📄 আল্লাহর স্মরণ বা জিকির করা
সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন হলো বেশি বেশি আল্লাহর জিকির, তাহলো অন্তরের জীবন, সুখ ও আত্মার প্রশান্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذْكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذْكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়। ১২৮
عن أبي الدرداء رضي الله عنه قال قال النبي صلى الله عليه وسلم ألا أنبئكم بخير أعمالكم وأزكاها عند مليككم وأرفعها في درجاتكم وخير لكم من إنفاق الذهب والورق وخير لكم من أن تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم ويضربوا أعناقكم ؟ قالوا بلى قال ذكر الله تعالى فقال معاذ بن جبل رضي الله عنه ما شيء أنجى من عذاب الله من ذكر الله
হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কী তোমাদের অধিক উত্তম আমল প্রসঙ্গে জানাব না, যা তোমাদের মনিবের নিকট সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের সম্মানের দিক থেকে সবচেয়ে উঁচু, স্বর্ণ ও রৌপ্য দান খায়রাত করার চেয়েও বেশি ভাল এবং তোমাদের শত্রুর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে তোমাদের সংহার করা ও তোমাদেরকে তাদের সংহার করার চাইতেও ভাল? তারা বললেন: হাঁ। তিনি বললেন: আল্লাহ তাআলার জিকির। মুআজ বিন জাবাল বলেন, আল্লাহ তাআলার শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার জিকিরের তুলনায় অগ্রগণ্য কোন জিনিস নেই। ১২৯
মুসলিমরা জিকিরের এই ফায়দার ব্যাপারে গাফেল ও উদাসীন থেকে আজ কতদূরে অবস্থান করছে! যারা জিকির করে ও যারা জিকির করেনা তারা দুইটি দলে পরিণত হয়েছে। আল্লাহর নবী তাদের উভয় দলের ব্যাপারে বলেন-
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
হযরত আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জিকির করে এবং যে ব্যক্তি জিকির করেনা তার উপমা হচ্ছে জীবিত ও মৃতের মত। ১৩০
জিকিরের অনেক ফায়দা রয়েছে
প্রথম ফায়দা
আল্লাহর জিকির বান্দাকে গুনাহ ও পাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার জিকির করে এবং জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে, ঘনিষ্ট হয় সে ঐ ব্যক্তির মত নয় যে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে উদাসীন এবং শাহওয়াত ও নিজের খেয়াল খুশির সাথে সম্পর্ক রাখে।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- সবসময় আল্লাহর জিকির ও স্মরণ আবশ্যিকভাবে নিজেকে ভুলে যাওয়া থেকে বাঁচায়। যা দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দার শিফা। কেননা প্রভু দয়াময়কে ভুলে যাওয়ার কারণে ব্যক্তি নিজেকে ও নিজের কল্যাণকে ভুলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلاَ تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَبُهُمْ أَنفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ তা, আলাকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তা,আলা তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য। (সূরা হাশর: ১৯)
আর যখন বান্দা যখন নিজেকেই ভুলে যায়, নিজের মাসলাহাত তথা কল্যাণকর বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা ভুলে যায়, নিজের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায় তখন সে আবশ্যিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায় নষ্ট হয়ে যায়। সে যেন ঐ ব্যক্তির ন্যায় যার ক্ষেত-খামার আছে অথবা বাগান আছে কিংবা গৃহপালিত বা গবাদিপশু ইত্যাদি রয়েছে যা দেখাশুনা করলে ও তা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকলে আবশ্যিকভাবে তার সফলতা ও কল্যাণ রয়েছে। কিন্তু সে ওগুলোকে উপেক্ষা করে অবহেলা করে, ভুলে যায় এবং অন্যকিছু নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায় এবং কল্যাণকে নষ্ট করে দেয়, তাহলে অবশ্যই সে তা নষ্ট করল। ১৩১
আর আল্লাহ তাআলার জিকিরের কারণে মানুষ অনেক প্রকার গুনাহ থেকে দূরে থাকে যেসব গুনাহে পতিত হওয়া তার জন্য সম্ভাব্য। যেমন-গিবত, পরনিন্দা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহঃ বলেন: আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন হওয়ার কারণে বাতিল কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকা যায়, যেমন-গিবত বা পরচর্চা, অসার ও বেহুদা কথাবার্তা বলা, মানুষের প্রশংসা ও তিরস্কার করা ইত্যাদি। কেননা, জিহ্বা কখনও নিবৃত্ত হয় না। সুতরাং হয়ত জিকিরকারী হবে জিহ্বা অথবা অসার ও অনর্থক কথাবার্তা বলবে। দুটোর একটি অবশ্যই হবে। নফসের ব্যাপারটি হলো, যদি তাকে তুমি সঠিক কাজে ব্যস্ত না কর তাহলে সে তোমাকে বাতিল ও ভ্রষ্ট কাজে ব্যস্ত রাখবে। আর ক্বলবের ব্যাপার হলো যদি সে আল্লাহ তাআলার মহব্বত করে যদি শান্তি ও প্রশান্তি লাভ না করে তাহলে সে মাখলুকের মহব্বত করে অবশ্যই প্রশান্তি নিবে। আর জিহ্বার ব্যাপার হলো যদি সে আল্লাহর জিকিরে মশগুল না থাকে তাহলে তোমাকে সে অনর্থক কথাবার্তায় লাগিয়ে দেবে। অতএব তুমি তোমার নফসের জন্য দুই খিত্তার একটি পছন্দ করে নাও। দুই মনজিলের এক মনজিলে অবতরণ করাও। ১৩২
দ্বিতীয় ফায়দা
অবশ্যই আল্লাহর জিকির শয়তানকে বিতাড়িত করে, যে শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা দেয় এবং গুনাহ ও পাপে নিমজ্জিত করে। আর এ ব্যাপারে বহু হাদীস বর্ণিত হয়ে। সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করা হচ্ছে-
আনাস বিন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বলে বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ তখন তাকে বলা হয়, তুমি রক্ষা পেয়েছ, শয়তান তোমার থেকে দূর হয়ে গেছে। অতপর অন্য এক শয়তান বলে, তুমি তাকে কী করবে যাকে পথ দেখানো হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে। ১৩৩
এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : مَنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ، فِي يَوْمِ مِائَةً مَرَّةٍ ، كَانَتْ لَهُ عَدْلَ عَشْرِ رِقَابٍ ، وَكُتِبَتْ لَهُ مِائَهُ حَسَنَةٍ وَمُحِيَتْ عَنْهُ مِائَهُ سَيِّئَةٍ ، وَكَانَتْ لَهُ حِرْزًا مِنَ الشَّيْطَانِ ، يَوْمَهُ ذَلِكَ ، حَتَّى يُمْسِيَ وَلَمْ يَأْتِ أَحَدٌ أَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ إِلَّا أَحَدٌ عَمِلَ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ ، وَمَنْ قَالَ : سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ ، فِي يَوْمِ مِائَةً مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ وَلَوْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লা-হু অহদাহু লা শারীকা লাহ, লাহুল মুলকু অলাহুল হামদু অহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থাৎ এক অদ্বিতীয় আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সত্য উপাস্য নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। (বিশাল) রাজ্যের তিনিই সার্বভৌম অধিপতি। তাঁরই যাবতীয় স্তুতিমালা এবং সমস্ত বস্তুর উপর তিনি ক্ষমতাবান।
যে ব্যক্তি এই দোআটি দিনে একশবার পড়বে, তার দশটি গোলাম আজাদ করার সমান নেকী অর্জিত হবে, একশ,টি নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে, তার একশ,টি গুনাহ মোচন করা হবে, উক্ত দিনের সন্ধ্যা অবধি তা তার জন্য শয়তান থেকে বাঁচার রক্ষামন্ত্র হবে এবং তার চেয়ে সেদিন কেউ উত্তম কাজ করতে পারবে না। কিন্তু যদি কেউ তার চেয়ে বেশী আমল করে তবে।„
তিনি আরও বলেছেন-যে ব্যক্তি দিনে একশবার 'সুবহানাল্লাহি অবিহামদিহ পড়বে তার গুনাহসমূহ মোচন করা হবে; যদিও তা সমুদ্রের ফেনা বরাবর হয়। (বুখারী-মুসলিম) ১৩৪
তিনি আরও বলেন- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ فِي يَوْمِ مِائَةً مَرَّةٍ كَانَتْ لَهُ عَدْلَ عَشْرِ رِقَابٍ وَكُتِبَتْ لَهُ مِائَهُ حَسَنَةٍ وَمُحِيَتْ عَنْهُ مِائَهُ سَيِّئَةٍ وَكَانَتْ لَهُ حِرْزًا مِنْ الشَّيْطَانِ يَوْمَهُ ذَلِكَ حَتَّى يُمْسِيَ وَلَمْ يَأْتِ أَحَدٌ بِأَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ إِلَّا أَحَدٌ عَمِلَ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ
সাইয়িদুনা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একশ বার এ দোআটি পড়বে- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। (দোআটির অর্থ) আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। তাহলে দশটি গোলাম আযাদ করার সমান সাওয়াব তার হবে। তার জন্য একশটি সাওয়াব লেখা হবে এবং আর একশটি গুনাহ মিটিয়ে ফেলা হবে। ঐদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান হতে মাহফুজ থাকবে। কোন লোক তার চেয়ে উত্তম সাওয়াবের কাজ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ঐ ব্যক্তি সক্ষম হবে, যে এর চেয়ে ঐ দোআটির আমল বেশি পরিমাণ করবে। ১৩৫
অতএব মুসলিমদের জন্য আবশ্যক হলো, বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা এবং অনর্থক ও অহেতুক কাজ হতে দূরে থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُةِ وَالْ ءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ
আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। ১৩৬
টিকাঃ
১২৮ সূরা রা’দ : ২৮
১২৯ সুনানুত তিরমিযী: ৩৩৭৭
১০০ সহিহুল বুখারী: ৬৪০৭
১৩১ আলওয়াবিলুস সবিল: ৬১
১৩২ আল ওয়াবিলুস সাবিল: ১০২
১৩৩ সুনানু আবি দাউদ : ৫০৯৫, তিরমিযী: ৩৪৭৩
১৩৪ সহীহুল বুখারী ৩২৯৩, ৬৪০৫, তিরমিযী ৩৪৬৬, ৩৪৬৮, ৩৪৬৯, আবু দাউদ ৫০৯১, ইবনু মাজাহ ৩৭৯৮, ৩৮১২, আহমাদ ৭৯৪৮, ৮৫০২, ৮৬১৬, ৮৬৫৬, ৯৮৯৭, ১০৩০৫, মুওয়াত্তা মালিক ৪৮৬, ৪৮৭
১৩৫ সহীহ বুখারী: ৬৪০৩
১৩৬ সূরা আরাফ: ২০৫
📄 সালাত প্রতিষ্ঠা
সালাতের মর্যাদা ও বড়ত্বের ব্যাপারে কারো কাছে গোপনীয় নয়। সালাত ইসলামের দ্বিতীয় আরকান এবং দীনের খুটি বা ভিত্তি। সালাত পরিত্যাগ করা কুফরি, তা নষ্ট করা কিয়ামতের দিন ক্ষতি ও লজ্জার কারণ। সালাত আদায় করা ও তার হেফাজত করা অর্থাৎ সালাতে যত্নবান হওয়ার অনেকগুলো উপকার ও ফায়দা নিহিত আছে। এখানে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ফায়দার ব্যাপারে অবগতি লাভ করব। আর সেটি হলো সালাত প্রতিষ্ঠা করার কারণে অশ্লীলতা, পাপাচার ও গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকা যায়। আল্লাহ তাআলা সূরা আনকাবুতের মাঝে বলেন-
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ
নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর। ১৩৭
রইসুল মুফাসসির আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: সালাতের মাঝে আল্লাহকে অমান্য করা থেকে বিরত রাখা ও প্রতিহত করার শক্তি রয়েছে বা মাধ্যম রয়েছে। ১৩৮
আল্লামা শাইখ সাদি রহিমাহুল্লাহ তার তাফসির তাফসিরু তাইসীরুল কারীমির রহমান এর মাঝে বলেন: সালাত ফাহশা ও গর্হিত কাজ থেকে নিবৃত রাখার দিকটি হলো: নিশ্চয় বান্দা সালাত আদায় করে তার আরকান ও শর্তসমূহ পুরা করে এবং একাগ্রতার সাথে আদায় করে তখন তার অন্তর আলোকিত হয়ে যায়, হৃদয় পবিত্র হয়, ঈমান বৃদ্ধি পায়, কল্যাণের দিকে আগ্রহ শক্তিশালী হয় এবং অকল্যাণ ও খারাপের প্রতি আগ্রহ কমে। তখন প্রয়োজন সর্বদা তা আদায় করা এবং সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া। এই দিক থেকে সালাত ফাহশা তথা অশালীন ও গর্হিত কাজ থেকে নিবৃত্ত্ব রাখে। 139
কিন্তু কখনও কোন প্রশ্নকারী প্রশ্ন উঠাতে পারে যে, আমরা তো দেখি যে, সালাত আদায় করছে সে ফাহেশা ও গর্হিত কাজে নিমজ্জিত হচ্ছে তাহলে তার জবাব কেমনে দেওয়া হবে?
মুফাসসিরীনে কেরাম এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যার সারকথা হলো যখন পরিপূর্ণ হক আদায় করে সালাত আদায় করা হবে, সময়মত জামাতের সাথে সালাত আদায় করা হবে তখন পাপাচারের দিকে আপনাআপনিই মন ফিরবে না। অন্তরে আল্লাহর ভয় পয়দা হবে। খারাপ কাজের সময় আল্লাহর ভয় চলে আসবে।
টিকাঃ
১৩৭ আনকাবুত: ৪৫
১৩৮ তাফসিরে তাবারি: ১৮/৪০৮
১৩৯ তাফসিরুল কারীমির রহমান
📄 ইখলাস
কেউ কেউ ইখলাস এর সংজ্ঞায়ন করেছেন এভাবে যে, ইবাদতের হক একমাত্র আল্লাহর জন্য। এবং এমতাবস্থায় তার আনুগত্যের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা অন্যকিছু ব্যতীত যেমন মাখলুকের জন্য কোন কিছু করা বা মানুষের কাছ থেকে মহব্বত অর্জন অথবা সৃষ্টজীবের পক্ষ থেকে প্রশংসা পাওয়া ইত্যাদি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ব্যতীত অন্য কোনকিছুর আশঙ্কা করা।
কেউ কেউ তো বলেন: ইখলাস মাখলুকের মনোযোগ ও দৃষ্টি থেকে আমলকে শোধন ও নির্মল করে।
আর যে ব্যক্তি ইখলাস অবলম্বন করে, আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয় তার গুণাবলীর ব্যাপারে ইবনুল কাইয়িম রহঃ বলেন: তাদের সকল আমল হয় আল্লাহর জন্য নির্ধারিত, তাদের সকল কথাবার্তা আল্লাহর জন্য, তাদের দান করা ও দান করা থেকে বিরত থাকা আল্লাহর জন্য, তাদের মহব্বত ও বিদ্বেষ আল্লাহর জন্যই। অতএব তাদের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য মোআমালা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির খাতিরেই হয়ে থাকে। তারা মানুষের কাছ থেকে কোন প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতার আশাবাদী না। তাদের কাছে কোন মর্যাদা, প্রশংসনীয় কোন উদ্দেশ্য, তাদের অন্তরে কোন স্থান নেওয়া, তাদের থেকে দূরে পলায়ন করারও ইচ্ছা পোষণ করে তারা। বরং তারা মানুষকে কবরবাসীদের মত গণনা করে, তাদের জন্য কোন কল্যাণকর ও উপকার করতে পারে না, মৃত্যু দিতে পারে না, জীবিত করতে পারে না এবং একত্রিত করতে পারে না। ১৪০
টিকাঃ
১৪০ মাদারিজুস সালিকীন: ১/৭২
📄 ইখলাসের অনেক ফায়দা রয়েছে
শয়তানের চক্রান্ত ও অনিষ্টতা প্রতিরোধের ক্ষেতে ইখলাস সবচেয়ে কঠিন বিষয়। ইখলাস হলো কঠিন পাথর; যা আল্লাহর দুশমনের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়, তার দিকে তাক করা তিরকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। ইখলাস হলো একটি রাব্বানি অস্ত্র বা হাতিয়ার এক দুশমন বিতাড়িত শয়তানের সাথে লড়াইয়ের সময় নিজের সুরক্ষাকবচ বা ঢাল। শয়তান নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে, যারা ইখলাস অবলম্বন করবে তাদের ব্যতীত অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেবে।
আল্লাহ তাআরা কুরআন শরিফের মাঝে বলেন-
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আপনি যেমন আমাকে পথ ভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথ ভ্রষ্ঠ করে দেব। আপনার মনোনীত বান্দাদের ব্যতীত। ১৪১ (যারা ইখলাস অবলম্বন করেছে)
আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি তো তারাই যারা একনিষ্ট হয় মুখলিস হয়। শয়তান তাদের সামনে গর্হিত ও খারাপকাজকে সুশোভিত করে দেখাতে পারে না। কেননা তারা তা থেকে মুক্ত, তাদেরকে শয়তানের চক্রান্ত থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষার ময়দানে রয়েছে। তাদের নফসের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকে।
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেদের একনিষ্ট করে নেবে, আল্লাহ তাআলা তাদের নফসকে নষ্ট করতে ছেড়ে দিবেন না, আল্লাহর রহমত তাদেরকে ঘিরে ফেলবে। আর এই মর্যাদা ও সম্মানই তো যথেষ্ট যে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন। ইখলাসের অন্যতম এই ফায়দা হলো, ইখলাস খারাপকাজ ও ফাহেশা কাজ থেকে বিরত রাখে এবং শাহওয়াত ও সন্দেহ সংশয় থেকে মুক্ত রাখে। ১৪২
মহান আল্লাহ তাআলা নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বলেন-
﴿وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّءَا بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ﴾
নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিল এবং সেও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করত। যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করত। এমনিভাবে হয়েছে, যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নিলজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন। ১৪৩
নাফে, ইবনু কাছির, ইবনু উমর, ইবনু আমের (الْمُخْلَصِينَ) এখানে যের দিয়ে পড়েন। সুতরাং তখন অর্থ হবে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও নবী ইউসুফ আঃ কে মুক্তি দিয়েছেন তার একনিষ্ট হওয়া, তাঁর প্রতি ইহসান এবং স্বীয় রবের মুরাকাবা করার কারণে। এবং আযিযের স্ত্রীর সকল প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র তার সামনে টিকেনি। কেবল তার ইখলাস বৃদ্ধিই পেয়েছে। ১৪৪
অতএব যে ব্যক্তি শয়তানের কুমন্ত্রনা ও তার কুটচাল এবং তার চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকতে চায় সে যেন ইখলাস নিজের মাঝে জড়িয়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি ধ্বংসাত্মক শাহওয়াত ও খাহেশাতে নিমজ্জিত হওয়া এবং ভ্রষ্টকারী মসিবতে পতিত হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে চায় সে যেন ইখলাসের ভূষণ ধারণ করে।
যেমন কোন একজন সালাফ বলে থাকেন-
হে আমার নফস! তুমি ইখলাস অবলম্বন কর। যাতে করে তুমি নিষ্কৃতি পাবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে কথাবার্তা ও কাজে কর্মে যেন তিনি আমাদেরকে ইখলাস অবলম্বন করার তাওফিক চাই।
টিকাঃ
১৪১ সূরা হিজর: ৩৯-৪০
১৪২ তাত্নীরুল আনফাস বি হাদীসিল ইখলাস: ১৩১
১৪৩ সূরা ইউসুফ: ২৪
১৪৪