📄 শিরকে খফী বা গোপন শিরক
শিরকের দ্বিতীয় আরেকটি প্রকার রয়েছে, যাকে শিরকে খফী (গোপন শিরক) বা রিয়া বলা হয়। শিরকে খফীর অর্থ হলো, এইজন্য আল্লাহ্র ইবাদত করা যাতে অন্যরা তা দেখে খুশি হয়। অথবা ইবাদতের মাধ্যমে ইবাদতকারীর পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য হয়—যেমন : ইজ্জত-সম্মান, ধনসম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি ইত্যাদি। শরীয়তের দৃষ্টিতে এই কাজ কুফর ও শিরকের স্তরের নয়, তবে তা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এই মানুষের মেহনতকে নিমেষেই বরবাদ করে দেয়। এই সংক্রান্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু বাণী নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
১. হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِذَا تَرَيَّنَ الرَّجُلُ لِأَعْمَلِ الْآخِرَةِ وَهُوَ لَا يُরِيْدُهَا وَلَا يَطْلُبُهَا لَعَنَ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ.
যে ব্যক্তি আখেরাতের প্রকৃত প্রত্যাশী না হয়ে আখেরাতের আমল দ্বারা সুশোভিত হয়, তাকে আসমান-জমিনে অভিশাপ দেওয়া হয়। ১৯
২. হযরত জাবীরুদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ طَلَبَ الدُّنْيَا بِعَمَلِ الْآخِرَةِ طَمَسَ وَجْهَهُ وَمُحِقَ ذِكْرُهُ وَأُثْبِتَ اسْمُهُ فِي الْكُفَّارِ.
যে ব্যক্তি আখিরাতের আমলের মাধ্যমে দুনিয়া অন্বেষণ করে, তার চেহারা নিষ্প্রভ হয়ে যাবে, নাম-ধাম মিটে যাবে এবং জাহান্নামীদের তালিকায় তার নাম লেখা হবে। ২৯
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, مَنْ أَحْسَنَ الصَّلَاةَ حَيْثُ يَرَاهُ النَّاسُ, ثُمَّ أَسَاءَهَا حِينَ يَخْلُو, فَتِلْكَ اسْتِهَانَةٌ اسْتَهَانَ بِهَا رَبَّهُ. যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ উত্তমভাবে আদায় করে, পক্ষান্তরে নির্জনে অবহেলা করে, এটা মূলত এমন অবহেলা, যা সে আল্লাহর প্রতি প্রদর্শন করছে। ৩০
৮. হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. বলেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ صَامَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ, وَمَنْ صَلَّى يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ وَمَنْ تَصَدَّقَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ. যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে রোযা রাখল, সে শিরক করল। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে নামায পড়ল, সে শিরক করল। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে দান-সদকা করল, সেও শিরক করল। ৩১
৯. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, الشِّرْكُ الْخَفِيُّ أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يُصَلِّي, فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ, لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ. শিরক খফী হলো, নামায আদায়কালে কেউ তার নামায দেখে এমন ধারণা হলে নামায আরও সুন্দর করে পড়া। ৩২
৬. হযরত মাহমুদ ইবনে লাবিদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَشِرْكَ السَّرَائِرِ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا شِرْكُ السَّرَائِرِ? قَالَ: يَقُومُ الرَّجُلُ فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ جَاهِدًا لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ النَّاسِ إِلَيْهِ فَذَلِكَ شِرْكُ السَّرَائِرِ হে লোকসকল, গোপন শিরক থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, গোপন শিরক কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নামায আদায়-কালে মানুষ দেখলে নামাযকে চেষ্টা করে সুন্দর করা ই হলো গোপন শিরক। ৩৩
৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ " قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ? قَالَ: "الرِّيَاءُ, يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاوُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً. আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই ছোট শিরকের। সাহাবাকেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ছোট শিরক কী? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রিয়া। আল্লাহ তায়ালা মানুষের আমলের বিনিময় প্রদানকালে বলবেন, তাদের কাছে যাও, যাদের দেখানোর উদ্দেশ্যে দুনিয়া তোমরা আমল করতে গিয়ে দেখো, তাদের কাছে কোনো প্রতিদান পাও না? ৩৪
৮. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, أَمَّا إِنَّهُمْ لَا يَعْبُدُونَ شَمْسًا وَلَا قَمَرًا وَلَا حَجَرًا وَلَا وَثَنًا, وَلَكِنْ يُرَاوُونَ بِأَعْمَالِهِمْ وَالشَّهْوَةُ الْخَفِيَّةُ أَنْ يُصْبِحَ أَحَدُهُمْ صَائِمًا, فَتَعْرِضُ لَهُ شَهْوَةٌ مِنْ شَهَوَاتِهِ, فَيَتْرُكُ صَوْمَهُ. উম্মতের মাঝে শিরক ব্যাপকভাবে হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) মানুষ চাঁদ-সূর্য, পাথর বা মূর্তির ইবাদত করবে না; তবে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করবে (এটাই শিরক)। আর গোপন প্রবৃত্তি হলো, মানুষ রোযাদার অবস্থায় দিন শুরু করলেও কুপবৃত্তির প্ররোচনায় রোযা ভেঙে ফেলবে। ৩৫
৯. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ جُبِّ الْحُزْنِ, قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ: وَمَا جُبُّ الْحُزْنِ? قَالَ: وَাদٍ فِي جَهَنَّمَ تَتَعَوَّذُ مِنْهُ جَهَنَّمُ كُلَّ يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ. قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَدْخُلُهُ? قَالَ: أَعَدَّ لِلْقُرَّاءِ الْمُرَائِينَ بِأَعْمَالِهِمْ. তোমরা আল্লাহর কাছে জুব্বুল হুযন (পেরেশানির ঘাঁটি) থেকে পানাহ চাইবে। সাহাবাকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, জুব্বুল হুযন কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, তা জাহান্নামের এমন এক উপত্যকা, যা থেকে জাহান্নাম নিজেই প্রতিদিন ৪২ বার পানাহ চায়। কেউ প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাতে কে প্রবেশ করবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা ঐসব কারী সাহেবদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আমল তথা কুরআন তিলাওয়াত করত। ৩৬
উপরিউক্ত কয়েকটি হাদীসই আমাদের টনক নড়ানোর জন্য যথেষ্ট যে, আমাদের মাথাকে প্রত্যেক ভ্রান্ত আমল ও আকীদা থেকে দূরে রাখা উচিত, যা আল্লাহর প্রতি লজ্জার পরিপন্থী। রিয়া, লৌকিকতা, ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করা ইত্যাদি মূলত আল্লাহর প্রতি নিতান্ত লজ্জাহীনতার শামিল। কাজেই আল্লাহকে লজ্জা করার ব্যাপারে সর্বপ্রথম যা উল্লেখ করা হলো, তা হলো, মাথা ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য অঙ্গ হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা。
টিকাঃ
১৯. আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১/৩২১।
২৯. তাবারানী, ২০২৪; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩২।
৩০. বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ৩৭০৬; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৩।
৩১. আবু দাউদ, ১২১৮; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৩।
৩২. ইবনে মাজাহ, ৪২০; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৩।
৩৩. বাইহাকী, ২৬৭২; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৪।
৩৪. মুসনাদে আহমদ, ২০৬৯০; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৪।
৩৫. মুসনাদে আহমদ, ১৯১৩০; মিশকাত, ২/৪৫৩।
৩৬. তিরমিযী, ২০৮৩; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩০।