যদিও সে ন্যায়ের পথে থাকুক না কেন। ৭২

উল্লিখিত হেদায়েত ও নির্দেশনাবলি সামনে রেখে আমাদের নিজেদের আমল পর্যবেক্ষণ করা উচিত। একটু ভেবে দেখুন, মিথ্যা কত নাজুক বিষয়? নিম্ন বর্ণিত ঘটনা থেকে মিথ্যার নাজুকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে :

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ أَنَّهُ قَالَ: دَعَتْنِي أُمِّي يَوْمًا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاعِدٌ فِي بَيْتِنَا فَقَالَتْ: هَا تَعَالَ أُعْطِيكَ، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ: «وَمَا أَرَدْتِ أَنْ تُعْطِيَهُ» قَالَتْ: تَمْرًا، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَا إِنَّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِهِ شَيْئًا كُتِبَتْ عَلَيْكِ كَذِبَةٌ»

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে আগমন করেছিলেন। (তখন আমি ছোট শিশু) আম্মাজান (মুন্সি বন্ধ করে) আমাকে ডেকে বললেন, 'এদিকে এসো, তোমাকে দেব।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আপনি তাকে কী দিতে চাচ্ছেন?' আম্মাজান বললেন, 'আমি তাকে খেজুর দিতে চাচ্ছিলাম।' তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যদি আপনি তাকে খেজুর না দিতেন, তবে আপনার আমল-নামায় একটা মিথ্যার গুনাহ লেখা হতো।' ৭৩

উল্লিখিত হাদিস থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, সামাজিক জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটে, যেগুলোকে বাহ্যত মিথ্যা মনে করা হয় না; অথচ এসবের কারণে মিথ্যার গুনাহ হয়। বাচ্চাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার সাথে মিথ্যা ওয়াদা করা সমাজের ব্যাপক ব্যাধি। এগুলোকে মিথ্যাই মনে করা হয় না। অথচ হাদিসের ভাষ্যমতে এগুলোও মিথ্যা। অনুরূপ হাসানোর জন্য এবং আনন্দ-বিনোদনের জন্য মিথ্যাকে হালাল মনে করা হয়; অথচ এ উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলাও ভীষণ গুনাহের কাজ।

টিকাঃ
৭২. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮৭।
৭৩. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮০।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 ব্যবসায়ীগণ এদিকে একটু মনোযোগ দিন

📄 ব্যবসায়ীগণ এদিকে একটু মনোযোগ দিন


আজকাল ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো মিথ্যা কথা বলা হয় এবং এতে কোনো রূপ গুনাহ হওয়ার অনুভূতিও থাকে না। ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, পণ্য বিক্রি হতে হবে; এতেও মিথ্যা বলার দরকার হলে বলতে হবে। গ্রাহককে প্রলুব্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। আর সামান্য লাভের আশায় নিজের আখিরাতকে ধ্বংস করে ছাড়ে। একারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

إِنَّ الْفُجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّارًا إِلَّا مَنِ اتَّقَى وَبَرَّ وَصَدَقَ.

মুতাকী, সৎ ও সত্যবাদী ব্যবসায়ী ব্যতীত অধিকাংশ ব্যবসায়ীকে কিয়ামতের দিন গুনাহগার অবস্থায় ওঠানো হবে। ৭৪

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়েকেরামকে সম্বোধন করে বলেন,
اِنَّ الْفُجَّارَ هُمُ الْفُجَّارُ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَيْسَ قَدْ أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا؟ قَالَ: بَلَى، وَلَكِنَّهُمْ يَحْلِفُونَ وَيَأْثَمُونَ.
নিশ্চয়ই ব্যবসায়ীরা গুনাহগার। সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা কি ব্যবসাকে হালাল করেননি? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, ব্যবসা হালাল, তবে ব্যবসায়ীরা মিথ্যা হুলফ করে এবং মিথ্যা কথা বলে। ৭৫

হযরত আবু যর গিফারী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ তায়ালা রহমতের দৃষ্টিতে দেখবেন না, তাদের আত্মশুদ্ধি হবে না এবং তারা মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ করবে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এমন হতভাগা কে হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন,
الْمَسْئِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ.
১. যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় পরে, ২. যে দান করে খোঁটা দেয়, ৩. যে ব্যবসায়ী মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে। ৭৬

বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের নিজের মুখে লাগাম দেওয়া উচিত। যদি তারা এক আল্লাহর উপর ভরসা করে সততা ও দীনদারীর সাথে রোজগার করে, তা হলে দুনিয়াতেও আল্লাহ তায়ালা তাদের বেহিসাব বরকত দান করবেন এবং আখিরাতেও তাদের হাশর করাবেন আম্বিয়া, সিদ্দিকিন, শুহাদা ও নেককার বান্দাদের সঙ্গে। ৭৭

টিকাঃ
৭৪. তিরমিযী, ১/২০০; মিশকাত, ২/২৪৪।
৭৫. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮৫।
৭৬. মুসলিম, ১/৭৯; আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৯৭।
৭৭. তিরমিযী, ১/২২৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 আমাদের অভ্যাস

📄 আমাদের অভ্যাস


বর্তমানকালে সাধারণত দোকানদার নিজ মাল বিক্রির জন্য বিভিন্ন রকম মিথ্যার আশ্রয় নেয়। নিন্মে কিছু উদাহরণ প্রদত্ত হলো :
১. নিন্মমানের পণ্যকে উন্নত বলো।
২. মূল্যের ক্ষেত্রে বেধড়ক মিথ্যা কথা বলা। এইভাবে বলে যে, এই দামে তো আমি কিনতে পারিনি, যাতে গ্রাহক প্রভাবিত হয়ে অধিক মূল্যে ক্রয় করে।
৩. গ্রাহক যদি নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানি পণ্য চায়। আর তা দোকানদারের কাছে না থাকে। তা হলে দোকানদার এ কথা বলে না যে, আমার কাছে এই কোম্পানি পণ্য নেই। আপনি অন্য দোকান থেকে নিন, বরং নিজের পণ্য চালিয়ে দেওয়ার জন্য এ কথা বলে গ্রাহককে ধোঁকা দেয় যে, আপনি যেই কোম্পানি পণ্য চাচ্ছেন, তা এখন বাজারে পাওয়া যায় না। অন্য কোম্পানিটা নিন।
৪. পুরাতন পণ্যের গায়ে নতুন মোড়েল বা স্টিকার লাগিয়ে দেয়।
৫. পণ্যের প্রশংসায় আসমান-জমিন এক করে ফেলে।

মোটকথা, এমন পদ্ধতি অবলম্বন করে, যাতে গ্রাহক বা ক্রেতা পণ্য ক্রয় বাবেধ্য হয় এবং ব্যবসায়ী এতেই নিজেকে সফল মনে করে।

এটা দীনী আমলের প্রতি অনাগ্রহ ও উপেক্ষার প্রমাণ। মিথ্যা সর্বদাই মিথ্যা। মিথ্যা যে সময়ই বলা হোক, যে অবস্থায় বলা হোক, গুনাহ হবেই।

ফন্ট সাইজ
15px
17px