📄 মিথ্যা
যবান দ্বারা সবচেয়ে বেশি যেই গুনাহ করে মানুষ নিজের নির্লজ্জতা প্রমাণ করে, তা হলো মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। কুরআনে কারীমে মিথ্যাবাদীদের অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,
فَتَجْعَلَ لَعْنَتَ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِيْنَ
এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী। ৪৯
হাদীস শরীফে বিভিন্ন আঙ্গিকে এই গুনাহের অনিষ্টতা বর্ণনা করা হয়েছে:
১. এক হাদীসে বর্ণিত রয়েছে,
إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ تَبَاعَدَ عَنْهُ الْمَلَكُ مِيْلاً مِنْ تَنَّ مَا جَاءَ بِهِ?
যখন বান্দা মিথ্যা কথা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধের রহমতের ফেরেশতা তার থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়। ৫০
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য বলতে এবং মিথ্যা থেকে বাঁচতে জোর তাগিদ দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ، فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِيْ إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِيْ إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ حَتَّى يَكْتُبَ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ صِدِّيْقًا، وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكِذْبَ يَهْدِيْ إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِيْ إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ، وَيَتَحَرَّى الْكِذْبَ، حَتّٰى يَكْتُبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا
তোমরা সর্বদা সত্য কথা বলবে। কারণ, সত্য কথা ন্যায়ের পথ দেখায়। আর ন্যায় জান্নাতের পথে নিয়ে যায়। মানুষ যখন সর্বদা সত্য বলতে থাকে এবং সত্য বলার প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকে, এক পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা তাকে সিদ্দিকিনদের তালিকাভুক্ত করেন। পক্ষান্তরে তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ মিথ্যা বলা অন্যায়ের পথ দেখায়। আর অন্যায় জাহান্নামের পৌঁছে দেয়। মানুষ যখন মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যা বলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে, একসময় সে আল্লাহর কাছে চিরদিনের জন্য মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হয়। ৫১
৩. একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন, দুজন ফেরেশতা তাঁকে আসমানের উপর নিয়ে গেলেন। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। একজন দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয়জন বসে আছে। দণ্ডায়মান ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তির চোয়ালে এমনভাবে লোহার আকড়া বিদ্ধ করছিল যে, তা (চোয়াল) বিদীর্ণ করে মস্তকের পশ্চাদভাগ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল। তারপর অপর চোয়ালটিও পূর্ববৎ বিদীর্ণ করল। ততক্ষণে প্রথম চোয়ালটা ঠিক হয়ে যাচ্ছিল। আকড়াধারী ব্যক্তি পুনরায় সেরূপ করছিল। তিনি সাথিদ্বয়কে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কী হচ্ছে? তারা উত্তর দিলেন,
الَّذِي رَأَيْتَهُ يُشَقُّ شِدْقُهُ فَكَذَّابٌ، يَكْذِبُ بِالْكَذْبَةِ تُحْمَلُ عَنْهُ حَتَّى تَبْلُغَ الْآفَاقَ، فَيُصْنَعُ بِهِ إِلَى يَوْমِ الْقِيَامَةِ.
আপনি যে ব্যক্তির চোয়াল বিদীর্ণ করার দৃশ্য দেখলেন, সে মিথ্যাবাদী। সে মিথ্যা বলে বেড়াতো। তার বিতৃত মিথ্যা কথা ক্রমাগত বণিত হয়ে দূরদূরান্তে পৌঁছে যেত। কিয়ামত পর্যন্ত তার সাথে এমনই করা হবে। ৫২
৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসি-তামাশার ছলেও মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। এমনকি এমন ব্যক্তির জন্য বদদোয়া করেছেন,
وَيْلٌ لِمَنْ يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ؛ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ، وَيْلٌ لَهُ، وَيْلٌ لَهُ،
যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, সে ধ্বংস হোক! ধ্বংস হোক! ধ্বংস হোক! ৫৩
আজকাল লোকহাসানোর জন্য নতুন নতুন কৌতুক বা জোক তৈরি করা হয়। শুধু মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলা হয়। উল্লিখিত হাদীসের সাবধান-বাণী তাদের জানা থাকা উচিত এবং এধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকা উচিত।
৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা বলাকে বড় খেয়ানত সাব্যস্ত করেছেন। এক হাদীসে এসেছে,
كَبُرَتْ خِيَانَةٌ تُحَدِّثَ أَخَاكَ حَدِيثًا هُوَ لَكَ مُصَدِّقٌ، وَأَنْتَ بِهِ كَاذِبٌ.
এটা খুব বড় খেয়ানত যে, তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তুমি এমন কথা বলবে, যে বিষয়ে সে তোমাকে সত্যবাদী মনে করে। অথচ তুমি মিথ্যাবাদী। ৫৪
৬. মিথ্যা বলাকে মুনাফিকের বিশেষ আলামত সাব্যস্ত করা হয়েছে। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ.
মুনাফিকের আলামত তিনটি : ১. কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, ২. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করা, ৩. আমানতের খেয়ানত করা। ৫৫
৭. এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য কথাকে জান্নাতের জামানত সাব্যস্ত করেছেন। হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنُ لَكُمُ الْجَنَّةَ: اِصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ، وَأَوْفُوْا إِذَا وَعَدْتُمْ، وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ، وَاحْفَظُوْا فُرُوْجَكُمْ، وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ، وَكُفُّوا أَيَدِيَكُمْ.
তোমরা আমাকে ছয়টি জিনিসের জামানত দাও, আমি তোমাদের জান্নাতের জামানত হব: ১. কথা বলার সময় সত্য বলবে, ২. ওয়াদা করলে তা পূরণ করবে, ৩. তোমাদের কাছে আমানত রাখা হলে তা যথাযথভাবে আদায় করবে, ৪. তোমাদের গোপনঙ্গ হেফাযত করবে, ৫. দৃষ্টি অবনত রাখবে এবং ৬. জুলুম থেকে হাতকে সংযত রাখবে। ৫৬
৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য কথা বলাকে আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতের নিদান সাব্যস্ত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُحِبَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، أَوْ يُحِبَّ اللَّهُ وَرَسُولَهُ فَلْيَصْدُقْ حَدِيثَهُ إِذَا حَدَّثَ، وَلْيُؤَدِّ أَمَانَتَهُ إِذَا اؤْتُمِنَ، وَلْيُؤَدِّ أَمَانَتَهُ إِذَا اؤْتُمِنَ، وَلْيُحْسِنْ جِوَارَ مَنْ جَاوَرَهُ.
যে ব্যক্তি চায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাকে ভালোবাসুক, সে যেন কথা বলার সময় সত্য বলে, আমানত যথাযথভাবে আদায় করে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। ৫৭
৯. অনুরূপ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকার বিনিময়েও জান্নাতের জামানত গ্রহণ করেছেন। হযরত আবু উসামা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا.
আমি ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যখানে একটি বাড়ির দায়িত্ব নিচ্ছি, যে মিথ্যা বর্জন করে, যদিও সে ঠাট্টাকারী হোক না কেন। ৫৮
টিকাঃ
৪৯. সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ৬১।
৫০. তিরমিযী, ২/১৮৬।
৫১. বুখারী; মুসলিম; মিশকাত, ২/৪২১।
৫২. বুখারী, ২/১০৫; হাদীস নং-১৩০৯, ২/১০০; হাদীস নং-৬২১৮।
৫৩. মুসনাদে আহমদ; তিরমিযী; মিশকাত, ২/৪২১।
৫৪. আবু দাউদ; মিশকাত, ২/৪১৩।
৫৫. বুখারী, ২/৯০০; মুসলিম, ১/৫৫।
৫৬. শুয়াবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/২০৪, ২০৫, হাদীস নং-৪৮০২, ৪২০৬।
৫৭. শুয়াবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ২/১০৩, হাদীস নং-১৫৩৩।
৫৮. আবু দাউদ; তিরমিযী; ৬/৩৭১, ৬/৩৩২; শুয়াবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/১৩৭, হাদীস নং-৬২৪৬।
📄 সত্যেই মুক্তি
আল্লাহ তায়ালার নেকট্যশীল হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো প্রত্যেক কাজে সততা অবলম্বন ও মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা। এই গুণের অসিলায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে লজ্জা করার প্রবণতা জাগ্রত হয় এবং সৎ কাজের তাওফীক পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে মিথ্যা কথা বলার কারণে চরম ক্ষতি ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়। মিথ্যা বলে হয়তো সামরিক দুনিয়াবী ফায়দা হয়, কিন্তু পরিণাম-বিবেচনায় তা মুক্তির মাধ্যমে হতে পারে না। অন্যদিকে অনেক সময় সত্য বলার কারণে সামরিক ক্ষতি হলেও সত্যের পরিণাম খুবই কল্যাণকর ও উপকারী হয়। হযরত মনসুর ইবনে মুআমির রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
تَحَرَّوْا الصِّدْقَ وَإِنْ রَأَيْتُمْ أَنَّ الْهَلَكَةَ فِيْهِ، فَإِنَّ فِيْهِ النَّجَاةَ.
সর্বদা সত্য অনুসন্ধানে মগ্ন থাকবে, যদিও তোমরা এতেও বাহ্যত ক্ষতি দেখতে পাও। বস্তুত এতে মুক্তি নিহিত। ৫৯
তাবুক যুদ্ধ কোনো কারণ ছাড়াই অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা তিনজন মুখলিস সাহাবীর নাম ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। তাঁরা হলেন : ১. হযরত কাব ইবনে মালেক, ২. হযরত মুরারা ইবনে রাবী এবং ৩. হযরত হেলাল ইবনে উমাইয়া রা.। তাঁরা সত্যকে অবলম্বন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ঠিক ঠিক কারণ বলে দিয়েছিলেন। যদিও এর জন্য তারা ৫০ দিনের বয়কট নিষ্পত্তিত হন। কিন্তু শেষ অবধি তাদের তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদস্বরূপ কুরআনে পাকের আয়াতও (الَّذِينَ خَلَفُوا إِلَخُ) وَعَلَى الثَّلَاثَةِ নাযিল হয় এবং সত্যকথনের কারণে মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তাদের রহমত ও মাগফিরাতের (দয়া ও ফমার) সুসংবাদ দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে সেসব মুনাফিক মিথ্যা ওজ্বর পেশ করে বাহ্যত শাস্তি থেকে সাময়িকভাবে নিস্কদের রক্ষা করেছিল, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে তাদের জাহান্নামী বলে ঘোষণা দেন। ৬০
অভিজ্ঞতার আলোকেও এ কথা প্রমাণিত যে, মিথ্যুককে মানুষ ভালো চোখে দেখে না এবং তার উপর ভরসা করে না। সাহাবায়েকেরাম বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মিথ্যাচার চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় আর কিছু ছিল না। ৭১
টিকাঃ
৫৯. তাফসীরে তাওয়ারিখ, ৩/৩৬১।
৬০. বুখারী, ২/৩৬১।
৭১. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮৭।
📄 এটাও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত
হযরত আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, মুমিন ব্যক্তির মাঝে সব ধরনের দোষ থাকতে পারে, তবে সে মিথ্যুক হতে পারে না (অর্থাৎ যদি মুমিন মিথ্যা কথা বলে, তা হলে তার ঈমানের চিহ্ন থাকবে)।
হযরত উমর ফারুক রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী বর্ণনা করেন যে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত হাসি-তামাশাতেও মিথ্যা ছেড়ে না দেয় এবং ঝগড়া-বিবাদে ত্যাগ না করে; যদিও সে ন্যায়ের পথে থাকুক না কেন। ৭২
উল্লিখিত হেদায়েত ও নির্দেশনাবলি সামনে রেখে আমাদের নিজেদের আমল পর্যবেক্ষণ করা উচিত। একটু ভেবে দেখুন, মিথ্যা কত নাজুক বিষয়? নিম্ন বর্ণিত ঘটনা থেকে মিথ্যার নাজুকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ أَنَّهُ قَالَ: دَعَتْنِي أُمِّي يَوْمًا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاعِدٌ فِي بَيْتِنَا فَقَالَتْ: هَا تَعَالَ أُعْطِيكَ، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ: «وَمَا أَرَدْتِ أَنْ تُعْطِيَهُ» قَالَتْ: تَمْرًا، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَا إِنَّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِهِ شَيْئًا كُتِبَتْ عَلَيْكِ كَذِبَةٌ»
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে আগমন করেছিলেন। (তখন আমি ছোট শিশু) আম্মাজান (মুন্সি বন্ধ করে) আমাকে ডেকে বললেন, 'এদিকে এসো, তোমাকে দেব।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আপনি তাকে কী দিতে চাচ্ছেন?' আম্মাজান বললেন, 'আমি তাকে খেজুর দিতে চাচ্ছিলাম।' তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যদি আপনি তাকে খেজুর না দিতেন, তবে আপনার আমল-নামায় একটা মিথ্যার গুনাহ লেখা হতো।' ৭৩
উল্লিখিত হাদিস থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, সামাজিক জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটে, যেগুলোকে বাহ্যত মিথ্যা মনে করা হয় না; অথচ এসবের কারণে মিথ্যার গুনাহ হয়। বাচ্চাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার সাথে মিথ্যা ওয়াদা করা সমাজের ব্যাপক ব্যাধি। এগুলোকে মিথ্যাই মনে করা হয় না। অথচ হাদিসের ভাষ্যমতে এগুলোও মিথ্যা। অনুরূপ হাসানোর জন্য এবং আনন্দ-বিনোদনের জন্য মিথ্যাকে হালাল মনে করা হয়; অথচ এ উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলাও ভীষণ গুনাহের কাজ।
টিকাঃ
৭২. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮৭।
৭৩. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮০।
📄 ব্যবসায়ীগণ এদিকে একটু মনোযোগ দিন
আজকাল ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো মিথ্যা কথা বলা হয় এবং এতে কোনো রূপ গুনাহ হওয়ার অনুভূতিও থাকে না। ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, পণ্য বিক্রি হতে হবে; এতেও মিথ্যা বলার দরকার হলে বলতে হবে। গ্রাহককে প্রলুব্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। আর সামান্য লাভের আশায় নিজের আখিরাতকে ধ্বংস করে ছাড়ে। একারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الْفُجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّارًا إِلَّا مَنِ اتَّقَى وَبَرَّ وَصَدَقَ.
মুতাকী, সৎ ও সত্যবাদী ব্যবসায়ী ব্যতীত অধিকাংশ ব্যবসায়ীকে কিয়ামতের দিন গুনাহগার অবস্থায় ওঠানো হবে। ৭৪
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়েকেরামকে সম্বোধন করে বলেন,
اِنَّ الْفُجَّارَ هُمُ الْفُجَّارُ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَيْسَ قَدْ أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا؟ قَالَ: بَلَى، وَلَكِنَّهُمْ يَحْلِفُونَ وَيَأْثَمُونَ.
নিশ্চয়ই ব্যবসায়ীরা গুনাহগার। সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা কি ব্যবসাকে হালাল করেননি? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, ব্যবসা হালাল, তবে ব্যবসায়ীরা মিথ্যা হুলফ করে এবং মিথ্যা কথা বলে। ৭৫
হযরত আবু যর গিফারী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ তায়ালা রহমতের দৃষ্টিতে দেখবেন না, তাদের আত্মশুদ্ধি হবে না এবং তারা মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ করবে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এমন হতভাগা কে হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন,
الْمَسْئِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ.
১. যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় পরে, ২. যে দান করে খোঁটা দেয়, ৩. যে ব্যবসায়ী মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে। ৭৬
বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের নিজের মুখে লাগাম দেওয়া উচিত। যদি তারা এক আল্লাহর উপর ভরসা করে সততা ও দীনদারীর সাথে রোজগার করে, তা হলে দুনিয়াতেও আল্লাহ তায়ালা তাদের বেহিসাব বরকত দান করবেন এবং আখিরাতেও তাদের হাশর করাবেন আম্বিয়া, সিদ্দিকিন, শুহাদা ও নেককার বান্দাদের সঙ্গে। ৭৭
টিকাঃ
৭৪. তিরমিযী, ১/২০০; মিশকাত, ২/২৪৪।
৭৫. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৮৫।
৭৬. মুসলিম, ১/৭৯; আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/৩৯৭।
৭৭. তিরমিযী, ১/২২৪।