📄 গুনাহের প্রবেশদ্বার
এই পুস্তিকার জন্য বিষয়বস্তুর গুরুত্বের প্রেক্ষাপট হলো, গুনাহের ভিত্তিতে পুরো উম্মতে ইসলামকে শামিল করার ব্যাপারটি। এই বিষয়টি ভালো ও খারাপের শনাক্তকারী ইমাম ইবনে কায়্যিম জাওযিয়াহ রহিমাহুল্লাহ তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্ণনামূলক কিতাব "আল ফাওয়ায়িদ, এর মাঝে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। আমরা তাঁর ইলমের প্রশস্ততা, গভীরতা, অভিজ্ঞতা এবং দ্বীনের বুঝ থেকে ফায়দা হাসিল করব ইনশাআল্লাহ।
ইমাম সাহেব বলেন' মুসলমান যখন নিজেদের ফায়সালাকে কুরআন-সুন্নাহর সামনে পেশ করে তার হুকুম আহকাম গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এর পরিবর্তে বিভিন্ন মানুষের আলোচনা ও সমালোচনার দ্বারস্থ হতে শুরু করে, তখন তার চিরাচরিত অভ্যাস ও স্বভাবের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি হয়। অন্তরে অন্ধকার ছেয়ে যায়। চিন্তা-চেতনার মাঝে অপবিত্রতা এসে যায় এবং তার আকল মরে যায়। আকলকে শয়তানের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। (যা এই বদনসিবরা খোলামনে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং দ্বীন থেকে দূরে চলে গিয়েছে।)
এই সকল ব্যাপারগুলো মানুষের মাঝে একেবারেই স্বাভাবিক আকার ধারণ করেছে ও তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে গেছে। এমনকি এর মধ্যে ছোট ছোট বিষয়গুলোর লালনপালন ও বড়গুলোর মাঝে পরিপক্কতা এসে গেছে। যার কারণে তাকে কোনো খারাপ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। অতঃপর এমন আরও এক রাজত্ব আসল, যেটি মানুষের মধ্যে সুন্নতের পরিবর্তে বিদআত প্রতিষ্ঠা করল। জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেকের পরিবর্তে নফসকে, হুশের পরিবর্তে খারাপ প্রবৃত্তিকে, হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতাকে, সততার পরিবর্তে মিথ্যা অবলম্বন করার মানসিকতা এবং আদল-ইনসাফ এর পরিবর্তে জুলুম প্রতিষ্ঠা করে দিল। সমকালীন রাজত্বের সময় উল্লেখিত বিষয়গুলো আরও ব্যাপকাকার ধারণ করেছে। আর এই যুগের অধিবাসীরা এইসব খারাপ ও নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজে নিমজ্জিত থাকার কারণে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এর পূর্বে বিষয়টি উল্টো ছিল। মানুষ নেক ও কল্যাণমূলক কাজ করে প্রসিদ্ধি লাভ করত ও বড় ব্যক্তিত্বে পরিণত হত।
যখন আপনি চার দিকে সুস্পষ্ট মন্দ ও গর্হিত কাজের রাজত্ব দেখবেন এবং তাদের সৈন্য সামন্তদের নেককাজের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত দেখবেন, তাহলে আল্লাহর শপথ! জমিনের পেট তার পিঠ থেকে, পাহাড়ের চূড়া তার ময়দান থেকে এবং একাকীত্ব, সম্প্রীতি, ঘনিষ্ঠতা এবং মানুষের সাথে মেলামেশা থেকে বেশি উত্তম ও বেশি সংরক্ষিত হবে। (অতঃপর এগুলো গ্রহণ করে নাও, এবং ফিতনা থেকে বেঁচে থাক।)
📄 ভূমিকা
মানুষ গুনাহ কেন করে?
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ نُفَيْرٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : لَمَّا فُتِحَتْ مَدَائِنُ قُبْرُسَ ، وَقَعَ النَّاسُ يَقْتَسِمُونَ السَّبْيَ ، وَيُفَرِّقُونَ بَيْنَهُمْ وَيَبْكِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ ، فَتَنَحَّى أَبُو الدَّرْدَاءِ ، ثُمَّ احْتَبَى بِحَمَائِلِ سَيْفِهِ ، فَجَعَلَ يَبْكِي ، فَأَتَاهُ جُبَيْرُ بْنُ نُفَيْرٍ ، فَقَالَ : مَا يُبكيكَ يَا أَبَا الدَّرْدَاءِ ؟ أَتَبْكِي فِي يَوْمٍ أَعَرَّ اللَّهُ فِيهِ الْإِسْلَامَ وَأَهْلَهُ ؟ وَأَذَلَّ فِيهِ الْكُفْرَ وَأَهْلَهُ ، فَضَرَبَ عَلَى مَنْكِبَيْهِ ، ثُمَّ قَالَ : ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا جُبَيْرُ بْنَ نُفَيْرٍ ، مَا أَهْوَنَ الْخَلْقَ عَلَى اللَّهِ إِذَا تَرَكُوا أَمْرَهُ ، بَيْنَا هِيَ أُمَّةٌ قَاهِرَةٌ ظَاهِرَةٌ عَلَى النَّاسِ ، لَهُمُ الْمُلْكُ حَتَّى تَرَكُوا أَمْرَ اللَّهِ ، فَصَارُوا إِلَى مَا تَرَى ، وَإِنَّهُ إِذَا سُلِّطَ السَّبَاءُ عَلَى قَوْمٍ فَقَدْ خَرَجُوا مِنْ عَيْنِ اللَّهِ, لَيْسَ لِلَّهِ بِهِمْ حَاجَةٌ
জুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, যখন কুবরিস বিজয় হওয়ার পর সেখানকার বাসিন্দাদের হুলস্থুল ও আহাজারিতে ছেয়ে গেল, তখন একে অপরের সামনে এসে হায় হুতাশ ও কান্নাকাটি করতে লাগল। এর মাঝে আমি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু কে দেখতে পেলাম, তিনি একাকী বসে কাঁদছেন। আমি আরয করলাম-হে আবু দারদা, আজ কি কান্নাকাটি করার দিন? অথচ আল্লাহ পাক ইসলাম ও মুসলমানদেরকে জিহাদের মাধ্যমে ইজ্জত ও সম্মান দান করেছেন এবং তাদের ওপর আল্লাহ দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন।
আবু দারদা জবাবে বললেন- জুবাইর, আমি তোমার বড়। তুমি কি দেখনি যে, কোনো মাখলুক যখন আহকামে ইলাহিকে ভেঙে ফেলে, তখন আল্লাহ তাআলার সামনে তার ইজ্জত কি আর বাকি থাকে? চিন্তা করে দেখ, এই লোকদের কি শান-শওকত ও মান-মর্যাদা অর্জিত হয়েছিল না? তাদের কি কোনো বাদশাহ ছিল না? কিন্তু যখন তারা আহকামে ইলাহির নাফরমানি করেছে, অবাধ্যতা করেছে এবং আহকামে ইলাহিকে উপেক্ষা করেছে তখন তাদের কী দুর্দশা ও দুর্গতিটাই না হলো! তুমি এই সবকিছু চোখের দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছ?
হাঁ, এটিই হলো সেই জিনিস, যা জাতিকে উচ্চ আসন থেকে অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানি অন্তরের মহব্বতকে খতম করে তার মাঝে ঘৃণা দিয়ে ভরপুর করে দিয়েছে। আর এই কারণেই বড় বড় জাতির ওপর আল্লাহর আজাব পতিত হয়েছে। এই জিনিসকেই গুনাহ বলা হয়।৪
অন্য একটি স্থানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহের সংজ্ঞা দিয়েছেন-
وَعَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ قَالَ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ عَنِ الْبِرِّ وَالإِثْمِ فَقَالَ :الْبِرُّ: حُسْنُ الخلق، والإثم: ما حاكَ فِي نَفْسِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ رواه مسلم.
নাওয়াস বিন সামআন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নেকি ও গুনাহর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন, নেকি উত্তম চরিত্রের নাম আর গুনাহ হলো তা, যা তোমার বক্ষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে এবং লোকেরা সেটি জানুক তা তুমি অপছন্দ করো। ৫
বর্তমান সমাজের অবস্থা তখনকার সময় থেকে বহুগুণ বেশি খারাপ হয়ে গেছে। মানুষজন প্রকাশ্যে লোকচক্ষুর সামনেই গুনাহ করে বেড়ায়। গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পর তাদের কাছে সামান্য পরিমাণ অনুতাপ ও অনুশোচনাও হয় না। তাদের অন্তরে পেরেশানির কোনো চিহ্ন, আলামত ও প্রভাব থাকে না। বরং তার বিপরীতে এসকল গুনাহ করে খুশি ও গর্ব অনুভব করা হয়। আর না তাদের এই ভয় থাকে যে, লোকসমাজে এই বিষয়টি বা ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে যাবে। বরং অত্যন্ত আনন্দের সাথে তার বর্ণনা অন্যান্য মানুষকে দেওয়া হয়।
দেখা যায়, আজকাল আমাদের সমাজব্যবস্থায় স্কুল, কলেজ ও মহল্লার অলিগলিতে গান বাদ্যের প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। ব্যাপকহারে জুয়া খেলা চলছে। ফ্যাশন শোর নামে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নোংরামি এবং উলঙ্গপনার প্রতিযোগিতা চলছে। সাহিত্যের নামে অশালীন যৌনসুড়সুড়িমূলক কবিতার আসরের আয়োজন সরগরম হচ্ছে। কৌতুকের নামে অশ্লীলতার আড্ডাবাজী জমছে।
এভাবে পরিধেয় বস্ত্র নির্বাচনের জন্য ফ্যাশন শো করাটা গুনাহের বাজার নয় কি? আর ফ্যাশন শোর চেয়ে বেশি সৌন্দর্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা এগিয়ে যাচ্ছে না? কৌতুকের নামে মিথ্যাচার করার স্টেজ কি প্রস্তুত করা হয় না?
এমনকি, অবস্থা এতটাই সঙ্গিন হয়ে গেছে, কোনো ব্যক্তি সৎপথে চলতে চাইলে তাকে মৌলবাদী, একঘেঁয়ে, ঘরকুণে ও সন্ত্রাসবাদীর মত উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আর চেষ্টা করা হয় তাকে যেন কোনো না কোনোভাবে Degrade করা যায়। যখন গুনাহ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে, গুনাহর সয়লাব হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে তার বৈধতা অর্জন হয়ে যায় এবং সৎ ও নেককাজকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় তখন বুঝে নিতে হবে, সেই সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। লাঞ্ছনা ও অপমান তার ভাগ্যলিপি হয়ে গেছে।
টিকাঃ
৪ সুনানু ইমাম সাইদ ইবনু মনসুর: ২৬৬০
৫ সহীহ মুসলিম: কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ, হাদীস নং ২৫৫৩
📄 কুরআনের ভাষায় অন্যায় ও খারাপকাজে লিপ্ত হওয়ার কিছু কারণ
খারাপকাজে আকৃষ্টকারী কিছু কারণ কুরআনে কারিম একস্থানে এভাবেই শনাক্ত করেছে,
আল্লাহ তাআলা বলেন- زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَثَابِ
মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ- রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। ৭
এই আয়াতে কারীমার মধ্যে আল্লাহ তাআলা সেইসব বিশেষ নিয়ামতসমূহের আলোচনা করেছেন, যা তিনি নিজের বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং বিশেষভাবে সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর রেখেছেন যে, প্রত্যেক মানুষই সেদিকে মনোনিবেশ করে ও ধাবিত হয়ে যায়। সেগুলোকে হাসিল করতে হলে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করে। আর এই চেষ্টা-প্রচেষ্টায় সে আল্লাহর অবাধ্যতা ও গুনাহের কাজও করে বসে। এমন নিয়ামত যা পেয়ে বান্দা নিজের সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে গিয়ে তাঁর অবাধ্যতা ও গুনাহ করে বসে সেগুলো এই আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে-
নারী
সন্তান-সন্ততি
সোনারোপার স্তুপ (ব্যাংক-ব্যলেন্স
চিহ্নিত ঘোড়া (নতুন নতুন মূল্যবান গাড়ি)
গবাদি পশুরাজি (বিভিন্ন পশুর খামার)...
ক্ষেত-খামার।
নারী লিন্সা, সন্তানাদির আশা-আকাঙ্ক্ষা, ধন-সম্পদ, সোনা-রোপা, নগদ টাকা পয়সা, ব্যাংক-ব্যালেন্স, নতুন নতুন দামি গাড়ি, বিভিন্ন পশুর খামার, জমিনের মালিকানা ইত্যাদি এসব কিছু কী! মুমিন ব্যক্তির তো এই উদ্দেশ্য নয়। মুমিনের মাকসাদ বা উদ্দেশ্য তো কেবল আখিরাতের কামিয়াবি অর্জন। তারা তো রবের সন্তুষ্টি চায়; যাতে করে রবকে সন্তুষ্ট করে তাঁর সুন্দর ও সৌন্দর্যমন্ডিত জান্নাতের মালিক হতে পারে। দুনিয়ার শান-শওকত ও ধন-দৌলত ইত্যাদি তো তার উদ্দেশ্যই নয়। তারা এই পরিমাণ জীবিকা অর্জন করুক, যার দ্বারা এই দুনিয়ায় সম্মানের জীবনযাপন করতে পারে এবং আল্লাহ তাআলার ইবাদত বন্দেগী নিয়মিতভাবে করতে সহজ হয়। যদি সে দুনিয়াবি শোভা-সৌন্দর্য ও বিলাসিতা এবং লোভ-লালসায় পড়ে যায়, তাহলে সে গুনাহর শিকার হয়ে যাবে; যা এই সব বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে জড়িত থাকে। আর এই সকল গুনাহ তাকে তার মনজিল থেকে বহুদূরে নিয়ে যাবে, যা কখনওই তার মনঃপূত হবে না। তাই তো সে মনে করে যে, এগুলো তো পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য ও ক'দিনের আরাম-আয়েশ মাত্র। যখনই জীবন শেষ হবে এই সকল সামানা আসবাবপত্র এখানেই যুগ যুগ ধরে পড়ে রবে। এসবের কিছুই মানুষের সাথে যাবে না। এই দিকে দৃষ্টিপাত করেই আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهُوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَلَهُ مُصْفَرًا ثُمَّ يَكُونُ حُطَبًا وَفِي الْأَنْ ءَاخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضُونَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন, ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও সন্তানাদির প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়। যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে। এরপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর তা খড়কুটো হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।
কুরআনে হাকিমের মধ্যে আল্লাহ তাআলা জায়গায় জায়গায় ধন-সম্পদ যে অস্থায়ী সে ব্যাপারে বর্ণনা দিয়েছেন। আর তার বিপরীতে আখিরাতের নিয়ামতকে দুনিয়ার নিয়ামত থেকে উত্তম, উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী বলে এই সকল নিয়ামত অর্জনের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَثَابِ
আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।
এর মানে হলো, আখিরাতের ঘর এই অস্থায়ী দুনিয়ার ঘর থেকে উত্তম হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا
ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদান প্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্যে উত্তম। ৯
টিকাঃ
৭ সূরা আলে ইমরান: ১৪
৮ সূরা হাদিদ: ২০
৯ সূরা কাহফ: ৪৬
📄 দুনিয়ার ধন-সম্পদের আসল হাকিকত
এখন ধন-সম্পদ আসবাব পত্রের হাকিকত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফরমানের আলোকে আপনাদের সামনে রাখা হচ্ছে— যেগুলোর কারণে মানুষ গুনাহে নিমজ্জিত হয়।
أَبُو عَاصِمٍ عَنْ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنْ عَطَاءٍ قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لَأَبْتَغَى ثَالِثًا وَلَا يَمْلَأَ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلا التَّرَابُ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ.
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যদি আদাম সন্তানের দুই উপত্যকা ভরা মালধন থাকে, তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া বনি আদামের পেট কিছুতেই ভরবে না। আর যে তওবা করবে, আল্লাহ্ তার তওবা কবুল করবেন। ১০
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ قَالَ سَمِعْتُ الزُّهْرِيَّ يَقُولُ أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ وَسَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ قَالَ سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَعْطَانِي ثُمَّ سَأَلْتُهُ فَأَعْطَانِي ثُمَّ سَأَلْتُهُ فَأَعْطَانِي ثُمَّ قَالَ هَذَا الْمَالُ وَرُبَّمَا قَالَ سُفْيَانُ قَالَ لِي يَا حَكِيمُ إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ فَمَنْ أَخَذَهُ بِطِيبٍ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
সাইয়িদুনা হাকিম ইবনু হিযাম রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু চাইলাম। তিনি আমাকে দিলেন। আমি তাঁর কাছে আবার চাইলাম। তিনি আমাকে দিলেন। আমি তাঁর কাছে আবার চাইলাম। তিনি দিলেন। এরপর বললেন- এ হলো ধন-সম্পদ (দুনিয়া)। সুফইয়ানের বর্ণনামতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- হে হাকিম, এ মাল সবুজ ও সুমিষ্ট। যে লোক তা খুশি মনে গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি তা লালসা নিয়ে গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে না। বরং সে ঐ ব্যক্তির মত যে খায় কিন্তু তৃপ্ত হয় না। আর উপরের (দাতার) হাত নিচের (গ্রহীতার) হাত থেকে শ্রেষ্ঠ। ১১
মানুষ মনে করে, গুনাহ করে অপরাধ করে যে মাল সে একত্রিত করেছে, পুঞ্জিভূত করেছে অতঃপর আলমারি ও লোহার সিন্দুক ভরে নিয়েছে, ব্যাংকে সংরক্ষিত করে রেখেছে, এখন এসব কিছু তার হয়ে গেছে। এসব যেন প্রকৃতপক্ষেই তার ধন-সম্পদ। আর অন্যরা যদি জায়িয পদ্ধতিতে ধন-সম্পদ উপার্জন করে জমা করে ব্যাংক ব্যালেন্স বানিয়ে রাখে, তাহলে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তির মাল অর্পণ করে দেননি বরং ইরশাদ করেছেন-
"তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি, নিজের সম্পদ হতে তার উত্তরাধিকারীর সম্পদকে অধিক প্রিয় মনে করে? তারা সবাই জবাব দিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তার নিজের সম্পদকে সবচেয়ে অধিক প্রিয় মনে করে না। তখন তিনি বললেন- নিশ্চয়ই মানুষের নিজের সম্পদ তা-ই, যা সে (সৎ কাজে ব্যয়ের মাধ্যমে) আগে পাঠিয়েছে। আর সে পিছনে যা রেখে যাবে তা তার ওয়ারিছের মাল।”১২
দুনিয়াতে ধন-দৌলত একত্রিতকারী মনোযোগ দিয়ে শুনে নাও। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন লোকদের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অনেক ধন-সম্পদ রেখে যাবে আখিরাতে সে ব্যক্তিই গরীব হবে। অবশ্য যাকে আল্লাহ পাক ধন-দৌলত দিয়েছেন অতঃপর সে ডানে-বামে সামনে-পিছনে চতুর্দিকে তা (গরীব মিসকিনদেরকে) বিলিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের ধন-সম্পদকে নেককাজে ব্যয় করেছে। সে আখিরাতে গরীব হবে না।” ১৩
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ وَلَكِنَّ الْغِنَى عَلَى النَّفْسِ.
অর্থাৎ সাইয়িদুনা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ধনের আধিক্য হলে ধনী হয় না, বরং অন্তরের ধনীই প্রকৃত ধনী।১৪
অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে ধনী তো সে ব্যক্তি, যার অন্তরও ধনী। আর সে অন্তর খুলে নিজের ধন-দৌলতকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ এর মাঝে দুই হাতে ব্যয় করে। এমন নয় যে, সে জোড়জবরদস্তি করে জমিয়ে রাখে। সে ব্যক্তি তো ধনী নয় যে অন্যায় কাজ, গুনাহ ও অবাধ্যতা করে টাকা পয়সা একত্রিত করে। অতঃপর সেই টাকা পয়সাকেও এমন জায়গায় খরচ করে যা বেশি গুনাহে লিপ্ত হওয়া সাব্যস্তকারী হয়। আর এটাও হাকিকত যে, যখন রিজিক ও ধন-সম্পদের মধ্যে আধিক্য এসে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ বিভিন্ন প্রকারের গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিই গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে, যার ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ থাকে। (এভাবেই জানা যায়, গুনাহের কারণগুলোর মধ্যে ধন-সম্পদ সবচেয়ে বড় কারণ)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَانْ ءَاخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
বস্তুতঃ তোমরা (আখিরাতের জীবনকে অগ্রাধিকার না দিয়ে) পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।১৫
আর সেই সন্তান-সন্ততি; মানুষ তাদের জন্য কতোই না পরিশ্রম করে থাকে। সারাজীবন ধোঁকাবাজি করে বেড়ায় এজন্য যে, এর দ্বারা মাল ও দৌলত কামাই করে সে নিজের সন্তানাদিকে সুখে রাখতে পারবে। এই সন্তানাদির সুখ-শান্তির জন্য মানুষ বিভিন্ন ধরণের গুনাহে নিমজ্জিত হয়ে থাকে। এই সন্তানাদি ও ধন-সম্পদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَلُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ )
আর জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (ফিতনা) অকল্যাণের সম্মুখিনকারী। বস্তুতঃ (এই ফিতনায় শিকার হওয়া থেকে বেঁচে যাওয়ার সুরতে) আল্লাহর নিকট রয়েছে মহা প্রতিদান।১৬
টিকাঃ
১০ বুখারী: ৬৪৩৬ ও ৬৪৩৭; মুসলিম ১২/৩৯, হাঃ ১০৪৯, আহমাদ ৩৪০১
১১ বুখারী: হাদীস নং ৬৪৪১। এ হাদীসে অন্যের কাছে হাত পাতাকে ঘৃণিত কাজ বলে গণ্য করা হয়েছে এবং দান করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
১২ বুখারী: ৫৪৪২।
১৩ বুখারী: ৬৪৪৩
১৪ বুখারী: ৬৪৪৬, মুসলিম ১২/৪০, হাঃ ১০৫১, আহমাদ ৭৩২০ আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাওয়াক্কুলই মানুষকে প্রকৃতপক্ষে ধনী অন্তঃকরণ দান করে, যার ফলে সে গরীব হয়েও দান করতে ভয় করে না। অপরপক্ষে আল্লাহর প্রতি যার বিশ্বাস ও নির্ভরতা দৃঢ় নয়, সে অগাধ সম্পদের অধিকারী হয়েও, গরীব হয়ে যাওয়ার ভয়ে দান করা থেকে বিরত থাকে।
১৫ সূরা আ,লা: ১৬-১৭
১৬ সূরা আনআম: ২৮