📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 ইখলাসের অনেক ফায়দা রয়েছে

📄 ইখলাসের অনেক ফায়দা রয়েছে


শয়তানের চক্রান্ত ও অনিষ্টতা প্রতিরোধের ক্ষেতে ইখলাস সবচেয়ে কঠিন বিষয়। ইখলাস হলো কঠিন পাথর; যা আল্লাহর দুশমনের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়, তার দিকে তাক করা তিরকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। ইখলাস হলো একটি রাব্বানি অস্ত্র বা হাতিয়ার এক দুশমন বিতাড়িত শয়তানের সাথে লড়াইয়ের সময় নিজের সুরক্ষাকবচ বা ঢাল। শয়তান নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে, যারা ইখলাস অবলম্বন করবে তাদের ব্যতীত অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেবে।

আল্লাহ তাআরা কুরআন শরিফের মাঝে বলেন-

قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ

সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আপনি যেমন আমাকে পথ ভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথ ভ্রষ্ঠ করে দেব। আপনার মনোনীত বান্দাদের ব্যতীত। ১৪১ (যারা ইখলাস অবলম্বন করেছে)

আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি তো তারাই যারা একনিষ্ট হয় মুখলিস হয়। শয়তান তাদের সামনে গর্হিত ও খারাপকাজকে সুশোভিত করে দেখাতে পারে না। কেননা তারা তা থেকে মুক্ত, তাদেরকে শয়তানের চক্রান্ত থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষার ময়দানে রয়েছে। তাদের নফসের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকে।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেদের একনিষ্ট করে নেবে, আল্লাহ তাআলা তাদের নফসকে নষ্ট করতে ছেড়ে দিবেন না, আল্লাহর রহমত তাদেরকে ঘিরে ফেলবে। আর এই মর্যাদা ও সম্মানই তো যথেষ্ট যে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন। ইখলাসের অন্যতম এই ফায়দা হলো, ইখলাস খারাপকাজ ও ফাহেশা কাজ থেকে বিরত রাখে এবং শাহওয়াত ও সন্দেহ সংশয় থেকে মুক্ত রাখে। ১৪২

মহান আল্লাহ তাআলা নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বলেন-

﴿وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّءَا بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ﴾

নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিল এবং সেও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করত। যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করত। এমনিভাবে হয়েছে, যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নিলজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন। ১৪৩

নাফে, ইবনু কাছির, ইবনু উমর, ইবনু আমের (الْمُخْلَصِينَ) এখানে যের দিয়ে পড়েন। সুতরাং তখন অর্থ হবে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও নবী ইউসুফ আঃ কে মুক্তি দিয়েছেন তার একনিষ্ট হওয়া, তাঁর প্রতি ইহসান এবং স্বীয় রবের মুরাকাবা করার কারণে। এবং আযিযের স্ত্রীর সকল প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র তার সামনে টিকেনি। কেবল তার ইখলাস বৃদ্ধিই পেয়েছে। ১৪৪

অতএব যে ব্যক্তি শয়তানের কুমন্ত্রনা ও তার কুটচাল এবং তার চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকতে চায় সে যেন ইখলাস নিজের মাঝে জড়িয়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি ধ্বংসাত্মক শাহওয়াত ও খাহেশাতে নিমজ্জিত হওয়া এবং ভ্রষ্টকারী মসিবতে পতিত হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে চায় সে যেন ইখলাসের ভূষণ ধারণ করে।

যেমন কোন একজন সালাফ বলে থাকেন-

হে আমার নফস! তুমি ইখলাস অবলম্বন কর। যাতে করে তুমি নিষ্কৃতি পাবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে কথাবার্তা ও কাজে কর্মে যেন তিনি আমাদেরকে ইখলাস অবলম্বন করার তাওফিক চাই।

টিকাঃ
১৪১ সূরা হিজর: ৩৯-৪০
১৪২ তাত্নীরুল আনফাস বি হাদীসিল ইখলাস: ১৩১
১৪৩ সূরা ইউসুফ: ২৪
১৪৪

📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণসমূহের বিপরীত চললে গুনাহ মুক্ত থাকা যাবে

📄 গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণসমূহের বিপরীত চললে গুনাহ মুক্ত থাকা যাবে


যেসব কারণে বান্দা গুনাহে লিপ্ত হয় সেগুলোর বিরোধিতা করলে, বিপরীত পন্থা অবলম্বন করলে গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়।

জাহালত এর বিপরীত উপকারি ইলম, উপকারী ইলম এর দ্বারা অন্তরের জীবন লাভ হয় এবং এর মাধ্যমেই পথভ্রষ্টকারী সংশয়সমূহ প্রতিরোধ করা যায়। আর উপকারী ইলম বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।

তাই ইলম অন্বেষণকারী যদি ইলম অন্বেষণের ক্ষেতে আল্লাহর একনিষ্ট হয় এবং নিজের ইলম অনুপাতে আমলকারী হয় তাহলে কিয়ামতের দিন সে সফলকাম হবে।

কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে তার বিরোধিতা করা, বিপরীতে চলা, কেননা প্রবৃত্তির অনুসরণ কামনা-বাসনা পূরণ এবং গুনাহে নিপতিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

﴿إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾

নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু। ১৪৫

অনুরূপভাবে আরও বলা হয় যে, প্রবৃত্তি ফিতনার দিকে ধাবিত করে। আর দুনিয়া হলো পরীক্ষার জায়গা, মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশার জায়গা। সুতরাং প্রবৃত্তি পরিত্যাগ কর তাহলে মসিবত ও বিপদাপদ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে আর দুনিয়ার ভোগ বিলাস ইত্যাদি থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে গনিমত লাভ করতে পারবে। আর তোমার প্রবৃত্তি তোমাকে উত্তম স্বাদ আস্বাদন করিয়ে যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে এবং তোমার দুনিয়া তোমাকে ফেতনায় আক্রান্ত না করে সুন্দর নগ্ন সৌন্দর্য। কেননা, খেল-তামাশার লগ্ন শেষ হয়ে যাবে এবং যুগের নগ্নতা পুরান হয়ে যাবে। বাকি থাকবে শুধু তা'ই, যে হারাম কাজে তুমি লিপ্ত হয়েছিলে এবং যে পাপ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৪৬

অতএব যে ব্যক্তি নাজাত পেতে যায় তার জন্য আবশ্যক হলো স্বীয় কামনা-বাসনার বিরোধিতা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। ১৪৭

শয়তানের আদেশের অনুসরণ না করে তার অবাধ্যতা করা এবং রহমানের আদেশের অনুসরণ করা। যেমন আল্লাহ তাআলা পাক কালামে বলেছেন-

أَلَمْ أَعْهَدُ إِلَيْكُمْ يَبَنِي ءَادَمَ أَن لَّا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ وَلَقَدْ أَضَلَّ مِنكُمْ جِبِلًا كَثِيرًا أَفَلَمْ تَكُونُوا تَعْقِلُونَ ﴾

হে বনী-আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের এবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? এবং আমার এবাদত কর। এটাই সরল পথ। শয়তান তোমাদের অনেক দলকে পথভ্রষ্ট করেছে। তবুও কি তোমরা বুঝনি? ১৪৮

এবং খারাপ ব্যক্তির সংশ্রব পরিত্যাগ করে সৎলোকের সংশ্রব গ্রহণ করা; যারা তাদের সাথিদেরকে যা ভুলে গিয়েছে তা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং যখন পদস্খলন ঘটে তখন নাসিহা প্রদান করে এবং আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের ওপর অভ্যস্ত বানিয়ে তুলে, গর্হিত ও অন্যায় কাজ থেকে বাধা প্রদান করে এবং দূরে সরিয়ে রাখে। সুতরাং যখন তুমি তাদের সংশ্রব গ্রহণ করলে খারাপ কাজ থেকে মুক্ত থাকা যাবে, মানুষ তাদের মজলিস থেকে বেশি বেশি ফায়দা হাসিল করে এবং তাদের আখলাক ও আচরণ এবং গুণাবলিসমূহ জানতে পারে।

বলা হয় সাথি হলো একজন পরিচালনাকারী-

انت في الناس تقاس بمن اخترت خليلا
فاصحب الأخيار تعلو وتنل ذكرا جميلا

নিজেকে মানুষের মাঝে তুলনা কর যে তুমি কাকে বন্ধরূপে গ্রহণ করেছো, তাই তুমি উত্তম নেককার লোকদের সাহচর্য সংশ্রব গ্রহণ কর তাহলে তুমি মর্যাদাশীল হবে পাবে উত্তম আলোচনা।

গাফলতি ও উদাসীনতার বিপরীতে সর্বদা সজাগ থাকা, নেক আমল করার মাধ্যমে হিসাবের জন্য প্রস্তুত থাকা, সর্বদা নফসের মুহাসাবা করা। গাফলতির কারণে বান্দা তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তথা ইবাদতকে ভুলে যায়।

লম্বা আশার বিরোধিতা করা: অল্প আশা করা, আখিরাতকে ভুলে গিয়ে ক্ষনস্থায়ী দুনিয়ার পিছে পড়ে ধোঁকাগ্রস্ত না হওয়া। কেননা আখিরাত হলো চিরস্থায়ী যার কোন শেষ নেই। আর দুনিয়া হলো ক্ষনস্থায়ী আজ আছে কাল শেষ হয়ে যাবে সব আয়োজন। আর বান্দার কিয়ামত তো তখনই শুরু হয়ে যায় যখন সে মৃত্যুবরণ করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوٰةَ الدُّنْيَا وَالْوَاخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى

বস্তুতঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। ১৪৯

টিকাঃ
১৪৫ সূরা ইউসুফ: ৫৩
১৪৬ আদাবুদ দুনয়া ওয়াদ দীন: ৪১ (পরিমার্জিত)
১৪৭ সূরা নাযিআত: ৪০-৪১
১৪৮ সূরা ইয়াসিন: ৬০-৬২

📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 নযর হেফাজত করা

📄 নযর হেফাজত করা


নজরকে হারাম বস্তু দেখা থেকে ফিরিয়ে রাখা। কারণ একটি পলকই তো জাহান্নামে যাবার জন্য যথেষ্ট। একটি পলকই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার দ্বার খুলে দেয়।

টিকাঃ
১৪৯ সূরা আলা: ১৬-১৭

📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 জিহবার হেফাজত করা

📄 জিহবার হেফাজত করা


কথা বলার সময় খুব চিন্তা ভাবনা করে কথা বলা। অশালীন কথা বার্তা না বলা, গালি না দেওয়া, কারো গিবত, পরনিন্দা না করা, মিথ্যা সাক্ষ্য না দেয়া এবং মিথ্যা কথা না বলা। এগুলোর বিপরীতে বান্দার আবশ্যক হলো জিকির ও তাসবিহ তাহলিল আদায় করা। অন্যথায় চুপ থাকাটাই শ্রেয়। আর যেমন বলা হয়, যে চুপ থাকে সে নাজাত পায়।

জনৈক ব্যক্তি সালমানকে বলল: আমাকে উপদেশ দিন। তখন তিনি বললেন, কথা বলো না। তখন ব্যক্তিটি বলল, যে মানুষের মাঝে বসবাস করে সে তো তাদের সাথে কথাবার্তা বলা ছাড়া থাকতে পারে না। তাহলে তুমি কথা বলবে, তবে যা বলবে হক বলবে অথবা চুপ থাকবে।

ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন: হুকামারা এ ব্যাপারে একমত যে, সকল হিকমতের মূল হলো চুপ থাকা।

অবশ্যই মুসলিমদের ওপর আবশ্যকীয় হলো নিজের জিহ্বাকে হেফাজত করা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকরুল্লাহ এবং আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও অন্যান্য ইবাদত ব্যতীত কোন কথা না বলা। যেগুলো মর্যাদা বুলন্দ করে এবং বান্দাকে নাজাতের পথে নিয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমিন।

وأخر دعوانا عن الحمد الله رب العالمين

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00