📄 দুনিয়াতে থাকলে গুনাহ কিছু না কিছু হবেই
হ্যাঁ, আমরা যেহেতু দুনিয়াতে আছি, তাই আমাদের গুনাহ হয়ে যেতে পারে। দুনিয়াতে থাকাকালীন বাতাস যখন প্রবাহিত হয় তখন আতরের পাশ দিয়ে গেলে সুগন্ধি লাগে, ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে গেলে গন্ধ লাগে! এটা কি আপনি প্রতিহত করতে পারবেন? বলতে পারবেন যে, আমি ভিআইপি মানুষ, আমার নাকে কেন গন্ধ লাগবে? বরং বাতাস তার গতিতে সুগন্ধি কিংবা দুর্গন্ধ আপনার নাকে পৌঁছাবেই।
অনুরূপভাবে আমরা যেহেতু দুনিয়াতে আছি, এ কথা আমরা কেউই বলতে পারব না, মরণের আগ পর্যন্তও না যে, আমার দ্বারা গুনাহ হবে না। এটা বলতে পারব না যে, আমার দ্বারা অহংকার হবে না, আমলে রিয়া আসবে না, গীবত হয়ে যাবে না, চোখের ব্যাভিচার হয়ে যাবে না।
আপনাদের হয়তো ধারণা যে, বড় কোনো বুজুর্গ হয়তো বলতে পারবেন। ধরুন, আব্দুল কাদের জিলানী এ মাপের কোনো বুজুর্গ হয়তো এ কথা বলতে পারবেন। তাহলে শুনুন, তিনিও বলতে পারবেন না। কেননা দুনিয়া মানেই হল, গুনাহের মুখোমুখি আপনাকে হতে হবে। দুনিয়া মানেই হল, কখনো কখনো আমার অহংকার চলে আসবে, গীবত হয়ে যাবে, কুদৃষ্টি হয়ে যাবে, রিয়া প্রকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা দেখতে চান যে, এ অবস্থাতে আমার মাঝে কি গোলামীর গুণ আছে না ইবলিশের গুণ আছে!
📄 নিজেকে গুনাহগার মনে করুন
তাহলে গুনাহ হয়ে যাওয়া এটা বড় বিষয় নয়। হ্যাঁ, এ নিয়ে টেনশন করবেন অবশ্যই। তাহলেই তো গুনাহ থেকে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার জন্য এটা বড় বাধা নয়। বড় বাধা হল, ইবলিশের আচরণ আমার আর আপনার মাঝে চলে আসা।
আল্লাহর দরবারে আমরা যদি সবসময় নিজেকে অপরাধী মনে করতে পারি, যদি মনে করতে পারি যে, আমি সবচেয়ে বড় গুনাহগার, আমার চেয়ে বড় গুনাহগার আর কেউ নেই, আমি মানুষের হক সবচেয়ে বেশি নষ্টকারী, আল্লাহর হক নষ্টকারী, আমার সব সময় তাওবা করতে হবে, আমার এ গুনাহগুলো না জানি কেমনে মাফ হবে। আহ! আমার আমল তো ইবলিশ নিয়ে গেল, রিয়া শেষ করে দিল, আহ! আমার আমল তো নফস নিয়ে গেল- যদি এ ধরণের মানসিকতা লালন করতে পারি তাহলে নিজেকে এভাবে যত নিচু করতে পারব আল্লাহ আমাদেরকে তত উঁচু করতে থাকবেন। এটাকে বলা হয় বিনয়। সকল মুসলমান থেকে নিজেকে ছোট মনে করা। সবার চেয়ে নিজের আমল খারাপ মনে করা। সবার চেয়ে নিজেকে বড় গুনাহগার মনে করা। নবীজী ﷺ বলেন, তুমি আল্লাহর জন্য ছোট হও رفعه الله আল্লাহ তোমাকে বড় করে দিবেন।
📄 ইবলিশের আচরণ যেন চলে না আসে
আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, কিন্তু যদি ইবলিশের স্বভাব আমাদের মাঝে চলে আসে অর্থাৎ যদি এভাবে চিন্তা করি যে, আমি তো এ নেক কাজটা করি, অমুক তো মদখোর, অমুক তো এ কাজটা করে না, অমুক তো এত বড় গুনাহগার তাহলে শুনুন, খুব ভাল করে শুনুন, 'আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, আল্লাহ সকল বেঈমানী থেকে আমাদের সকলকে হেফাজত করুন, সকল নেফাকী থেকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখুন' কিন্তু আমি আর আপনি ঈমান নিয়ে মারা যাবো, এর নিশ্চয়তাটা কোথায় আছে? কে এই নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, সে ঈমান নিয়ে মারা যাবে?
এ নিশ্চয়তা আমরা কেউই দিতে পারব না। আল্লাহর একান্ত রহমত ছাড়া ঈমান নিয়ে কেউ মরতে পারবে না।।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের দৌলত নসীব করুন আমীন।
📄 আবুদ্দারদা রাযি.-এর মৃত্যুকালীন ঘটনা
আরে আমরা কে! আমাদের মূল্যই বা কী! সাহাবায়ে কেরাম রাযি., যাদের ঈমান গঠন করেছেন স্বয়ং নবীজী ﷺ। সাহাবী হযরত আবুদ্দারদা রাযি.। যখন তাঁর মৃত্যু হচ্ছিল, তাঁর স্ত্রী উম্মুদ্দারদা রাযি. তাঁর পাশে বসে আফসোস করছিলেন আর কান্না করছিলেন। আবুদ্দারদা রাযি. তখন স্ত্রীকে বললেন, উম্মুদ্দারদা! এখানে বসে কান্নার দরকার নেই। আমি আমার হাবীব থেকে হাদীস শুনেছি, আল্লাহ তাআলার দুই হাত। এক হাতের মধ্যে আল্লাহ ঈমানদারদের রুহগুলো রেখেছেন। আরেক হাতের মধ্যে আল্লাহ বেঈমানদের রুহগুলো রেখেছেন। আমি আবুদ্দারদার তো জানা নেই, আমার রুহটা আল্লাহর কোন হাতের ভিতর আছে; বাম হাতের ভিতরে না ডান হাতের ভিতর? সুতরাং উম্মুদ্দারদা! তুমি জায়নামায নিয়ে বসে পড়, আল্লাহর কাছে দোয়া কর, আল্লাহ যেন আমাকে ঈমানের হালতে মওত দান করেন।
চিন্তা করে দেখুন, আবুদ্দারদা রাযি. ছিলেন حكيم هذه الامة এই উম্মতের হাকিম, শীর্ষ সাহাবীদের একজন ছিলেন। আলেম সাহাবী ছিলেন। আর তিনি একথা বলছেন!
উম্মুদ্দারদা রাযি. জায়নামায নিয়ে বসে গেলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া শুরু করে দিলেন এ মহান সাহাবীর জন্য।
ও আল্লাহর বান্দা! সেখানে আমি আর আপনি কে? আমরা কেন দেখি না যে, আল্লাহ ইবলিশের এক হাজারের বছরের ইবাদতের ব্যাপারে এক সেকেন্ডে বলে দিয়েছেন, দরকার নেই! বালআম বাউরার তিনশ বছরের ইবাদতের ব্যাপারে এক সেকেন্ডে বলে দিয়েছেন, দরকার নেই!
অপর দিকে যে লোকটি একশ লোেক হত্যা করেছে আল্লাহ তাকে মাফ করে জান্নাতে ডেকে নিয়েছেন!
এর কারণ হল, আল্লাহ তাআলা আমলগুলো পরে দেখেন, আগে দেখেন দিলের অবস্থা। ইবাদত করে ভরপুর করে দিলাম কিন্তু দিল ইবলিশ মার্কা। কোনো ফায়দা নেই। দিল এমন যে, মনে করছি আমি সবচেয়ে ভাল, আর সবাই খারাপ। আমারটাই ঠিক, বাকি সব বেঠিক। আমি যে কাজ করি এটাই দীন, বাকি কোনোটাই দীন না। তাহলে কোনো লাভ নেই! কেননা, এটাতো ইবলিশের মানসিকতা। সে বলেছিল, আমিই শ্রেষ্ঠ انا خير منه আমি আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
যাই হোক, উম্মুদ্দারদা রাযি. আল্লাহর কাছে দোয়া শুরু করে দিলেন যে, ওগো আল্লাহ! আপনি আমার স্বামী আবুদ্দারদাকে ঈমানের হালতে মওত দান করেন।
কিছুক্ষণ পর আবুদ্দারদা রাযি.-এর ইন্তেকাল হল। আলহামদুলিল্লাহ ঈমানের সঙ্গে ইন্তেকাল হয়েছে। ঘোষক ঘোষণা দিল- উম্মুদ্দারদা! ওঠো, আর কান্নাকাটির দরকার নেই, কারণ তোমার স্বামী আবুদ্দারদার ঈমানের সঙ্গে মওত হয়েছে।