📄 ৩২. পুরো দিন নিজের আমলের ‘মুরাকাবা’ করুন
'মুশারাতা' তথা মনের সঙ্গে অঙ্গীকার করার পর নিজের কাজে বেরিয়ে যান। চাকরি করলে চাকরিতে, ব্যবসা করলে ব্যবসায়, দোকান করলে দোকানে চলে যান। সেখানে গিয়ে একটি কাজ করুন যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে একটু ভেবে দেখুন, এই কাজটি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কি-না। এই শব্দ যা উচ্চারণ করছি তা প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী কি-না। যদি প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী মনে হয় তাহলে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করুন। এটাকে ইমাম গাযালী রহ. বলেছেন 'মুরাকাবা'।
📄 ৩৩. শোয়ার আগে ‘মুহাসাবা’ করুন
মুশারাতা ও মুরাকাবা করার পর আরেকটি কাজ করতে হবে শোয়ার আগে, আর তা হলো 'মুহাসাবা' অর্থাৎ নফসকে বলবেন-
তুমি সারাদিন গুনাহ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। প্রতিটি কাজ শরিয়তমত করবে। হুকুকুল্লাহ তথা আল্লাহর হক ও হুকুকুল ইবাদ তথা বান্দার হক ঠিক মত আদায় করবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। এখন বলো, কোন কাজ তুমি প্রতিজ্ঞামত করেছ, আর কোন কাজ প্রতিজ্ঞামত করনি? সকালে যখন বাড়ি ত্যাগ করলে তখন অমুক লোককে কী বলেছ? চাকরির ক্ষেত্রে গিয়ে নিজ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছ? ব্যবসা কীভাবে পরিচালনা করেছ? হালালভাবে না হারাম পদ্ধতিতে? যত লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের হক কীভাবে আদায় করেছ? বিবি-বাচ্চার হক কীভাবে আদায় করেছ? ইমাম গাযালী রহ. বলেন, এভাবে যাবতীয় কাজের হিসাব নেয়াকে 'মুহাসাবা' বলা হয়।
'মুহাসাবা'র ফলাফল যদি এই হয় যে, 'সকালের প্রতিজ্ঞায় আপনি সফল' তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন। শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তাআলা তা বৃদ্ধি করে দেন।
কিন্তু 'মুহাসাবা'র ফলাফল যদি এই দাঁড়ায় যে, অমুক স্থানে প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী কাজ করেছেন, অমুক সময় প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছেন, পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন এবং স্বীয় কৃত প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারেননি, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাওবা করুন, বলুন, হে আল্লাহ! আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কিন্তু শয়তানের প্ররাচনায়, প্রবৃত্তির তাড়নায় প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারিনি। হে মাবুদ! আমি আপনার কাছে তাওবা করছি এবং ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি আমার তাওবা কবুল করে আমার পাপ মাফ করে দিন। ভবিষ্যতে আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন।
📄 ৬৫. পাঁচটা কথা গ্রহণ করলে গুনাহ ক্ষতি করতে পারবে না
এক ব্যক্তি ইবরাহীম ইবনু আদহামের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আবু ইসহাক! আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি। আমাকে এমন কিছু বলুন; যা শুনেই আমার অন্তরে দাগ টেনে দিবে আর আমি গুনাহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব।
তিনি বললেন, যদি তুমি পাঁচটা কথা গ্রহণ করতে ও মানতে পার, তবে কখনও গুনাহ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না আর দুনিয়ার ভোগবিলাস তোমাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করতে সক্ষম হবে না।
লোকটি বলল, আবু ইসহাক! কী সেই পাঁচ কথা? তিনি বললেন, প্রথম কথা হল, তুমি আল্লাহর নাফরমানি করতে চাইলে তাঁর রিজিক খাবে না।
লোকটি বলল, তাহলে কী খাব! পৃথিবীতে যত রিজিক সবি তো তাঁর। তিনি বললেন, এটা কেমন কথা! তুমি তাঁর রিজিক খেয়ে তাঁরই নাফরমানি করবে? এটা কী ভাল কথা?
লোকটি বলল, না, এটা ভাল কথা না। তিনি বললেন, দ্বিতীয় কথা হল, তুমি তাঁর নাফরমানি করতে চাইলে তাঁর জমিন থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর। তাঁর জমিনে নয়।
লোকটি বলল, এটা তো প্রথমটার চেয়েও কঠিন। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু সবি তো তাঁর জমিন। তাহলে কোথায় যাব? তিনি বললেন, এটা কেমন কথা! তাঁর রিজিক খেয়ে, তাঁর জমিনে থেকে তাঁরই নাফরমানি করবে? এটা তো খুবই খারাপ কথা।
লোকটি বলল, তৃতীয় কথা বলুন।
তিনি বললেন, তাঁর রিজিক খেয়ে, তাঁর জমিনে থেকে তাঁরই নাফরমানি করতে চাইলে এমন স্থানে কর, যেখানে তিনি তোমাকে দেখতে পাবেন না। লোকটি বলল, ইবরাহীম! এটা কীভাবে সম্ভব?! তিনি তো সবকিছুই দেখেন। অনুপরিমাণ জিনিসও তাঁর জ্ঞানের ও দর্শনের বাইরে নয়।
তিনি বললেন, তাঁর রিজিক খেয়ে, তাঁর জমিনে থেকে তাঁকে দেখিয়ে তাঁরই নাফারমানি করবে? এটা তো ভাল কথা নয়।
লোকটি বলল, এটা অবশ্যই ভাল কথা নয়।
তিনি বললেন, এবার চতুর্থ কথা শুনো। আজরাইল তোমার জান কবজ করতে আসলে তাকে বলবে, আমাকে কিছুদিন সময় দেন, যাতে তাওবা ও কিছু ভাল আমল করে নিতে পারি। কী, এ সুযোগ আছে?
লোকটি বলল, না, এ সুযোগ থাকতেই পারে না।
তিনি বললেন, যখন তুমি জান যে, আজরাইলকে কিছুক্ষণ থামিয়ে তাওবা করতেও পারবে না, তাহলে নাজাত কীভাবে পাবে?
লোকটি বলল, এবার পঞ্চম কথা বলুন।
তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ফেরেশতারা তোমাকে টেনে- হেঁচড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার সময় কী জোর করে চলে আসতে পারবে? লোকটি বলল, এটা অসম্ভব। তারা আমাকে ছেড়েও দিবে না আর ওজর- আপত্তিও শুনবে না।
তিনি বললেন, তাহলে তোমার নাজাতের উপায় কী?
লোকটি বলল, ব্যস, এ ওয়াজ-নসীহতই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি খালেস নিয়তে আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম।
তারপর লোকটি ইবরাহীম ইবনু আদহামের সাহচর্য গ্রহণ করে বাকী জীবন আল্লাহর ঈবাদত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দেয়।
টিকাঃ
২২৫ আত-তাওওয়াবীন: ২৮৭-২৮৮
📄 ৬৬. নিম্নের পাঁচটি গুনাহ থেকে বাঁচুন
মাশায়েখ বলেন, যদি কেউ পাঁচটি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিয়ে তার অলি বানিয়ে মৃত্যু দিবেন।
এক. কুরআন কারীম অশুদ্ধ পড়ার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জন্য যে সূরাগুলোর প্রয়োজন, সেগুলোকে শুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক, অন্যথায় সে গুনাহগার হয়।
দুই. চোখের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। (মা-বোনদের জন্য বেপর্দার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা)। কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। পুরুষদের জন্য কেবল পরনারীকে দেখা নয়; বরং যদি মাহরাম-নারীকে দেখলেও কামনা জাগে তখন তাদেরকেও দেখা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। বালকদেরকে দেখার ক্ষেত্রেও একই কথা। বরং কোনো পুরুষকে দেখলে যদি গুনাহের চিন্তা আসে তাহলে তাকেও দেখবে না।
একই বিষয় নারীদের ক্ষেত্রেও। তাদের জন্য কেবল পরপুরুষ নয়; বরং কোনো ছোট ছেলেকে দেখার পর যদি কুকল্পনা আসে তাকেও দেখা থেকে বিরত থাকবে। হযরত আবু হুরাইরা রাযি. ছোট ছেলেদের প্রতি স্থির দৃষ্টিতে তাকানো থেকে নিষেধ করতেন।
তিন. অন্তরের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। হুযায়ফা ইবনু কাতাদা রহ. বলেন— “সবচেয়ে বড় বিপদ হল অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া।”
ইবনুল জাওযী রহ. বলেন— “বহু ইবাদতগুযার লোক আছে, যারা বেশি বেশি নামায আদায় করে, রোজা রাখে, কিন্তু অন্তরের পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় না। ফলে নিজের অজান্তেই তাদের মনে অহংকার, লৌকিকতা, মুনাফিকী ও অজ্ঞতার অনুপ্রবেশ ঘটে যায়।”
চার. পুরুষদের টাখনুর নিচে কাপড়-পরার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “টাখনুর নিচে কাপড়ের যেটুকু থাকবে তা জাহান্নামে যাবে।”
পাঁচ. এক মুষ্ঠির কমে দাড়ি কাটা ছাটার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। শাফেঈ বিদ্বান আবু শামাহ মাকদেসী রহ. আফসোস করে বলেন— “কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে যারা তাদের দাড়ি মুণ্ডন করে সেটা অগ্নিপূজকদের ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে তা থেকে মারাত্মক। কারণ তারা দাড়ি কর্তন করে।”
আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন আমীন।
টিকাঃ
২২৬ মুকাদ্দামায়ে জাযারিয়া: ১১
২২৭ কামনার দৃষ্টিতে মাহরাম দেখা হারাম - কিফায়াতুল আখইয়ার: ১/৪৬০
২২৮ কাম-দৃষ্টিতে বালকের প্রতি তাকানো হারাম - হাশিয়া ইবনু আবিদীন: ১/৪০৭
২২৯ তালবীসে ইবলীস: ৩৪৬
২৩০ সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৯/২৮৪
২৩১ ইবনুল জাওযী, আত-তাবসিরাহ: ২/২০৮
২৩২ সুনান নাসাঈ: ৫৩৩০
২৩৩ ফাতহুল বারী: ১০/৩৫১