📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ


প্রবৃত্তির অনুসরণ বান্দাকে গুনাহ ও অবাধ্যতায় লিপ্ত করার সবচেয়ে বড় কারণের অন্যতম। নিজের খেয়ালখুশি মাফিক চলাকে প্রবৃত্তির অনুসরণ বলে।

প্রবৃত্তির অনুসরণ নিষেধের ক্ষেত্রে আল্লাহর বাণী আল্লাহ তাআলার বাণী-

وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَلَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطَا

আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। ৬৫

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- ﴿أَفَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا﴾
আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার জিম্মাদার-দায়িত্বশীল হবেন? ৬৬

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন- ﴿فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَأَعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ﴾
অতঃপর তারা যদি আপনার কথায় সাড়া না দেয়, তবে জানবেন, তারা শুধু নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহর হিদায়াতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। ৬৭

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন- ﴿يَادَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ﴾
হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। অতএব তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। কেননা, তারা হিসাব-দিবসকে ভুলে যায়। ৬৮

এ প্রসঙ্গে কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে। বান্দার উচিত ও অবশ্য কর্তব্য হলো, এই সকল আয়াতগুলোকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা। যাতে করে নিজেদের খেয়াল খুশি তথা কু-প্রবৃত্তির অনুসরণের ভয়াবহতার ব্যাপারে এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করলে যেসব ধ্বংস, পথভ্রষ্টতা ও বিচ্যুতি হয়ে থাকে তা জানা যায়।

হাদীসের মাঝে ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কু-প্রবৃত্তি হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। যেমন: হাদীসে এসেছে- যিয়াদ ইবনু ইলাক্বাহ (রহঃ) তাঁর চাচা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআয় বলতেন-

اللهم إني أعوذ بك من منكرات الأخلاق والأعمال والأهواء و الأدواء

হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে গর্হিত চরিত্র, গর্হিত কাজ ও কু-প্রবৃত্তি হতে আশ্রয় চাই। ৬৯

এ ব্যাপারে আরও বিভিন্ন আছার বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ যাম্মুল হাওয়া কিতাবে উল্লেখ করেছেন-
১. মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : বাহাদুরি হলো শাহওয়াত পরিত্যাগ করা ও কু-প্রবৃত্তির অবাধ্য হওয়া।

২. হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: কোন মানুষ যখন সকালে উপনীত হয় তখন তার প্রবৃত্তি ও আমল একত্রিত হয়। সুতরাং যদি তার আমল তার নফসের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তাহলে সেই দিন তার খারাপ, কিন্তু যদি অন্তরের কামনা-বাসনা তার আমলের অনুগামী হয় তাহলে সেই দিনটি হয় তার উত্তম দিন।

৩. আসমায়ি বলেন: আমি জনৈক গ্রাম্য ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, যদি তোমার কাছে মুশকিল হয়ে পড়ে যে, তুমি জানতে পারছ না যে দুটি বিষয়ের কোনটি হিদায়াতের অধিক নিকটবর্তী, তখন তুমি তোমার কামনা-বাসনার নিকটবর্তী যা তার বিরোধিতা কর। কেননা, অধিকাংশ ভুল হয়ে থাকে নফসের কামনা-বাসনার অনুসরণের কারণে।

৪. জনৈক ব্যক্তি হাসান বসরি কে জিজ্ঞেস করলেন হে আবু সা'দ! সর্বোত্তম জিহাদ কোনটা? তিনি বললেন: তোমার নফসের সাথে তোমার জিহাদ করা।

আবু আলি সাকাফি বলেন- যার কামনা-বাসনা তাকে পরাজিত করে ফেলেছে তার আকল শেষ হয়ে গেছে।

বিশর হাফি হাসান আল ফাল্লাসকে বলেন- যে ব্যক্তি দুনিয়ার শাহওয়াতকে পায়ের নিচে ফেলবে শয়তান তার ছায়া থেকে পৃথক থাকবে। আর যার ইলম তার অন্তরের বাসনার ওপর বিজয়ী হয়েছে সেই হলো (প্রকৃত) ধৈর্যধারণকারী বিজয়ী। আর জেনে রাখ, তোমার কামনা-বাসনার মাঝেই রয়েছে সকল বিপদাপদ। আর এর প্রতিষেধক হলো কামনা-বাসনার বিপরীত চলা।

কেউ বলেন- প্রত্যেক ব্যক্তিই তার সঠিক পথ ও অবস্থার ব্যাপারে জানে। কিন্তু সেই অন্ধ যে তার নফসকে অনুসরণ করে। কল্যাণকামীরা তাকে মেহনত-মুজাহাদার পরামর্শ দেয়। কিন্তু সে তাদের নসিহত উপদেশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। অথচ সে জানে ও দেখে।

তার নফস তাকে সঠিক পথ অবলম্বন করা থেকে অন্ধ করে রাখে, এবং সেটি ব্যতীত অন্য সকল কিছুর দোষত্রুটি অবগতি লাভ করে। ৭০

অতএব আমাদের জন্য নফসের কামনা-বাসনা থেকে গভীরভাবে বিরত থাকা উচিত এবং খাহেশাতের তরিৎ চাওয়া পাওয়া থেকে দূরে অবস্থান করা উচিত। কেননা, খাহেশাত জাহান্নামের পথ সুগম করে দেয়।

যে কেউ নফসের অনুসরণ করে সে কেবল নিজের মাঝে জিল্লতি ও অপমানই দেখতে পায়। আর কেউ যেন আহলুল হাওয়া অর্থাৎ প্রবৃত্তি পূজারীদের খপ্পরে না পড়ে। কেননা, তারা হলো দুনিয়ার নিকৃষ্ট মানুষ।

টিকাঃ
৬৫ সূরা কাহফ: ২৮
৬৬ সূরা ফুরকান: ৪৩
৬৭ কাসাস: ৫০
৬৮ সোয়াদ: ২৬
৬৯ জামিউত তিরমিযি: ৩৫৯১ ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরিব বলেন।
৭০ যাম্মুল হাওয়া: ৩৫

📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 মূর্খতা

📄 মূর্খতা


জাহালাত বা মূর্খতা মানে হলো, ইলমহীনতা। সুতরাং জাহালাত হলো, নিন্দনীয় ও দোষণীয় বস্তু। বান্দা যেসব কারণে গুনাহে নিমজ্জিত হলো, পাপের আঁধারে ঘুরপাক খায়, তা হলো— আল্লাহ তাআলা ও তাঁর আনুগত্যের জন্য যা যা জরুরি-অত্যাবশ্যক তার ব্যাপারে অজানা থাকা। সুতরাং যেই ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করে সে জাহিল বা মূর্খ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيب

অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে। ৭১

এই আয়াতের তাফসিরের ক্ষেত্রে সালাফদের উক্তি ও মতামত:

যুজাজ বলেন: এখানে আল্লাহ তাআলা বাণী জাহালত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—অফুরন্ত স্বাদ এর বিপরীত নশ্বর স্বাদকে গ্রহণ করা। ৭২

ইবনু জারির তার সনদে মুজাহিদ থেকে রেওয়ায়াত করেন: প্রত্যেক ব্যক্তি যে আল্লাহর অবাধ্যতা করে সেই হলো মূর্খ ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ অবাধ্যতা থেকে বিরত না হয়, নিবৃত্ত না হয়। ৭৩

অতএব জাহালত বা মূর্খতা ব্যক্তিকে অনেক পরিমাণে দুনিয়াবি ও দীনি মসিবতে আপতিত করে।

ইবনে হাযম রহিমাহুল্লাহ বলেন: যদি জাহালত না কমে তাহলে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের প্রতি হিংসাপরায়ন হয়ে উঠে। ৭৪

অতএব আমাদেরকে জাহালত ও মূর্খতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং যেসব বিষয় জাহালত বৃদ্ধি করে এবং জাহালতের স্তরে নামিয়ে আনে সেগুলিকেও পরিহার করতে হবে।

টিকাঃ
৭১ সূরা নিসা: ১৭
৭২ মাআনিল কুরআন: ২/২৯
৭৩ তাফসীরু ইবনু জারির তাবারি: ৬/২০৮
৭৪ আল আখলাকু ওয়াস সিয়ার: ৯৩

📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 শয়তান

📄 শয়তান


শয়তানের কুমন্ত্রণা ও বনি আদমকে বিভ্রান্ত করার কঠিন পদক্ষেপের ব্যাপারে কোনো মুসলিম অজানা নয়। আর এই ধারাবাহিকতা তখন থেকেই চলে আসছে, যখন তাকে আমাদের পিতা আদমকে সিজদা করার জন্য আদেশ করা হয়েছিল। তখন সে অহংকার করে ঔদ্ধত্ত হয়ে নিজেকে আদম আলাইহিস সালাম-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করার ঘৃণ্য প্রয়াস চালিয়েছিল। অথচ সে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করেছিল। এ ব্যাপারে কুরআন মাজিদে পাওয়া যায়-

قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ

আল্লাহ বললেন- আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি তখন তোকে কিসে সিজদা করতে বারণ করল? সে বলল' আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা। ৭৫

ফলে সে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনের কারণে বিতাড়িত হওয়ার যোগ্য এবং অভিশপ্ত হলো। যেমন: আল্লাহ তাআলা কালামে পাকের মাঝে বলেন-

قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَنْءُ وما مَّدْحُورًا لِّمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ

বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। তাদের যে কেউ তোর পথে চলবে, নিশ্চয় আমি তোদের সবার দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করে দিব। ৭৬

আল্লাহর দুশমন আরও বেশি পরিমাণ ঐদ্ধত্ত হলো। বাড়াবাড়ি করল। বনি আদমকে বিভ্রান্ত করতে ও তাদের মাঝে ফাসাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়ে দিল। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হচ্ছে-

﴿قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ ﴾

সে বললঃ হে আমার পলনকর্তা, আপনি যেমন আমাকে পথ ভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ঠ করে দেব। আপনার মনোনীত বান্দাদের ব্যতীত। ৭৭

ঐ সময় থেকে শয়তানের একমাত্র কাজ হলো বনি আদমকে বিভ্রান্ত করা। বিভিন্ন বাহানা ইত্যাদির মাধ্যমে আদমসন্তানকে সত্যপথ সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত করে জাহান্নামের পথে নিয়ে যাওয়া। এ কারণে মাওলায়ে কারীম শয়তানের ষড়যন্ত্র ও কূটচাল হতে আমাদেরকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন এবং তার অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

﴿يَبَنِي ءَادَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْءَتِهِمَا إِنَّهُ يَرَبِّكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ ﴾

হে বনী-আদম শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছি-যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখ না। আমি শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু করে দিয়েছি, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। ৭৮

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَتِ الشَّيْطَانِ وَمَن يَتَّبِعُ خُطُوَتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তখন তো শয়তান নির্লজ্জতা ও মন্দ কাজেরই আদেশ করবে। ৭৯

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُوا حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ

শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহবান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়। ৮০

আর শয়তান মানুষের ক্বলবে প্রবেশ করে তাকে ওয়াসওয়াসা দেবার জন্য প্রবেশপথ রয়েছে।

ইমাম গাযযালী রহিমাহুল্লাহ বলেন- জেনে রাখ, কলব হলো দূর্গের মত। আর শয়তান এমন শত্রু, যে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করতে চায়। তারপর সে তাদেরকে পরিচালিত করে কর্তৃত্ব করতে চায়। আর দূর্গ রক্ষা করা যাবে না যদি দূর্গের ফটক, প্রবেশপথ এবং ছিদ্রের স্থানগুলোতে পাহারাদারি না করা হয়। আর ফটক ও দরজার পাহারাদারি সে করতে পারবে না, যে তা না জানে। সুতরাং ক্বলবকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে রক্ষা করা আবশ্যক এবং প্রত্যেক মুকাল্লিফ ব্যক্তির জন্য ফরজে আইন। আর যে জিনিস ব্যতীত ওয়াজিব পর্যন্ত পৌঁছা যায় না তা অর্জন করাটাও ওয়াজিব। শয়তানকে ক্বলবের ভেতরে প্রবেশ করা থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তার প্রবেশপথের ব্যাপারে অবগত না হওয়া যায়। সুতরাং প্রবেশপথ জানাটাও ওয়াজিব। আর শয়তান ক্বলবে প্রবেশ করার পথ ও রাস্তা হলো বান্দার অভ্যাস, স্বভাব বা দোষগুণ। আর সেগুলো অনেক। তন্মধ্যে কিছু নিম্নবর্ণিত-

এক. ক্রোধ ও শাহওয়াত: সুতরাং মানুষ যখন রাগান্বিত হয় তখন শয়তান তাকে নিয়ে খেলাধুলা করে, যেমনিভাবে ছোট বাচ্চারা বল নিয়ে খেলাধুলা করে।

দুই. লোভ-লালসা : বান্দা যখনই কোনো জিনিসের লোভ করে বা কোনো জিনিসের প্রতি লালায়িত হয় তখনই তার লোভ তাকে অন্ধ ও বধির করে দেয়। তাই শয়তান লোভীকে তার শাহওয়াত তথা কামনা-বাসনার দিকে পৌঁছার প্রতিটি জিনিসকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়, যদিও তা গর্হিত ও ফাহেশা কাজ হয়ে থাকে।

তিন. খাবারে পরিতৃপ্ত হওয়া/পেট ভরে খাওয়া: খানা স্বচ্ছ হালাল হওয়া সত্ত্বেও পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করলে শাহওয়াত শক্তিশালী হয়ে যায়। আর এটিই হলো শয়তানের অস্ত্র।

চার. কোনো কাজের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা এবং ধীরস্থিরতা ও সাবধানতা অবলম্বনকে পরিহার করা: যখনই কোনো কাজের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ার আশ্রয় নেওয়া হয় শয়তান তখন মানুষের মাঝে তার অনিষ্টতার আমদানি করে থাকে। অথচ তা ব্যক্তি জানতেও পারে না। বুঝতেও পারে না।

পাঁচ, কৃপণতা করা ও দারিদ্রের ভয় করা: কেননা, কৃপণতা এবং দারিদ্রের ভয় করার কারণে ব্যক্তি দান ও খরচ করতে বাঁধাগ্রস্ত হয়। এগুলো তাকে জমিয়ে পঞ্জিভূত করে রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।

ছয়. মত-পথ ও মাজহাব এবং নিজের খেয়াল খুশির ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করা। বিরোধীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা। তাদের দিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে চাওয়া। এগুলো এমন বিষয়, যা ইবাদতকারী ও ফাসাদকারী সকলকে ধ্বংস করে দেয়।

সাত, মুসলিমদের ব্যাপারে বদধারণা ও কৃধারণা পোষণ করা, অতএব এর থেকে দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।

কলবের ভেতর শয়তান প্রবেশ করার এসকল দরজা ও ফটকগুলো বন্ধ করাটা মানুষের জন্য জরুরি। আর জিকরুল্লাহ এসকল দরজা ও ফটক বন্ধ করতে সাহায্য করে। ৮১

সুতরাং আমরা বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করব। সর্বাবস্থায় জিকির করলে শয়তানের চক্রান্ত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। নেক আমল করার প্রতি মন আকৃষ্ট হবে।

টিকাঃ
৭৫ সূরা আরাফ: ১২
৭৬ সূরা আরাফ: ১৮
৭৭ সূরা হিজর: ৩৯-৪০
৭৮ সূরা আরাফ: ২৭
৭৯ সূরা নূর: ২১
৮০ সূরা ফাতির: ৬
৮১ মুকাশাফাতুল কুলুব থেকে সংক্ষেপিত: ৭৬-৭৯

📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 খারাপ বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠী

📄 খারাপ বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠী


গুনাহে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়ের মাঝে অন্যতম হলো খারাপ বন্ধ ও অসৎ সঙ্গ। কেননা, খারাপ সঙ্গী তার সৎ সঙ্গীর সামনে পাপ ও গর্হিত কাজগুলোকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। আর মানুষ তার সাথির দ্বারাই প্রভাবিত হয়। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যেমন আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে রয়েছে। তিনি বলেন:

"সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুতকারকারী ব্যক্তির ন্যায়। সুগন্ধি বিক্রেতা হয়ত সে তোমাকে কিছু সুগন্ধি দিবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে সুগন্ধি ক্রয় করবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে উত্তম ঘ্রাণ পাবে। আর হাপরে ফুতকারকারী হয়ত সে তোমার কাপড়কে জালিয়ে দেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।৮২

সুতরাং খারাপ ব্যক্তির সাহচর্য কামারের কাছে সাহচর্য গ্রহণের মত, যে হাপরে হাওয়া ভরে যাতে সে লোহার তৈজসপত্র ইত্যাদি বানাতে পারে। তার আগুন থেকে কেবল তুমি খারাপ জিনিসই পাবে। হাপরের কাছে গেলে, তার আগুন তোমার কাপড়কে জালিয়ে দেবে। অথবা তার থেকে তুমি ধুয়া ও বিশ্রী গন্ধ পাবে। আর ফাসাদপ্রবন ও খারাপ লোকের সাহচর্য হয়ত তোমাকে খারাপকাজে অভ্যস্ত করে তুলবে, অথবা তোমাকে খারাপের দিকে পরিচালিত করে নিয়ে যাবে, কিংবা তুমি তার কাছ থেকে এমন কিছু শুনবে যা ক্ষতিকর ও উপকারহীন। ফলে শয়তান তোমাকে বেষ্টন করে নেবে যেভাবে তাদেরকে বেষ্টন করে নিয়েছে। অথবা কমপক্ষে তোমাকে লোকেরা তোমাকে তাদের দলে ও তাদের অনুসরণকারীদের মধ্যে ফেলে দেবে, তাদের মধ্যে গণ্য করবে যদিও তুমি তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নও, তাদের তরিকা ও পথ অবলম্বনকারী নও। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে রহম করেন যারা নেককার সালেহীন ও আহলুল খায়রকে ভালবাসে এবং তাদের সাহচর্য গ্রহণ করে এবং পাপি ও আহলুশ শারকে অপছন্দ করে এবং তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। ৮৩

এ কারণেই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী কিয়ামতের দিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ﴾
বন্ধুবর্গ সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে খোদাভীরুরা নয়। ৮৪

* অতএব আমরা সত্যবাদী ও নেককারদের সংশ্রব গ্রহণ করব। মিথ্যাবাদী ও ভ্রান্ত এবং অসৎলোকদের থেকে দূরে অবস্থান করব। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের সাথে থাকার আদেশ দিয়েছেন। সূরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾
হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সংশ্রব গ্রহণ কর।

সুতরাং আমরা সৎলোকের সংশ্রব গ্রহণ করব এবং বদলোক থেকে দূরে থাকব।

টিকাঃ
৮২ বুখারী: ২৫৫৩৩, মুসলিম: ২০৬২৭
৮৩ ফাতহুল মুনয়িম শরহু সহিহি মুসলিম: ১০/১২৭
৮৪ সূরা যুখরুফ: ৬৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00