📄 খারাপ বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠী
গুনাহে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়ের মাঝে অন্যতম হলো খারাপ বন্ধ ও অসৎ সঙ্গ। কেননা, খারাপ সঙ্গী তার সৎ সঙ্গীর সামনে পাপ ও গর্হিত কাজগুলোকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। আর মানুষ তার সাথির দ্বারাই প্রভাবিত হয়। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যেমন আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে রয়েছে। তিনি বলেন:
"সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুতকারকারী ব্যক্তির ন্যায়। সুগন্ধি বিক্রেতা হয়ত সে তোমাকে কিছু সুগন্ধি দিবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে সুগন্ধি ক্রয় করবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে উত্তম ঘ্রাণ পাবে। আর হাপরে ফুতকারকারী হয়ত সে তোমার কাপড়কে জালিয়ে দেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।৮২
সুতরাং খারাপ ব্যক্তির সাহচর্য কামারের কাছে সাহচর্য গ্রহণের মত, যে হাপরে হাওয়া ভরে যাতে সে লোহার তৈজসপত্র ইত্যাদি বানাতে পারে। তার আগুন থেকে কেবল তুমি খারাপ জিনিসই পাবে। হাপরের কাছে গেলে, তার আগুন তোমার কাপড়কে জালিয়ে দেবে। অথবা তার থেকে তুমি ধুয়া ও বিশ্রী গন্ধ পাবে। আর ফাসাদপ্রবন ও খারাপ লোকের সাহচর্য হয়ত তোমাকে খারাপকাজে অভ্যস্ত করে তুলবে, অথবা তোমাকে খারাপের দিকে পরিচালিত করে নিয়ে যাবে, কিংবা তুমি তার কাছ থেকে এমন কিছু শুনবে যা ক্ষতিকর ও উপকারহীন। ফলে শয়তান তোমাকে বেষ্টন করে নেবে যেভাবে তাদেরকে বেষ্টন করে নিয়েছে। অথবা কমপক্ষে তোমাকে লোকেরা তোমাকে তাদের দলে ও তাদের অনুসরণকারীদের মধ্যে ফেলে দেবে, তাদের মধ্যে গণ্য করবে যদিও তুমি তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নও, তাদের তরিকা ও পথ অবলম্বনকারী নও। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে রহম করেন যারা নেককার সালেহীন ও আহলুল খায়রকে ভালবাসে এবং তাদের সাহচর্য গ্রহণ করে এবং পাপি ও আহলুশ শারকে অপছন্দ করে এবং তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। ৮৩
এ কারণেই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী কিয়ামতের দিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ﴾
বন্ধুবর্গ সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে খোদাভীরুরা নয়। ৮৪
* অতএব আমরা সত্যবাদী ও নেককারদের সংশ্রব গ্রহণ করব। মিথ্যাবাদী ও ভ্রান্ত এবং অসৎলোকদের থেকে দূরে অবস্থান করব। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের সাথে থাকার আদেশ দিয়েছেন। সূরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾
হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সংশ্রব গ্রহণ কর।
সুতরাং আমরা সৎলোকের সংশ্রব গ্রহণ করব এবং বদলোক থেকে দূরে থাকব।
টিকাঃ
৮২ বুখারী: ২৫৫৩৩, মুসলিম: ২০৬২৭
৮৩ ফাতহুল মুনয়িম শরহু সহিহি মুসলিম: ১০/১২৭
৮৪ সূরা যুখরুফ: ৬৭
📄 উদাসীনতা
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ও আখিরাতের ব্যাপারে উদাসীন ও বেখবর থাকলে তা গুনাহে নিমজ্জিত করে, অন্তরকে বিনষ্ট করে এবং ওয়াসওয়াসা ও খারাপকাজের দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং গায়েবের ব্যাপারে পরিপূর্ণ জ্ঞানী আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অতএব উদাসীন ক্বলব তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে বেখবর থাকে। আর মানুষের অন্তর যখনই আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল হয়ে যায় উদাসীন হয়ে তখনই শয়তান তার মাঝে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়ে যায়। তার পেছনে লেগে থাকে ও তার জন্য অসৎ সঙ্গী হয়ে যায়; যে তার খারাপ জিনিস ও বিষয়গুলোকে সুন্দর ও সুশোভিত করে তার কাছে মেলে ধরে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ ﴾
যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। ৮৫
মানুষ গুনাহে নিপতিত হয়ে থাকে কেবল আল্লাহ থেকে গাফেল থাকার কারণে, আল্লাহর আদেশ এর ব্যাপারে গাফেল থাকার কারণে, দুনিয়া ও আখিরাতে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার শাস্তির ব্যাপারে গাফেল থাকার কারণে। আর যারা আল্লাহ তাআলা ও তার সাথে সাক্ষাত লাভের ব্যাপারে গাফেল থাকে, পরকালীন জীবন ছেড়ে পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তাআলার জাগতিক নিদর্শন ও কুরআনের নিদর্শনের ব্যাপারে গাফেল থাকে তাদের প্রত্যাবর্তন স্থলই হলো জাহান্নাম। কেননা তারা কুফরি করেছে এবং স্বীয় রবের নিদর্শনাবলীর ব্যাপারে গাফলতি করেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ أُولَئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
অবশ্যই যেসব লোক আমার সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই উৎফুল্ল রয়েছে, তাতেই প্রশান্তি অনুভব করেছে এবং যারা আমার নির্দশনসমূহ সম্পর্কে বেখবর। এমন লোকদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম সেসবের বদলা হিসাবে যা তারা অর্জন করছিল। ৮৬
আল্লামা ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ বলেন: গাফলতি উদগত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় হলো দুটি জিনিস। একটি হলো পেট ভরে খাওয়া, আরেকটি হলো পেট ভরে যারা খায় তাদের সাথে চলাফেরা করা। অতএব যদি তুমি গাফলতি ও উদাসীনতা থেকে মুক্তি ও পরিত্রাণ পেতে চাও তাহলে তোমার জন্য আবশ্যক হলো ক্ষুধার্ত থাকা।
তিনি বলেন: বান্দার ওপর দুটি জিনিস থেকে ক্ষতিকারক আর কোন কিছু নেই। সেই দুটি হলো, আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল থাকা এবং আল্লাহর আদেশের মুখালাফাত করা বিরোধিতা করা।
আর উদাসীনতা ও গাফলতি কল্যাণ থেকে মাহরুম করে আর গুনাহ ক্ষতিকে আবশ্যক করে। গাফলতি জান্নাতের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয় আর গুনাহ ও পাপাচার জাহান্নামের দরজা উন্মুক্ত করে। ৮৭
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন- কোন সন্দেহ নেই যে, ক্বলবের মাঝে মরিচা পড়ে যেভাবে তামা, সোনা ইত্যাদির মাঝে মরিচা পড়ে। আর 'অন্তরের মরিচা দুই কারণে হয়; গাফিলতি ও গোনাহ। আবার মরিচা দূরও হয় দুই জিনিসে; জিকির ও ইস্তেগফারে।
যার প্রায় সময় গাফিলতিতে কাটে তার অন্তরে মরিচা জমতে থাকে। গাফিলতি ও অলসতার অনুপাতে প্রতিটি অন্তরে মরিচা পড়ে। অন্তর মরিচাগ্রস্ত হলে তাতে ইলমের ছাপ পড়ে না। তখন বাতিলকে হকের সুরতে দেখে। আর হককে বাতিলের সুরতে। যখন অন্তরে মরিচা জমাট বাঁধে এবং হৃদয় কালো-ধূসর হয়ে যায়, তখন এর কল্পনা ও বোধশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। তখন হক গ্রহণও করে না। বাতিলকে বারণও করে না। আর এটাই অন্তরের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। আর এগুলোর মূলে হলো গাফলতি ও নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ। কেননা, এগুলো অন্তরের নূরকে নিভিয়ে দেয় এবং চক্ষুকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَلَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্য কলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার অনুগত্য করবেন না। (সূরা কাহাফ : ২৮)
সুতরাং আল্লাহ তাআলা ও তার জিকির হতে গাফেল থাকাটা অন্তর কঠিন ও নিষ্ঠুর হওয়া এবং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর কথার প্রভাব থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় কারণের অন্যতম।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন: যখনই অন্তরের উদাসীনতা প্রবল হয় তখন অন্তরের নিষ্ঠুরতাও কঠোর হতে থাকে। অতপর যখন আল্লাহর জিকির করে তখন ঐ নিষ্ঠুরতা গলে যায় যেভাবে আগুনের মাঝে সীসা গলে যায়। জিকরুল্লাহর মত কোন জিনিস দ্বারাই অন্তরে নিষ্ঠুরতা নির্দয়তাকে গলানো যায় না। সুতরাং জিকির হলো ক্বলবের শিফা ও তার দাওয়া অর্থাৎ ঔষধ। আর গাফলতি ও উদাসীনতা হলো রোগ। সুতরাং রোগাক্রান্ত অন্তরসমূহের শিফা ও আরোগ্য হলো আল্লাহ তাআলার জিকিরের মাঝে।
মাকহুল বলেন: জিকরুল্লাহ তথা আল্লাহর স্মরণ হলো শিফা ও আরোগ্য আর মানুষের স্মরণ হলো রোগ ও ব্যাধি।
ইমাম বায়হাকী মাকহুল থেকে মারফু মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন: যদি আমি জিকির করি তাহলে সেই জিকির আমার শিফা দান করে। আর যখন আমি জিকির থেকে গাফেল থাকি আমার অধঃপতন হয়। যেমন বলা হয়:
إذَا مَرِضْنَا تَدَاوَيْنَا بِذِكْرِكُمْ وَنَتْرُكُ الذِّكْرَ أَحْيَاناً فَنَنْتَكِسُ
যখন আমরা রোগাক্রান্ত হয়ে যাই তোমার জিকির আমাকে সুস্থ করে তোলে। আর যখনই তোমার জিকির ছেড়ে দেই আমার অধঃপতন হয়।
তিনি বলেন: জিকির হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্কস্থাপনের আসল বস্তু, বন্ধুত্বস্থাপনের মূল বিষয়। আর গাফলতি ও উদাসীনতা হলো আল্লাহর সাথে শত্রুতা পোষণের মূল বিষয় ও আসল বস্তু। তাই বান্দা যদি সর্বদা তার রবের জিকিরে থাকবে, তাঁকে স্মরণ করবে এমনকি তাকে ভালবাসতে থাকবে তাহলে তার সাথে সম্পর্ক হবে আর যদি বান্দা তার রবের জিকির থেকে গাফেল থাকে এমনকি তার প্রতি সে অসন্তুষ্ট হয়ে যায় তাহলে তার সাথে শত্রুতা হবে।
ইমাম আওযায়ি বলেন, হাসান বিন আতিয়াহ বলেন, বান্দা তার রবের সাথে সীমালঙ্ঘন করে বা শত্রুতাপোষণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বান্দা তার রবের জিকিরকে ও যারা তাঁর জিকির করে তাদেরকে অপছন্দ করা। সুতরাং এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণ হলো গাফলতি। বান্দা যখনই আল্লাহর জিকিরকে অপছন্দ করে, যারা জিকির করে তাদেরকে অপছন্দ করে তখন থেকেই আল্লাহ তাআলা তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করে যেভাবে আল্লাহ তাঁর জিকিরকারীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে। ৮৮
তাই জিকির থেকে গাফেল ও উদাসীন থাকা আমাদের অনুচিত। কেননা জিকিরে গাফেল ব্যক্তি আল্লাহর শত্রুতে পরিণত হয় এবং জিকিরকারী ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধু হয়।
টিকাঃ
৮৫ সূরা যুখরুফ: ৩৬
৮৬ সূরা ইউনুস: ৭-৮
৮৭ আত তাযকিরাতু ফিল ওয়ায: ১০২-১০৩
৮৮ আল ওয়াবিলুস সবিল: ৯০
📄 দীর্ঘ হায়াত আশা করা
মুসলিম গুনাহে পতিত হয়ে যায়, হিসাবের কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় প্রতিক্ষিতি প্রতিদান যেদিন পাবে সেদিনের কথা। এগুলো ভুলে যায় বান্দা তার দীর্ঘ হায়াতের আশা ও মওতের কথা ভুলে গেলে, মৃত্যু যন্ত্রণার কথা ভুলে গেলে, কবর ও সিরাতে মুসতাকিমের কথা ভুলে গেলে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ﴾
যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী। ৮৯
আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبِي فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سبيل
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাধে ধররে বললেন, দুনিয়াতে তুমি এমনভাবে থাকো যেন তুমি আগন্তুক অথবা পথচারী।৯০
হাফিজ ইবনু রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ বলেন : দুনিয়াতে অল্প হায়াতের আশা করার প্রেক্ষিতে এই হাদীসখানা হলো আসল বা মূল। আর নিঃসন্দেহে মুমিনদের জন্য উচিত নয় দুনিয়াকে বাসস্থান ও বসবাসের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করে তাতে প্রশান্তি লাভ করবে। বরং মুমিনের জন্য উচিত হলো এখানে থাকবে সফরের ডানার ওপর ভর করে, যেখানে সে সফর বা যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ৯১
সাইয়িদুনা আলি ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি তোমাদের ব্যাপারে দুই জিনিসের ভয় করি। আর তাহলো, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ ও দীর্ঘ হায়াতের আশা করা। কেননা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হক থেকে বিরত রাখে আর দীর্ঘ হায়াতের আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন : বান্দা দীর্ঘ হায়াতের আশা করেনা কেবল আমলকে ভুলে যায়। ৯২
জনৈক ব্যক্তি বসরায় কোন এক যাহেদকে বলল, বাগদাদে কী আপনার কোন প্রয়োজন আছে? তখন যাহেদ বলল, আমার আশাকে এত লম্বা করা পছন্দ করি না যে, সে বাগদাদ আসা যাওয়া করবে।
কোন এক হাকিম বলেন: জাহেল ব্যক্তি তার আশার ওপর ভরসা করে আর জ্ঞানী ব্যক্তি ভরসা করে নিজের আমলের ওপর।
কোন এক সাহিত্যিক বলেন: আশা হলো মরীচিকার মত। যে তা দেখে সেই ধোঁকা খায় আর যে তার আশা করে সেই ত্রুটিযুক্ত হয়। ৯৩
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন: উলামাদের তিনজন একত্রিত হলো। তারা তাদের একজনকে বলল, তোমার আশা আকাঙ্খা কী? সে বলল, আমার কোছে যে মাসই এসেছে আমি ধারণা করেছি যে মৃত্যুবরণ করব মাসটিতে। হাসান বলেন: তার সাথি তাকে বলল, নিশ্চয় এটি আশা আকাঙ্খা। অতপর দ্বিতীয় জনকে বলা হলো, তোমার আশা কী? সে বলল, আমার কাছে এমন কোন জুমা আসে নি যাতে আমি আশা করিনি যে সে জুমাতে আমি মৃত্যুবরণ করব। হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন: এটিও আশা। অতপর তারা দুজনে তৃতীয় জনকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আশা কী? সে বলল, যার শ্বাস নিঃশ্বাস অন্যের হাতে তার কী আশা থাকতে পারে?
কোন এক সালাফ বলেন: এমন কোন ঘুমে যাইনি যে, নিজেকে বলেছি আমি এই ঘুম থেকে জাগ্রত হবো।
মারুফ কারখি নামাজে দাঁড়ালেন। অতপর এক ব্যক্তিকে বললেন, সামনে অগ্রসর হও, আর আমাদের নামাজের ইমামতি কর। অতপর লোকটি বলল, যদি আমি এই নামাজে আপনাদের ইমামতি করি তাহলে এ ছাড়া আর কোন নামাজে আপনাদের ইমামতি করবো না। মারুফ কারখি বললেন, তুমি নিজের ব্যাপারে বলছ যে, আরও এক নামাজ পড়ানোর কথা। আল্লাহর কাছে দীর্ঘ আশা থেকে পানাহ চাই। কেননা, নিশ্চয়ই দীর্ঘ আশা নেক আমল থেকে বাধাপ্রদান করে। ৯৪
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন: প্রবৃত্তির অনুসরণ ও উচ্চ আশা সকল ফাসাদের মূল, সকল অনিষ্টের মূল। কেননা, প্রবৃত্তির অনুসরণ হক জানতে ও হকের ইচ্ছা করা থেকে অন্ধ বানিয়ে দেয়, আর উচ্চ আশা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয় এবং আখিরাতের পাথেয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে ভুলিয়ে দেয়।
হাদীসে এরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সমযের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নাফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে। ৯৫
তাই আমরা নফসের দাবির অনুসারে চলে নির্বোধ হতে চাই না, আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করতে চাই না। আল্লাহর কাছে পবিত্রতা ও নিরাপত্তা কামনা করছি।
টিকাঃ
৮৯ সূরা হাদীদ: ১৬
৯০ সহিহুল বুখারী: ২১৩
১১ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭১০
৯২ আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ৩৪
৯৩ আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ৩৪
৯৪ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭১৭
৯৫ জামিউত তিরমিযি: ২৪৫৯
📄 নযর বা দৃষ্টি
অধিকাংশ গুনাহ ও হারাম কাজে লিপ্ত করে বেগানা মহিলা ও তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিকে দৃষ্টি। এ কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দৃষ্টিকে নীচের দিকে রাখার আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন-
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴾
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ৯৬
আল্লামা ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন: এটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তার মুমিন বান্দাদের প্রতি দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ। সুতরাং যা তার জন্য বৈধ করা হয়েছে তা ব্যতীত অন্য কিছু যেন না দেখে এবং দৃষ্টি যেন হারামকৃত বস্তু দেখা থেকে নত থাকে। অতপর যদি আচমকা ইচ্ছার বাহিরে কোন হারাম বস্তুর দিকে দৃষ্টি চলে যায় তাহলে যেন দ্রুত তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। যেমন বর্ণিত হয়েছে সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতে: "হযরত জারির বিন আবদুল্লাহ বাজালি থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অতর্কিতে হয়ে যাওয়া দৃষ্টির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে আদেশ দিলেন যেন আমি দৃষ্টি সরিয়ে ফেলি।
আর যখন চোখের সেই দৃষ্টি অন্তরকে ফাসাদের দিকে আহ্বানকারী হয় তখন কোনো কোনো সালাফ বলেন' দৃষ্টি হলো বিষাক্ত তীর। যা অন্তরে বিদ্ধ করা হয়।
এই প্রেক্ষিতে আল্লামা ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন' এ কারণেই লজ্জাস্থানকে হেফাজতের আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেভাবে আদেশ দেওয়া হয়েছে চোখের হেফাজতের। ৯৭
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন- মানুষ যেসব মসিবতের মাঝে ব্যাপকাকারে পতিত হয় সেগুলোর মূলে রয়েছে দৃষ্টি। কেননা, চোখের এক পলক জন্ম দেয় কুমন্ত্রণা। আর কুমন্ত্রণা চিন্তার জন্ম দেয়। চিন্তা জন্ম দেয় কামনার। ধীরে ধীরে কামনা-বাসনা শক্তিশালী হয়। তারপর হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার দৃঢ় সংকল্প তৈরি হয়। এক পর্যায়ে সে যেকোনোভাবে সেই কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। কোনো বাঁধাদানকারী তাকে বাধা দেয় না। এ ব্যাপারে বলা হয়- চোখের দৃষ্টি নিচু রাখার সবর করাটা চোখের দৃষ্টি দেওয়ার পর যে যন্ত্রণা হয় সেই যন্ত্রণা সহ্য করার ওপর সবর ধরা থেকেও সহজ।
চোখের বিপদ হলো, চোখ আফসোস, দুর্ভাগ্য, এবং দহনজ্বালা তৈরি করে। অতঃপর বান্দা দেখে যে, তার ওপর সে সক্ষম নয় এবং সবর ধরতেও পারে। ৯৮
* চোখ হলো আল্লাহর নিয়ামত। মহান এক নিয়ামত। এমন নিয়ামত যার কোনো মূল্য কেউ দিতে পারবে না। প্রতিটি মুসলিমের জন্য নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। যে নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, নিয়ামতকে সঠিকভাবে কাজে লাগায় না, তার কাছ থেকে নিয়ামত কেড়ে নেওয়া হয়। সুতরাং আমাদের উচিত হলো, চোখের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং চোখকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যপূর্ণ কাজে লাগানো। কত মানুষই তো আছে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি দেননি। তারা এই নিয়ামত থেকে মাহরুম আছে। কিন্তু তারা কত আশা আকাঙ্খা করে একটিবারের জন্য হলেও দেখতে পাবে দুটি চোখ দিয়ে। তাই হে আমার মুসলিম ভাই, আপনার জন্য নিয়ামতসমূহের ব্যাপারে চিন্তা করা এবং নিয়ামতের কারণে আল্লাহ তাআলা শুকরিয়া আদায় করা জরুরি। বিশেষ করে চোখের ব্যাপারটি। চোখকে এমন কোনো কাজে না লাগানো, যা আল্লাহ পাক অপছন্দ করেন এবং ক্রোধান্বিত হোন। যেমন: গায়রে মাহরাম মহিলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া। ফিল্ম, ড্রামা, সিরিয়াল দেখা। ইন্টারনেটে অশালীন ছবি ভিডিও দেখা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলার দৃষ্টি তোমার প্রতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রয়েছে এবং তারই আয়ত্বাধীন তুমি রয়েছ।
টিকাঃ
৯৬ সূরা নূর: ৩০
৯৭ মাওয়ারিদুয যামআন: ৩/১১০-১১১
৯৮ আল জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দা-ঈশ শাফী: ২৩৪-২৩৬