📘 গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ৭০ টি আমল ও কৌশল 📄 ৬৫. পাঁচটা কথা গ্রহণ করলে গুনাহ ক্ষতি করতে পারবে না

📄 ৬৫. পাঁচটা কথা গ্রহণ করলে গুনাহ ক্ষতি করতে পারবে না


এক ব্যক্তি ইবরাহীম ইবনু আদহামের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আবু ইসহাক! আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি। আমাকে এমন কিছু বলুন; যা শুনেই আমার অন্তরে দাগ টেনে দিবে আর আমি গুনাহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব।
তিনি বললেন, যদি তুমি পাঁচটা কথা গ্রহণ করতে ও মানতে পার, তবে কখনও গুনাহ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না আর দুনিয়ার ভোগবিলাস তোমাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করতে সক্ষম হবে না।
লোকটি বলল, আবু ইসহাক! কী সেই পাঁচ কথা? তিনি বললেন, প্রথম কথা হল, তুমি আল্লাহর নাফরমানি করতে চাইলে তাঁর রিজিক খাবে না।
লোকটি বলল, তাহলে কী খাব! পৃথিবীতে যত রিজিক সবি তো তাঁর। তিনি বললেন, এটা কেমন কথা! তুমি তাঁর রিজিক খেয়ে তাঁরই নাফরমানি করবে? এটা কী ভাল কথা?
লোকটি বলল, না, এটা ভাল কথা না। তিনি বললেন, দ্বিতীয় কথা হল, তুমি তাঁর নাফরমানি করতে চাইলে তাঁর জমিন থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর। তাঁর জমিনে নয়।
লোকটি বলল, এটা তো প্রথমটার চেয়েও কঠিন। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু সবি তো তাঁর জমিন। তাহলে কোথায় যাব? তিনি বললেন, এটা কেমন কথা! তাঁর রিজিক খেয়ে, তাঁর জমিনে থেকে তাঁরই নাফরমানি করবে? এটা তো খুবই খারাপ কথা।
লোকটি বলল, তৃতীয় কথা বলুন।
তিনি বললেন, তাঁর রিজিক খেয়ে, তাঁর জমিনে থেকে তাঁরই নাফরমানি করতে চাইলে এমন স্থানে কর, যেখানে তিনি তোমাকে দেখতে পাবেন না। লোকটি বলল, ইবরাহীম! এটা কীভাবে সম্ভব?! তিনি তো সবকিছুই দেখেন। অনুপরিমাণ জিনিসও তাঁর জ্ঞানের ও দর্শনের বাইরে নয়।
তিনি বললেন, তাঁর রিজিক খেয়ে, তাঁর জমিনে থেকে তাঁকে দেখিয়ে তাঁরই নাফারমানি করবে? এটা তো ভাল কথা নয়।
লোকটি বলল, এটা অবশ্যই ভাল কথা নয়।
তিনি বললেন, এবার চতুর্থ কথা শুনো। আজরাইল তোমার জান কবজ করতে আসলে তাকে বলবে, আমাকে কিছুদিন সময় দেন, যাতে তাওবা ও কিছু ভাল আমল করে নিতে পারি। কী, এ সুযোগ আছে?
লোকটি বলল, না, এ সুযোগ থাকতেই পারে না।
তিনি বললেন, যখন তুমি জান যে, আজরাইলকে কিছুক্ষণ থামিয়ে তাওবা করতেও পারবে না, তাহলে নাজাত কীভাবে পাবে?
লোকটি বলল, এবার পঞ্চম কথা বলুন।
তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ফেরেশতারা তোমাকে টেনে- হেঁচড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার সময় কী জোর করে চলে আসতে পারবে? লোকটি বলল, এটা অসম্ভব। তারা আমাকে ছেড়েও দিবে না আর ওজর- আপত্তিও শুনবে না।
তিনি বললেন, তাহলে তোমার নাজাতের উপায় কী?
লোকটি বলল, ব্যস, এ ওয়াজ-নসীহতই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি খালেস নিয়তে আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম।
তারপর লোকটি ইবরাহীম ইবনু আদহামের সাহচর্য গ্রহণ করে বাকী জীবন আল্লাহর ঈবাদত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দেয়।

টিকাঃ
২২৫ আত-তাওওয়াবীন: ২৮৭-২৮৮

📘 গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ৭০ টি আমল ও কৌশল 📄 ৬৬. নিম্নের পাঁচটি গুনাহ থেকে বাঁচুন

📄 ৬৬. নিম্নের পাঁচটি গুনাহ থেকে বাঁচুন


মাশায়েখ বলেন, যদি কেউ পাঁচটি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিয়ে তার অলি বানিয়ে মৃত্যু দিবেন।

এক. কুরআন কারীম অশুদ্ধ পড়ার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জন্য যে সূরাগুলোর প্রয়োজন, সেগুলোকে শুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক, অন্যথায় সে গুনাহগার হয়।

দুই. চোখের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। (মা-বোনদের জন্য বেপর্দার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা)। কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। পুরুষদের জন্য কেবল পরনারীকে দেখা নয়; বরং যদি মাহরাম-নারীকে দেখলেও কামনা জাগে তখন তাদেরকেও দেখা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। বালকদেরকে দেখার ক্ষেত্রেও একই কথা। বরং কোনো পুরুষকে দেখলে যদি গুনাহের চিন্তা আসে তাহলে তাকেও দেখবে না।
একই বিষয় নারীদের ক্ষেত্রেও। তাদের জন্য কেবল পরপুরুষ নয়; বরং কোনো ছোট ছেলেকে দেখার পর যদি কুকল্পনা আসে তাকেও দেখা থেকে বিরত থাকবে। হযরত আবু হুরাইরা রাযি. ছোট ছেলেদের প্রতি স্থির দৃষ্টিতে তাকানো থেকে নিষেধ করতেন।

তিন. অন্তরের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। হুযায়ফা ইবনু কাতাদা রহ. বলেন— “সবচেয়ে বড় বিপদ হল অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া।”
ইবনুল জাওযী রহ. বলেন— “বহু ইবাদতগুযার লোক আছে, যারা বেশি বেশি নামায আদায় করে, রোজা রাখে, কিন্তু অন্তরের পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় না। ফলে নিজের অজান্তেই তাদের মনে অহংকার, লৌকিকতা, মুনাফিকী ও অজ্ঞতার অনুপ্রবেশ ঘটে যায়।”

চার. পুরুষদের টাখনুর নিচে কাপড়-পরার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “টাখনুর নিচে কাপড়ের যেটুকু থাকবে তা জাহান্নামে যাবে।”

পাঁচ. এক মুষ্ঠির কমে দাড়ি কাটা ছাটার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। শাফেঈ বিদ্বান আবু শামাহ মাকদেসী রহ. আফসোস করে বলেন— “কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে যারা তাদের দাড়ি মুণ্ডন করে সেটা অগ্নিপূজকদের ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে তা থেকে মারাত্মক। কারণ তারা দাড়ি কর্তন করে।”
আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন আমীন।

টিকাঃ
২২৬ মুকাদ্দামায়ে জাযারিয়া: ১১
২২৭ কামনার দৃষ্টিতে মাহরাম দেখা হারাম - কিফায়াতুল আখইয়ার: ১/৪৬০
২২৮ কাম-দৃষ্টিতে বালকের প্রতি তাকানো হারাম - হাশিয়া ইবনু আবিদীন: ১/৪০৭
২২৯ তালবীসে ইবলীস: ৩৪৬
২৩০ সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৯/২৮৪
২৩১ ইবনুল জাওযী, আত-তাবসিরাহ: ২/২০৮
২৩২ সুনান নাসাঈ: ৫৩৩০
২৩৩ ফাতহুল বারী: ১০/৩৫১

📘 গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ৭০ টি আমল ও কৌশল 📄 ৬৭. তিনটি বড় গুনাহ থেকে বাঁচুন

📄 ৬৭. তিনটি বড় গুনাহ থেকে বাঁচুন


কোনো কোনো মাশায়েখ বলেন, তিনটি বড় গুনাহ এমন রয়েছে, যদি আল্লাহর কোনো বান্দা সতর্ক হয়ে সেগুলো থেকে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে তার জন্য অন্য সকল গুনাহ হতে বেঁচে থাকা সহজ হবে। গুনাহ তিনটি এই-

এক. বদজবানী অর্থাৎ কুকথা। প্রখ্যাত তাবিয়ী ইউনুস ইবনু উবাইদ রহ. বলেন— “মানুষের দুটি বিষয় ঠিক হয়ে গেলে বাকি সব ঠিক হয়ে যায়। ১. নামায ২. জবান।”

দুই. বদনেগাহী অর্থাৎ কুদৃষ্টি। এক ব্যক্তি যখন হাসান বসরী রহ.-কে বলল, অনারব নারীরা তাদের বক্ষ ও মাথাকে খোলা রাখে, তখন তিনি বললেন— “তোমার চোখ ফিরিয়ে রেখো।”
ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া আলাইহিসসালামকে জিজ্ঞেস করা হল, ব্যভিচারের শুরুটা কিভাবে হয়? তিনি বললেন— “চোখ ও কামনা থেকে।”

তিন. বদগুমানী অর্থাৎ কুধারণা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কারণ ধারণা ভিত্তিক কথাই হল সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।”

টিকাঃ
২৩৪ হিলয়াতুল আউলিয়া: ৩/১৫
২৩৫ সহীহ বুখারী, পরিচ্ছেদ ৭৯/২
২৩৬ ইতহাফুস সাদাহ: ৭/৪৩৩
২৩৭ বুখারী: ৪৮৪৯, ৫১৪৩

📘 গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ৭০ টি আমল ও কৌশল 📄 ৭০. নিম্নোক্ত দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়ুন

📄 ৭০. নিম্নোক্ত দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়ুন


এক. “হে আমাদের রব! আপনি হেদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।”

দুই. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ পর্যাপ্ত পরিমাণে দোয়া করতেন— “হে আল্লাহ! আপনার কাছে সুস্থতা, গুনাহমুক্ত জীবন, আমানতদারিতা, উত্তম চরিত্র ও তাকদিরের উপর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করছি।”

তিন. “হে আল্লাহ! আপনার প্রতি এমন ভীতি আমাদেরকে দান করুন, যা আমাদের মাঝে এবং আমাদের গুনাহের মাঝে প্রতিবন্ধক হবে এবং এমন আনুগত্য দান করুন, যা আমাদেরকে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছাবে।”

চার. শাকল ইবন হুমায়দ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী এর কাছে এসে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাকে পানাহ চাওয়ার একটি দোয়া শিখিয়ে দিন যদ্বারা আমি পানাহ চাইব। তিনি তখন আমার হাত ধরে বললেন, বলো— “হে আল্লাহ! আমি পানাহ চাই আপনার কাছে আমার কানের অনিষ্ট থেকে, চোখের অনিষ্ট থেকে, জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, আমার হৃদয়ের অনিষ্ট থেকে এবং বীর্যের অনিষ্ট থেকে।”

পাঁচ. আবদুল্লাহ ইবনু ওমর রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অন্যতম দোয়া ছিল— “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার নেয়ামতের বিলুপ্তি, আপনার অনুকম্পার পরিবর্তন, আকস্মিক শাস্তি এবং আপনার সমস্ত ক্রোধ থেকে।”

ছয়. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ দোয়া করতেন— “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়াত, তাকওয়া, সচ্চরিত্রতা ও প্রাচুর্য্যতার প্রার্থনা করছি।”

সাত. “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার অন্তর পরিষ্কার করুন এবং আমার চরিত্র রক্ষা করুন।”

আট. “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে গর্হিত চরিত্র, গর্হিত কাজ ও কুপ্রবৃত্তি হতে আশ্রয় চাই।”

নয়. শাহর ইবন হাওশাব রহ. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি উম্মু সালামা রাযি.-কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন অধিকাংশ সময় তিনি কী দোয়া করতেন? তিনি বললেন, তাঁর অধিকাংশ দোয়া ছিল— “হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর আপনি আপনার দীনের ওপর সুদৃঢ় রাখুন।”

দশ. “কলবসমূহ পরিচালনাকারী হে আল্লাহ! আপনি আমাদের কলবকে আপনার আনুগত্যের ওপর স্থির রাখুন।”

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে আমল করার তাওফীক দান করুন আমীন।

টিকাঃ
২৪৪ সূরা আলি ইমরান: ০৮
২৪৫ বাহরুল ফাওয়াইদ: ১৫
২৪৬ তিরমিযী: ৩৫০২
২৪৭ তিরমিযী: ৩৪৯২
২৪৮ মুসলিম: ২৭৩৯
২৪৯ মুসলিম: ২৭৩৯
২৫০ আহমদ: ২২২১১
২৫১ তিরমিযী: ৩৫৯১
২৫২ তিরমিযী: ৩৫২২
২৫৩ মুসলিম: ৬৫০৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px