📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 লজ্জার হকদার কে?

📄 লজ্জার হকদার কে?


স্বাভাবিকভাবে সবার মাঝে কিছু-না-কিছু লজ্জার গুণ থাকে। অর্থাৎ সাধারণত মানুষ অপরের সামনে বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতাকে পছন্দ করে না এবং সবাই চেষ্টা করে, যেন অন্য কেউ তাকে খারাপ কাজ করতে না দেখে। অনুরূপ অনেকে সম্মান রক্ষার চিন্তায় অন্যের সামনে খারাপ কাজ লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকে। মানুষের মাঝে অন্তর্নিহিত লাজুকতাই মানুষকে এ ধরনের খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। লজ্জার কারণে খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার বহু দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ জনসম্মুখে সতর খোলার কথা বলা যায়। মানুষ লজ্জার কারণে এই কাজ করতে পারে না। তবে একাকী ও নির্জনতায় এই কাজকে লজ্জার পরিপন্থী মনে করা হয় না। কিন্তু ইসলামধর্মে লজ্জার অর্থ কেবল মানুষকে লজ্জা পাওয়াই নয়, বরং ইসলামে মুসলমানদের সেই মহান রাব্বুল আলামিনকে লজ্জা করার শিক্ষা দেয়, যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, উপস্থিত-অনুপস্থিত, ছোট-বড় সবকিছুর পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। আল্লাহকে লজ্জা করার অর্থ হলো, আল্লাহর দৃষ্টিতে যেসব কাজ অনুচিত ও অশোভন, কোনো অবস্থাতেই তা না করা এবং শরীরের প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সেসব কাজ থেকে বিরত রাখা। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়েকেরামকে সম্বোধন করে বলেন,

আল্লাহকে যথাযথ লজ্জা করো। সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! আমরা তো তাঁকে অবশ্যই লজ্জা করি। আমাদের কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে শুরু করলেন, তা নয়। আল্লাহকে যথাযথ লজ্জা করার অর্থ হলো, তুমি মাথা ও তাতে যা সংরক্ষিত আছে, তা রক্ষা করবে; পেট ও তাতে যা জমা আছে, তা হেফাযত করবে; মৃত্যু ও হাড়গোড় চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার কথা স্মরণ রাখবে। যে ব্যক্তি আখেরাতের আশা রাখে, সে দুনিয়ার আড়ম্বরতা পরিত্যাগ করে। যে ব্যক্তি এই কাজগুলো করল, সে যথাযথ লজ্জা করল। ১৮

আলোচ্য হাদিস থেকে স্পষ্ট জানা যায়, আল্লাহকে লজ্জা পাওয়া অত্যন্ত জরুরি বিষয়। তবে এর জন্য শুধু মৌখিক দাবিই যথেষ্ট নয়, বরং নিজের দেহ-মন ও কামনা-বাসনাকে আল্লাহর আনুগত্যের রঙে রঙিন করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর দাসত্বের চিন্তায় মগ্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য।

টিকাঃ
১৮. কিতাবুল যুহদ, ১০৭; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৪২; মিশকাত, ১/১৪০; তিরমিযী, ২/২১; আত্ব-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/২২৯।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 লজ্জার প্রেরণা সৃষ্টি হওয়ার উপায়

📄 লজ্জার প্রেরণা সৃষ্টি হওয়ার উপায়


আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জার আগ্রহ ও প্রেরণা কীভাবে সৃষ্টি হয়? এ বিষয়ে বুযুর্গানে দীন এবং উলামায়েকেরামের নিম্নোক্ত কথামালা প্রণিধানযোগ্য:

১. হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহ. বলেন, ‘সর্বাবস্থায় আল্লাহর নেয়ামতরাজি স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অলসতা-অবহেলা ও গুনাহের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে যে মানসিক অবস্থা সৃষ্টি হয়, তাকেই লজ্জা বলে।’ ১৯

২. হযরত যুননুন মিসরী রহ. বলেন, ‘যে জিনিস আল্লাহ তায়ালাকে যথাযথ লজ্জা করার প্রতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, তা হলো মানুষের প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত ও অনুগ্রহ। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ ও ইহসানের শোকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব। সুতরাং আল্লাহর বড়ই ও মহত্ত্ব যেমন অসীম, অনুরূপ আল্লাহর কৃতজ্ঞতারও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।’ ২০

৩. হযরত মুহাম্মদ ইবনে ফজল রহ. বলেন, ‘লজ্জা সৃষ্টির উপায় হলো, প্রথমে তুমি অনুগ্রহশীল নেয়ামতদাতা নেয়ামতের প্রতি দৃষ্টি ফেরাবে। এরপর গভীরভাবে ভাববে, এসব নেয়ামতের বিনিময়ে আল্লাহর সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত, তা কি তুমি করেছ? সর্বদা এই দুটি বিষয় মাথায় রাখলে তোমার মাঝে লজ্জাশীলতার গুণ সক্রিয় হবে, ইনশাআল্লাহ।’ ২১

উলামায়েকেরামদের উপরিউক্ত বক্তব্যের সারমর্ম হলো, প্রথমত আমাদের উচিত আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য নেয়ামতকে—যা সর্বদা বৃষ্টির ন্যায় আমাদের উপর বর্ষিত হয়—সব সময় স্মরণ রাখা। এরপর দেখা উচিত, আমরা এসব নেয়ামতের কতটুকু হক আদায় করছি? পক্ষান্তরে আমরা কত বেশি অবহেলা করছি? এই দুটি বিষয় সর্বদা অন্তরে জাগরুক থাকলে এমনিতেই আমাদের মাঝে এই অনুভূতি জাগ্রত হবে যে, আমাদের পক্ষে এমন কাজ কখনও উচিত হবে না, যার কারণে আমাদের উপর আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন এবং এসব নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়। এই অনুভূতির নামই লজ্জা, যা মুমিন বান্দার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের প্রত্যেককে লজ্জার গুনে গুণান্বিত করুন। আমিন।

টিকাঃ
১৯. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৪৭।
২০. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৪৭।
২১. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৬/১৪৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px