📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 যবানের হেফাযত

📄 যবানের হেফাযত


আল্লাহকে লজ্জা করো অর্থবহ হাদিসে মাথার হেফাযতকে লজ্জাশীলতার মূল ভিত্তি সাব্যস্ত করা হয়নি; বরং ‘মাথা ও তাতে যা সংরক্ষিত আছে, তা রক্ষা করবে’—বাক্যটি এমন একথা বুঝানো হয়েছে যে, মাথাসংশিষ্ট যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে এবং যেসব অঙ্গের মাধ্যমে কোনো-না-কোনো কাজ প্রকাশ পাওয়া সম্ভব, আল্লাহ তায়ালার প্রতি যথাযথ লজ্জাবশত হওয়ার জন্য সেসব অঙ্গও গুনাহ ও অপরাধ থেকে হেফাযত করা অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক। মাথাসংশিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাঝে যবান তথা জিহ্বার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এই ছোট্ট অঙ্গটি যদি সঠিক পন্থায় ব্যবহৃত হত, তা হলে তা বিরাট সম্মান ও মর্যাদা হাসিলের মাধ্যম ও অসিলা হয়। পক্ষান্তরে যবান যদি নির্লজ্জ হয় এবং খোদাভীতির পরওয়া না করে নিষিদ্ধ কথাবার্তা বলে বেড়ায়, তবে তা মানুষের লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

إِذَا أَصْبَحَ ابْنُ آدَمَ كَفَّرَتْ جَوَارِحُهُ لِلِسَانِهِ، فَقَالَتْ: اتَّقِ اللَّهَ فِينَا فَإِنَّكَ إِنِ اسْتَقَمْتَ اسْتَقَمْنَا، وَإِنِ اعْوَجَجْتَ اعْوَجَجْنَا.

মানুষ যখন ঘুম থেকে ওঠে, তখন অন্যান্য অঙ্গ জিহ্বাকে লক্ষ করে বিনয়াশ্রয়ী হয়ে বলে, আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, আমরা তোমার সঙ্গী। তুমি সোজা পথে চললে আমরাও সোজা পথে চলব, আর তুমি বাঁকা পথ অবলম্বন করলে আমরাও বাঁকা পথ অবলম্বন করব। ৫৯

উক্ত হাদিসের আলোকে জানা গেল, আল্লাহকে লজ্জা করতে হলে যবান নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। তা ছাড়া আল্লাহকে যথাযথ লজ্জা করা সম্ভব নয়। এ জন্যই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোর তাকীদের সাথে যবান হেফাজতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। নিম্নে এ বিষয়ে কিছু হাদিস প্রদত্ত হলো :

১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, مَنْ صَمَتَ نَجَا. যে ব্যক্তি (ভুল বা অন্যায় কথা না বলে) চুপ থাকল, সে নিরাপদে থাকল। ৮১

২. হযরত উকবা ইবনে আমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় কী? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, أَمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ. জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, তোমার ঘরই যেন তোমার জন্য যথেষ্ট হয় (অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে না) এবং নিজের গুনাহের কারণে ক্রন্দন করো। ৮২

৩. হযরত সালমান ইবনে আবদুুল্লাহ সাকাফী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আমার ব্যাপারে কোন বস্তুর সবচেয়ে আশঙ্কা বেশি করেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের যবান মোবারক ধরে (ইশারা করে) বলেন, এটার ৮৩ অর্থাৎ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বস্তু হলো যবান।

৪. হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মَقَامُ الرَّجُلِ لِلصَّمْتِ أَفْضَلُ مِنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سَنَةٍ কিছু সময়ের নীরবতা অবলম্বন ৬০ বছরের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। ৮৫

৫. একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ যর গিফারী রা.-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, يَا أَبَا ذَرٍّ أَدَلُّكَ عَلَى خَصْلَتَيْنِ هُمَا خَفِيفَتَانِ عَلَى الظَّهْرِ وَأَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ غَيْرِهِمَا? قَالَ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: عَلَيْكَ بِحُسْنِ الْخُلُقِ، وَطُولِ الصَّمْتِ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا عَمِلَ الْخَلَائِقُ بِمِثْلِهِمَا. হে আবূ যর, আমি কি তোমাকে এমন দুটি চরিত্রের কথা বলে দেব না, যা পেটের উপর খুব হালকা (অর্থাৎ খুব সহজসাধ্য), তবে আমলনামায় খুব ভারী হয়? আবূ যর রা. বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, অবশ্যই বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, ১. দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকা, ২. উত্তম আচরণ। ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! এই দুই আমলের চেয়ে উত্তম আমল কোনো মাখলুক করেনি। ৮৬

৬. হযরত সাহল ইবনে সাআদ রা. বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, مَنْ يَضْمَنْ لِّيْ مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ. যে ব্যক্তি আমাকে দুই বস্তুর জামানত দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হবো। বস্তুটি হলো: ১. দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান তথা যবান, ২. দুই পায়ের মধ্যবর্তী স্থান তথা লজ্জাস্থান। ৮৭

৭. হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেন, أَتَدْرُونَ مَنْ يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ أَتَدْرُونَ مَنْ يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ الْأَجْوَفَانِ: الْفَمُ وَالْفَرْجُ. তোমরা কি জানো, কোন্ বস্তু মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তা হলো আল্লাহর ভয় এবং উত্তম চরিত্র। তোমরা কি জানো, কোন্ বস্তু মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে? তা হলো দুটি মধ্যবর্তী স্থান : যবান ও লজ্জাস্থান। ৮৮

৮. বুখারী শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত উপদেশ বর্ণিত হয়েছে, মَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ. যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা অন্যায় নীরব থাকে। ৮৯

৯. অন্য এক হাদিসে হযরত বিলাল ইবনে হারেস রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنَ الْخَيْرِ مَا يَعْلَمُ مَبْلَغَهَا، فَيَكْتُبُ اللَّهُ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْমِ يَلْقَاهُ، وَإِنَّ الرَّজُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنَ الشَّرِّ مَا يَعْلَمُ مَبْلَغَهَا, فَيَكْتُبُ اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا سَخَطَهُ إِلَى يَوْমِ يَلْقَاهُ. মানুষ কখনও কখনও উত্তম কথা বলে, অথচ এর পরিণতির কথা জানে না। তবুও এর ওসিলায় আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত তার উপর সন্তুষ্টি লিখে দেন। আবার অনেক সময় মানুষ খারাপ কথা উচ্চারণ করে। অথচ সে জানে না এর পরিণাম কী? এর কারণে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত তার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান। ৯০

উল্লিখিত হাদিসসমূহ দ্বারা বোঝা যায়, যবানের হেফাজত না করে এবং যবানের ব্যাপারে সতর্ক না থেকে আল্লাহ তায়ালার প্রতি যথাযথ লজ্জাবানত হওয়া সম্ভব নয়।

টিকাঃ
৫৯. তিরমিযী, ২/৬৬; ওয়াজুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/২৭৭ হাদিস নং-৮০৪৯; মিশকাত, ২/৪৮১।
৮১. আবূবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/২৫৪, হাদিস নং-৪৬৬০।
৮২. তিরমিযী, ২/৬৬; আবূবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ১/৪৫২, হাদিস নং-৬০৫।
৮৩. তিরমিযী, ২/৬৬; মিশকাত, ২/৪০১।
৮৫. মিশকাত, ২/৪১৪; আবূবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/২৫৪, হাদিস নং-৪৬৬০।
৮৬. মিশকাত, ২/৪১৫; আবূবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/২৫৪, হাদিস নং-৪৬৬১।
৮৭. বুখারী, ২/৯৬৯।
৮৮. তিরমিযী, ২/৬১।
৮৯. বুখারী, ২/৯৬১।
৯০. কিতাবুল যুহদ, ১০৯৪; মিশকাত, ২/৪৫২।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 যবানের গুনাহসমূহ

📄 যবানের গুনাহসমূহ


যবানের মাধ্যমে যেসব গুনাহ প্রকাশ পায় অথবা যবান যেসব গুনাহের কারণ হয়, তা অসংখ্য। এসব গুনাহ একত্রে লিপিবদ্ধ করা খুব কঠিন। এতদসত্ত্বেও ইমাম গাযালী রহ. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম গ্রন্থে মানুষ যবানের কারণে যেসব গুনাহে লিপ্ত হয়, সেগুলোকে ২৩টি শিরোনামে একত্র করার চেষ্টা করেছেন। নিম্নে সেসব গুনাহ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হলো : ১. অপ্রয়োজনে কথা বলা। ২. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা। ৩. হারাম জিনিসের পর্যালোচনা করা— যেমন: চলচ্চিত্রের কাহিনি, ফাসেকদের মজলিসের আলোচনা ইত্যাদি। ৪. ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া। ৫. অন্যকে হেয় করার উদ্দেশ্যে চিৎকার ট্যাঁচামেচি করা। ৬. অশ্লীল কথাবার্তা বলা। ৭. উসকানিিমূলক কথাবার্তা বলা। ৮. অন্যকে অভিশাপ দেওয়া। ৯. অবৈধ হাসিঠাট্টা করা। ১০. গান গাওয়া, অশ্লীল কবিতা আবৃত্তি করা। ১১. অন্যকে বিদ্রূপ করা। ১২. অন্যের গোপন বিষয় প্রকাশ করা। ১৩. মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া। ১৪. মিথ্যা বলা। ১৫. কারও নিন্দা করা (গিবত করা)। ১৬. পরনিন্দা করা। ১৭. দু'মুখো কথা বলা। ১৮. অন্যের প্রশংসা করা। ১৯. নিজের গুনাহের ব্যাপারে উদাসীন থাকা। ২০. সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন কথা বলা, যা তাদের বুঝা-ক্ষমতার ঊর্ধ্বে (যেমন: তাকদির, আল্লাহর সত্তা ইত্যাদি)। ৮৮

এ সমস্ত গুনাহ সাধারণত যবানের অসংযততার কারণে প্রকাশ পায়। আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জাবানত হওয়ার জন্য নিজেকে এ সকল গুনাহ থেকে পবিত্র রাখা জরুরি।

টিকাঃ
৮৮. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম, তৃতীয় খণ্ড।

ফন্ট সাইজ
15px
17px