📄 উদাসীনতা
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ও আখিরাতের ব্যাপারে উদাসীন ও বেখবর থাকলে তা গুনাহে নিমজ্জিত করে, অন্তরকে বিনষ্ট করে এবং ওয়াসওয়াসা ও খারাপকাজের দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং গায়েবের ব্যাপারে পরিপূর্ণ জ্ঞানী আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অতএব উদাসীন ক্বলব তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে বেখবর থাকে। আর মানুষের অন্তর যখনই আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল হয়ে যায় উদাসীন হয়ে তখনই শয়তান তার মাঝে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়ে যায়। তার পেছনে লেগে থাকে ও তার জন্য অসৎ সঙ্গী হয়ে যায়; যে তার খারাপ জিনিস ও বিষয়গুলোকে সুন্দর ও সুশোভিত করে তার কাছে মেলে ধরে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ ﴾
যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। ৮৫
মানুষ গুনাহে নিপতিত হয়ে থাকে কেবল আল্লাহ থেকে গাফেল থাকার কারণে, আল্লাহর আদেশ এর ব্যাপারে গাফেল থাকার কারণে, দুনিয়া ও আখিরাতে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার শাস্তির ব্যাপারে গাফেল থাকার কারণে। আর যারা আল্লাহ তাআলা ও তার সাথে সাক্ষাত লাভের ব্যাপারে গাফেল থাকে, পরকালীন জীবন ছেড়ে পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তাআলার জাগতিক নিদর্শন ও কুরআনের নিদর্শনের ব্যাপারে গাফেল থাকে তাদের প্রত্যাবর্তন স্থলই হলো জাহান্নাম। কেননা তারা কুফরি করেছে এবং স্বীয় রবের নিদর্শনাবলীর ব্যাপারে গাফলতি করেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ أُولَئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
অবশ্যই যেসব লোক আমার সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই উৎফুল্ল রয়েছে, তাতেই প্রশান্তি অনুভব করেছে এবং যারা আমার নির্দশনসমূহ সম্পর্কে বেখবর। এমন লোকদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম সেসবের বদলা হিসাবে যা তারা অর্জন করছিল। ৮৬
আল্লামা ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ বলেন: গাফলতি উদগত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় হলো দুটি জিনিস। একটি হলো পেট ভরে খাওয়া, আরেকটি হলো পেট ভরে যারা খায় তাদের সাথে চলাফেরা করা। অতএব যদি তুমি গাফলতি ও উদাসীনতা থেকে মুক্তি ও পরিত্রাণ পেতে চাও তাহলে তোমার জন্য আবশ্যক হলো ক্ষুধার্ত থাকা।
তিনি বলেন: বান্দার ওপর দুটি জিনিস থেকে ক্ষতিকারক আর কোন কিছু নেই। সেই দুটি হলো, আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল থাকা এবং আল্লাহর আদেশের মুখালাফাত করা বিরোধিতা করা।
আর উদাসীনতা ও গাফলতি কল্যাণ থেকে মাহরুম করে আর গুনাহ ক্ষতিকে আবশ্যক করে। গাফলতি জান্নাতের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয় আর গুনাহ ও পাপাচার জাহান্নামের দরজা উন্মুক্ত করে। ৮৭
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন- কোন সন্দেহ নেই যে, ক্বলবের মাঝে মরিচা পড়ে যেভাবে তামা, সোনা ইত্যাদির মাঝে মরিচা পড়ে। আর 'অন্তরের মরিচা দুই কারণে হয়; গাফিলতি ও গোনাহ। আবার মরিচা দূরও হয় দুই জিনিসে; জিকির ও ইস্তেগফারে।
যার প্রায় সময় গাফিলতিতে কাটে তার অন্তরে মরিচা জমতে থাকে। গাফিলতি ও অলসতার অনুপাতে প্রতিটি অন্তরে মরিচা পড়ে। অন্তর মরিচাগ্রস্ত হলে তাতে ইলমের ছাপ পড়ে না। তখন বাতিলকে হকের সুরতে দেখে। আর হককে বাতিলের সুরতে। যখন অন্তরে মরিচা জমাট বাঁধে এবং হৃদয় কালো-ধূসর হয়ে যায়, তখন এর কল্পনা ও বোধশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। তখন হক গ্রহণও করে না। বাতিলকে বারণও করে না। আর এটাই অন্তরের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। আর এগুলোর মূলে হলো গাফলতি ও নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ। কেননা, এগুলো অন্তরের নূরকে নিভিয়ে দেয় এবং চক্ষুকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَلَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্য কলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার অনুগত্য করবেন না। (সূরা কাহাফ : ২৮)
সুতরাং আল্লাহ তাআলা ও তার জিকির হতে গাফেল থাকাটা অন্তর কঠিন ও নিষ্ঠুর হওয়া এবং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর কথার প্রভাব থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় কারণের অন্যতম।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন: যখনই অন্তরের উদাসীনতা প্রবল হয় তখন অন্তরের নিষ্ঠুরতাও কঠোর হতে থাকে। অতপর যখন আল্লাহর জিকির করে তখন ঐ নিষ্ঠুরতা গলে যায় যেভাবে আগুনের মাঝে সীসা গলে যায়। জিকরুল্লাহর মত কোন জিনিস দ্বারাই অন্তরে নিষ্ঠুরতা নির্দয়তাকে গলানো যায় না। সুতরাং জিকির হলো ক্বলবের শিফা ও তার দাওয়া অর্থাৎ ঔষধ। আর গাফলতি ও উদাসীনতা হলো রোগ। সুতরাং রোগাক্রান্ত অন্তরসমূহের শিফা ও আরোগ্য হলো আল্লাহ তাআলার জিকিরের মাঝে।
মাকহুল বলেন: জিকরুল্লাহ তথা আল্লাহর স্মরণ হলো শিফা ও আরোগ্য আর মানুষের স্মরণ হলো রোগ ও ব্যাধি।
ইমাম বায়হাকী মাকহুল থেকে মারফু মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন: যদি আমি জিকির করি তাহলে সেই জিকির আমার শিফা দান করে। আর যখন আমি জিকির থেকে গাফেল থাকি আমার অধঃপতন হয়। যেমন বলা হয়:
إذَا مَرِضْنَا تَدَاوَيْنَا بِذِكْرِكُمْ وَنَتْرُكُ الذِّكْرَ أَحْيَاناً فَنَنْتَكِسُ
যখন আমরা রোগাক্রান্ত হয়ে যাই তোমার জিকির আমাকে সুস্থ করে তোলে। আর যখনই তোমার জিকির ছেড়ে দেই আমার অধঃপতন হয়।
তিনি বলেন: জিকির হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্কস্থাপনের আসল বস্তু, বন্ধুত্বস্থাপনের মূল বিষয়। আর গাফলতি ও উদাসীনতা হলো আল্লাহর সাথে শত্রুতা পোষণের মূল বিষয় ও আসল বস্তু। তাই বান্দা যদি সর্বদা তার রবের জিকিরে থাকবে, তাঁকে স্মরণ করবে এমনকি তাকে ভালবাসতে থাকবে তাহলে তার সাথে সম্পর্ক হবে আর যদি বান্দা তার রবের জিকির থেকে গাফেল থাকে এমনকি তার প্রতি সে অসন্তুষ্ট হয়ে যায় তাহলে তার সাথে শত্রুতা হবে।
ইমাম আওযায়ি বলেন, হাসান বিন আতিয়াহ বলেন, বান্দা তার রবের সাথে সীমালঙ্ঘন করে বা শত্রুতাপোষণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বান্দা তার রবের জিকিরকে ও যারা তাঁর জিকির করে তাদেরকে অপছন্দ করা। সুতরাং এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণ হলো গাফলতি। বান্দা যখনই আল্লাহর জিকিরকে অপছন্দ করে, যারা জিকির করে তাদেরকে অপছন্দ করে তখন থেকেই আল্লাহ তাআলা তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করে যেভাবে আল্লাহ তাঁর জিকিরকারীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে। ৮৮
তাই জিকির থেকে গাফেল ও উদাসীন থাকা আমাদের অনুচিত। কেননা জিকিরে গাফেল ব্যক্তি আল্লাহর শত্রুতে পরিণত হয় এবং জিকিরকারী ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধু হয়।
টিকাঃ
৮৫ সূরা যুখরুফ: ৩৬
৮৬ সূরা ইউনুস: ৭-৮
৮৭ আত তাযকিরাতু ফিল ওয়ায: ১০২-১০৩
৮৮ আল ওয়াবিলুস সবিল: ৯০
📄 দীর্ঘ হায়াত আশা করা
মুসলিম গুনাহে পতিত হয়ে যায়, হিসাবের কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় প্রতিক্ষিতি প্রতিদান যেদিন পাবে সেদিনের কথা। এগুলো ভুলে যায় বান্দা তার দীর্ঘ হায়াতের আশা ও মওতের কথা ভুলে গেলে, মৃত্যু যন্ত্রণার কথা ভুলে গেলে, কবর ও সিরাতে মুসতাকিমের কথা ভুলে গেলে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ﴾
যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী। ৮৯
আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبِي فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سبيل
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাধে ধররে বললেন, দুনিয়াতে তুমি এমনভাবে থাকো যেন তুমি আগন্তুক অথবা পথচারী।৯০
হাফিজ ইবনু রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ বলেন : দুনিয়াতে অল্প হায়াতের আশা করার প্রেক্ষিতে এই হাদীসখানা হলো আসল বা মূল। আর নিঃসন্দেহে মুমিনদের জন্য উচিত নয় দুনিয়াকে বাসস্থান ও বসবাসের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে তাতে প্রশান্তি লাভ করবে। বরং মুমিনের জন্য উচিত হলো এখানে থাকবে সফরের ডানার ওপর ভর করে, যেখানে সে সফর বা যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ৯১
সাইয়িদুনা আলি ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি তোমাদের ব্যাপারে দুই জিনিসের ভয় করি। আর তাহলো, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ ও দীর্ঘ হায়াতের আশা করা। কেননা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হক থেকে বিরত রাখে আর দীর্ঘ হায়াতের আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন : বান্দা দীর্ঘ হায়াতের আশা করেনা কেবল আমলকে ভুলে যায়। ৯২
জনৈক ব্যক্তি বসরায় কোন এক যাহেদকে বলল, বাগদাদে কী আপনার কোন প্রয়োজন আছে? তখন যাহেদ বলল, আমার আশাকে এত লম্বা করা পছন্দ করি না যে, সে বাগদাদ আসা যাওয়া করবে।
কোন এক হাকিম বলেন: জাহেল ব্যক্তি তার আশার ওপর ভরসা করে আর জ্ঞানী ব্যক্তি ভরসা করে নিজের আমলের ওপর।
কোন এক সাহিত্যিক বলেন: আশা হলো মরীচিকার মত। যে তা দেখে সেই ধোঁকা খায় আর যে তার আশা করে সেই ত্রুটিযুক্ত হয়। ৯৩
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন: উলামাদের তিনজন একত্রিত হলো। তারা তাদের একজনকে বলল, তোমার আশা আকাঙ্খা কী? সে বলল, আমার কোছে যে মাসই এসেছে আমি ধারণা করেছি যে মৃত্যুবরণ করব মাসটিতে। হাসান বলেন: তার সাথি তাকে বলল, নিশ্চয় এটি আশা আকাঙ্খা। অতপর দ্বিতীয় জনকে বলা হলো, তোমার আশা কী? সে বলল, আমার কাছে এমন কোন জুমা আসে নি যাতে আমি আশা করিনি যে সে জুমাতে আমি মৃত্যুবরণ করব। হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন: এটিও আশা। অতপর তারা দুজনে তৃতীয় জনকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আশা কী? সে বলল, যার শ্বাস নিঃশ্বাস অন্যের হাতে তার কী আশা থাকতে পারে?
কোন এক সালাফ বলেন: এমন কোন ঘুমে যাইনি যে, নিজেকে বলেছি আমি এই ঘুম থেকে জাগ্রত হবো।
মারুফ কারখি নামাজে দাঁড়ালেন। অতপর এক ব্যক্তিকে বললেন, সামনে অগ্রসর হও, আর আমাদের নামাজের ইমামতি কর। অতপর লোকটি বলল, যদি আমি এই নামাজে আপনাদের ইমামতি করি তাহলে এ ছাড়া আর কোন নামাজে আপনাদের ইমামতি করবো না। মারুফ কারখি বললেন, তুমি নিজের ব্যাপারে বলছ যে, আরও এক নামাজ পড়ানোর কথা। আল্লাহর কাছে দীর্ঘ আশা থেকে পানাহ চাই। কেননা, নিশ্চয়ই দীর্ঘ আশা নেক আমল থেকে বাধাপ্রদান করে। ৯৪
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন: প্রবৃত্তির অনুসরণ ও উচ্চ আশা সকল ফাসাদের মূল, সকল অনিষ্টের মূল। কেননা, প্রবৃত্তির অনুসরণ হক জানতে ও হকের ইচ্ছা করা থেকে অন্ধ বানিয়ে দেয়, আর উচ্চ আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয় এবং আখিরাতের পাথেয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে ভুলিয়ে দেয়।
হাদীসে এরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সমযের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নাফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে। ৯৫
তাই আমরা নফসের দাবির অনুসারে চলে নির্বোধ হতে চাই না, আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করতে চাই না। আল্লাহর কাছে পবিত্রতা ও নিরাপত্তা কামনা করছি।
টিকাঃ
৮৯ সূরা হাদীদ: ১৬
৯০ সহিহুল বুখারী: ২১৩
১১ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭১০
৯২ আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ৩৪
৯৩ আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ৩৪
৯৪ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭১৭
৯৫ জামিউত তিরমিযি: ২৪৫৯
📄 নযর বা দৃষ্টি
অধিকাংশ গুনাহ ও হারাম কাজে লিপ্ত করে বেগানা মহিলা ও তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিকে দৃষ্টি। এ কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দৃষ্টিকে নীচের দিকে রাখার আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন-
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴾
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ৯৬
আল্লামা ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন: এটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তার মুমিন বান্দাদের প্রতি দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ। সুতরাং যা তার জন্য বৈধ করা হয়েছে তা ব্যতীত অন্য কিছু যেন না দেখে এবং দৃষ্টি যেন হারামকৃত বস্তু দেখা থেকে নত থাকে। অতপর যদি আচমকা ইচ্ছার বাহিরে কোন হারাম বস্তুর দিকে দৃষ্টি চলে যায় তাহলে যেন দ্রুত তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। যেমন বর্ণিত হয়েছে সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতে: "হযরত জারির বিন আবদুল্লাহ বাজালি থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অতর্কিতে হয়ে যাওয়া দৃষ্টির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে আদেশ দিলেন যেন আমি দৃষ্টি সরিয়ে ফেলি।
আর যখন চোখের সেই দৃষ্টি অন্তরকে ফাসাদের দিকে আহ্বানকারী হয় তখন কোনো কোনো সালাফ বলেন' দৃষ্টি হলো বিষাক্ত তীর। যা অন্তরে বিদ্ধ করা হয়।
এই প্রেক্ষিতে আল্লামা ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন' এ কারণেই লজ্জাস্থানকে হেফাজতের আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেভাবে আদেশ দেওয়া হয়েছে চোখের হেফাজতের। ৯৭
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষ যেসব মসিবতের মাঝে ব্যাপকাকারে পতিত হয় সেগুলোর মূলে রয়েছে দৃষ্টি। কেননা, চোখের এক পলক জন্ম দেয় কুমন্ত্রণা। আর কুমন্ত্রণা চিন্তার জন্ম দেয়। চিন্তা জন্ম দেয় কামনার। ধীরে ধীরে কামনা-বাসনা শক্তিশালী হয়। তারপর হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার দৃঢ় সংকল্প তৈরি হয়। এক পর্যায়ে সে যেকোনোভাবে সেই কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। কোনো বাঁধাদানকারী তাকে বাধা দেয় না। এ ব্যাপারে বলা হয়- চোখের দৃষ্টি নিচু রাখার সবর করাটা চোখের দৃষ্টি দেওয়ার পর যে যন্ত্রণা হয় সেই যন্ত্রণা সহ্য করার ওপর সবর ধরা থেকেও সহজ।
চোখের বিপদ হলো, চোখ আফসোস, দুর্ভাগ্য, এবং দহনজ্বালা তৈরি করে। অতঃপর বান্দা দেখে যে, তার ওপর সে সক্ষম নয় এবং সবর ধরতেও পারে। ৯৮
* চোখ হলো আল্লাহর নিয়ামত। মহান এক নিয়ামত। এমন নিয়ামত যার কোনো মূল্য কেউ দিতে পারবে না। প্রতিটি মুসলিমের জন্য নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। যে নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, নিয়ামতকে সঠিকভাবে কাজে লাগায় না, তার কাছ থেকে নিয়ামত কেড়ে নেওয়া হয়। সুতরাং আমাদের উচিত হলো, চোখের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং চোখকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যপূর্ণ কাজে লাগানো। কত মানুষই তো আছে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি দেননি। তারা এই নিয়ামত থেকে মাহরুম আছে। কিন্তু তারা কত আশা আকাঙ্খা করে একটিবারের জন্য হলেও দেখতে পাবে দুটি চোখ দিয়ে। তাই হে আমার মুসলিম ভাই, আপনার জন্য নিয়ামতসমূহের ব্যাপারে চিন্তা করা এবং নিয়ামতের কারণে আল্লাহ তাআলা শুকরিয়া আদায় করা জরুরি। বিশেষ করে চোখের ব্যাপারটি। চোখকে এমন কোনো কাজে না লাগানো, যা আল্লাহ পাক অপছন্দ করেন এবং ক্রোধান্বিত হোন। যেমন: গায়রে মাহরাম মহিলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া। ফিল্ম, ড্রামা, সিরিয়াল দেখা। ইন্টারনেটে অশালীন ছবি ভিডিও দেখা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলার দৃষ্টি তোমার প্রতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রয়েছে এবং তারই আয়ত্বাধীন তুমি রয়েছ।
টিকাঃ
৯৬ সূরা নূর: ৩০
৯৭ মাওয়ারিদুয যামআন: ৩/১১০-১১১
৯৮ আল জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দা-ঈশ শাফী: ২৩৪-২৩৬
📄 অবসরতা
অবসরতা বিরাট একটি নিয়ামত ঐ ব্যক্তির জন্য, যে ব্যক্তি তার অবসর সময়ে ফায়দা হাসিল করে। সময়কে কাজে লাগায়। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অবসরের সময়গুলো হারাম কাজে ব্যয় করে কিয়ামতের দিন সেই অবসরতা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। কঠিন শাস্তি ও বিপদের কারণ হবে। অধিকাংশ মানুষ নিজেদের অবসরতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগায় না। ভালো কোনো কাজে ব্যয় করে না, যা তার জন্য উপকারী ও লাভজনক হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবসরতার ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। যেমন সহীহ বুখারীর রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
হযরত ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- এমন দুটি নিয়ামত আছে, যে দুটোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে' সুস্থতা ও অবসর। ৯৯
✓ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল বাত্তাল রহিমাহুল্লাহ বলেন- হাদীসের ভাবার্থ (উদ্দেশ্য) হলো, ব্যক্তি ফারিগ (অবসর) হতে পারে না এমনকি যদি সে সুস্থ সবল থাকে তবুও। কিন্তু যার এই নিয়ামত নসিব হয়, সে যেন এমন কাজের প্রতি মনোনিবেশ করে, যা তাকে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন তার প্রতি শুকরিয়া আদায় থেকে বিরত রেখে ক্ষতিতে না ফেলে দেয়। আর আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় হলো, তাঁর আদেশসমূহ মানা ও নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকা। অতঃপর যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে সে-ই হলো ক্ষতিগ্রস্ত। আর { كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ الصّئَةُ} এর দ্বারা ইঙ্গিত করেছেন যে, যাদেরকে এর তাওফীক দেওয়া হবে তারা নিতান্তই কম সংখ্যক হবে।
আল্লামা ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষ সুস্থ থাকতে পারে, কিন্তু জীবিকা নির্বাহে ব্যস্ত থাকার দরুন অবসরতা মিলে না। আবার কখনও অবসরতা পেলেও সুস্থ থাকে না। কিন্তু যখন উভয়টি একত্রিত হলো (অর্থাৎ সুস্থ থাকে এবং অবসরতাও মিলে) তখন আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্য থেকে অলসতা বেড়ে যায়। তখন সে হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এর পূর্ণতা হলো যে, দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। সেখানে এমন ব্যবসা রয়েছে যার লাভ প্রকাশ পাবে আখিরাতে। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের অবসর সময়কে ও সুস্থতাকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে ও ইবাদত-বন্দেগীতে কাজে লাগায়, সে হলো সৌভাগ্যবান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা ও অমান্য করার কাজে ব্যয় করে, সে হলো ক্ষতিগ্রস্ত। কেননা, অবসরের পরপরই ব্যস্ততা এবং সুস্থতার পরেই আসে অসুস্থতা।১০০
সময় চলে যায়, আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘমালার মতো। যেমন : বলা হয়, সময় হলো তরবারির ন্যায়। যদি তুমি তাকে না কাট, তাহলে সে তোমাকে কেটে ফেলবে। সুতরাং মানুষের জন্য নিজের অবসর সময়কে নেক আমল ও উত্তম কাজে ব্যয় করা আবশ্যক।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষের সময় প্রকৃতপক্ষে তার বয়স। এটি নিয়ামতসমৃদ্ধ জান্নাতে চিরস্থায়ী জীবনের উপাদান এবং আযাব সমৃদ্ধ জাহান্নামের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছল জীবিকা নির্বাহের উপাদান। সময় মেঘমালা থেকেও আগে অতিক্রম করে। সুতরাং যে ব্যক্তির যে সময়টুকু আল্লাহর জন্য, আল্লাহর কাজের জন্য, ততটুকুই তার হায়াত ও জীবন হিসেবে গণ্য করা হবে। তাছাড়া অন্য কিছুকে হায়াতের মাঝে গণ্য করা হবে না। সুতরাং সে দুনিয়ায় চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় জীবনযাপন করেছে। অতঃপর সে তার সময়কে গাফলতি, শাহওয়াত ও বাতিল আশা আকাঙ্খায় ব্যয় করে।
আর অবসর সময় যদি বান্দা উপকারমূলক কাজে, লাভজনক কাজে ব্যয় না করে, তাহলে খারাপ চিন্তা উদ্রেক হারাম সম্পর্ক এবং ধ্বংসাত্মক কামনা-বাসনা তাকে টেনে নিয়ে যাবে সেদিকে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মনে উদ্রেক হওয়া বা চিন্তার ব্যাপারটি অনেক মারাত্মক। কেননা, তা-ই ভালো খারাপের উৎসস্থল। ইচ্ছা, বাসনা, হিম্মত, দৃঢ়প্রত্যয়ের জন্ম হৃদয় থেকে। অতএব যে ব্যক্তি তার চিন্তা-ভাবনাকে কন্ট্রোল করতে পারবে সে তার মনের লাগাম ধরতে পারবে। কামনা-বাসনাকে দমন করতে পারবে। আর যার মনের চিন্তা- ভাবনা তাকে পরাভূত করে ফেলবে, খেয়াল-খুশি, কামনা-বাসনা ও নফস তার ওপর বিজয় লাভ করবে। যে ব্যক্তি মনের উদ্রেককে দুর্বল মনে করবে, সাধারণ মনে করবে তাকে জোর করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। আর সর্বদা মনের ভাবনাগুলো কলবের ওপর বারবার গমন করে। একপর্যায়ে সেটি বাতিল আশা আকাঙ্খায় পরিণত হয়। আল্লাহর বাণী-
كَسَرَابِ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّبْآنُ مَاءً حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدُهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللهَ عِنْدَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ
মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি, সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সূরা নুর : ৩৯) ১০১
মানুষের সময় হলো, তার বয়স; যদি তা চলে যায় তাহলে তা আর ফিরে আসে না কখনও।
মাওয়ারদি বলেন- আল্লাহ তোমাকে তাওফীক দিয়ে ইহসান করুন। তোমার উচিত রবের ইবাদতে অবহেলা করে শরীরের সুস্থতা ও অবসর সময়কে নষ্ট না করা এবং নিজের পূর্ব আমলগুলোর নির্ভরতাকে বরবাদ না করা। তোমার সুস্থতাকে গনিমত করে আমলের চেষ্টা-মুজাহাদা করো। প্রতিটি সময় তোমার সৌভাগ্যের নয়।
মোটকথা, অবসর সময়টুকু যেন মানুষ উপকারী ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করে। কারণ, এই অবসরতাই খারাপ চিন্তা ও ধ্যান- ধারণার জন্ম দেয়। নফসের গোলামি করতে ও পাপাচারে লিপ্ত হতে আহ্বান করে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুস্থতার নিয়ামত দান করুন এবং অবসরতাকে কাজে লাগানোর তাওফীক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
৯৯ ৬৪১২
১০০ ফাতহুল বারী (ইবনু হাজার): ১১/২৩০
১০১ আল জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দাইশ শাফী: ১/১৫৫