📄 আল্লাহর ধ্যান-খেয়াল
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম সাহায্যকারী হলো, আল্লাহর মুরাকাবা করা। তাঁর ধ্যান-খেয়াল করা। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আমাদের ব্যাপারে সব জানেন এবং তিনি আমাদেরকে দেখছেন ও পর্যবেক্ষণ করছেন আমাদেরকে। সর্বদা তাঁর দৃষ্টির সম্মুখেই রয়েছি আমরা। পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
আর একথা তোমরা জেনে রেখো যে, তোমাদের মনে যে কথা রয়েছে, আল্লাহর তা জানা আছে। কাজেই তাঁকে ভয় করতে থাক। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাকারী ও ধৈর্য্যশীল। ১১৮
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন-
وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا
আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন। ১১৯
অন্য আরেক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন-
(يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ)
চোখের চুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন। ১২০
আরও অনেক আয়াত রয়েছে এ ব্যাপারে, যা প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহর মুরাকাবা ও ধ্যান-খেয়ালের গুরুত্ব বর্ণনা করে।
যুন্নুন মিসরি বলেন- মুরাকাবা তথা আল্লাহর ধ্যান-খেয়ালে থাকার আলামত হলো, আল্লাহ তাআলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার অগ্রাধিকার দেওয়া। আল্লাহ পাক যাকে সম্মানিত করেছেন তার সম্মান করা ও যাকে ছোট ও লাঞ্ছিত করেছেন তাকে ছোট ও লাঞ্ছিত করা।
ইবরাহিম আল খাওয়াস বলেন- মুরাকাবা হলো প্রকাশ্যে-গোপনে আল্লাহর জন্য একনিষ্ট হওয়া।
তরিকতপন্থিগণ এ ব্যাপারে একমত যে, অন্তরে আল্লাহর মুরাকাবা করা প্রকাশ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া সংরক্ষণ করার কারণ। সুতরাং যে ব্যক্তি গোপনে আল্লাহর ধ্যান করে আল্লাহ তাআলা তার প্রকাশ্য ও গোপনে নড়াচড়াকে হেফাজত করে। ১২১
অতএব এই সকল বাণীগুলো আমাদেরকে আল্লাহর মুরাকাবা ও তাঁর ধ্যান করার মর্যাদা বয়ান করে। আর মুরাকাবা নিশ্চয় আল্লাহর মুহাব্বত ও তাঁর ঘনিষ্ঠতা লাভ এবং তাঁর ক্রোধ থেকে দূরে থাকার মাধ্যম।
ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ বলেন- যে ব্যক্তি জানে যে, সে যেখানেই থাকুক না কেন তাকে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, তিনি তার জাহের-বাতেন প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সব জানেন এবং যখন সে একাকী থাকে তখনও তিনিও হাজির আছেন তাহলে এ বিষয়টি তাকে প্রকাশ্যে গুনাহ করা থেকে বেঁচে থাকাকে আবশ্যক করে। আর এ অর্থের দিকে ইঙ্গিত করেই কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞা করে থাক এবং আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা: ১)
কোনো কোনো সালাফ তার সাথিদেরকে বলতেন- আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হারাম থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করুন, যার পক্ষে একাকিত্বে সময় বিরত থাকা সম্ভব হয়। সুতরাং যখন জানবে যে আল্লাহ তাআলা তাকে দেখছেন তখন সে তাঁর ভয়ে গুনাহ পরিত্যাগ করবে। অথবা এমনই বলেছেন।
ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন, সবচেয়ে মর্যাদাবান তিনটি জিনিস-অল্প থাকাবস্থায় দান, একাকিত্বে আল্লাহকে ভয়, এবং যার কাছে ভয় ও আশা করা যায় তার সম্মুখে সত্যের উচ্চারণ।
ইবনু সিমাক তার ভাইকে উপদেশ স্বরূপ লিখে পাঠান- আম্মা বা'দ, আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার আদেশ দিচ্ছি। সেটি গোপনাবস্থায় তোমাকে রক্ষা করবে ও প্রকাশ্যে তত্ত্বাবধান করবে। সুতরাং দিবারাত্রির প্রতিটি মুশকিল আসান করার জন্য তুমি তাকে তোমার মনোযোগ বানাও (অর্থাৎ তাঁর দিকে মনোযোগী হও)। আর আল্লাহ পাক তোমাকে তাঁর প্রতি তোমার নৈকট্য ও শক্তিমত্তা অনুসারে তোমাকে সহজ করে দেবেন। আর জেনে রেখো! নিশ্চয় তুমি তার চোখের সামনেই রয়েছ। তাঁর রাজত্ব ও মালিকানা থেকে অন্য কোনো মালিকানা ও রাজত্বে বের হয়ে যাওনি। সুতরাং তিনি যেন তোমাকে তার প্রতি সকর্ততা অবলম্বন করাকে বাড়িয়ে দেন এবং তাকে ভয় করাকে বৃদ্ধি করে দেন। ওয়াসসালাম।
আবুল জালাদ বলেন- আল্লাহ তাআলা তাঁর এক নবীকে আদেশ দেন যে, তুমি তোমার কওমকে বলে দাও, আল্লাহ তাআলা বলেছেন' তোমাদের কী হলো, তোমরা আমার সৃষ্টির কাছে পাপ গোপন করছ এবং আমার কাছে তা প্রকাশ করছ? যদি তোমরা ধারণা করে থাক যে, আমি তোমাদেরকে দেখছি না, তাহলে তোমরা আমার সাথে কুফরি করলে। আর যদি ধারণা করে থাক আমি তোমাদেরকে দেখছি, তাহলে কেন আমাকে তোমাদের দিকে দুর্বল দৃষ্টিসম্পন্ন ধারণা করছ?
ইবনু ওহাইব বলতেন- আল্লাহর দিকে অগ্রসর হও সেই পরিমাণ যেই পরিমাণ তাঁর কুদরত তোমার ওপরে এবং ততটাই তাকে লজ্জা করো, যতটা তিনি তোমার নিকটে আছেন। কোনো এক ব্যক্তি তাঁকে বলল' আমাকে উপদেশ দিন। তখন তিনি তাকে বললেন- আল্লাহ তাআলাকে তোমার দিকে স্বল্প দৃষ্টিপাতকারী বানিও না। কোনো কোনো সালাফ বলেন- তুমি কী মনে করছ, তিনি তোমাকে রহম করবেন যিনি তোমার অবাধ্যতার কারণে তার চক্ষু শীতল হয় না? এমনকি তিনি জানেন যে, সেই অবাধ্যতা তুমি ছাড়া আর কোনো চক্ষু দেখেনি?
(ঘন গাছপালায় ভরপুর এক জঙ্গলে প্রবেশ করল জনৈক ব্যক্তি। তারপর বলল-যদি আমি এখানে পাপাচার করি, তাহলে কে আমাকে দেখবে? অতঃপর সে গোটা জঙ্গল থেকে আওয়াজ শুনতে পেল-
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ)
যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সূক্ষনজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত। (সূরা মুলক : ১৪)
কোনো এক লোক এক গ্রাম্য মহিলার সাথে খারাপ কাজ করার জন্য তাকে প্ররোচিত করতে লাগল। তাকে বলল— তারকা ছাড়া কেউ দেখছে না। তখন মহিলাটি বলল : নক্ষত্রপুঞ্জ কোথায়?
হারিস আল মুহাসিবি বলেন, মুরাকাবা হচ্ছে— অন্তরের ইলম, যা দ্বারা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়।।
ইমাম আহমদ রহিঃ আবৃত্তি করতেন—
إِذَا مَا خَلَوْتَ الدَّهْرَ يومًا فلا تَقُلْ خَلَوْتُ وَلَكِنْ قُلْ : عَلَيَّ رَقِيبُ
ولا تَحْسَبَنَّ الله يَغْفُلُ سَاعَةً
ولا أَنَّ مَا يَخْفَى - عَلَيْهِ يَغِيبُ
যখনই তুমি যুগ থেকে অবসর গ্রহণ কর একাকিত্বে চলে আস তখন বলো না যে, আমি একাকী বরং বলো আমার ওপর পর্যবেক্ষণকারী দৃষ্টিপাতকারী রয়েছেন।
আর ধারণা করবে না যে, তিনি এক মুহুর্তের জন্যেও গাফেল উদাসীন রয়েছেন এবং যা কিছু অদৃশ্যের মাঝে তা তার কাছেও গোপনীয়। ১২২
অতএব আমাদের সবার উচিত হলো একাকিত্বে আল্লাহর মুরাকাবা করা এবং তাঁর কাছে মন্দ কাজ প্রকাশ না করা অথচ তিনি আমাদের ব্যাপারে অবগত আছেন। যেমন কোরআনে আছে:
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى)
সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখেন? ১২৩
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
( وَيُحَذِّرُكُمُ اللهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ )
আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। ১২৪
টিকাঃ
১১৮ সূরা বাকারা: ২৩৫
১১৯ সূরা আহযাব: ৫২
১২০ সূরা গাফির: ১৯
১২১ তাহজিবু মাদারিজুস সালিকীন: ১/৪৯৬
১২২ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৩০১-৩০৩
১২৩ সূরা আলাক: ১৪
১২৪ সূরা আলি ইমরান: ২৮
📄 নফসের মুহাসাবা বা হিসাবনিকাশ
গুনাহ পরিত্যাগ করতে সাহায্যকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সর্বদা নফসের মুহাসাবা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
( يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ * إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ )
মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্যে সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা,আলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন। ১২৫
ইবনু কাসির রহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা নিজেদের নফসের মুহাসাবা (হিসাব-নিকাশ) কর তোমাদের হিসাব লওয়ার পূর্বে। আর দেখ, নিজেদের নফসের জন্য কী নেক আমল সেই দিনের জন্য জমিয়ে রেখেছ যেই দিন তোমাদেরকে পুনরায় উত্থিত করা হবে এবং স্বীয় প্রতিপালকের নিকট তোমাদেরকে উপস্থাপন করা হবে। ১২৬
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন— নফসের মুহাসাবা (হিসাবনিকাশ) দুই ধরণের।
(১) আমলের পূর্বে ও (২) আমলের পর।
(১) আমল করার পূর্বে মুহাসাবা করা: প্রথম ধরণের মুহাসাবা হলো, যে হিসাব প্রথম ইচ্ছা ও ইরাদার সময় থেমে যায় এবং যতক্ষণ না তা পরিত্যাগ করার দিকটি প্রাধান্য পায় ততক্ষণ কোনো কাজ করে না।
ইমাম হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন— আল্লাহ তাআলা সেই বান্দার ওপর রহম করুন, যে গুনাহর কাজের ইচ্ছার সময়ই থেমে গিয়েছে (গুনাহ পরিত্যাগ করে)।
(২) আমল করার পর মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা করা: আর দ্বিতীয় আরেক ধরণের যে মুহাসাবা রয়েছে, অর্থাৎ যে কাজটা সংঘটিত করার পর মুহাসাবা করা সেটি। এই ধরণের মুহাসাবার আবার তিন প্রকার রয়েছে :
প্রথম, এমন আনুগত্যের মুহাসাবা করা যাতে আল্লাহর হকের কমতি করা হয়েছে। তাঁর হক যেভাবে আদায় করার প্রয়োজন ছিল সেভাবে আদায় করা হয় নি। আর ইতাআত-আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর হক ছয়টি জিনিস: সেগুলো হলো— (১) আমলের মাঝে ইখলাস বা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়া, (২) তাতে আল্লাহর নসিহত থাকা, (৩) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ থাকা, (৪) ইহসান ও (৫) আল্লাহর অনুগ্রহের ব্যাপারে জানা থাকা এবং (৬) এর ব্যর্থতাকেও জানা থাকা। অতঃপর সে নফসের মুহাসাবা করবে। সে কি এই পরিস্থিতিতে হক আদায় করতে পারবে? পারবে কি এই ধরণের আনুগত্য ও ইবাদত করতে?
দ্বিতীয়, নফসের মুহাসাবা মুবাহ বা জায়েয বিষয়ের ক্ষেত্রে। এবং তৃতীয়, নফসের মুহাসাবা করা রীতিসিদ্ধ বা স্বাভাবিক কোন কাজের ক্ষেত্রে, কেন সে তা করল?
সে কী আল্লাহ তাআলা বা পরকালের জীবনের ইচ্ছা করেছে, যদি এমন করে, তাহলে সেটি তার জন্য হবে লাভজনক। নাকি সে এর দ্বারা দুনিয়া ও তাৎক্ষনিক লাভ কামনা করেছে? যদি এমন করে, তাহলে তার এই তাৎক্ষনিক লাভের কারণে সে কী পরকালীন ক্ষতিগ্রস্ত হলো না এবং চূড়ান্ত সফলতাকে হারিয়ে ফেলল না?
তিনি রহিমাহুল্লাহ আরও বলেন- যে জিনিসের অবকাশ দেওয়া হয় তার অনিষ্টতা, মুহাসাবা ও ইসতিরসাল ছেড়ে দেওয়া এবং কোনো বিষয়কে সহজসাধ্য মনে করা ও তা চলতে দেওয়া নিশ্চয় তা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর এমন অবস্থাই ছিল ধোঁকাগ্রস্তদের; তারা তাদের চক্ষুদ্বয় পরিণতির দিকে দৃষ্টি দেয় না আর এ অবস্থাতেই চলতে থাকে এবং ক্ষমা পাওয়ার ওপর ভরসা করে বসে থাকে। যার ফলে নফসের মুহাসাবা ও প্রতিদান পরিণামের দিকে দৃষ্টি দেওয়াকে বিলম্বিত করা হয়। যখন সে এরূপ করে তখন তার জন্য পাপে নিমজ্জিত হওয়া, পাপের নিকটবর্তী হওয়া এবং তার জন্য তা ছাড়ানো অনেক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। আর যদি তার কাছে হিদায়াত বা পথনির্দেশ উপস্থিত থাকে তখন সে জানে যে, গুনাহে লিপ্ত হওয়াটা গুনাহ ছাড়ানো, পছন্দনীয় ও রীতিসিদ্ধ বিষয় থেকে ছাড়া পাওয়া থেকে সহজ।
মুহাসাবা বা হিসাব এর ব্যাপারে সালাফদের উক্তিসমূহ-
ইমাম আহমদ রহিমাহুল্লাহ উমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেন- তোমরা নিজেদের হিসাব- নিকাশ করে নাও, তোমাদের হিসাব-নিকাশ করার পূর্বে। আর তোমরা নিজেদের পরিমাপ করে নাও, তোমাদেরকে পরিমাপ করানোর পূর্বে। তাহলে আগামীকাল তোমার হিসাব লওয়া সহজ হবে, আজ তুমি নিজের মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা করার কারণে।
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন- মুমিন ব্যক্তি কেবল নিজের নফসের ব্যাপারে এই মুহাসাবা করে যে, তার নফস কী করতে চায়, নফস কী খেতে চায় এবং কী পান করতে চায়। (অর্থাৎ এগুলোর ব্যাপারে সে খুব চিন্তা-ভাবনা করার পর সামনে পা বাড়ায়) কিন্তু পাপি ব্যক্তি তার নফসের কোনো হিসাব-নিকাশ না করেই তাতে কদম বাড়ায়।
মায়মুন বিন মিহরান বলেন- ব্যক্তি মুত্তাকি ও পরহেযগার হতে পারে না ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না সে তার নফসের সাথে মুহাসাবা করে, তার শরিকের চেয়ে অনেক বেশি মুহাসাবা।
মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ বলেন- আল্লাহ পাক তার ওপর রহম করুন, যে তার নফসকে বলেছে- তুমি কী এমন এমন নও, তুমি কী এমন এমন নও? অতঃপর সে তার নফসকে আটকিয়ে রাখে, বেঁধে রাখে। তারপর তাকে পরাভূত করে আল্লাহর কিতাবকে মানা আবশ্যক করে নেয়। কুরআন তার নফসের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
ইমাম হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন- মুমিন ব্যক্তি তার নফসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সে আল্লাহর জন্য নফসের মুহাসাবা করে। কিয়ামতের দিন মুহাসাবাকে হালকা করা হবে কেবল এমন লোকদের বেলায়, যারা দুনিয়ায় নিজেদের নফসের মুহাসাবা করেছে। আর তাদের মুহাসাবাই কঠিন করা হবে যারা এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। যদি মুমিন অপ্রত্যাশিতভাবে তা করে ফেলে তখন সে আশ্চার্যান্বিত হয়ে বলে' আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকেই চাচ্ছিলাম। আপনার কাছেই আমার প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহর শপথ! তোমার সাথে আমার সম্পর্ক নেই, অনেক দূর। তোমার মাঝে ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধক। এবং তার থেকে কোনো জিনিস বেরিয়ে গেলে সে তার নিজের নফসের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। অতঃপর বলে’ আমি এই জিনিসের ইচ্ছা করিনি, যা আমার কাছে রয়েছে এবং এটি। আল্লাহর শপথ! আর কখনও আমি এর পুনরাবৃত্তি করব না। নিশ্চয় মুমিন তো এমন লোকেরাই, যাদেরকে কুরআন থামিয়ে দেয়। কুরআন সেসকল লোক ও তাদের ধ্বংসের মধ্যবর্তী প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। মুমিন হলো দুনিয়ায় এমন কারাবন্দি, যে তার নিজেকে মুক্ত করার জন্য দৌঁড়াদৌঁড়ি করে। আল্লাহর সাথে সাক্ষাত ব্যতীত কিছুই সে নিরাপত্তার মনে করে না। সে জানে যে, তার শ্রবণ, দর্শন, কথন এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাঁকড়াও করা হবে (হিসাব নেওয়া হবে)। এই সকল কিছুকে পাঁকড়াও করা হবে। ১২৭
তাই প্রতিটি মুমিনকে অবশ্যই নফসের মুহাসাবা করা জরুরি। আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। যাতে করে আল্লাহ তাআলা হিসাবকে সহজ করে দেন। নাজাত দান করেন।
টিকাঃ
১২৫ সূরা হাশর: ১৮
১২৬ তাফসিরে ইবনে কাসির: ৪/৪০৪
১২৭ ইবনুল কায়্যিম এর ইগাছাতুল লাহফান থেকে সংক্ষেপ করা হয়েছে।
📄 আল্লাহর স্মরণ বা জিকির করা
সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন হলো বেশি বেশি আল্লাহর জিকির, তাহলো অন্তরের জীবন, সুখ ও আত্মার প্রশান্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذْكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذْكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়। ১২৮
عن أبي الدرداء رضي الله عنه قال قال النبي صلى الله عليه وسلم ألا أنبئكم بخير أعمالكم وأزكاها عند مليككم وأرفعها في درجاتكم وخير لكم من إنفاق الذهب والورق وخير لكم من أن تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم ويضربوا أعناقكم ؟ قالوا بلى قال ذكر الله تعالى فقال معاذ بن جبل رضي الله عنه ما شيء أنجى من عذاب الله من ذكر الله
হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কী তোমাদের অধিক উত্তম আমল প্রসঙ্গে জানাব না, যা তোমাদের মনিবের নিকট সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের সম্মানের দিক থেকে সবচেয়ে উঁচু, স্বর্ণ ও রৌপ্য দান খায়রাত করার চেয়েও বেশি ভাল এবং তোমাদের শত্রুর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে তোমাদের সংহার করা ও তোমাদেরকে তাদের সংহার করার চাইতেও ভাল? তারা বললেন: হাঁ। তিনি বললেন: আল্লাহ তাআলার জিকির। মুআজ বিন জাবাল বলেন, আল্লাহ তাআলার শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার জিকিরের তুলনায় অগ্রগণ্য কোন জিনিস নেই। ১২৯
মুসলিমরা জিকিরের এই ফায়দার ব্যাপারে গাফেল ও উদাসীন থেকে আজ কতদূরে অবস্থান করছে! যারা জিকির করে ও যারা জিকির করেনা তারা দুইটি দলে পরিণত হয়েছে। আল্লাহর নবী তাদের উভয় দলের ব্যাপারে বলেন-
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
হযরত আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জিকির করে এবং যে ব্যক্তি জিকির করেনা তার উপমা হচ্ছে জীবিত ও মৃতের মত। ১৩০
জিকিরের অনেক ফায়দা রয়েছে
প্রথম ফায়দা
আল্লাহর জিকির বান্দাকে গুনাহ ও পাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার জিকির করে এবং জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে, ঘনিষ্ট হয় সে ঐ ব্যক্তির মত নয় যে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে উদাসীন এবং শাহওয়াত ও নিজের খেয়াল খুশির সাথে সম্পর্ক রাখে।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- সবসময় আল্লাহর জিকির ও স্মরণ আবশ্যিকভাবে নিজেকে ভুলে যাওয়া থেকে বাঁচায়। যা দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দার শিফা। কেননা প্রভু দয়াময়কে ভুলে যাওয়ার কারণে ব্যক্তি নিজেকে ও নিজের কল্যাণকে ভুলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلاَ تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَبُهُمْ أَنفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ তা, আলাকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তা,আলা তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য। (সূরা হাশর: ১৯)
আর যখন বান্দা যখন নিজেকেই ভুলে যায়, নিজের মাসলাহাত তথা কল্যাণকর বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা ভুলে যায়, নিজের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায় তখন সে আবশ্যিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায় নষ্ট হয়ে যায়। সে যেন ঐ ব্যক্তির ন্যায় যার ক্ষেত-খামার আছে অথবা বাগান আছে কিংবা গৃহপালিত বা গবাদিপশু ইত্যাদি রয়েছে যা দেখাশুনা করলে ও তা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকলে আবশ্যিকভাবে তার সফলতা ও কল্যাণ রয়েছে। কিন্তু সে ওগুলোকে উপেক্ষা করে অবহেলা করে, ভুলে যায় এবং অন্যকিছু নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায় এবং কল্যাণকে নষ্ট করে দেয়, তাহলে অবশ্যই সে তা নষ্ট করল। ১৩১
আর আল্লাহ তাআলার জিকিরের কারণে মানুষ অনেক প্রকার গুনাহ থেকে দূরে থাকে যেসব গুনাহে পতিত হওয়া তার জন্য সম্ভাব্য। যেমন-গিবত, পরনিন্দা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহঃ বলেন: আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন হওয়ার কারণে বাতিল কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকা যায়, যেমন-গিবত বা পরচর্চা, অসার ও বেহুদা কথাবার্তা বলা, মানুষের প্রশংসা ও তিরস্কার করা ইত্যাদি। কেননা, জিহ্বা কখনও নিবৃত্ত হয় না। সুতরাং হয়ত জিকিরকারী হবে জিহ্বা অথবা অসার ও অনর্থক কথাবার্তা বলবে। দুটোর একটি অবশ্যই হবে। নফসের ব্যাপারটি হলো, যদি তাকে তুমি সঠিক কাজে ব্যস্ত না কর তাহলে সে তোমাকে বাতিল ও ভ্রষ্ট কাজে ব্যস্ত রাখবে। আর ক্বলবের ব্যাপার হলো যদি সে আল্লাহ তাআলার মহব্বত করে যদি শান্তি ও প্রশান্তি লাভ না করে তাহলে সে মাখলুকের মহব্বত করে অবশ্যই প্রশান্তি নিবে। আর জিহ্বার ব্যাপার হলো যদি সে আল্লাহর জিকিরে মশগুল না থাকে তাহলে তোমাকে সে অনর্থক কথাবার্তায় লাগিয়ে দেবে। অতএব তুমি তোমার নফসের জন্য দুই খিত্তার একটি পছন্দ করে নাও। দুই মনজিলের এক মনজিলে অবতরণ করাও। ১৩২
দ্বিতীয় ফায়দা
অবশ্যই আল্লাহর জিকির শয়তানকে বিতাড়িত করে, যে শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা দেয় এবং গুনাহ ও পাপে নিমজ্জিত করে। আর এ ব্যাপারে বহু হাদীস বর্ণিত হয়ে। সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করা হচ্ছে-
আনাস বিন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বলে বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ তখন তাকে বলা হয়, তুমি রক্ষা পেয়েছ, শয়তান তোমার থেকে দূর হয়ে গেছে। অতপর অন্য এক শয়তান বলে, তুমি তাকে কী করবে যাকে পথ দেখানো হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে। ১৩৩
এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : مَنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ، فِي يَوْمِ مِائَةً مَرَّةٍ ، كَانَتْ لَهُ عَدْلَ عَشْرِ رِقَابٍ ، وَكُتِبَتْ لَهُ مِائَهُ حَسَنَةٍ وَمُحِيَتْ عَنْهُ مِائَهُ سَيِّئَةٍ ، وَكَانَتْ لَهُ حِرْزًا مِنَ الشَّيْطَانِ ، يَوْمَهُ ذَلِكَ ، حَتَّى يُمْسِيَ وَلَمْ يَأْتِ أَحَدٌ أَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ إِلَّا أَحَدٌ عَمِلَ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ ، وَمَنْ قَالَ : سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ ، فِي يَوْمِ مِائَةً مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ وَلَوْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লা-হু অহদাহু লা শারীকা লাহ, লাহুল মুলকু অলাহুল হামদু অহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থাৎ এক অদ্বিতীয় আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সত্য উপাস্য নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। (বিশাল) রাজ্যের তিনিই সার্বভৌম অধিপতি। তাঁরই যাবতীয় স্তুতিমালা এবং সমস্ত বস্তুর উপর তিনি ক্ষমতাবান।
যে ব্যক্তি এই দোআটি দিনে একশবার পড়বে, তার দশটি গোলাম আজাদ করার সমান নেকী অর্জিত হবে, একশ,টি নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে, তার একশ,টি গুনাহ মোচন করা হবে, উক্ত দিনের সন্ধ্যা অবধি তা তার জন্য শয়তান থেকে বাঁচার রক্ষামন্ত্র হবে এবং তার চেয়ে সেদিন কেউ উত্তম কাজ করতে পারবে না। কিন্তু যদি কেউ তার চেয়ে বেশী আমল করে তবে।„
তিনি আরও বলেছেন-যে ব্যক্তি দিনে একশবার 'সুবহানাল্লাহি অবিহামদিহ পড়বে তার গুনাহসমূহ মোচন করা হবে; যদিও তা সমুদ্রের ফেনা বরাবর হয়। (বুখারী-মুসলিম) ১৩৪
তিনি আরও বলেন- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ فِي يَوْمِ مِائَةً مَرَّةٍ كَانَتْ لَهُ عَدْلَ عَشْرِ رِقَابٍ وَكُتِبَتْ لَهُ مِائَهُ حَسَنَةٍ وَمُحِيَتْ عَنْهُ مِائَهُ سَيِّئَةٍ وَكَانَتْ لَهُ حِرْزًا مِنْ الشَّيْطَانِ يَوْمَهُ ذَلِكَ حَتَّى يُمْسِيَ وَلَمْ يَأْتِ أَحَدٌ بِأَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ إِلَّا أَحَدٌ عَمِلَ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ
সাইয়িদুনা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একশ বার এ দোআটি পড়বে- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। (দোআটির অর্থ) আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। তাহলে দশটি গোলাম আযাদ করার সমান সাওয়াব তার হবে। তার জন্য একশটি সাওয়াব লেখা হবে এবং আর একশটি গুনাহ মিটিয়ে ফেলা হবে। ঐদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান হতে মাহফুজ থাকবে। কোন লোক তার চেয়ে উত্তম সাওয়াবের কাজ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ঐ ব্যক্তি সক্ষম হবে, যে এর চেয়ে ঐ দোআটির আমল বেশি পরিমাণ করবে। ১৩৫
অতএব মুসলিমদের জন্য আবশ্যক হলো, বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা এবং অনর্থক ও অহেতুক কাজ হতে দূরে থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُةِ وَالْ ءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ
আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। ১৩৬
টিকাঃ
১২৮ সূরা রা’দ : ২৮
১২৯ সুনানুত তিরমিযী: ৩৩৭৭
১০০ সহিহুল বুখারী: ৬৪০৭
১৩১ আলওয়াবিলুস সবিল: ৬১
১৩২ আল ওয়াবিলুস সাবিল: ১০২
১৩৩ সুনানু আবি দাউদ : ৫০৯৫, তিরমিযী: ৩৪৭৩
১৩৪ সহীহুল বুখারী ৩২৯৩, ৬৪০৫, তিরমিযী ৩৪৬৬, ৩৪৬৮, ৩৪৬৯, আবু দাউদ ৫০৯১, ইবনু মাজাহ ৩৭৯৮, ৩৮১২, আহমাদ ৭৯৪৮, ৮৫০২, ৮৬১৬, ৮৬৫৬, ৯৮৯৭, ১০৩০৫, মুওয়াত্তা মালিক ৪৮৬, ৪৮৭
১৩৫ সহীহ বুখারী: ৬৪০৩
১৩৬ সূরা আরাফ: ২০৫
📄 সালাত প্রতিষ্ঠা
সালাতের মর্যাদা ও বড়ত্বের ব্যাপারে কারো কাছে গোপনীয় নয়। সালাত ইসলামের দ্বিতীয় আরকান এবং দীনের খুটি বা ভিত্তি। সালাত পরিত্যাগ করা কুফরি, তা নষ্ট করা কিয়ামতের দিন ক্ষতি ও লজ্জার কারণ। সালাত আদায় করা ও তার হেফাজত করা অর্থাৎ সালাতে যত্নবান হওয়ার অনেকগুলো উপকার ও ফায়দা নিহিত আছে। এখানে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ফায়দার ব্যাপারে অবগতি লাভ করব। আর সেটি হলো সালাত প্রতিষ্ঠা করার কারণে অশ্লীলতা, পাপাচার ও গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকা যায়। আল্লাহ তাআলা সূরা আনকাবুতের মাঝে বলেন-
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ
নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর। ১৩৭
রইসুল মুফাসসির আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: সালাতের মাঝে আল্লাহকে অমান্য করা থেকে বিরত রাখা ও প্রতিহত করার শক্তি রয়েছে বা মাধ্যম রয়েছে। ১৩৮
আল্লামা শাইখ সাদি রহিমাহুল্লাহ তার তাফসির তাফসিরু তাইসীরুল কারীমির রহমান এর মাঝে বলেন: সালাত ফাহশা ও গর্হিত কাজ থেকে নিবৃত রাখার দিকটি হলো: নিশ্চয় বান্দা সালাত আদায় করে তার আরকান ও শর্তসমূহ পুরা করে এবং একাগ্রতার সাথে আদায় করে তখন তার অন্তর আলোকিত হয়ে যায়, হৃদয় পবিত্র হয়, ঈমান বৃদ্ধি পায়, কল্যাণের দিকে আগ্রহ শক্তিশালী হয় এবং অকল্যাণ ও খারাপের প্রতি আগ্রহ কমে। তখন প্রয়োজন সর্বদা তা আদায় করা এবং সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া। এই দিক থেকে সালাত ফাহশা তথা অশালীন ও গর্হিত কাজ থেকে নিবৃত্ত্ব রাখে। 139
কিন্তু কখনও কোন প্রশ্নকারী প্রশ্ন উঠাতে পারে যে, আমরা তো দেখি যে, সালাত আদায় করছে সে ফাহেশা ও গর্হিত কাজে নিমজ্জিত হচ্ছে তাহলে তার জবাব কেমনে দেওয়া হবে?
মুফাসসিরীনে কেরাম এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যার সারকথা হলো যখন পরিপূর্ণ হক আদায় করে সালাত আদায় করা হবে, সময়মত জামাতের সাথে সালাত আদায় করা হবে তখন পাপাচারের দিকে আপনাআপনিই মন ফিরবে না। অন্তরে আল্লাহর ভয় পয়দা হবে। খারাপ কাজের সময় আল্লাহর ভয় চলে আসবে।
টিকাঃ
১৩৭ আনকাবুত: ৪৫
১৩৮ তাফসিরে তাবারি: ১৮/৪০৮
১৩৯ তাফসিরুল কারীমির রহমান