📄 দীর্ঘ হায়াত আশা করা
মুসলিম গুনাহে পতিত হয়ে যায়, হিসাবের কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় প্রতিক্ষিতি প্রতিদান যেদিন পাবে সেদিনের কথা। এগুলো ভুলে যায় বান্দা তার দীর্ঘ হায়াতের আশা ও মওতের কথা ভুলে গেলে, মৃত্যু যন্ত্রণার কথা ভুলে গেলে, কবর ও সিরাতে মুসতাকিমের কথা ভুলে গেলে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ﴾
যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী। ৮৯
আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبِي فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سبيل
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাধে ধররে বললেন, দুনিয়াতে তুমি এমনভাবে থাকো যেন তুমি আগন্তুক অথবা পথচারী।৯০
হাফিজ ইবনু রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ বলেন : দুনিয়াতে অল্প হায়াতের আশা করার প্রেক্ষিতে এই হাদীসখানা হলো আসল বা মূল। আর নিঃসন্দেহে মুমিনদের জন্য উচিত নয় দুনিয়াকে বাসস্থান ও বসবাসের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে তাতে প্রশান্তি লাভ করবে। বরং মুমিনের জন্য উচিত হলো এখানে থাকবে সফরের ডানার ওপর ভর করে, যেখানে সে সফর বা যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ৯১
সাইয়িদুনা আলি ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি তোমাদের ব্যাপারে দুই জিনিসের ভয় করি। আর তাহলো, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ ও দীর্ঘ হায়াতের আশা করা। কেননা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হক থেকে বিরত রাখে আর দীর্ঘ হায়াতের আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন : বান্দা দীর্ঘ হায়াতের আশা করেনা কেবল আমলকে ভুলে যায়। ৯২
জনৈক ব্যক্তি বসরায় কোন এক যাহেদকে বলল, বাগদাদে কী আপনার কোন প্রয়োজন আছে? তখন যাহেদ বলল, আমার আশাকে এত লম্বা করা পছন্দ করি না যে, সে বাগদাদ আসা যাওয়া করবে।
কোন এক হাকিম বলেন: জাহেল ব্যক্তি তার আশার ওপর ভরসা করে আর জ্ঞানী ব্যক্তি ভরসা করে নিজের আমলের ওপর।
কোন এক সাহিত্যিক বলেন: আশা হলো মরীচিকার মত। যে তা দেখে সেই ধোঁকা খায় আর যে তার আশা করে সেই ত্রুটিযুক্ত হয়। ৯৩
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন: উলামাদের তিনজন একত্রিত হলো। তারা তাদের একজনকে বলল, তোমার আশা আকাঙ্খা কী? সে বলল, আমার কোছে যে মাসই এসেছে আমি ধারণা করেছি যে মৃত্যুবরণ করব মাসটিতে। হাসান বলেন: তার সাথি তাকে বলল, নিশ্চয় এটি আশা আকাঙ্খা। অতপর দ্বিতীয় জনকে বলা হলো, তোমার আশা কী? সে বলল, আমার কাছে এমন কোন জুমা আসে নি যাতে আমি আশা করিনি যে সে জুমাতে আমি মৃত্যুবরণ করব। হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন: এটিও আশা। অতপর তারা দুজনে তৃতীয় জনকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আশা কী? সে বলল, যার শ্বাস নিঃশ্বাস অন্যের হাতে তার কী আশা থাকতে পারে?
কোন এক সালাফ বলেন: এমন কোন ঘুমে যাইনি যে, নিজেকে বলেছি আমি এই ঘুম থেকে জাগ্রত হবো।
মারুফ কারখি নামাজে দাঁড়ালেন। অতপর এক ব্যক্তিকে বললেন, সামনে অগ্রসর হও, আর আমাদের নামাজের ইমামতি কর। অতপর লোকটি বলল, যদি আমি এই নামাজে আপনাদের ইমামতি করি তাহলে এ ছাড়া আর কোন নামাজে আপনাদের ইমামতি করবো না। মারুফ কারখি বললেন, তুমি নিজের ব্যাপারে বলছ যে, আরও এক নামাজ পড়ানোর কথা। আল্লাহর কাছে দীর্ঘ আশা থেকে পানাহ চাই। কেননা, নিশ্চয়ই দীর্ঘ আশা নেক আমল থেকে বাধাপ্রদান করে। ৯৪
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন: প্রবৃত্তির অনুসরণ ও উচ্চ আশা সকল ফাসাদের মূল, সকল অনিষ্টের মূল। কেননা, প্রবৃত্তির অনুসরণ হক জানতে ও হকের ইচ্ছা করা থেকে অন্ধ বানিয়ে দেয়, আর উচ্চ আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয় এবং আখিরাতের পাথেয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে ভুলিয়ে দেয়।
হাদীসে এরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সমযের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নাফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে। ৯৫
তাই আমরা নফসের দাবির অনুসারে চলে নির্বোধ হতে চাই না, আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করতে চাই না। আল্লাহর কাছে পবিত্রতা ও নিরাপত্তা কামনা করছি।
টিকাঃ
৮৯ সূরা হাদীদ: ১৬
৯০ সহিহুল বুখারী: ২১৩
১১ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭১০
৯২ আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ৩৪
৯৩ আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ৩৪
৯৪ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭১৭
৯৫ জামিউত তিরমিযি: ২৪৫৯
📄 নযর বা দৃষ্টি
অধিকাংশ গুনাহ ও হারাম কাজে লিপ্ত করে বেগানা মহিলা ও তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিকে দৃষ্টি। এ কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দৃষ্টিকে নীচের দিকে রাখার আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন-
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴾
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ৯৬
আল্লামা ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন: এটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তার মুমিন বান্দাদের প্রতি দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ। সুতরাং যা তার জন্য বৈধ করা হয়েছে তা ব্যতীত অন্য কিছু যেন না দেখে এবং দৃষ্টি যেন হারামকৃত বস্তু দেখা থেকে নত থাকে। অতপর যদি আচমকা ইচ্ছার বাহিরে কোন হারাম বস্তুর দিকে দৃষ্টি চলে যায় তাহলে যেন দ্রুত তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। যেমন বর্ণিত হয়েছে সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতে: "হযরত জারির বিন আবদুল্লাহ বাজালি থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অতর্কিতে হয়ে যাওয়া দৃষ্টির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে আদেশ দিলেন যেন আমি দৃষ্টি সরিয়ে ফেলি।
আর যখন চোখের সেই দৃষ্টি অন্তরকে ফাসাদের দিকে আহ্বানকারী হয় তখন কোনো কোনো সালাফ বলেন' দৃষ্টি হলো বিষাক্ত তীর। যা অন্তরে বিদ্ধ করা হয়।
এই প্রেক্ষিতে আল্লামা ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন' এ কারণেই লজ্জাস্থানকে হেফাজতের আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেভাবে আদেশ দেওয়া হয়েছে চোখের হেফাজতের। ৯৭
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষ যেসব মসিবতের মাঝে ব্যাপকাকারে পতিত হয় সেগুলোর মূলে রয়েছে দৃষ্টি। কেননা, চোখের এক পলক জন্ম দেয় কুমন্ত্রণা। আর কুমন্ত্রণা চিন্তার জন্ম দেয়। চিন্তা জন্ম দেয় কামনার। ধীরে ধীরে কামনা-বাসনা শক্তিশালী হয়। তারপর হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার দৃঢ় সংকল্প তৈরি হয়। এক পর্যায়ে সে যেকোনোভাবে সেই কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। কোনো বাঁধাদানকারী তাকে বাধা দেয় না। এ ব্যাপারে বলা হয়- চোখের দৃষ্টি নিচু রাখার সবর করাটা চোখের দৃষ্টি দেওয়ার পর যে যন্ত্রণা হয় সেই যন্ত্রণা সহ্য করার ওপর সবর ধরা থেকেও সহজ।
চোখের বিপদ হলো, চোখ আফসোস, দুর্ভাগ্য, এবং দহনজ্বালা তৈরি করে। অতঃপর বান্দা দেখে যে, তার ওপর সে সক্ষম নয় এবং সবর ধরতেও পারে। ৯৮
* চোখ হলো আল্লাহর নিয়ামত। মহান এক নিয়ামত। এমন নিয়ামত যার কোনো মূল্য কেউ দিতে পারবে না। প্রতিটি মুসলিমের জন্য নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। যে নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, নিয়ামতকে সঠিকভাবে কাজে লাগায় না, তার কাছ থেকে নিয়ামত কেড়ে নেওয়া হয়। সুতরাং আমাদের উচিত হলো, চোখের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং চোখকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যপূর্ণ কাজে লাগানো। কত মানুষই তো আছে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি দেননি। তারা এই নিয়ামত থেকে মাহরুম আছে। কিন্তু তারা কত আশা আকাঙ্খা করে একটিবারের জন্য হলেও দেখতে পাবে দুটি চোখ দিয়ে। তাই হে আমার মুসলিম ভাই, আপনার জন্য নিয়ামতসমূহের ব্যাপারে চিন্তা করা এবং নিয়ামতের কারণে আল্লাহ তাআলা শুকরিয়া আদায় করা জরুরি। বিশেষ করে চোখের ব্যাপারটি। চোখকে এমন কোনো কাজে না লাগানো, যা আল্লাহ পাক অপছন্দ করেন এবং ক্রোধান্বিত হোন। যেমন: গায়রে মাহরাম মহিলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া। ফিল্ম, ড্রামা, সিরিয়াল দেখা। ইন্টারনেটে অশালীন ছবি ভিডিও দেখা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলার দৃষ্টি তোমার প্রতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রয়েছে এবং তারই আয়ত্বাধীন তুমি রয়েছ।
টিকাঃ
৯৬ সূরা নূর: ৩০
৯৭ মাওয়ারিদুয যামআন: ৩/১১০-১১১
৯৮ আল জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দা-ঈশ শাফী: ২৩৪-২৩৬
📄 অবসরতা
অবসরতা বিরাট একটি নিয়ামত ঐ ব্যক্তির জন্য, যে ব্যক্তি তার অবসর সময়ে ফায়দা হাসিল করে। সময়কে কাজে লাগায়। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অবসরের সময়গুলো হারাম কাজে ব্যয় করে কিয়ামতের দিন সেই অবসরতা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। কঠিন শাস্তি ও বিপদের কারণ হবে। অধিকাংশ মানুষ নিজেদের অবসরতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগায় না। ভালো কোনো কাজে ব্যয় করে না, যা তার জন্য উপকারী ও লাভজনক হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবসরতার ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। যেমন সহীহ বুখারীর রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
হযরত ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- এমন দুটি নিয়ামত আছে, যে দুটোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে' সুস্থতা ও অবসর। ৯৯
✓ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল বাত্তাল রহিমাহুল্লাহ বলেন- হাদীসের ভাবার্থ (উদ্দেশ্য) হলো, ব্যক্তি ফারিগ (অবসর) হতে পারে না এমনকি যদি সে সুস্থ সবল থাকে তবুও। কিন্তু যার এই নিয়ামত নসিব হয়, সে যেন এমন কাজের প্রতি মনোনিবেশ করে, যা তাকে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন তার প্রতি শুকরিয়া আদায় থেকে বিরত রেখে ক্ষতিতে না ফেলে দেয়। আর আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় হলো, তাঁর আদেশসমূহ মানা ও নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকা। অতঃপর যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে সে-ই হলো ক্ষতিগ্রস্ত। আর { كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ الصّئَةُ} এর দ্বারা ইঙ্গিত করেছেন যে, যাদেরকে এর তাওফীক দেওয়া হবে তারা নিতান্তই কম সংখ্যক হবে।
আল্লামা ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষ সুস্থ থাকতে পারে, কিন্তু জীবিকা নির্বাহে ব্যস্ত থাকার দরুন অবসরতা মিলে না। আবার কখনও অবসরতা পেলেও সুস্থ থাকে না। কিন্তু যখন উভয়টি একত্রিত হলো (অর্থাৎ সুস্থ থাকে এবং অবসরতাও মিলে) তখন আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্য থেকে অলসতা বেড়ে যায়। তখন সে হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এর পূর্ণতা হলো যে, দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। সেখানে এমন ব্যবসা রয়েছে যার লাভ প্রকাশ পাবে আখিরাতে। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের অবসর সময়কে ও সুস্থতাকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে ও ইবাদত-বন্দেগীতে কাজে লাগায়, সে হলো সৌভাগ্যবান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা ও অমান্য করার কাজে ব্যয় করে, সে হলো ক্ষতিগ্রস্ত। কেননা, অবসরের পরপরই ব্যস্ততা এবং সুস্থতার পরেই আসে অসুস্থতা।১০০
সময় চলে যায়, আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘমালার মতো। যেমন : বলা হয়, সময় হলো তরবারির ন্যায়। যদি তুমি তাকে না কাট, তাহলে সে তোমাকে কেটে ফেলবে। সুতরাং মানুষের জন্য নিজের অবসর সময়কে নেক আমল ও উত্তম কাজে ব্যয় করা আবশ্যক।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষের সময় প্রকৃতপক্ষে তার বয়স। এটি নিয়ামতসমৃদ্ধ জান্নাতে চিরস্থায়ী জীবনের উপাদান এবং আযাব সমৃদ্ধ জাহান্নামের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছল জীবিকা নির্বাহের উপাদান। সময় মেঘমালা থেকেও আগে অতিক্রম করে। সুতরাং যে ব্যক্তির যে সময়টুকু আল্লাহর জন্য, আল্লাহর কাজের জন্য, ততটুকুই তার হায়াত ও জীবন হিসেবে গণ্য করা হবে। তাছাড়া অন্য কিছুকে হায়াতের মাঝে গণ্য করা হবে না। সুতরাং সে দুনিয়ায় চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় জীবনযাপন করেছে। অতঃপর সে তার সময়কে গাফলতি, শাহওয়াত ও বাতিল আশা আকাঙ্খায় ব্যয় করে।
আর অবসর সময় যদি বান্দা উপকারমূলক কাজে, লাভজনক কাজে ব্যয় না করে, তাহলে খারাপ চিন্তা উদ্রেক হারাম সম্পর্ক এবং ধ্বংসাত্মক কামনা-বাসনা তাকে টেনে নিয়ে যাবে সেদিকে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মনে উদ্রেক হওয়া বা চিন্তার ব্যাপারটি অনেক মারাত্মক। কেননা, তা-ই ভালো খারাপের উৎসস্থল। ইচ্ছা, বাসনা, হিম্মত, দৃঢ়প্রত্যয়ের জন্ম হৃদয় থেকে। অতএব যে ব্যক্তি তার চিন্তা-ভাবনাকে কন্ট্রোল করতে পারবে সে তার মনের লাগাম ধরতে পারবে। কামনা-বাসনাকে দমন করতে পারবে। আর যার মনের চিন্তা- ভাবনা তাকে পরাভূত করে ফেলবে, খেয়াল-খুশি, কামনা-বাসনা ও নফস তার ওপর বিজয় লাভ করবে। যে ব্যক্তি মনের উদ্রেককে দুর্বল মনে করবে, সাধারণ মনে করবে তাকে জোর করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। আর সর্বদা মনের ভাবনাগুলো কলবের ওপর বারবার গমন করে। একপর্যায়ে সেটি বাতিল আশা আকাঙ্খায় পরিণত হয়। আল্লাহর বাণী-
كَسَرَابِ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّبْآنُ مَاءً حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدُهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللهَ عِنْدَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ
মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি, সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সূরা নুর : ৩৯) ১০১
মানুষের সময় হলো, তার বয়স; যদি তা চলে যায় তাহলে তা আর ফিরে আসে না কখনও।
মাওয়ারদি বলেন- আল্লাহ তোমাকে তাওফীক দিয়ে ইহসান করুন। তোমার উচিত রবের ইবাদতে অবহেলা করে শরীরের সুস্থতা ও অবসর সময়কে নষ্ট না করা এবং নিজের পূর্ব আমলগুলোর নির্ভরতাকে বরবাদ না করা। তোমার সুস্থতাকে গনিমত করে আমলের চেষ্টা-মুজাহাদা করো। প্রতিটি সময় তোমার সৌভাগ্যের নয়।
মোটকথা, অবসর সময়টুকু যেন মানুষ উপকারী ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করে। কারণ, এই অবসরতাই খারাপ চিন্তা ও ধ্যান- ধারণার জন্ম দেয়। নফসের গোলামি করতে ও পাপাচারে লিপ্ত হতে আহ্বান করে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুস্থতার নিয়ামত দান করুন এবং অবসরতাকে কাজে লাগানোর তাওফীক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
৯৯ ৬৪১২
১০০ ফাতহুল বারী (ইবনু হাজার): ১১/২৩০
১০১ আল জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দাইশ শাফী: ১/১৫৫
📄 জিহবা
জিহ্বার দ্বারাও অনেক গুনাহে লিপ্ত হয়। যেমন: গিবত, পরনিন্দা, মিথ্যা, হাসি-তামাসা ও কৌতুক ইত্যাদি। একারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসের মাঝে বলেন, যেমন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস,
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ ليصمت
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রতি এবং শেষদিবসের প্রতি ঈমান এনেছে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। ১০২
অর্থাৎ সে যেন এমন কথাবার্তা বলে যা উত্তম এবং কল্যাণজনক। অন্যথায় সে যেন চুপ থাকে।
এ জিহ্বার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল মুআজ বিন জাবালকে সকল কিছুর মূল কী জিনিস, তা বলে দিয়েছেন।
আল্লাহর রাসূল মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন—
আমি তোমাকে সে সবের (পাপকাজে লিপ্ত হওয়ার) মূল সম্বন্ধে বলে দেব না? (মুআজ রাদি. বলেন) আমি বললাম, অবশ্যই বলে দিন হে আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি নিজ জিভটিকে ধরে বললেন' তোমার মধ্যে এটিকে সংযত রাখ। মু'আজ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা যে কথা বলি, তা কি আমাদেরকে হিসাব দিতে হবে? তিনি বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক হে মুআজ, মানুষকে তাদের নিজেদের জিভ-ঘটিত পাপ ছাড়া অন্য কিছু কি তাদের মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?
মানুষ মুখ নিসৃত কথার দ্বারা বেশি জাহান্নামে পতিত হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
দুটি ফাঁকা মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে। সেগুলো হলো: মুখ ও লজ্জাস্থান। ১০৩
মুখ ও লজ্জাস্থান হেফাজত করার মাধ্যমে যেমন জান্নাত পাওয়া যায়, আবার এই ২টি অঙ্গের ক্ষেত্রে শয়তানকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে অধিকহারে মানুষ জাহান্নামী হবে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন' যে ব্যক্তি উভয় চোয়ালের মধ্যভাগ (জিহ্বা) এবং দুই রানের মধ্যভাগ (লজ্জাস্থান) হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহন করে আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করি। ১০৪
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন জিনিস অধিকহারে মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে? তিনি উত্তরে বলেন, মুখ ও লজ্জাস্থান। ১০৫
একটি বাক্য বা কথাই ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহর কাছে এমন কথা থেকে পানাহ চাই।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه: أَنَّه سَمِعَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: «إِنَّ العَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يَتَبَيَّنُ فِيهَا يَزِلُّ بِهَا إِلَى النَّارِ أَبْعَدَ مِمَّا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ». متفق عَلَيْهِ
সাইয়িদুনা আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, মানুষ চিন্তা-ভাবনা না করে এমন কথাবার্তা বলে ফেলে, যার দ্বারা তার পদস্খলন ঘটে পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকে বেশি দূরত্ব দোযখে গিয়ে পতিত হয়। ১০৬
অপর একটি বর্ণনায় আছে,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ ، يَنْزِلُ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ
মানুষ এমন কথাবার্তা বলে ফেলে যা তাকে জাহান্নামে অবতরণ করায়। যা পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকে বেশি দূরত্বে। ১০৭
একটি কথাই বান্দাকে পূর্ব পশ্চিম থেকে দূরত্বে নিয়ে যেতে পারে। জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে পারে একটি কথার কারণেই। তাই তো আমাদের সালাফগণ জিহ্বাকে হেফাজত করার প্রতি অনেক বেশি জোর দিতেন।
সালাফগণ কতাবার্তাও কম বলতেন। আর যা বলতেন খুব চিন্তা ফিকির করেই বলতেন। অহেতুক ও অসার কোন কথা যেন মুখ থেকে না বের হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।
সাইয়িদুনা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের জিহ্বার একাংশ ধরে বললেন, এই জিনিসটিই আমাকে এই স্থানে অবতরণ করিয়েছে। ১০৮
সাইয়িদুনা আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: তোমরা চুপ করা শিখ যেভাবে তোমরা কথা বলা শিখেছ। কেননা চুপ থাকা অনেক বড় সহনশীলতা। আর শ্রবণ করার প্রতি মনোযোগী হও, এমন কোন কথা বলোনা যা অনর্থক এবং তোমার কোন কাজে আসে না। আশ্চর্য হওয়া ছাড়া হাসবে না, প্রয়োজন ছাড়া রাস্তা চলবে না। ১০৯
হযরত হাসান বলেন: যে ব্যক্তি তার জিহ্বাকে হেফাজত করে না সে বুদ্ধিমান নয়। ১১০
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিঃ বলেন, যে ব্যক্তি চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।১১১
হযরত আনাস বিন মালিক বলেন: প্রকৃতপক্ষে পরহেযগার হতে পারবে না কেউ যতক্ষণ না সে তার জিহ্বার ব্যাপারে চিন্তিত না হয়।১১২
সাইয়িদুনা হযরত কায়স বিন আওফ বলেন: আমি আবুবকরকে দেখলাম সে তার জিহ্বার একপার্শ্ব ধরে বলছে, এই জিনিসটি আমাদেরকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ১১৩
হযরত দাউদ তাঈ বলেন: জিহ্বাকে সংযত রাখা সবচেয়ে কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ। ১১৪
সাইয়িদুনা আলি ইবন আবি তালিব বলেন: জিহ্বা হলো শরীরের স্তম্ভ। যখন জিহ্বা দৃঢ় থাকে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকে। আর যখন জিহবা অশান্ত হয়ে যায় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকে না। স্থির থাকে না। ১১৫
ইমাম মালিক বলেন: ঐ ব্যক্তির কথা আমলে গণ্য হয় যে ব্যক্তি কম কথা বলে এবং কথা বলে কেবল যথার্থ ও উপযুক্ত।
সাইয়িদুনা হযরত আলি ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: সর্বোত্তম ইবাদত হচ্ছে চুপ থাকা এবং কষ্ট লাঘবের অপেক্ষা (বিপদ কেটে যাওয়ার অপেক্ষা) করা। ১১৬
হযরত উহাইব ইবনুল ওয়ারদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: বলা হয় হিকমাহ (প্রজ্ঞা) এর দশটি অংশ। তন্মধ্যে নয়টি অংশ রয়েছে চুপ থাকার মাঝে। আর দশম অংশ হলো মানুষের একাকীত্ব, নিঃস্বঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা। ১১৭
অতএব কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের উচিত এমন কথাবার্তা থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখা যেসব কথাবার্তা আমাদেরকে পাপাচার ও অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়।
টিকাঃ
১০২ বুখারী: ৬৪৭৫, মুসলিম: ৪৭
১০০ তিরমিযী : ২০০৪, আহমাদ: ৯০৮৫, ইবনু মাজাহ: ৪২৪৬, আদাবুল মুফরাদ: ২৮৯
১০৪ বুখারী, ৬৪৭৪
১০৫ তিরমিযী, ২০০৪
১০৬ সহীহুল বুখারী : ৬৪৭৭, ৬৪৭৮, মুসলিম: ২৯৮৮, তিরমিযি: ২৩১৪, আহমাদ: ৭১৭৪, ৭৮৯৮, ৮২০৬, ৮৪৪৪, ৮৭০৩, ৮৯৬৭, ১০৫১৪, মুওয়াত্তা মালিক: ১৮৯৪
১০৭ সহীহ মুসলিম: ৫৪৩৭
১০৮ মালিক: ২/৯৮৮, সুনানুল কুবরা লিননাসায়ি: ১০/৪০২ অথবা ১১৮৪১ নং হাদীস
১০৯ মাকারিমুল আখলাক: ১৩৬
১১০ কিতাবুস সামাতি ওয়া আদাবুল লিসান: ৬১
১১১ কিতাবুস সামাতি ওয়াআদাবুল লিসান: ৪৮
১১২ কিতাবুস সামাতি ওয়াআদাবুল লিসান: ৫৩
১১০ কিতাবুস সামাতি ওয়াআদাবুল লিসান: ৫৫
১১৪ আসসামাতু ওয়া আদাবুল লিসান: ৬৯
১১৫ আসসামাতু ওয়া আদাবুল লিসান: ৬৯
১১৬ আলবায়ানু ওয়াত তাবয়ীন: ১/২৪৫
১১৭ আস সিমত – লিইবনি আবিদ দুনয়া: ৬২