📄 প্রাক-কথন
إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا من يهده الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدا عبده ورسوله
নিঃসন্দেহে সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, আমরা তাঁর স্তুতি বর্ণনা করি, তাঁর কাছ থেকেই সাহায্য ও সহযোগিতা অনুসন্ধান করি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করি। নিজেদের অন্তরের খারাপ প্রবৃত্তি ও বদ আমল থেকে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা যাকে সঠিক পথের দিশা দেন তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই আর যাকে তিনি পথহারা করেন তাকে পথ দেখাবার কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। তিনি একক। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ তাআলাকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। আর অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। ১
তিনি আরো বলেন-
يَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
হে মানব সমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।২
তিনি আরো বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحُ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্য-সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করবেন। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। ৩
অতঃপর নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম বাণী হলো, আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পথনির্দেশনা। দ্বীন ও দুনিয়ার সকল কাজের মধ্য হতে সবচেয়ে খারাপ কাজ হলো, দ্বীনের মধ্যে নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। আর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশকৃত সকল নতুন বিষয় হচ্ছে বিদআত। প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং ভ্রষ্টতার ফলস্বরূপ ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।
আপনার হাতে এটি ক'পৃষ্ঠার ছোট একটি বই। যা গুনাহের অপকার, ক্ষতি এবং তার ভয়াবহতার ব্যাপার সতর্ক করবে। কিতাবটি আলেমে রাব্বানি শাইখুল ইসলাম ছানি, ইমাম ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়াহ রহিমাহুল্লাহ এর "আলজাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দায়িশ শাফী, নামক অত্যন্ত মূল্যবান কিতাব থেকে নেওয়া হয়েছে। আল্লামা ইবুনল কাইয়িম আল জাওযিয়াহ রহিমাহুল্লাহ অন্তরের ব্যাধির প্রতি দৃষ্টিপাতকারী এবং অন্তরের রোগ শনাক্তকারী ছিলেন। তিনি নিজের যুগে যেসব বিষয়ের কথা তাঁর কিতাবের মধ্যে লিখে রেখেছিলেন সেগুলো আজ আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে বর্ণনা করে। ঐ যুগেও গুনাহ ও ফিতনার প্রসার এতো ব্যাপকাকার ধারণ করেছিল যে, অন্তর এর মুসিবত ও ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে যেত। আজও সেই একই দুনিয়া প্রতিষ্ঠিত। (আল্লাহই সাহায্যস্থল)
এটি একটি দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ এবং অনন্য উপদেশ ভাণ্ডারের জন্য সর্বोत्कृष्ट নমুনা। আর পুস্তিকাটি লিখিত হয়েছে এমন এক মহান আলেমের পক্ষ থেকে; যিনি তাঁর মুসলিম ভাইদের ব্যাপারে একনিষ্ঠভাবে গুনাহের অপকার, ক্ষতিসমূহ এবং ভয়াবহতার ব্যাপারে ভীত ছিলেন। বাস্তব কথা হলো, এই পুস্তিকাটির ব্যাপারে আমাদের চিন্তা-ফিকির করার অধিকার রয়েছে। আর এবিষয়টিও জানা উচিত যে, বর্তমান যুগে উম্মতে মুসলিমার মধ্যে আমরা যে ফিরকাবন্দি; একে অপরের থেকে দূরত্ব, হিংসা ও বিদ্বেষ দেখতে পাচ্ছি এই সবকিছু আমাদের গুনাহ এবং মহান আল্লাহ তাআলার এই ফরমানের ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। তিনি বলেন-
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ
তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আমরা যদি এই আয়াতের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খানুরূপে চিন্তা-ভাবনা করি, তাহলে আমরা আমাদের দ্বীনে হানীফ তথা একনিষ্ঠ দ্বীনের দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করতে পারব। এতে করে আমরা আমাদের হারানো গৌরবকে পুনরায় ফিরে পাব। আমরা নিজেদের দৃঢ় আশা আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারব। আর তখনই আমরা সেই উম্মত হয়ে যেতে পারব, যেই উম্মতকে খাইরুল উমাম তথা সর্বোত্তম উম্মত নামে জানা যায়, যে উম্মত নেককাজ ও কল্যাণকর কাজের আদেশ প্রদান করে এবং গর্হিত ও অকল্যাণমূলক কাজ থেকে বাঁধাপ্রদান করে।
সম্মানিত পাঠকবর্গ, এই পুস্তিকাটি পড়ার পর আমাদের সবার প্রতি আবশ্যকীয় হলো, গভীর মনোযোগের সাথে এর বিষয়বস্তুর প্রতি চিন্তা-ভাবনা করা এবং এটিকে বারবার পাঠ করা। এর দ্বারা হতে পারে আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরের কঠোরতা দূর করে দিয়ে সিরাতে মুস্তাকিম তথা সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত করবেন। তিনি তো সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। এই পুস্তিকাটির মধ্যে আমার কাজ কেবলমাত্র এতটুকুই যে, আমি কুরআনের আয়াত ও হাদীসগুলোকে তাখরিজ করে দিয়েছি এবং বিষয়বস্তু অনুপাতে সূচিপত্র বানিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোআ করছি, তিনি যেন দ্বীনকে বিজয়ী করে দেন এবং বাতিলকে লজ্জিত ও অপদস্ত করেন। করে তাকে পরাজিত করেন। তিনি এতে সামর্থবান এবং তিনিই দোআ শোনা ও কবুল করার যোগ্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাথিদের ওপর পরিপূর্ণ শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন। আমীন।
আবদুর রহমান বিন ইউসুফ আবু ওয়াদা আসরী
মদিনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব
মঙ্গলবার বাদ জোহর ৪ রবিউল আউয়াল/১৪১৩ হিজরি
টিকাঃ
১ সূরা আলে ইমরান: ১০২
২ সূরা নিসা: ১
৩ সূরা আহযাব: ৭০-৭১
📄 গুনাহের প্রবেশদ্বার
এই পুস্তিকার জন্য বিষয়বস্তুর গুরুত্বের প্রেক্ষাপট হলো, গুনাহের ভিত্তিতে পুরো উম্মতে ইসলামকে শামিল করার ব্যাপারটি। এই বিষয়টি ভালো ও খারাপের শনাক্তকারী ইমাম ইবনে কায়্যিম জাওযিয়াহ রহিমাহুল্লাহ তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্ণনামূলক কিতাব "আল ফাওয়ায়িদ, এর মাঝে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। আমরা তাঁর ইলমের প্রশস্ততা, গভীরতা, অভিজ্ঞতা এবং দ্বীনের বুঝ থেকে ফায়দা হাসিল করব ইনশাআল্লাহ।
ইমাম সাহেব বলেন' মুসলমান যখন নিজেদের ফায়সালাকে কুরআন-সুন্নাহর সামনে পেশ করে তার হুকুম আহকাম গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এর পরিবর্তে বিভিন্ন মানুষের আলোচনা ও সমালোচনার দ্বারস্থ হতে শুরু করে, তখন তার চিরাচরিত অভ্যাস ও স্বভাবের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি হয়। অন্তরে অন্ধকার ছেয়ে যায়। চিন্তা-চেতনার মাঝে অপবিত্রতা এসে যায় এবং তার আকল মরে যায়। আকলকে শয়তানের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। (যা এই বদনসিবরা খোলামনে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং দ্বীন থেকে দূরে চলে গিয়েছে।)
এই সকল ব্যাপারগুলো মানুষের মাঝে একেবারেই স্বাভাবিক আকার ধারণ করেছে ও তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে গেছে। এমনকি এর মধ্যে ছোট ছোট বিষয়গুলোর লালনপালন ও বড়গুলোর মাঝে পরিপক্কতা এসে গেছে। যার কারণে তাকে কোনো খারাপ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। অতঃপর এমন আরও এক রাজত্ব আসল, যেটি মানুষের মধ্যে সুন্নতের পরিবর্তে বিদআত প্রতিষ্ঠা করল। জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেকের পরিবর্তে নফসকে, হুশের পরিবর্তে খারাপ প্রবৃত্তিকে, হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতাকে, সততার পরিবর্তে মিথ্যা অবলম্বন করার মানসিকতা এবং আদল-ইনসাফ এর পরিবর্তে জুলুম প্রতিষ্ঠা করে দিল। সমকালীন রাজত্বের সময় উল্লেখিত বিষয়গুলো আরও ব্যাপকাকার ধারণ করেছে। আর এই যুগের অধিবাসীরা এইসব খারাপ ও নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজে নিমজ্জিত থাকার কারণে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এর পূর্বে বিষয়টি উল্টো ছিল। মানুষ নেক ও কল্যাণমূলক কাজ করে প্রসিদ্ধি লাভ করত ও বড় ব্যক্তিত্বে পরিণত হত।
যখন আপনি চার দিকে সুস্পষ্ট মন্দ ও গর্হিত কাজের রাজত্ব দেখবেন এবং তাদের সৈন্য সামন্তদের নেককাজের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত দেখবেন, তাহলে আল্লাহর শপথ! জমিনের পেট তার পিঠ থেকে, পাহাড়ের চূড়া তার ময়দান থেকে এবং একাকীত্ব, সম্প্রীতি, ঘনিষ্ঠতা এবং মানুষের সাথে মেলামেশা থেকে বেশি উত্তম ও বেশি সংরক্ষিত হবে। (অতঃপর এগুলো গ্রহণ করে নাও, এবং ফিতনা থেকে বেঁচে থাক।)
📄 ভূমিকা
মানুষ গুনাহ কেন করে?
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ نُفَيْرٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : لَمَّا فُتِحَتْ مَدَائِنُ قُبْرُسَ ، وَقَعَ النَّاسُ يَقْتَسِمُونَ السَّبْيَ ، وَيُفَرِّقُونَ بَيْنَهُمْ وَيَبْكِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ ، فَتَنَحَّى أَبُو الدَّرْدَاءِ ، ثُمَّ احْتَبَى بِحَمَائِلِ سَيْفِهِ ، فَجَعَلَ يَبْكِي ، فَأَتَاهُ جُبَيْرُ بْنُ نُفَيْرٍ ، فَقَالَ : مَا يُبكيكَ يَا أَبَا الدَّرْدَاءِ ؟ أَتَبْكِي فِي يَوْمٍ أَعَرَّ اللَّهُ فِيهِ الْإِسْلَامَ وَأَهْلَهُ ؟ وَأَذَلَّ فِيهِ الْكُفْرَ وَأَهْلَهُ ، فَضَرَبَ عَلَى مَنْكِبَيْهِ ، ثُمَّ قَالَ : ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا جُبَيْرُ بْنَ نُفَيْرٍ ، مَا أَهْوَنَ الْخَلْقَ عَلَى اللَّهِ إِذَا تَرَكُوا أَمْرَهُ ، بَيْنَا هِيَ أُمَّةٌ قَاهِرَةٌ ظَاهِرَةٌ عَلَى النَّاسِ ، لَهُمُ الْمُلْكُ حَتَّى تَرَكُوا أَمْرَ اللَّهِ ، فَصَارُوا إِلَى مَا تَرَى ، وَإِنَّهُ إِذَا سُلِّطَ السَّبَاءُ عَلَى قَوْمٍ فَقَدْ خَرَجُوا مِنْ عَيْنِ اللَّهِ, لَيْسَ لِلَّهِ بِهِمْ حَاجَةٌ
জুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, যখন কুবরিস বিজয় হওয়ার পর সেখানকার বাসিন্দাদের হুলস্থুল ও আহাজারিতে ছেয়ে গেল, তখন একে অপরের সামনে এসে হায় হুতাশ ও কান্নাকাটি করতে লাগল। এর মাঝে আমি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু কে দেখতে পেলাম, তিনি একাকী বসে কাঁদছেন। আমি আরয করলাম-হে আবু দারদা, আজ কি কান্নাকাটি করার দিন? অথচ আল্লাহ পাক ইসলাম ও মুসলমানদেরকে জিহাদের মাধ্যমে ইজ্জত ও সম্মান দান করেছেন এবং তাদের ওপর আল্লাহ দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন।
আবু দারদা জবাবে বললেন- জুবাইর, আমি তোমার বড়। তুমি কি দেখনি যে, কোনো মাখলুক যখন আহকামে ইলাহিকে ভেঙে ফেলে, তখন আল্লাহ তাআলার সামনে তার ইজ্জত কি আর বাকি থাকে? চিন্তা করে দেখ, এই লোকদের কি শান-শওকত ও মান-মর্যাদা অর্জিত হয়েছিল না? তাদের কি কোনো বাদশাহ ছিল না? কিন্তু যখন তারা আহকামে ইলাহির নাফরমানি করেছে, অবাধ্যতা করেছে এবং আহকামে ইলাহিকে উপেক্ষা করেছে তখন তাদের কী দুর্দশা ও দুর্গতিটাই না হলো! তুমি এই সবকিছু চোখের দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছ?
হাঁ, এটিই হলো সেই জিনিস, যা জাতিকে উচ্চ আসন থেকে অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানি অন্তরের মহব্বতকে খতম করে তার মাঝে ঘৃণা দিয়ে ভরপুর করে দিয়েছে। আর এই কারণেই বড় বড় জাতির ওপর আল্লাহর আজাব পতিত হয়েছে। এই জিনিসকেই গুনাহ বলা হয়।৪
অন্য একটি স্থানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহের সংজ্ঞা দিয়েছেন-
وَعَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ قَالَ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ عَنِ الْبِرِّ وَالإِثْمِ فَقَالَ :الْبِرُّ: حُسْنُ الخلق، والإثم: ما حاكَ فِي نَفْسِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ رواه مسلم.
নাওয়াস বিন সামআন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নেকি ও গুনাহর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন, নেকি উত্তম চরিত্রের নাম আর গুনাহ হলো তা, যা তোমার বক্ষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে এবং লোকেরা সেটি জানুক তা তুমি অপছন্দ করো। ৫
বর্তমান সমাজের অবস্থা তখনকার সময় থেকে বহুগুণ বেশি খারাপ হয়ে গেছে। মানুষজন প্রকাশ্যে লোকচক্ষুর সামনেই গুনাহ করে বেড়ায়। গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পর তাদের কাছে সামান্য পরিমাণ অনুতাপ ও অনুশোচনাও হয় না। তাদের অন্তরে পেরেশানির কোনো চিহ্ন, আলামত ও প্রভাব থাকে না। বরং তার বিপরীতে এসকল গুনাহ করে খুশি ও গর্ব অনুভব করা হয়। আর না তাদের এই ভয় থাকে যে, লোকসমাজে এই বিষয়টি বা ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে যাবে। বরং অত্যন্ত আনন্দের সাথে তার বর্ণনা অন্যান্য মানুষকে দেওয়া হয়।
দেখা যায়, আজকাল আমাদের সমাজব্যবস্থায় স্কুল, কলেজ ও মহল্লার অলিগলিতে গান বাদ্যের প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। ব্যাপকহারে জুয়া খেলা চলছে। ফ্যাশন শোর নামে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নোংরামি এবং উলঙ্গপনার প্রতিযোগিতা চলছে। সাহিত্যের নামে অশালীন যৌনসুড়সুড়িমূলক কবিতার আসরের আয়োজন সরগরম হচ্ছে। কৌতুকের নামে অশ্লীলতার আড্ডাবাজী জমছে।
এভাবে পরিধেয় বস্ত্র নির্বাচনের জন্য ফ্যাশন শো করাটা গুনাহের বাজার নয় কি? আর ফ্যাশন শোর চেয়ে বেশি সৌন্দর্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা এগিয়ে যাচ্ছে না? কৌতুকের নামে মিথ্যাচার করার স্টেজ কি প্রস্তুত করা হয় না?
এমনকি, অবস্থা এতটাই সঙ্গিন হয়ে গেছে, কোনো ব্যক্তি সৎপথে চলতে চাইলে তাকে মৌলবাদী, একঘেঁয়ে, ঘরকুণে ও সন্ত্রাসবাদীর মত উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আর চেষ্টা করা হয় তাকে যেন কোনো না কোনোভাবে Degrade করা যায়। যখন গুনাহ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে, গুনাহর সয়লাব হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে তার বৈধতা অর্জন হয়ে যায় এবং সৎ ও নেককাজকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় তখন বুঝে নিতে হবে, সেই সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। লাঞ্ছনা ও অপমান তার ভাগ্যলিপি হয়ে গেছে।
টিকাঃ
৪ সুনানু ইমাম সাইদ ইবনু মনসুর: ২৬৬০
৫ সহীহ মুসলিম: কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ, হাদীস নং ২৫৫৩
📄 কুরআনের ভাষায় অন্যায় ও খারাপকাজে লিপ্ত হওয়ার কিছু কারণ
খারাপকাজে আকৃষ্টকারী কিছু কারণ কুরআনে কারিম একস্থানে এভাবেই শনাক্ত করেছে,
আল্লাহ তাআলা বলেন- زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَثَابِ
মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ- রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। ৭
এই আয়াতে কারীমার মধ্যে আল্লাহ তাআলা সেইসব বিশেষ নিয়ামতসমূহের আলোচনা করেছেন, যা তিনি নিজের বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং বিশেষভাবে সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর রেখেছেন যে, প্রত্যেক মানুষই সেদিকে মনোনিবেশ করে ও ধাবিত হয়ে যায়। সেগুলোকে হাসিল করতে হলে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করে। আর এই চেষ্টা-প্রচেষ্টায় সে আল্লাহর অবাধ্যতা ও গুনাহের কাজও করে বসে। এমন নিয়ামত যা পেয়ে বান্দা নিজের সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে গিয়ে তাঁর অবাধ্যতা ও গুনাহ করে বসে সেগুলো এই আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে-
নারী
সন্তান-সন্ততি
সোনারোপার স্তুপ (ব্যাংক-ব্যলেন্স
চিহ্নিত ঘোড়া (নতুন নতুন মূল্যবান গাড়ি)
গবাদি পশুরাজি (বিভিন্ন পশুর খামার)...
ক্ষেত-খামার।
নারী লিন্সা, সন্তানাদির আশা-আকাঙ্ক্ষা, ধন-সম্পদ, সোনা-রোপা, নগদ টাকা পয়সা, ব্যাংক-ব্যালেন্স, নতুন নতুন দামি গাড়ি, বিভিন্ন পশুর খামার, জমিনের মালিকানা ইত্যাদি এসব কিছু কী! মুমিন ব্যক্তির তো এই উদ্দেশ্য নয়। মুমিনের মাকসাদ বা উদ্দেশ্য তো কেবল আখিরাতের কামিয়াবি অর্জন। তারা তো রবের সন্তুষ্টি চায়; যাতে করে রবকে সন্তুষ্ট করে তাঁর সুন্দর ও সৌন্দর্যমন্ডিত জান্নাতের মালিক হতে পারে। দুনিয়ার শান-শওকত ও ধন-দৌলত ইত্যাদি তো তার উদ্দেশ্যই নয়। তারা এই পরিমাণ জীবিকা অর্জন করুক, যার দ্বারা এই দুনিয়ায় সম্মানের জীবনযাপন করতে পারে এবং আল্লাহ তাআলার ইবাদত বন্দেগী নিয়মিতভাবে করতে সহজ হয়। যদি সে দুনিয়াবি শোভা-সৌন্দর্য ও বিলাসিতা এবং লোভ-লালসায় পড়ে যায়, তাহলে সে গুনাহর শিকার হয়ে যাবে; যা এই সব বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে জড়িত থাকে। আর এই সকল গুনাহ তাকে তার মনজিল থেকে বহুদূরে নিয়ে যাবে, যা কখনওই তার মনঃপূত হবে না। তাই তো সে মনে করে যে, এগুলো তো পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য ও ক'দিনের আরাম-আয়েশ মাত্র। যখনই জীবন শেষ হবে এই সকল সামানা আসবাবপত্র এখানেই যুগ যুগ ধরে পড়ে রবে। এসবের কিছুই মানুষের সাথে যাবে না। এই দিকে দৃষ্টিপাত করেই আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهُوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَلَهُ مُصْفَرًا ثُمَّ يَكُونُ حُطَبًا وَفِي الْأَنْ ءَاخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضُونَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন, ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও সন্তানাদির প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়। যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে। এরপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর তা খড়কুটো হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।
কুরআনে হাকিমের মধ্যে আল্লাহ তাআলা জায়গায় জায়গায় ধন-সম্পদ যে অস্থায়ী সে ব্যাপারে বর্ণনা দিয়েছেন। আর তার বিপরীতে আখিরাতের নিয়ামতকে দুনিয়ার নিয়ামত থেকে উত্তম, উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী বলে এই সকল নিয়ামত অর্জনের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَثَابِ
আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।
এর মানে হলো, আখিরাতের ঘর এই অস্থায়ী দুনিয়ার ঘর থেকে উত্তম হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا
ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদান প্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্যে উত্তম। ৯
টিকাঃ
৭ সূরা আলে ইমরান: ১৪
৮ সূরা হাদিদ: ২০
৯ সূরা কাহফ: ৪৬