📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 জীবনের বিনিময়ে সতীত্ব রক্ষা

📄 জীবনের বিনিময়ে সতীত্ব রক্ষা


সতীত্ব সতী-সাধ্বী নারীর মূল্যবান সম্পদ। সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনে সে জীবন দিতেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। খাত্তাবী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আসমানী ইনসাফ'-এ একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ।

চল্লিশ বছর পূর্বে বাগদাদে এক কসাই ছিল। ফজরের আগেই সে দোকানে চলে যেত। সে ছাগল-মেষ যবেহ করে অন্ধকার থাকতেই বাড়ী ফিরে আসত। একদা ছাগল যবেহ করে বাড়ি ফিরছিল। তখনো রাতের আঁধার কাটেনি। সেদিন তার জামা-কাপড়ে অনেক রক্ত লেগেছিল। পথিমধ্যে সে এক গলির ভিতর থেকে একটা কাতর গোঙানি শুনতে পেল। সে গোঙানিটা লক্ষ্য করে দ্রুত এগিয়ে গেল। হঠাৎ সে একটা দেহের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। একজন আহত লোক পড়ে আছে মাটিতে। যখম গুরুতর। বাঁচাতে হ'লে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন। তখনো দেহ থেকে দরদর করে রক্ত বেরুচ্ছে। তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। ছুরিটা তখনো দেহে গেঁথে আছে। দ্রুত সে ছুরিটা ঝটকা টানে বের করে ফেলল। তারপর লোকটিকে কাঁধে তুলে নিল। কিন্তু লোকটি পথে তার কাঁধেই মারা গেল।

এর মধ্যেই লোকজন জড়ো হ'ল। কসাইয়ের হাতে ছুরি। সদ্য মৃত লোকটির গায়ে তাজা রক্ত। এসব দেখে লোকজনের নিশ্চিত ধারণা হ'ল যে, সেই ঘাতক। অগত্যা তাকে হন্তারক হিসাবে অভিযুক্ত হ'তে হ'ল এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হ'ল।

যখন তাকে 'ক্বিছাছ'-এর জায়গায় আনা হ'ল এবং মৃত্যু যখন অবধারিত, তখন সে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, 'হে উপস্থিত জনতা! আমি এই লোকটিকে মোটেই হত্যা করিনি। তবে আজ থেকে বিশ বছর আগে আমি অপর একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিলাম। আজ যদি আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তাহ'লে এই ব্যক্তির হত্যার কারণে নয়, বরং সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য হ'তে পারে'।

অতঃপর সে বিশ বছর আগের হত্যার ঘটনাটি বলা শুরু করল— আজ থেকে বিশ বছর আগে আমি ছিলাম এক টগবগে যুবক। নৌকা চালাতাম। লোকজনকে পারাপার করা ছিল আমার নিত্যদিনের কাজ। একদিন এক ধনবতী যুবতী তার মাকে নিয়ে আমার নৌকায় পার হ'ল। পরদিন আবার তাদেরকে পার করলাম। এভাবে প্রতিদিনই আমি তাদেরকে আমার নৌকায় পার করতাম।

এ পারাপারের সুবাদে যুবতীটির সাথে আমার আন্তরিকতা গড়ে উঠল। ধীরে ধীরে আমরা একে অপরকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেললাম। এক সময় আমি তার পিতার নিকট বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। কিন্তু আমার মত দরিদ্র এক মাঝির কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে তিনি অস্বীকার করলেন। এরপর আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সেও এদিকে আর আসত না। সম্ভবত মেয়েটির বাবা নিষেধ করে দিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভুলতে পারলাম না। এভাবে কেটে গেল ২/৩ বছর। একদিন আমি নৌকা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় এক মহিলা ছোট একটি মেয়েকে নিয়ে ঘাটে উপস্থিত হ'ল এবং আমাকে নদী পার করে দিতে অনুরোধ করল।

আমি তাকে নিয়ে রওয়ানা হ'লাম। মাঝ নদীতে এসে তাকালাম তার চেহারার দিকে। চিনতে দেরী হ'ল না যে, এ আমার সেই প্রেয়সী। এর পিতা আমাদের মাঝে বিচ্ছেদের পর্দা টেনে না দিলে সে আজ আমার স্ত্রী হতে পারত। আমি তাকে দেখে খুশি হ'লাম। বিভিন্ন মধুময় স্মৃতির ঝাঁপি একে একে তার সামনে মেলে ধরতে লাগলাম। সে খুব সতর্কতা ও বিনয়ের সাথে উত্তর দিচ্ছিল। পরক্ষণেই সে জানাল যে, সে বিবাহিতা এবং সঙ্গের শিশুটি তারই সন্তান। আমার মন বড় অস্থির হয়ে গেল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। একটা অশুভ ইচ্ছা আমাকে তাড়া করল। এক পর্যায়ে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্য আমি তার উপর চাপাচাপি শুরু করলাম। সে আমাকে মিনতি করে বলল, 'আল্লাহকে ভয় কর! আমার সর্বনাশ কর না'।

আমি তার কথা শুনলাম না। নিবৃত্ত হ'লাম না। তখন অসহায় নারীটি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে লাগল। তার শিশু কন্যাটি চিৎকার করতে লাগল। আমি তখন তার শিশু কন্যাটিকে শক্ত হাতে ধরে বললাম, তুমি আমার আহ্বানে সাড়া না দিলে তোমার সন্তানকে আমি পানিতে ডুবিয়ে মারব। তখন সে কেঁদে উঠল। হাত জোড় করে মিনতি জানাতে লাগল। কিন্তু আমি এমনই অমানুষে পরিণত হ'লাম যে, নারীর অশ্রু ও কান্না কিছুই আমার প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার চেয়ে মূল্যবান মনে হ'ল না। আমি নিষ্ঠুরভাবে শিশু কন্যাটির মাথা পানিতে চেপে ধরলাম। মরার উপক্রম হ'তেই আবার বের করে আনলাম। বললাম, জলদি রাযী হও, নইলে একটু পরই এর লাশ দেখবে। কিন্তু সে যুগপৎ সন্তানের মায়ায় এবং সতীত্বের ভালবাসায় বিলাপ করে কাঁদতে লাগল, যা আমার কাছে ছিল অর্থহীন, মূল্যহীন।

আমি আবার মেয়েটিকে পানিতে চেপে ধরলাম। শিশুটি হাত-পা নাড়ছিল। জীবনের বেলাভূমিতে আরো অনেক দিন হাঁটার স্বপ্নে দ্রুত হাত-পা ছুঁড়ছিল। কিন্তু ওর জানা ছিল না কেমন হিংস্রের হাতে সে পড়েছে। এবার আমি তার মাথাটা তুলে আনলাম না। ফল যা হবার তাই হ'ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটির প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।

আমি এবার তাকালাম তার দিকে। কিন্তু মেয়ের করুণ মৃত্যুও তাকে নরম করতে পারল না। সে তার সিদ্ধান্তে অনড়, অবিচল। তার দৃষ্টি যেন বলছিল 'সন্তান গেছে, প্রয়োজনে আমিও যাব। জান দেব। তবু মান দেব না'। কিন্তু আমার মনুষ্য সত্তা হারিয়ে গিয়েছিল। আমার মাঝে রাজত্ব করছিল শুধু আমার পশু-সত্তা। আমি ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো তার দিকে এগিয়ে গেলাম। চুলকে মুষ্টিবদ্ধ করলাম। তারপর তাকেও পানিতে চেপে ধরলাম। বললাম, ভেবে দেখ জলদি; জীবনের মায়া যদি কর তবে আবার ভাব'। সে ঘৃণাভরে না বলে দিল। আমিও তাকে চেপে ধরে রাখলাম। এক সময় আমার হাত ক্লান্ত হয়ে এল। সাথে সাথে তার দেহটাও নিথর হয়ে গেল। আমি ওকে পানিতে ফেলে দিয়ে ফিরে এলাম। খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানল না। মহান সেই সত্তা, যিনি বান্দাকে সুযোগ দেন। কিন্তু ছুঁড়ে ফেলে দেন না। এই করুণ কাহিনী শুনে উপস্থিত সবার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। এরপর তার শিরোশ্ছেদ করা হ'ল।

শিক্ষা : সতীত্ব নারীর অমূল্য সম্পদ। সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষায় ঐ সতী-সাধ্বী নারী নিজের মেয়েকে নিজের চোখের সামনে মরতে দেখেও আপোষ করল না। নিজের জীবন দিল। তবুও নিজের মান সে বিলিয়ে দিল না।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 ইনছাফপ্রিয় বাদশাহ

📄 ইনছাফপ্রিয় বাদশাহ


বাদশাহ মালিক শাহ সালজুকী রাজধানী নিশাপুরে অবস্থান করছিলেন। তখন মহিমান্বিত রামাযান মাসের বিদায় ঘণ্টা বাজার উপক্রম। রামাযান শেষে তিনি রাজ্যের সর্বত্র পরিদর্শনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। তার ইচ্ছা ছিল যে, তিনি ঈদের পরেই সফরে বের হবেন। সুতরাং ২৯শে রামাযানে তিনি তার মন্ত্রীবর্গ ও সাথীদের নিয়ে চাঁদ দেখতে বের হ'লেন। কিছু আমলা হৈচৈ শুরু করে দিল— 'চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে' বলে। যদিও বাদশাহ ও তার দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ চাঁদ দেখেননি। কিন্তু বাদশাহর অভিপ্রায় জেনে সবাই আগামী কাল ঈদের ঘোষণা দিল।

ইমামুল হারামাইন আবুল মা'আলী তদানীন্তন নিশাপুরের প্রধান মুফতী ও বিচারপতি ছিলেন। তিনি আগামীকালের ঈদের কথা জানতে পেরে সারা দেশে ঘোষণা করে দিলেন— আগামী কাল পর্যন্ত রামাযান মাস। সুতরাং যে রাসূলের সুন্নাতের অনুসরণ করতে চায় সে যেন অবশ্যই আগামীকাল ছিয়াম পালন করে।

ঈদের আনন্দে নিশাপুরবাসী যখন ফুর্তিতে মত্ত ছিল, ঠিক সেই সময় ইমামুল হারামাইনের ঘোষণায় তারা অভিভূত হ'ল। বাদশাহর নির্দেশমত আগামীকাল যদি ঈদ না হয়, তবে সেটা বাদশার জন্য অপমানজনক হবে। সুলতান বদমেযাজী ছিলেন না। তাই ইমামুল হারামাইনের ঘোষণায় দুঃখিত হওয়া সত্ত্বেও নির্দেশ দিলেন, তাকে সসম্মানে রাজদরবারে হাযির করা হোক। দুষ্ট প্রকৃতির মন্ত্রীরা বাদশাহকে ক্ষেপাবার জন্য বলল, যে ব্যক্তি বাদশাহর নির্দেশ অমান্য করে, সে কখনো সম্মানের পাত্র হ'তে পারে না।

বাদশাহ মুফতী ছাহেবের প্রতি রাগান্বিত হ'লেও ধৈর্যের সাথে রাগ দমন করে বললেন, আমি তাঁর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে চাই। প্রকৃত বিষয় না জেনে কোন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে অসম্মান করা মোটেও সমীচীন নয়। বিচারপতির নিকট শাহী পয়গাম পাঠানো হ'ল। বিচারপতি পয়গাম পেয়ে মনে করলেন, দরবারী পোশাক পরতে গেলে হয়তবা দেরী হয়ে যাবে। তাই তিনি যে পোশাকে ছিলেন ঐ পোশাকেই রাজদরবারে রওনা হ'লেন।

দরবারের প্রধান ফটকে তাকে বাধা দেওয়া হ'ল। কারণ সাধারণ পোশাকে রাজসভায় প্রবেশ নিষেধ। ঐদিকে হিংসুটে লোকেরা বাদশাকে উসকে দিয়ে বলল, এ ব্যক্তি আপনার হুকুম অমান্য করেছে। আবার সাধারণ পোশাকে রাজদরবারে এসে আপনার সাথে বেয়াদবী করেছে। বাদশাহর মেযাজ আরো বিগড়ে গেল। তবুও তিনি বিচারপতিকে শাহীমহলে আসার অনুমতি দিলেন। বিচারপতি ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে বললেন, এ অবস্থায় আপনি কেন আসলেন? দরবারী পোশাক পরেননি কেন?

এবার বিচারপতি আবুল মা'আলী নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিলেন, হে বাদশাহ! এখন আমি যে পোশাক পরে আছি, তাতেই আমি ছালাত আদায় করি, যা শরী'আতে জায়েয। সুতরাং যে পোশাকে আমি বিশ্বচরাচরের রাজাধিরাজ মহান আল্লাহ্র দরবারে হাযির হ'তে পারি, সে পোশাকে আপনার দরবারে আসা কি অন্যায়? তবে হ্যাঁ! নিয়ম অনুযায়ী এ পোশাক দরবারী নয় বলে এটা শিষ্টাচারের বহির্ভূত নয়। কারণ আমি ভেবেছি, দেরীতে আসলে আমার দ্বারা মুসলিম বাদশাহর নির্দেশ লঙ্ঘন না হয়ে যায় এবং ফেরেশতারা যেন আমার নাম নাফরমানদের খাতায় না লিখে নেন। এজন্য আমি যে অবস্থায় ছিলাম সে অবস্থায় চলে এসেছি।

বাদশা বললেন, যদি ইসলামী বাদশাহ্ আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য হয়, তাহ'লে আমার নির্দেশের বিপরীতে ঘোষণা দেওয়া হ'ল কেন? বিচারপতি বললেন, যেসব বিষয়ের নির্দেশ বাদশাহর উপর ন্যস্ত, সেসব ব্যাপারে বাদশাহ্ আনুগত্য করা আবশ্যক। কিন্তু যেসব বিষয় ফৎওয়ার উপর নির্ভরশীল, তা অবশ্যই পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের মানদণ্ডে হ'তে হবে। সুতরাং বাদশাহ হোক বা অন্য কেউ হোক আমার কাছে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল এবং শাহী নির্দেশ শারঈ বিধান অনুযায়ী হওয়া আবশ্যক ছিল।

প্রধান বিচারপতি মুফতী আবুল মা'আলীর বক্তব্য শুনে বাদশার রোষের অনল নিভে গেল। ইমাম ছাহেবের দৃঢ়চিত্ততা ও সাহসিকতার পরশে বাদশার হৃদয় মালঞ্চে খুশি ও প্রীতির ফুল ফুটল। তিনি ইমাম ছাহেবের সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, আমি যে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তা ভুল ছিল। প্রধান বিচারপতির ফায়ছালাই সঠিক।

শিক্ষা : ১. আলেম-ওলামা যদি সততা ও রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শের উপর অবিচল থাকেন, তাহ'লে সরকার তাকে সম্মান করতে বাধ্য হবে।
২. যিনি যত বড় দ্বায়িত্বশীল, তাকে তত বেশী ধৈর্যশীল হ'তে হয়। বিশেষ করে কোন রাষ্ট্রে ইনছাফ প্রতিষ্ঠা করতে হ'লে সরকারকে অবশ্যই ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। ধৈর্যহীন ব্যক্তি রাষ্ট্রের বা দলের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নয়।
৩. সরকারের সাথে সব সময় একদল ধূর্ত ও চাটুকার লোক থাকে, যারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নীতিবান মানুষের গলায় অপবাদের উন্মুক্ত কৃপাণ চালাতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।
৪. কোন বিষয়ে পরিষ্কারভাবে অবগত না হয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া আদৌ কোন আদর্শ শাসকের পরিচয় নয়।
৫. দেশের আলেম-ওলামা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী।
৬. সরকারের শরী'আত বিরোধী কোন নির্দেশ মানতে জনগণ বাধ্য নয়।

[মালিক শাহ সুলতান আরসালান সালজুকীর পুত্র ছিলেন। তিনি ১০৭৩ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। নিশাপুর এ রাজ্যের রাজধানী ছিল। বাগদাদ, হারামাইন শরীফাইন এমনকি বায়তুল মাকুদিসেও তার নামে খুৎবা পড়া হ'ত। তিনি ১৫ শাওয়াল ৪৮৮ হিজরী মোতাবেক ১৮ নভেম্বর ১১০৯ খৃষ্টাব্দে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমেই সালজুকী রাজত্বের অবসান ঘটে]

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 মুসলমানদের বিজয়ের গূঢ় রহস্য

📄 মুসলমানদের বিজয়ের গূঢ় রহস্য


প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের বিশ্বজয়ের মূল শক্তি ছিল আল্লাহ্র উপরে অটুট নির্ভরতা। তৎকালীন পরাশক্তি রোম সেনাপতি বারবার পরাজিত হয়ে ১৩ হিজরীতে ইয়ারমুকের পূর্বে আজনাদাইন যুদ্ধের এক পর্যায়ে তার এক দুঃসাহসী ও উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আরব খৃষ্টান গুপ্তচরকে মুসলিম বাহিনীর অবস্থা প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রেরণ করেন। গুপ্তচর মুসলিম সেনা শিবিরে কয়েকদিন অবস্থান শেষে ফিরে গিয়ে যে রিপোর্ট দেয়, তা ছিল নিম্নরূপ : هُمْ بِاللَّيْلِ رُهْبَانٌ وَبِالنَّهَارِ ফُرْسَانٌ وَلَوْ سَرَقَ ابْنُ مَلِكِهِمْ قَطَعُوْا يَدَهُ وَلَوْ زَنَى - رَجَمُوْهُ 'তারা রাতের বেলায় ইবাদতগুযার ও দিনের বেলায় ঘোড় সওয়ার। আল্লাহ্র কসম! যদি তাদের শাসকপুত্র চুরি করে, তাহ'লে তারা তার হাত কেটে দেয়। অথবা যদি যেনা করে, তবে তাকে প্রস্তরাঘাতে মাথা ফাটিয়ে হত্যা করে ফেলে'। একথা শুনে সেনাপতি ক্বায়কুলান বলে ওঠেন, وَالله لَئِنْ كُنْتَ صَادِقًا لَبَطْنُ الْأَرْضِ خَيْرٌ لَنَا مِنْ ظَهْرِهَا 'আল্লাহ্র কসম! যদি তোমার কথা সত্য হয়, তাহ'লে ভূগর্ভ আমাদের জন্য উত্তম হবে ভূপৃষ্ঠের চাইতে'। অর্থাৎ আমাদের মরে যাওয়াই উত্তম হবে।

উল্লেখ্য যে, যুদ্ধে উক্ত সেনাপতি নিহত হন এবং মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। পরবর্তীতে ১৬ হিজরীতে শাম থেকে নিরাশ হয়ে রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে ফিরে গিয়ে রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস তাঁর এক গুপ্তচরকে মুসলমানদের বিজয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, هُمْ فُرْسَانُ بِالنَّهَارِ وَرُهْبَانُ بِاللَّيْلِ، لَا يَأْكُلُونَ فِي ذِمَّتِهِمْ إِلَّا بِثَمَنٍ، وَلَا يَدْخُلُونَ إِلَّا بِسَلَامٍ ، يَقِفُوْনَ عَلَى مَنْ حَارَبُوهُ حَتَّى يَأْتُوا عَلَيْهِ. 'তারা দিনের বেলায় সওয়ার ও রাতের বেলায় ইবাদতগুযার। তারা তাদের যিম্মায় থাকা কোন বস্তু মূল্য না দিয়ে খায় না এবং শান্তির বার্তা ব্যতীত কোন স্থানে প্রবেশ করে না। যারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তারা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, যতক্ষণ না তারা পরাজিত হয়ে তাদের কাছে ফিরে আসে'। একথা শুনে রোম সম্রাট বলে উঠলেন, لَئِنْ كُنْتَ صَدَقْتَنِي لَيَمْلِكُنَّ مَوْضِعَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ 'যদি তুমি আমাকে সত্য বলে থাক, তাহ'লে ওরা অবশ্যই আমার দু'পায়ের নীচের এই সিংহাসনটারও মালিক হয়ে যাবে' (ইবনু জারীর, তারীখুত তাবারী ২/২১৫; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/৭, ৫৪)। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল এবং হযরত ওমর ও ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে রোমক ও পারসিক সাম্রাজ্য ইসলামী খেলাফতের অধীনস্ত হয়েছিল।

শিক্ষা: মুসলমানেরা বীরের জাতি। তারা যদি ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে, আল্লাহ্র উপর অবিচল আস্থা নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহ'লে পৃথিবীর কোন শক্তি তাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 ক্বিয়ামতের সামান্য দৃশ্য

📄 ক্বিয়ামতের সামান্য দৃশ্য


মানুষের জীবন-মৃত্যু আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। যার যতদিন হায়াত আছে সে পৃথিবীতে ততদিন বেঁচে থাকবে। আবার যার যেখানে যে অবস্থায় মৃত্যু লেখা আছে, তাকে সেখানে সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হবে। এ ব্যাপারে মানুষের কোন হাত নেই। কিন্তু পৃথিবীতে কোন কোন সময় মানুষের এমন অবস্থায় মৃত্যু ঘটে, যা বিবেকবান সকলের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে অনেকেই। নিজের অজান্তেই চোখের কোণা থেকে তপ্ত অশ্রুফোটা গড়িয়ে পড়ে অবিরত বর্ষণধারায়। ধৈর্য ধারণ করা অতি কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও সবকিছু মেনে নিতে হয়। কিন্তু হৃদয়ে যে গভীর ক্ষত হয় তা অমোচনীয় হয়েই থেকে যায়। কখনও ঐ ঘটনা স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠলে ডুকরে কেঁদে ওঠে মন। এমনই একটি বিষয় তুলে ধরতে নিম্নের ঘটনাটির অবতারণা।

আমরা সাগর কূলের মানুষ। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতা সহ্য করেই আমাদের বেঁচে থাকা। বিপদ মাথায় নিয়ে আমাদের পথ চলা। আমাদের বিপদ মুহূর্তের একটি হৃদয়বিদারক সত্য ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হ'ল।

আমি তখন যুবক ছিলাম। একদিন দেখি আকাশে খুব মেঘ। ভাবলাম ঝড় হ'তে পারে। পরিবারের সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিলাম। সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি সাগরের দিক থেকে বিরাট জলোচ্ছ্বাস ৩৫-৪০ ফুটের বেশী উঁচু হয়ে ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। তখন ভাবলাম বাঁচার আর কোন উপায় নেই। সবাইকে জোরে আঁকড়ে ধরেছিলাম। ৭-৮ বছরের এক ছেলে আমার কাঁধে ছিল।

পানি এতো জোরে এসে ধাক্কা দিল যে, ছেলেটা ছাড়া আর সবাই হারিয়ে গেল। তখন আমরা অনেক পানির নিচে। পানি আমাদেরকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। যখন পানির উপরে উঠলাম তখন কোথাও কোন ঠাঁই নেই। কোথাও কোন গাছ বা উঁচু কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। ছেলেটা তখনও কাঁধে। গলা ধরে আছে। ওকে বললাম, আব্বা! তুমি দু'হাতে আমার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধর, ছেড় না যেন! তাহ'লে ডুবে যাবে। ছেলেটি কাঁদছে আর বলছে, আব্বা তুমি আমাকে ফেলে দিও না। তাহ'লে আমি কিন্তু ডুবে যাব। তখন আবার ঢেউ চলছে ২-৩ ফুট উঁচু হয়ে। আমরা সেই ঢেউয়ে ডুবে যাচ্ছি। পানি খেয়ে আবার উপরে উঠছি। ছেলেকে কাঁধে নিয়ে আধা ঘণ্টার মত খুব কষ্টে সাঁতার কেটে বেঁচে আছি। কোথাও কোন ঠাঁই দেখা যায় না। তখন ভাবছি, আর বোধ হয় বাঁচতে পারব না। জীবন যায় যায় অবস্থা। মনে মনে ভাবছিলাম, ছেলেটা যদি গলা ছেড়ে ডুবে যেত তাহ'লে হয়তো নিজে বাঁচতাম। পরে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বলে দিলাম, তুই আমার গলা ছেড়ে দে। ছেলে তখন কেঁদে ফেলল। আর কাঁদতে কাঁদতেই বলল, আব্বা! তুমি আমাকে ছেড়ে দিও না, আমি ডুবে যাব। বার বার বলার পরেও যখন ছেলেটি গলা ছাড়ছে না, তখন আমি হাত ধরে টান দিই। ছেলে আরো জোরে কাঁদে এবং জোরে গলা জড়িয়ে ধরে। আমরা দু'জনের কেউ মরতে চাই না, আবার কেউ বাঁচতেও পারছি না। (এমন পরিস্থিতিতে আপনি আপনার সন্তানকে নিয়ে একটু কল্পনা করুন তো, কেমন লাগে!)। এটা ছিল মৃত্যুর পূর্বের ভয়াবহ অবস্থা। ছেলের কান্নাতে আমার আর মায়া হ'ল না। আমি ওর হাত টেনে কামড়িয়ে ধরলে সে আমার গলা ছেড়ে দেয়। সাথে সাথে ছেলেটি ডুবে যায়। পানির অনেক নীচে চলে যায়। তখন মনে মনে বললাম, বেঁচে গেছি। এর মাত্র ৫ মিনিট পর আমার পায়ে উঁচু গাছের ডাল লাগল। আমি তার উপরে দাঁড়ালাম। সাথে সাথে ছেলেটির হৃদয় বিদীর্ণকারী কান্নাজড়িত কথা কানে ভেসে আসল। চোখে বাঁধভাঙ্গা অশ্রু নেমে এলো। তখন ভাবছি এই তো ঠাঁই পেলাম, তবে কেন আমার ছেলেটাকে পানিতে ফেলে দিলাম! একি করলাম আমি? এইটুকু সময় আমি তাকে ধরে রাখতে পারলাম না! কত বড় ভুল হয়ে গেল! আমি সেখানে দাঁড়িয়ে জায়গাটাও বুঝতে পারছি। পানি সরে গেলে ওখানে লাশ পাওয়া যাবে। দেড়দিন পর পানি সরে গেল, আমি গাছে ছিলাম। একটু ক্ষুধাও লাগেনি, ঘুমও আসেনি। তারপর ছেলের লাশ সেখানে পেয়ে আরো কষ্ট হ'ল। যে কষ্ট আমি আজও ভুলতে পারছি না। আমার এখন কয়েকটা ছেলে-মেয়ে। বয়স ৬০ বছর। তবুও ঐ স্মৃতি আমাকে পাগল করে দেয়। তাই মাঝে মাঝে ভাবি, দুনিয়ায় এ অবস্থা হ'লে ক্বিয়ামতের দিন কি অবস্থা হবে? যেখানে কোন দিন মরণ হবে না। কেউ কাউকে সাহায্য করবে না।

শিক্ষা : দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষ নিজেকে বাঁচাতে যদি কলিজার টুকরা প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে ছুঁড়ে দিতে পারে, তাহ'লে ক্বিয়ামতের ভয়াবহতায় মানুষ কি করবে সেটা চিন্তার বিষয়। যে দিবসের বিবরণ দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, 'যেদিন ঐ বিকট ধ্বনি আসবে, সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার নিজের ভাই হ'তে, তার মাতা, তার পিতা, তার স্ত্রী ও তার সন্তান হ'তে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই একই চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে' (আবাসা ৩৩-৩৭)। অতএব সচেতন মানুষ মাত্রেরই ঐ জীবনের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা আবশ্যক। পার্থিব জীবনে সঠিক প্রস্তুতি তথা সৎ আমল করতে না পারলে পরকালীন জীবনে কোন আপনজন কাজে আসবে না। বরং সেদিন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। একান্ত আপনজনও পরিচয় দিবে না। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00