📄 উস্তায জিগর মুরাদাবাদী
উস্তাদ জিগর মুরাদাবাদী। সমকালে প্রসিদ্ধ ও প্রথিতযশা কবি ছিলেন। শুরুর দিকে তিনি কেবল নেশা পানকারী ছিলেন না; বরং পান ছাড়া তাঁর চলত না। কল্পনার জগতে সব সময় ডুবে থাকতেন। কবিতার জগতে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, মনে হত, বিষয়বস্তুর নক্ষত্রগুলো আকাশ থেকে পেড়ে নামাতেন।
একবারের ঘটনা। কোনো এক মজলিসে উস্তাদ জিগরের সঙ্গে খাজা আজিজুল হাসান মাজযুব রহ.-এর সাক্ষাত হয়। মাজযুব রহ.-এর কথাবার্তা শুনে জিগর সাহেব দারুণ প্রভাবিত হন যে, একজন ইংরেজি শিক্ষিত, উচ্চপদস্থ ব্যক্তি অথচ তাঁর হৃদয়পাতালে ইশকে ইলাহীর ঝড় চলছে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি হযরত মাজযুবকে মজা করে জিজ্ঞেস করেন, জনাব! আপনার 'টার' কীভাবে 'মিস' হয়ে গেল?' অর্থাৎ মিস্টারের 'টার' কিভাবে মিস হল?
হযরত মাজযুব রহ. উত্তর দিলেন, হাকীমুল উম্মত থানভী রহ.-এর আলোকিত দৃষ্টির উসিলায় আমার মিস্টারের 'টার' পড়ে গেছে।
উস্তাদ জিগর বললেন, আচ্ছা, খুব ভালো।
মাজযুব রহ. বললেন, আপনি যদি হাকীমুল উম্মতের সাথে সাক্ষাৎ করতে চান তাহলে আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
উস্তাদ জিগর উত্তর দিলেন, আমি রাজি আছি তবে সেখানে গিয়েও আমি পান করব। কারণ পান করা ছাড়া তো এক মুহূর্তও আমার চলে না।
যাই হোক হযরত মাজযুব রহ. বিষয়টি থানভী রহ.-এর কাছে উত্থাপন করলেন। থানভী রহ. উত্তর দিলেন, খানকাহ তো সকলের জন্য। সুতরাং এখানে পান করার প্রশ্নই ওঠে না। তবে আমি জিগর সাহেবকে নিজের মেহমান হিসেবে রাখতে পারি। তিনি সেখানে একা থাকবেন। তারপর তাঁর যা করার ইচ্ছা করবেন, এতে আমি কী করতে পারি।
অবশেষে হযরত মাজযুব উস্তাদ জিগরকে থানভী রহ.-এর দরবারে একদিন নিয়ে গেলেন। একজন কামিল অলির অল্প কিছুক্ষণের সোহবতে উস্তাদ জিগরের হৃদয়জগত পাল্টে গেল। শেষ পর্যন্ত তিনি তো পান করলেনই না, বরং থানভী রহ.-কে দিয়ে নিজের জন্য তিনটি দোয়া করালেন। প্রথম দোয়া- আমি মদপান ছেড়ে দিলাম। দোয়া করবেন যেন মদ ছাড়তে পারি। দ্বিতীয় দোয়া- সুন্নাতে-রাসূল ﷺ দাড়ি দ্বারা আমি আমার চেহারা সজ্জিত করব। দোয়া করবেন। তৃতীয় দোয়া- আমি হজ্জ করব। দোয়া করবেন। তারপর উস্তাদ জিগর মুরাদাবাদী থানভী রহ.-এর দরবার থেকে চলে আসলেন। মানুষ তাঁর জীবনের এই পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হল। তাঁকে দেখার জন্য লোকজন আসত। তখন উস্তাদ জিগর নিজের সম্পর্কে একটি ছন্দ তৈরি করেছিলেন—
“চলো একটু দেখে আসি তামাশা জিগরের। শুনলাম, বনেছে মুসলিম ওই কাফের।”
মদপান পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কারণে উস্তাদ জিগর খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তাররা পরামর্শ দিল, একবারে না ছেড়ে ধীরে ধীরে ছাড়লে ভালো হত। তিনি উত্তর দিলেন, ছেড়েছি তো ছেড়েছি। নিয়ত পাল্টাবো না- ইনশাআল্লাহ। যদি মৃত্যু এসে যায় তবে তো আল্লাহ চাহে তো তাওবা কবুল হয়ে যাবে। আখেরাত সুন্দর হয়ে যাবে।
এভাবে উস্তাদ জিগরের জীবনের মোড় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ঘুরে গেল। এটা কেন হয়েছিল? একজন আল্লাহর অলির সঙ্গে আন্তরিক বন্ধন তৈরির উসিলাতেই হয়েছিল।