📘 গুনাহ থেকে ফিরে আসুন > 📄 গুনাহর কারণে অন্তর সুস্থ না থাকা, ইসতিক্বামাত তথা অবিচলতা থেকে দুর সরে যাওয়া

📄 গুনাহর কারণে অন্তর সুস্থ না থাকা, ইসতিক্বামাত তথা অবিচলতা থেকে দুর সরে যাওয়া


গুনাহ অন্তরে ঠিক ঐভাবে প্রভাব বিস্তার করে যেভাবে রোগ শরীরের মধ্যে প্রভাব ফেলে। গুনাহের কারণে অন্তর সর্বদা অসুস্থ থাকে। কোনো ঔষধ তাকে আরওগ্যতা দেয় না। কেননা, এর সুস্থতা অন্তরের খাদ্য (অর্থাৎ আল্লাহর যিকির) অর্জিত হয়। গুনাহ তো অন্তরের ব্যাধি আর এর আরওগ্যতা কেবল গুনাহকে পরিত্যাগ করা। আল্লাহর সালিকীনগণ এই কথার ব্যাপারে একমত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তর স্বীয় মাওলার (আল্লাহ রাব্বুল আলামিন) সাথে মিলে না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের অভিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জান্নাতকে কখনও হাসিল করতে পারে না। আর অন্তর ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর সাথে জুড়তে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা সুস্থ ও সঠিক না হয়। আর ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তর সুস্থ হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত এসব ব্যাধির প্রতিকার না করা হয়। প্রতিকার করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভবপর হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত প্রবৃত্তির বিরোধিতা না করা হয়। নফসের প্রবৃত্তির সাথে সম্পৃক্তার কারণেই তার ব্যাধিগুলো হয় আর সেগুলোর প্রতিকার কেবল প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ করা। যদি প্রবৃত্তি অনুসরণের ব্যাধি অন্তরে কঠিনভাবে বসে যায়, তাহলে সেটি তাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যায় অথবা কমপক্ষে তাকে মৃত্যুর নিকটবর্তী করে দেয়।

নিঃসন্দেহে যে ব্যক্তি তার অন্তরকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বাঁচিয়ে রাখে যেমন তার জন্য জান্নাত উত্তম ঠিকানা হয় ঠিক তদ্রুপ ঐ ব্যক্তির জন্য এই দুনিয়া অস্থায়ী জান্নাত সাবেত হয় যে তার প্রবৃত্তির পিছনে পিছনে দৌঁড়ায়। এই উভয় জান্নাতের কোনো আকৃতি বা সুরতের মাঝে সামঞ্জস্য দেওয়া যায় না। যেমনভাবে অস্থায়ী ও স্থায়ী নিয়ামতের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে, অনুরূপ উভয় জাহানের মধ্যকার ভিন্নতার মাঝেও।

আল্লাহ তাআলা নিম্নবর্ণিত ইরশাদকে নেয়ামত ও জাহান্নামের দিক থেকে শুধুমাত্র আখেরাতের জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ বুঝা যাবে না। তিনি ইরশাদ করেন-

إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمِ ﴾

নিশ্চয় সৎকর্মশীলগণ থাকবে জান্নাতে। এবং দুষ্কর্মীরা থাকবে জাহান্নামে। ৬৩

বরং সে দুনিয়াবি জীবন, আলমে বরযখ এবং দারুল ক্বারার তথা আখিরাতের জীবন এই তিনটি জগতের মধ্যে নেককারগণ নিয়ামত দ্বারা সম্মানিত হবে (যে তাদের জন্য দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো অন্তরের প্রশান্তি)। আর দুষ্কর্মীরা জাহান্নামে থাকবে (যে তাদের জন্য দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো পেরেশানি ও হতাশা)। মোটকথা আসল নিয়ামত তো হলো অন্তরের প্রশান্তি আর আসল আযাব ও শাস্তি অন্তরের পেরেশানি ও হতাশা এবং অন্তরের সংকীর্ণতা, চিন্তা, ভয়ভীতি থেকেও বেশি কোনো কিছু হতে পারে কী? আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতের সাথে অন্তরের মুখ ফিরিয়ে রাখা এবং গায়রুল্লাহর সাথে সম্পর্ক বহাল রাখার চেয়ে বেশি কোনো একাকিত্ব ও নির্জনতা হতে পারে কি?

সুতরাং প্রত্যেক ঐ আমল যা মানুষ গায়রুল্লাহর মহব্বতে করেছে সেটির কারণে তাকে তিনবার আযাবে পতিত হতে হবে। একবার এই দুনিয়ার জীবনে। দুনিয়া অর্জনের পূর্বে তাকে আযাব দেওয়া হয় অতঃপর যখন সেটিকে হাসিল করে নেয় তখন তা ছিনিয়ে নেওয়া, পুরোপুরি ফায়দা হাসিল করতে না পারা এবং বিভিন্ন ধরণের প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ভয়ের সাথে আযাব দেওয়া হয়। যদি বাস্তবিক পক্ষেই দুনিয়ার কোনো নিয়ামত তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে এই বিষয়টি মানুষের জন্য কঠিন শাস্তিতে পরিণত হয়। এ তো ছিল দুনিয়ায় আযাবের তিন প্রকার। আর আলমে বরযখ তথা কবরের জীবনের শান্তি ও আযাবের সম্পর্ক, সেগুলোর প্রথমটি হলো—

(১) দুনিয়াতে তার নিকট পৃথক হয়ে যাবার চিন্তা হবে যে, সে যার দিকে সে কখনও সে ফিরে যাওয়া হবে না।

(২) দ্বিতীয়ত সেসব পরকালীন নেআমতের দূরত্বের দুঃখ হবে, যেগুলো বিরুদ্ধে সে দুনিয়াতে মশগুল থাকবে।

(৩) তার তৃতীয় চিন্তা ও পেরেশানির বিষয় হবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের থেকে পর্দা ও হিজাবের হবে যে, স্বীয় রবকে সে কখনও দেখতে পারবে না। আফসোস ও পরিতাপের কষ্ট, যা অন্তরসমূহকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। (বান্দা বলবে: হায় যদি আমি এমন না করতাম। হায় যদি আমি রাসুলের কথাকে মেনে নিতাম)

সুতরাং দুঃখ, কষ্ট, চিন্তা-পেরেশানি ও আফসোস তাদের শরীরে ঠিক সেভাবে কাজ করবে যেভাবে হলোককে কাঁটাতে পরিণতকারী কঠিন ধরণের পিপাসা ও কোনো অভ্যাস শরীরের মঝে প্রভাবিত হয়। বরং এই সকল জিনিস তার নফসের সাথে সর্বদার জন্য চিমটি কেটে লেগে থাকে। ঐ সময় এই শাস্তি অন্য এক প্রকারের মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে যাবে, যা আরও বেশি কষ্টদায়ক ও প্রাণবিনাশি হবে। (কিন্তু জান বের হতে পারবে না) কোথায় এইসকল বদবখত এবং..

দ্বিতীয় দিক থেকে বান্দা স্বীয় রবের সাথে সাক্ষাত করার আকাঙ্ক্ষা, তাঁর মহব্বতের প্রশান্তি এবং তাঁর যিকিরের প্রশান্তি; যার উপস্থিতিতে অন্তর খুশিতে ভরে উঠে। অন্তিম নিঃশ্বাসের সময় এ সকল নিয়ামতের কথা স্মরণ করে সে খুশি হয়ে যায়। প্রথম স্তরের লোকেরা বলে— যেইসব লোকেরা স্বীয় রবের ধ্যান-খেয়ালে রত ছিল তারা দুনিয়া থেকে কী অর্জন করেছে? দুনিয়াবি আরাম আয়েশের স্বাদ আস্বাদন ব্যতীতই দুনিয়া থেকে চলে গেল? অথচ আল্লাহওয়ালা আলমে বরযখের মধ্যে তাদেরকে এভাবে জবাব দেন' যদি বাদশাহ আর শাহজাদাদের এই আরাম আয়েশের জীবনের ব্যাপারে খবর মিলে যায়, যা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন, তাহলে তারা সেই জীবন হাসিল করার জন্য অবশ্যই আমাদের সাথে ঝগড়া করত। গুনাহগার লোকেরা বলে- দুনিয়াতেও জান্নাত রয়েছে। যে তাতে প্রবেশ করে না আখিরাতেও সে জান্নাত পাবে না।

এই অস্থায়ী জান্নাতের অনুরাগী হে বদনসিব!

নিজের আখিরাতকে দুনিয়ার সামান্য মূল্যে বিক্রয়কারী!

যদি এই সম্পদ (জান্নাত) এর মূল্য তোর জানা না থাকে তাহলে তার আসল খরিদদার ৬৪ দের কাছ থেকে সামান্য জেনে নিতে পারিস না?

তোর কাছে (যে জান, মাল ও যে পুঁজি এবং তা ছাড়াও যা কিছু আছে সবকিছু রব্বে কায়েনাতের পক্ষ থেকে দানকৃত) এইসকল সামান ও আসবাবপত্র সবকিছুর খরিদদার হলেন আল্লাহ তাআলা। যার মূল্যস্বরূপ তিনি জান্নাতুল মাওয়া রেখেছেন। তুই ও তোর রবের মধ্যে সওদাকারী আল্লাহর দূত, তাঁর সত্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; যার হাতে তোর কেনাবেচা হচ্ছে। তারচেয়ে বেশি দুনিয়াতে কেউ জিম্মাদার হবে কি?

অতএব তুই সব চিন্তা ছেড়ে দিয়ে বিনাদ্বিধায় এই সওদা করে ফেল।

টিকাঃ
৬০ সূরা ইনফিতার: ১৩, ১৪
৬৪ জান্নাতের আসল খরিদদার তথা ক্রেতা হলেন তারা, যারা ইমান, তাকওয়া, দুনিয়ার মায়া মোহকে পরিত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির ভিত্তিতে নিজের জানের বিনিময়ে রাব্বুল আলামিনের জান্নাতের সওদা করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00