📄 অহংকার না করা
মাথা হেফাজত করার দ্বিতীয় মূলনীতি এবং আল্লাহর প্রতি লজ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, মাথা এবং মস্তিষ্ক অহংকার ও অহমিকা থেকে পাক-পবিত্র রাখা। অহংকার মুমিনের সকল আমল বিনষ্ট করে দেয়। অহংকার কেবল আল্লাহকেই শোভা পায়। কুরআনে কারিমে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে,
১. وَلَهُ الْكِبْرِيَاءُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে গৌরব-গরিমা তারই এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। ৩৭
জমিনে দম্ভভরা হাঁটা এবং অহংকারীর মতো মাথা হেলিয়ে চলা কুরআনে কারিমের দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয় কাজ। ইরশাদ হচ্ছে,
২. وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না; তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-সমান হতে পারবে না। ৩৮
৩. وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। ৩৯
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
১. হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: الْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي، وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي، مَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا، قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ. আল্লাহ তায়ালা বলেন, অহঙ্কার আমার চাদর। বড়ত্ব আমার পরনের পোশাক। যে ব্যক্তি এই দুই বস্তুর কোনো একটি আমার কাছে থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। ৪৮
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ كِبْرٍ. এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে। ৪৯
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, يُحْشَرُ الْمُتَكَبِّرُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمْثَالَ الذَّرِّ فِي صُوَرِ الرِّجَالِ، يَغْشَاهُمُ الذُّلُّ مِنْ কُلِّ مَكَانٍ، يُسَاقُونَ إِلَى سِجْنٍ جَهَنَّمَ، يُقَالُ لَهُ: بُولُسُ، تَعْلُوهُمْ نَارُ الْأَنْيَارِ، يُسْقَوْنَ مِنْ عُصَارَةِ أَهْلِ النَّارِ : طِينَةِ الْخَبَالِ. কিয়ামতের দিন অহঙ্কারীদের মানুষের আকৃতিতে পিপীলিকার ন্যায় একত্র করা হবে। চতুর্দিক থেকে লাঞ্ছনা তাদের ঘিরে রাখবে। তাদের হেঁটে ছেড়ে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের ‘বুলুস’ নামক কারাগারের দিকে। জাহান্নামের দগ্ধাগ্নি আগুন তাদের উপর প্রজ্বলিত করা হবে। জাহান্নামীদের রক্ত-পূঁজ তাদের পান করানো হবে হবে, যার নাম হবে ‘তিনাতুল খবাল’। ৫০
৪. অন্য হাদিসে হযরত সালামা আওকুয়া রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَذْهَبُ بِنَفْسِهِ حَتَّى يُكْتَبَ فِي الْجَبَّارِينَ فَيُصِيبَهُ مَا أَصَابَهُمْ. মানুষ অহঙ্কারের দিকে ধাবিত হতে হতে এক সময় অহঙ্কারীদের তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। অতঃপর অহঙ্কারীদের মতো শাস্তি তারাও ভোগ করে। ৫২
৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ دَرَجَةً رَفَعَهُ اللَّهُ دَرَجَةً، حَتَّى يَجْعَلَهُ فِي عِلِّيِّينَ، وَمَنْ تَكَبَّرَ عَلَى اللَّهِ دَرَجَةً، وَضَعَهُ اللَّهُ دَرَجَةً، حَتَّى يَجْعَلَهُ فِي أَسْفَلِ السَّافِلِينَ. যে ব্যক্তি আল্লাহ্র ওয়াস্তে এক স্তর বিনয়ী হয়, আল্লাহ তায়ালা তার এক ধাপ মর্যাদা উন্নীত করেন। এভাবে একসময় তাকে ইল্লিয়্যিনের সর্বোচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এক স্তর অহঙ্কার করে, আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদার এক ধাপ অবনতি ঘটান। এভাবে একসময় তাকে জাহান্নামের সবচেয়ে নিম্নস্তরে পৌঁছে দেন। ৫৩
৬. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, إِيَّاكُمْ وَالْكِبْرَ فَإِنَّ الْكِبْرَ يَكُونُ فِي الرَّجُلِ وَإِنَّ عَلَيْهِ الْعَبَاءَةَ. তোমরা অহঙ্কার থেকে দূরে থাকো। কারণ বুযুর্গীর চাদর পরিহিত থাকলেও মানুষের মাঝে অহঙ্কার বিদ্যমান থাকে। ৫৪
৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, بَيْنَمَا رَجُلٌ يَجُرُّ إِزَارَهُ مِنَ الْخُيَلَاءِ خُسِفَ بِهِ، فَهُوَ يَتَجَلْجَلُ فِي الْأَرْضِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ. পরবর্তী উম্মতের এক ব্যক্তি অহঙ্কারবশত লুঙ্গি মাটিতে ঠেকিয়ে হাঁটত। এ কারণে তাকে জমিনের নিচে দাবিয়ে দেওয়া হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে জমিনের ভেতর দাবতে থাকবে। ৫৫
৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ، لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْমَ الْقِيَامَةِ. যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। ৫৬
৯. হযরত ইবনে উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, মَنْ تَعَظَّمَ فِي نَفْسِهِ، أَوِ اخْتَالَ فِي مِشْيَتِهِ لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ. যে ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে করে এবং চাল-চলনে অহঙ্কার প্রকাশ করে, সে এমনাবস্থায় আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ তায়ালা তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন। ৫৭
মোটকথা, অহঙ্কার ও অহমিকা ভীষণ খারাপ অভ্যাস, যা মানুষের দুনিয়া- আখেরাত উভয় জগৎ ধ্বংসের কারণ। অধিকন্তু আল্লাহ্র বি পক্ষকে অহঙ্কার প্রদর্শন নিতান্ত নির্লজ্জতা ও ধৃষ্টতার পরিচায়ক। কাজেই নিজের মন-মস্তিষ্ককে এই ব্যাধি থেকে হেফাযত না করে আল্লাহ তায়ালার প্রতি পরিপূর্ণভাবে লজ্জাবান হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সর্বাধিক দিক থেকে বিনয় ও নম্রতার গুণে গুণান্বিত হওয়া উচিত। বিনয়ের মাধ্যমে মানুষ কল্পনা অতীত সম্মান ও মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়। পক্ষান্তরে অহঙ্কারের কারণে মানুষ নিজেকে যত বড়ই মনে করুক না কেন, মানুষের নজরে সে কুকুর ও শূকরের চেয়েও জঘন্য হয়ে যায়। ৫৮ আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই জঘন্যতম কাজ থেকে বিরত রাখুন এবং পূর্ণরূপে লজ্জা গুণে গুণান্বিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৩৭. সূরা জাসিয়া, আয়াত : ১৭।
৩৮. সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩৭।
৩৯. সূরা লুকমান, আয়াত : ১৮।
৪৮. আবু দাউদ, ২/৮৬৯; মুসলিম, ২/৩২১; ইবনে মাজাহ, ৩০৮।
৪৯. মুসলিম, ১/৬৮; তিরমিযী, ২/২০; মিশকাত, ২/৪৪০।
৫০. তিরমিযী; মিশকাত, ২/৪৩০; আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৫৩১।
৫১. তিরমিযী; মিশকাত, ২/৪৩০; আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৫৩১।
৫২. তিরমিযী, ২/২০।
৫৩. ইবনে মাজাহ, ৩০৮; আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৫২১।
৫৪. তাবারানী; আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৩২; তাবারানী, ৫০৪।
৫৫. নাসায়ী, ২/৯৮; আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৩২।
৫৬. বুখারী, ২/৮৬০, হাদিস নং-৫৭৮৫, আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩২৭।
৫৭. তাবারানী, আত্তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩২৭।
৫৮. মিশকাত, ২/৪০৪।