📄 মাথার হেফাযত
পূর্বে বর্ণিত 'আল্লাহকে লজ্জা করো' অর্থবহ হাদীসে সর্বপ্রথম যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা হলো, মাথা ও মাথাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য অঙ্গের হেফাযত করা। হাদীসের অর্থ এই নয় যে, মাথাকে শারীরিক ব্যাধি থেকে নিরাপদে রাখবে এবং ঔষধ ও অন্যান্য বস্তুর সাহায্যে এর চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। বরং হাদীসের উদ্দেশ্য হলো, মাথা এবং মাথার সাথে সংযুক্ত অঙ্গগুলোকে ঐ সমস্ত খারাপ কাজ থেকে হেফাযত করা, শরীয়ত যেসব কাজের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যেমন : আল্লাহ্র দুয়ার ব্যতীত অন্য কোনো দুয়ারে মাথা না ঝুঁকানো, চোখ দ্বারা অবৈধ বস্তু না দেখা, কান দ্বারা হারাম আওয়াজ না শোনা এবং মুখে নালায়েক কথা না বলা। কুরআন ও হাদীসে এসব অঙ্গ হেফাযত করার ব্যাপারে বিভিন্ন আঙ্গিকে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো :
📄 শিরক থেকে বেঁচে থাকা
মাথা হেফাযতের প্রথম মূলনীতি হলো, কারও মেধা-মস্তিষ্ক যেন কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ্র ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করার ইচ্ছা না দেখায়। কারণ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করা কিংবা অন্য কাউকে ইবাদতের যোগ্য মনে করা ইসলামের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শিরক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। ১৫
হাদীস শরিফে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় শিরকের নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। শুধু শিরকে হাকিকী (অর্থাৎ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কিছুকে মাবুদ মনে করে সিজদা করা ইত্যাদি) নয়, বরং সন্দেহজনক শিরক (অর্থাৎ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে মাবুদের মতো আচরণ করা) থেকেও বেঁচে থাকার নির্দেশ এসেছে। মৃত্যুষয্যায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশ কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওসিয়ত করেছিলেন। তন্মধ্যে একটি হলো:
أَنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيْهِمْ মَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ، إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ.
জেনে রাখো, পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেককারদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত (সিজদার স্থান বানাত)। সাবধান, তোমরা কবরকে মসজিদ বানাবে না। আমি তোমাদের এ কাজ করতে নিষেধ করছি। ১৬
সাধারণত আল্লাহ্র ওলী ও নবীদের না খোঁদা মনে করা হয়, আর না তাদের খোঁদা মনে করে সিজদা করা হয়। তবুও কবরকে সিজদা করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কারণ কবরকে সিজদা করা ও প্রকৃত শিরকের মাঝে বাহ্যত মিল রয়েছে এবং কবরকে সিজদা করা ক্রমান্বয়ে মানুষকে প্রকৃত সিজদার দিকে ধাবিত করে। সুতরাং মাথার হেফাযত ও আল্লাহ্র প্রতি লজ্জার দাবি হলো, আমাদের মাথা যেন আল্লাহ্র দরবার ব্যতীত অন্য কোনো দরবারে না ঝুঁকে এবং অন্য কারও প্রতিও আমরা আল্লাহ্ তায়ালার ন্যায় সম্মান প্রদর্শন না করি।
টিকাঃ
১৫. সূরা নিসা, আয়াত : ৪৮।
১৬. মুসলিম, ১/২০১।
📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন
বর্তমানে কবর সামনে মাথা ঝুঁকানো ও কবরে মাথা ঠেকানোর ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। যখন লোকেদের এই খারাপ কাজে বাঁধা দেওয়া হয় এবং তাদের সেসমস্ত সহিহ্ হাদীস পাঠ করে শোনানো হয়, যেসব হাদীসে কবরকে সিজদা করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে, তখন কিছু হতভাগা হক ও বাতিলের মাঝে সন্দেহ সৃষ্টিইন্নে ইচ্ছুক। সেসমস্ত সহিহ্ হাদীসগুলোর এই ব্যাখ্যা পেশ করে যে, 'হাদীস শরিফে যেই সিজদা করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা হলো নামাযের সিজদা। অর্থাৎ কবরকে এমন সিজদা করা যাবে না, যেমন নামাযে সিজদা করা হয়। তবে নামাযের সিজদা ব্যতীত অন্যান্য পদ্ধতিতে মাথা ঝুঁকানো হাদীসের আলোকে নিষিদ্ধ নয়।' অথচ এটা সম্পূর্ণ অমূলক ব্যাখ্যা বৈ কিছু নয়। কবরে রুকু-সিজদা করা এবং যেকোনো পদ্ধতিতে মাথা ঝুঁকানোর বিধান অন্যায়। একইভাবে আল্লাহ্ ভিন্ন কারুও সামনে যেকোনো ইবাদতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকলাপও নাজায়েয এবং হারাম। হানাকী মাযহাবের ফিকহ্গণ এই বিষয়টি স্পষ্টভাষাতে বর্ণনা করেছেন। ফিকহে হানাফীর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ দুররে মুখতারে এসেছে,
وَكَذَا مَا يَفْعَلُوْنَهُ مِنْ تَقْبِيْلِ الْاَرْضِ بَيْنَ يَدَيِ الْعُلَمَاءِ وَالْعُظَمَاءِ فَحَرَامٌ وَالْفَاعِلُ وَالرَّاضِيْ بِهِ آثِمَانِ، لِاَنَّهُ يُشْبِهُ عِبَادَةَ الْوَثَنِ. وَهَلْ يَكْفُرُ؟ اِنْ كَانَ عَلَى وَجْهِ الْعِبَادَةِ وَالتَّعْظِيْمِ كَفَرَ وَإِنْ عَلَى وَجْهِ التَّحِيَّةِ لَا. وَصَارَ آثِمًا مُرْتَكِبًا لِلْكَبِيْرَةِ.
অনুরূপ যেসকল মূর্খ মানুষ উলামায়েকেরাম ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সামনে জমিনে মাথা ঠেকিয়ে যে চুমু দেয়, তা হারাম। যারা এই কাজে লিপ্ত হয় এবং যারা এই কাজের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে, উভয়ই সমান গুনাহগার হবে। কারণ এই আমল মূর্তিপূজার সাথে সাদৃশ্য রাখে। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের ব্যক্তিকে কি কাফির বলা হবে? এর উত্তর হলো, ইবাদত ও সম্মানের নিয়তে কেউ এ কাজ করলে তাকে কাফির বলা হবে। আর যদি কেউ কেবল সম্মান প্রদর্শনার্থে এমনটা করে, তবে সে কাফির হবে না। কিন্তু সে ব্যক্তি কবিরা গুনাহে লিপ্ত বলে গণ্য হবে। ১৭
উপরিউক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ. লেখেন,
وَفِي الزَّاهِدِيِّ: الايْمَاءُ فِي السَّلَامِ اِلَى الرُّكُوْعِ كَالسُّجُوْডِ وَفِي الْمُحِيْطِ: اَنَّهُ يَكْرَهُ الْاِغْنَا الْسُّلْطَانَ وَغَيْرِهِ وَظَاهِرُ كَلَامِهِ اِطْلَاقُ السُّجُوْডِ عَلَى هَذَا التَّقْبِيْلِ.
ফাতাওয়ায় জাহেদীতে রয়েছে, রুকুর কাছাকাছি ঝুঁকে সালাম করাও সিজদার শামিল। এবং মুহীত্ব গ্রন্থে রয়েছে, বাদশাহ্ ও অন্য কারও সামনে মাথা ঝুঁকানো মাকরূহ তাহরীমী। ফুকাহায়েকেরামের স্পষ্ট বক্তব্য থেকে বুঝে আসে যে, সিজদা করে চুমু খাওয়ার ব্যাপারেও একই হুকুম দেওয়া হয়েছে। ১৮
মোটকথা, ফুকাহায়েকেরামের বক্তব্য থেকে এ কথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত নিষেধাজ্ঞা কেবল নামাযের মতো সিজদার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গাইরুল্লাহ্র সামনে ইবাদতের আকৃতি অবলম্বন ও সীমাতিক্রমী সম্মানপ্রদর্শন নিষেধ। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র প্রতি লজ্জা রাখে, সে কবর বা অন্য কিছুর সামনে মাথা ঝুঁকানোর স্পর্ধা দেখাতে পারে না।
টিকাঃ
১৭. দুররে মুখতার।
১৮. সহিহ্ (বইফেরত), ৯/৮৬৮, কিতাবুল হজ্জ্ব ওয়া ওয়াজিবুল ইহরাম; শামী (করাচি), ৬/৩৮৩।
📄 শিরকে খফী বা গোপন শিরক
শিরকের দ্বিতীয় আরেকটি প্রকার রয়েছে, যাকে শিরকে খফী (গোপন শিরক) বা রিয়া বলা হয়। শিরকে খফীর অর্থ হলো, এইজন্য আল্লাহ্র ইবাদত করা যাতে অন্যরা তা দেখে খুশি হয়। অথবা ইবাদতের মাধ্যমে ইবাদতকারীর পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য হয়—যেমন : ইজ্জত-সম্মান, ধনসম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি ইত্যাদি। শরীয়তের দৃষ্টিতে এই কাজ কুফর ও শিরকের স্তরের নয়, তবে তা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এই মানুষের মেহনতকে নিমেষেই বরবাদ করে দেয়। এই সংক্রান্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু বাণী নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
১. হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِذَا تَرَيَّنَ الرَّجُلُ لِأَعْمَلِ الْآخِرَةِ وَهُوَ لَا يُরِيْدُهَا وَلَا يَطْلُبُهَا لَعَنَ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ.
যে ব্যক্তি আখেরাতের প্রকৃত প্রত্যাশী না হয়ে আখেরাতের আমল দ্বারা সুশোভিত হয়, তাকে আসমান-জমিনে অভিশাপ দেওয়া হয়। ১৯
২. হযরত জাবীরুদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ طَلَبَ الدُّنْيَا بِعَمَلِ الْآخِرَةِ طَمَسَ وَجْهَهُ وَمُحِقَ ذِكْرُهُ وَأُثْبِتَ اسْمُهُ فِي الْكُفَّارِ.
যে ব্যক্তি আখিরাতের আমলের মাধ্যমে দুনিয়া অন্বেষণ করে, তার চেহারা নিষ্প্রভ হয়ে যাবে, নাম-ধাম মিটে যাবে এবং জাহান্নামীদের তালিকায় তার নাম লেখা হবে। ২৯
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, مَنْ أَحْسَنَ الصَّلَاةَ حَيْثُ يَرَاهُ النَّاسُ, ثُمَّ أَسَاءَهَا حِينَ يَخْلُو, فَتِلْكَ اسْتِهَانَةٌ اسْتَهَانَ بِهَا رَبَّهُ. যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ উত্তমভাবে আদায় করে, পক্ষান্তরে নির্জনে অবহেলা করে, এটা মূলত এমন অবহেলা, যা সে আল্লাহর প্রতি প্রদর্শন করছে। ৩০
৮. হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. বলেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ صَامَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ, وَمَنْ صَلَّى يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ وَمَنْ تَصَدَّقَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ. যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে রোযা রাখল, সে শিরক করল। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে নামায পড়ল, সে শিরক করল। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে দান-সদকা করল, সেও শিরক করল। ৩১
৯. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, الشِّرْكُ الْخَفِيُّ أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يُصَلِّي, فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ, لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ. শিরক খফী হলো, নামায আদায়কালে কেউ তার নামায দেখে এমন ধারণা হলে নামায আরও সুন্দর করে পড়া। ৩২
৬. হযরত মাহমুদ ইবনে লাবিদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَشِرْكَ السَّرَائِرِ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا شِرْكُ السَّرَائِرِ? قَالَ: يَقُومُ الرَّجُلُ فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ جَاهِدًا لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ النَّاسِ إِلَيْهِ فَذَلِكَ شِرْكُ السَّرَائِرِ হে লোকসকল, গোপন শিরক থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, গোপন শিরক কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নামায আদায়-কালে মানুষ দেখলে নামাযকে চেষ্টা করে সুন্দর করা ই হলো গোপন শিরক। ৩৩
৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ " قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ? قَالَ: "الرِّيَاءُ, يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاوُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً. আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই ছোট শিরকের। সাহাবাকেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ছোট শিরক কী? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রিয়া। আল্লাহ তায়ালা মানুষের আমলের বিনিময় প্রদানকালে বলবেন, তাদের কাছে যাও, যাদের দেখানোর উদ্দেশ্যে দুনিয়া তোমরা আমল করতে গিয়ে দেখো, তাদের কাছে কোনো প্রতিদান পাও না? ৩৪
৮. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, أَمَّا إِنَّهُمْ لَا يَعْبُدُونَ شَمْسًا وَلَا قَمَرًا وَلَا حَجَرًا وَلَا وَثَنًا, وَلَكِنْ يُرَاوُونَ بِأَعْمَالِهِمْ وَالشَّهْوَةُ الْخَفِيَّةُ أَنْ يُصْبِحَ أَحَدُهُمْ صَائِمًا, فَتَعْرِضُ لَهُ شَهْوَةٌ مِنْ شَهَوَاتِهِ, فَيَتْرُكُ صَوْمَهُ. উম্মতের মাঝে শিরক ব্যাপকভাবে হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) মানুষ চাঁদ-সূর্য, পাথর বা মূর্তির ইবাদত করবে না; তবে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করবে (এটাই শিরক)। আর গোপন প্রবৃত্তি হলো, মানুষ রোযাদার অবস্থায় দিন শুরু করলেও কুপবৃত্তির প্ররোচনায় রোযা ভেঙে ফেলবে। ৩৫
৯. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ جُبِّ الْحُزْنِ, قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ: وَمَا جُبُّ الْحُزْنِ? قَالَ: وَাদٍ فِي جَهَنَّمَ تَتَعَوَّذُ مِنْهُ جَهَنَّمُ كُلَّ يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ. قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَدْخُلُهُ? قَالَ: أَعَدَّ لِلْقُرَّاءِ الْمُرَائِينَ بِأَعْمَالِهِمْ. তোমরা আল্লাহর কাছে জুব্বুল হুযন (পেরেশানির ঘাঁটি) থেকে পানাহ চাইবে। সাহাবাকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, জুব্বুল হুযন কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, তা জাহান্নামের এমন এক উপত্যকা, যা থেকে জাহান্নাম নিজেই প্রতিদিন ৪২ বার পানাহ চায়। কেউ প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাতে কে প্রবেশ করবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা ঐসব কারী সাহেবদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আমল তথা কুরআন তিলাওয়াত করত। ৩৬
উপরিউক্ত কয়েকটি হাদীসই আমাদের টনক নড়ানোর জন্য যথেষ্ট যে, আমাদের মাথাকে প্রত্যেক ভ্রান্ত আমল ও আকীদা থেকে দূরে রাখা উচিত, যা আল্লাহর প্রতি লজ্জার পরিপন্থী। রিয়া, লৌকিকতা, ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করা ইত্যাদি মূলত আল্লাহর প্রতি নিতান্ত লজ্জাহীনতার শামিল। কাজেই আল্লাহকে লজ্জা করার ব্যাপারে সর্বপ্রথম যা উল্লেখ করা হলো, তা হলো, মাথা ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য অঙ্গ হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা。
টিকাঃ
১৯. আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১/৩২১।
২৯. তাবারানী, ২০২৪; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩২।
৩০. বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ৩৭০৬; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৩।
৩১. আবু দাউদ, ১২১৮; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৩।
৩২. ইবনে মাজাহ, ৪২০; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৩।
৩৩. বাইহাকী, ২৬৭২; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৪।
৩৪. মুসনাদে আহমদ, ২০৬৯০; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩৪।
৩৫. মুসনাদে আহমদ, ১৯১৩০; মিশকাত, ২/৪৫৩।
৩৬. তিরমিযী, ২০৮৩; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৩০।