📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 দুঃস্বপ্নের কালো টাকা

📄 দুঃস্বপ্নের কালো টাকা


আমীন অনার্স-মাস্টার্স পাশ একজন টগবগে যুবক। অন্যান্য ছেলেদের মতো তাকে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়নি বেশী দিন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ছয় মাসের মধ্যে চাকরি জুটে গেল। খুব ভাল চাকরি। বড় অফিসার পদে। বেতনও বেশ ভাল। কিন্তু পরিশ্রমটা একটু বেশী। সেই সকাল ৮-টা থেকে রাত ৮-টা পর্যন্ত।

স্বতঃস্ফূর্ততা, কর্মচাঞ্চল্য ও সৃজনশীল চিন্তাধারা দিয়ে সে অল্প সময়ের মধ্যে অফিসের ছোট-বড় সবার মন জয় করে ফেলে। সে অফিসের কাজে খুবই যত্নশীল ও আন্তরিক। তার হাযিরা খাতায় কোনদিন লালকালির দাগ পড়েনি।

পানির স্রোতের মতো দিন বয়ে চলল। ইতিমধ্যে চাকরি জীবনে তার পঞ্চম বছরে পদার্পণ। সফলতার সাথে এ বছরটা চোখের পলকে কেটে গেল। ষষ্ঠ বছর চলছে। সেদিনটির কথা আজো তার ভাল স্মরণ আছে। ভুলে যাবে কি করে? দিনটি ছিল সোমবার। সকাল ৭-টায় ঘুম ভাঙ্গলো। জানালা দিয়ে বাইরে সোনাঝরা রোদ্দুর চারিদিকে ঝলমল করছে। দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে কোন এক অজানা আনন্দে নিজে নিজে হাসল আমীন। তারপর গোসলের জন্য বাথরুমে ঢুকে সাবান-শ্যাম্পু মেখে খুব ভাল করে গোসল করল। মিনিট দশেক ব্যয় হ'ল তাতে। এবার চিরুনি নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় চোখ পড়তেই ভীষণভাবে চমকে উঠল সে। হৃদপিণ্ডটায় যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ল। হাতুড়ী পেটানোর শব্দ যেন সে নিজের কানেও শুনতে পাচ্ছে। নিজের অজান্তেই আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে। আয়নার কাছ থেকে ২-৪ পা পিছিয়ে আসল সে। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। মনে হ'ল শরীরের শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। ভূত দেখার মত মনে হ'ল। সেকি! তাজ্জব ব্যাপার।

নির্বাক পাথরের মত কত সময় দাঁড়িয়ে ছিল সে তা বলতে পারবে না। নিজের মধ্যে শক্তি-সাহস সঞ্চয় করে এক পা দু'পা করে আয়নার খুব কাছে চলে গেল সে। হাত দিয়ে ভাল করে দেখতে লাগল। তাইতো নাক গেল কোথায়? হাওয়া হয়ে গেল নাকি? সে মনে করল, গত রাতে হয়তো কেউ তা চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে তো রক্তের দাগ থাকবে। তাও তো নেই। তাকে কত বীভৎস দেখাচ্ছে। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিল না।

এতক্ষণে নিজেকে সে আবিষ্কার করল। সমস্ত শরীরে শীতের বরফ জমা বিশাল পাহাড়। শরীর এত ভারী মনে হ'ল যে, পা তোলার ক্ষমতা নেই। অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগল। সোজা চলে গেল জানালার পাশে। রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ সবারই তো নাক ঠিক জায়গায় আছে। তাহ'লে তারটা গেল কোথায়?

মেঘাচ্ছন্ন মুখ-চোখে কষ্টের লোনা পানি নিয়ে আমীন একবার খাটের উপর বসছে আবার উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছে। নিজেকে তার খুব অসহায় মনে হ'ল। এমন ভয়ংকর ঘটনা দেখা তো দূরের কথা পত্র-পত্রিকায়ও তো কোনদিন পড়েনি সে। অস্থির ছটফটানিতে কেটে যাচ্ছে সময়। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। সকাল সাড়ে দশটা।

খাটের উপর নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। তাও অস্বস্তি লাগছে তার। হঠাৎ তার বাড়ীর কথা মনে পড়ল। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কত বন্ধু-বান্ধব ওদের সামনে সে এ অবস্থায় কিভাবে দাঁড়াবে? ঘামে সমস্ত শরীর ভিজে যাচ্ছে। হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠলো। কিছুই ভাবতে পারছে না। মাথা ঘুরছে। চিন্তায় কাতর হয়ে পড়ল আমীন।

গত দু'দিন আগে আমীনের কাছে আসাদ ছাহেব এসেছিলেন একটা যরূরী কাজে। তার সমস্ত কিছু শুনল। ঘাড় নেড়ে আসাদ ছাহেবকে বলল, ব্যাপারটা বড় গুরুতর। তিনি পাশে এসে হাত ধরে বললেন, ভাই আমাকে উদ্ধার করেন নইলে...? গম্ভীর কণ্ঠে বলল, পনের হাযার টাকা দিতে হবে। টাকার অংকটা শুনে তার চোখ ছানাবড়া। তিনি একটু কম দিতে চাইলেন। আমীন একেবারে না করল। অবশেষে কি আর করা? পুরো টাকাটাই দিয়ে গেলেন আসাদ ছাহেব। টাকাগুলি তাড়াতাড়ি নিয়ে আলমারির মধ্যে তালাবদ্ধ করল আমীন। মনের ভিতরে অনাবিল আনন্দ বয়ে যেতে লাগল তার।

সেদিনের কথা আজ শুয়ে চিন্তা করছে, এটা নিশ্চয়ই তার পাপের প্রতিফল। এমন নাজুক অবস্থায় মনুষ্য সমাজে বাস করা সম্ভব নয়। লজ্জায় মুষড়ে পড়ল সে। জীবন থেকে সে পালিয়ে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিল। আজ রাতই হবে তার জীবনের শেষ রাত। ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা ৬-টা। আবারও আয়নার কাছে গেল। সিদ্ধান্ত নিল আগে এই পাপের টাকাগুলি ফিরিয়ে দেবে, তারপর দুনিয়ার মায়াজাল ত্যাগ করবে।

তড়িৎ গতিতে উঠে হাত মুখ ধুয়ে প্যান্ট-শার্ট পরে নিল। পাপের টাকাগুলি আলমারি থেকে বের করে থলে ভর্তি করল। বড় একখানা রুমাল মুখ বরাবর চেপে ধরে বের হ'ল। একটি রিক্সা ডেকে সরাসরি আসাদ ছাহেবের বাসার দিকে ছুটল। গিয়ে টাকার ব্যাগটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে চলে আসল আমীন। আসাদ ছাহেব মূর্তির মত তাকিয়ে থাকল। কিছু বলতে গেল কিন্তু...? রিক্সায় আবার চেপে বসল আমীন। রিক্সা আপন গতিতে চলছে। মনের মধ্যে প্রশ্ন উদয় হ'ল সবাই তো বেশ সুখেই চলছে। কিন্তু আমার একি হ'ল? পৃথিবী ছেড়ে যাবার পূর্ব মুহূর্তটি চারিদিকে ভাল করে দেখে নিচ্ছে সে। আল্লাহ্র সৃষ্টি পৃথিবী কতই না সুন্দর! নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। নিজের জীবনের জন্য একটু দুঃখিত হ'ল।

সামনে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে তার বাসা। রুমালের ভিতরে শক্ত অনুভূতি টের পেল। ছলকে উঠলো বুকের রক্ত। চমকে উঠল সে। আবার কি হ'ল? ভয় পেল কিছুটা। ভয়ে চুপচাপ বসে আছে। বুকের ভিতরে কি যেন অনুভূতি জোরে জোরে লাফাচ্ছে। রিক্সা তার বাসার সামনে রাখল। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দ্বিগুণ দিল। ড্রাইভার তার দিকে করুণ নয়নে তাকিয়ে থাকল।

সোজা রুমে ঢুকে দরজার ছিটকিনী আটকে দিল আমীন। আয়নার সামনে গিয়ে ভয়ে ভয়ে রুমাল সরালো। দেখেই আনন্দে নেচে উঠল তার মন, চিৎকার দিয়ে উঠল সে। এবার নাকতো ঠিক জায়গায়ই আছে। সে নিখুঁতভাবে দেখতে লাগল। ঠিক জায়গায়ই তো নাক আছে। পরম সুখে চোখের কোণে অশ্রু এসে গেল। মনে পড়লো তার আজ সোমবার। বৃহস্পতি ও সোমবার তওবা কবুলের দিন। তাই সে তওবা করল। আর নয় পাপের পথে উপার্জিত টাকার লোভ। এখন থেকে হালাল পথে উপার্জন করব; সৎ ও সুন্দরভাবে বাঁচবো। এটা আমীনের দৃঢ় সংকল্প।

শিক্ষা: অন্যায় পথে যে অর্থ উপার্জন করে, সে অর্থবিত্তের মালিক হ'লেও মানসিকভাবে কখনই স্বস্তির মধ্যে থাকতে পারে না। সর্বদাই পাপের অনুভূতি তাকে তাড়া করে। অন্তর থেকে প্রশান্তি ও মনুষ্যত্বের ছোঁয়া লোপ পেয়ে যায়। এটা তার দুনিয়াবী শাস্তি। পরকালে তার জন্য অপেক্ষা করছে আরো মর্মান্তিক শাস্তি। তাই সময় থাকতেই তওবা করে নেয়া আবশ্যক।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 নাছিরুদ্দীন হোজা ও এক দুঃখবিলাসী

📄 নাছিরুদ্দীন হোজা ও এক দুঃখবিলাসী


একবার নাছিরুদ্দীন হোজা এক লোককে পথের ওপর খুব বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই লোকটি বলল, তার অনেক ধন-সম্পত্তি। খাওয়া-পরা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। কিন্তু তার কিছুই ভালো লাগে না। জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ঘর-বাড়ী, স্ত্রী-সন্তান কোনোকিছুই আর তাকে আকর্ষণ করে না। এ অস্থিরতা সইতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে সে।

হোজা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনলেন। হঠাৎ কিছু না বলেই পাশে রাখা লোকটির কাপড়ের ব্যাগটি নিয়ে দিলেন দৌড় এবং নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেলেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই লোকটিও পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু হোজাকে পায় কে? অনেকদূর যাওয়ার পর রাস্তার ওপর এক জায়গায় ব্যাগটি রেখে গাছের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগলেন হোজা। এদিকে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত, অবসন্ন, উদ্বিগ্ন লোকটি যখন এখানে এসে তার ব্যাগটি খুঁজে পেল, আনন্দে চিৎকার করে সে বলে উঠল, পেয়েছি! পেয়েছি! এইতো আমার ব্যাগ। বহুদিন সে এত খুশি হতে পারেনি। হোজা আড়াল থেকে হেসে বললেন, দুঃখবিলাসীদের এভাবেই শায়েস্তা করতে হয়।

শিক্ষা: لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ 'সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত প্রাচুর্য নয়। বরং অন্তরের প্রাচুর্যই প্রকৃত প্রাচুর্য' (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৭০)।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 অতি চালাকের গলায় দড়ি

📄 অতি চালাকের গলায় দড়ি


এ জগতে অনেক মানুষ আছে, যারা অন্যের ভাল দেখতে পারে না। অন্যের সুখে তাদের গা জ্বালা করে। ফলে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের চেষ্টা করে। পরের অকল্যাণ চিন্তা সদা তাদের মাথায় ঘুরপাক খায়। অনেক সময় অন্যের ক্ষতি সাধন করতে গিয়ে নিজেই সেই ক্ষতির শিকার হয়। এ সম্পর্কেই নিম্নের গল্পটির উপস্থাপনা।

অনেক দিন আগের কথা। এক গ্রামে বাস করত এক বুড়ি। বুড়ির ছিল এক নাতী। বুড়ি তার নাতিকে খুব ভালবাসত। বুড়ি একদিন তার মেয়ের বাড়ি বেড়াতে যায়। তার নাতী তার বাড়ি দেখাশুনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে শুরু করে সব কাজই করে থাকে। বুড়ি যেমন করে সবকিছু রেখে গিয়েছিল তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। পাঁচ-ছয়দিন পর বুড়ি বাড়ি আসে। তার নাতীর কাজ দেখে সে খুব খুশি হয়। নাতীকে আদর করে এবং তার জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্র দরবারে দো'আ করে।

একদিন বুড়ি বাড়ীর পাশে পাতা কুড়াতে গিয়ে দেখে একটি মেয়ে গাছের তলায় বসে কাঁদছে। বুড়ি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাঁদছ কেন? মেয়েটি বলল, আমার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই, আমি ইয়াতীম। কিন্তু মেয়েটি ছিল ভীষণ মিথ্যাবাদী। তার মা-বাবা সবাই ছিল, কিন্তু সে বাড়ি থেকে ঝগড়া করে এসে ঐ গাছতলায় বসে কাঁদছিল। বুড়িকে সে মিথ্যা কথা বলেছিল। মেয়েটিকে দেখে বুড়ির খুব দরদ হ'ল। সে মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ি গেল। পরে তার নাতীর সাথে মেয়েটির বিয়ে দিল। বিয়ের কিছুদিন পর মেয়েটি বুড়িকে সত্য কথা বলল এবং তার বাবার বাড়ি যাবার বায়না ধরল।

এরপর থেকে মেয়েটি মাঝে মাঝে তার বাবার বাড়ি যেত। তার এক ছোট ভাই তার কাছে আসা-যাওয়া করত। সে সংসারের জিনিসপত্র গোপনে বাবার বাড়ি নিয়ে যেত। কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারত না। এতে ধীরে ধীরে বুড়ির সংসার ধ্বংস হ'তে থাকে। বুড়ির সঞ্চয় সব ফুরাতে থাকে। ইতিমধ্যে তার নাতীর এক কন্যা হয়। বুড়ি খুব চিন্তিত। সে ভাবে এমনিতেই তো সব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, আবার এই শিশুর খাদ্য জুটবে কিভাবে? তার নাতী খুব কাজ করে, কিন্তু অভাব দূর হয় না? বুড়ির নাতবউ গোপনে সংসারের জিনিস তার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ায় তাদের সংসারের এ দৈন্যদশা। সে নিজের সংসার এমনকি তার কন্যার কথাও চিন্তা করত না। এদিকে তার মেয়েটি বড় হ'তে থাকে। সে অনেক চালাক-চতুর।

একদিন বুড়ি একটা কাপড় বাজার থেকে কিনে নিয়ে এনে ঘরে তুলে রাখে। বুড়ির নাতবউ তা দেখে ফেলে এবং মনে মনে ভাবে, তার ভাই আসলে তা বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু সেদিন তার ভাই আসেনি। তাই সে তার মেয়েকে বলল, মা তুমি তোমার নানার বাড়ি যাও এবং এই শাড়িটা তোমার নানীকে দিয়ে এস। মেয়ে বলল, এটাতো বড় মায়ের শাড়ি। মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নাতবউ শাড়িটি বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বুড়ি এসে দেখে তার কাপড়টি নেই। তখন সে অঝোরে কাঁদতে থাকে। মেয়েটি এসে জিজ্ঞেস করে, বড় মা তুমি কাঁদছ কেন? বুড়ি সব খুলে বলল। মেয়েটি বলে, আমাকে ক্ষমা কর। অতঃপর সে সবকথা বলে দেয়। এভাবে সংসারের বিভিন্ন জিনিস খোয়া যাওয়ার উৎস ও কারণ বুড়ির কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সে তার নাতী আসলে সব খুলে বলে। আড়ালে থেকে বুড়ির নাতবউ শুনে ফেলে। বুড়ির নাতী তখন তার বউকে মারধর করে, তাকে শাসন করে। তার এই কাজের জন্য যারপর নেই ভর্ৎসনা করে। এতে সে ক্ষেপে যায় এবং মনে মনে ভাবে বুড়িকে জব্দ করতে হবে।

একদিন বুড়ি তার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে যায়। বুড়ির নাতী কাজের সন্ধানে বাড়ী থেকে অনেক দূরে চলে যায়, ফেরে অনেক রাত করে। এসেই সে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে সুযোগ পেয়ে বুড়ির নাতবউ ঘরে বিরাট গর্ত খোড়ে। তাতে কাঁটা, কাঁচের টুকরা, গোবর, কাঁদা-পানি সহ অনেক কিছু দিয়ে রাখে। উপরে আলতোভাবে পাটি বিছিয়ে রাখে, যাতে সহজে বুঝা না যায় যে, নীচে গর্ত আছে।

বুড়ি এলে তার নাতবৌ তাকে খুব সমাদর করে, যা বুড়ি কোনদিন পায়নি। এতে বুড়ি অবাক হয়, খুশীও হয়। কিন্তু আসল মতলব বুঝতে পারে না। এবার বুড়িকে ঘরে নিয়ে যায়। তাকে ঐ স্থানে বসতে দেওয়া হয়। বুড়ি এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে। এদিকে নাতবৌ বুড়িকে ধাক্কা দিতে গিয়ে তাল সামলাতে না পেরে নিজেই ধপাস করে গর্তে পড়ে যায়। বুড়ি ভয় পেয়ে দৌড়ে বাইরে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে নাতবৌকে তুলতে যায়। কিন্তু ততক্ষণে সবশেষ। বুড়ি তাকে তুলতে পারে না। ইতিমধ্যে তার নাতী এসে পড়ে। ঘরে গিয়ে দেখে তার বউ গর্তে মরে পড়ে আছে। ঘরের মাঝে গর্ত দেখে সে বউয়ের কু-মতলব সব বুঝতে পারে।

শিক্ষা: অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়া হ'লে তাতে নিজেই পড়তে হয়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 জীবনের বিনিময়ে সতীত্ব রক্ষা

📄 জীবনের বিনিময়ে সতীত্ব রক্ষা


সতীত্ব সতী-সাধ্বী নারীর মূল্যবান সম্পদ। সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনে সে জীবন দিতেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। খাত্তাবী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আসমানী ইনসাফ'-এ একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ।

চল্লিশ বছর পূর্বে বাগদাদে এক কসাই ছিল। ফজরের আগেই সে দোকানে চলে যেত। সে ছাগল-মেষ যবেহ করে অন্ধকার থাকতেই বাড়ী ফিরে আসত। একদা ছাগল যবেহ করে বাড়ি ফিরছিল। তখনো রাতের আঁধার কাটেনি। সেদিন তার জামা-কাপড়ে অনেক রক্ত লেগেছিল। পথিমধ্যে সে এক গলির ভিতর থেকে একটা কাতর গোঙানি শুনতে পেল। সে গোঙানিটা লক্ষ্য করে দ্রুত এগিয়ে গেল। হঠাৎ সে একটা দেহের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। একজন আহত লোক পড়ে আছে মাটিতে। যখম গুরুতর। বাঁচাতে হ'লে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন। তখনো দেহ থেকে দরদর করে রক্ত বেরুচ্ছে। তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। ছুরিটা তখনো দেহে গেঁথে আছে। দ্রুত সে ছুরিটা ঝটকা টানে বের করে ফেলল। তারপর লোকটিকে কাঁধে তুলে নিল। কিন্তু লোকটি পথে তার কাঁধেই মারা গেল।

এর মধ্যেই লোকজন জড়ো হ'ল। কসাইয়ের হাতে ছুরি। সদ্য মৃত লোকটির গায়ে তাজা রক্ত। এসব দেখে লোকজনের নিশ্চিত ধারণা হ'ল যে, সেই ঘাতক। অগত্যা তাকে হন্তারক হিসাবে অভিযুক্ত হ'তে হ'ল এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হ'ল।

যখন তাকে 'ক্বিছাছ'-এর জায়গায় আনা হ'ল এবং মৃত্যু যখন অবধারিত, তখন সে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, 'হে উপস্থিত জনতা! আমি এই লোকটিকে মোটেই হত্যা করিনি। তবে আজ থেকে বিশ বছর আগে আমি অপর একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিলাম। আজ যদি আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তাহ'লে এই ব্যক্তির হত্যার কারণে নয়, বরং সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য হ'তে পারে'।

অতঃপর সে বিশ বছর আগের হত্যার ঘটনাটি বলা শুরু করল— আজ থেকে বিশ বছর আগে আমি ছিলাম এক টগবগে যুবক। নৌকা চালাতাম। লোকজনকে পারাপার করা ছিল আমার নিত্যদিনের কাজ। একদিন এক ধনবতী যুবতী তার মাকে নিয়ে আমার নৌকায় পার হ'ল। পরদিন আবার তাদেরকে পার করলাম। এভাবে প্রতিদিনই আমি তাদেরকে আমার নৌকায় পার করতাম।

এ পারাপারের সুবাদে যুবতীটির সাথে আমার আন্তরিকতা গড়ে উঠল। ধীরে ধীরে আমরা একে অপরকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেললাম। এক সময় আমি তার পিতার নিকট বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। কিন্তু আমার মত দরিদ্র এক মাঝির কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে তিনি অস্বীকার করলেন। এরপর আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সেও এদিকে আর আসত না। সম্ভবত মেয়েটির বাবা নিষেধ করে দিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভুলতে পারলাম না। এভাবে কেটে গেল ২/৩ বছর। একদিন আমি নৌকা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় এক মহিলা ছোট একটি মেয়েকে নিয়ে ঘাটে উপস্থিত হ'ল এবং আমাকে নদী পার করে দিতে অনুরোধ করল।

আমি তাকে নিয়ে রওয়ানা হ'লাম। মাঝ নদীতে এসে তাকালাম তার চেহারার দিকে। চিনতে দেরী হ'ল না যে, এ আমার সেই প্রেয়সী। এর পিতা আমাদের মাঝে বিচ্ছেদের পর্দা টেনে না দিলে সে আজ আমার স্ত্রী হতে পারত। আমি তাকে দেখে খুশি হ'লাম। বিভিন্ন মধুময় স্মৃতির ঝাঁপি একে একে তার সামনে মেলে ধরতে লাগলাম। সে খুব সতর্কতা ও বিনয়ের সাথে উত্তর দিচ্ছিল। পরক্ষণেই সে জানাল যে, সে বিবাহিতা এবং সঙ্গের শিশুটি তারই সন্তান। আমার মন বড় অস্থির হয়ে গেল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। একটা অশুভ ইচ্ছা আমাকে তাড়া করল। এক পর্যায়ে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্য আমি তার উপর চাপাচাপি শুরু করলাম। সে আমাকে মিনতি করে বলল, 'আল্লাহকে ভয় কর! আমার সর্বনাশ কর না'।

আমি তার কথা শুনলাম না। নিবৃত্ত হ'লাম না। তখন অসহায় নারীটি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে লাগল। তার শিশু কন্যাটি চিৎকার করতে লাগল। আমি তখন তার শিশু কন্যাটিকে শক্ত হাতে ধরে বললাম, তুমি আমার আহ্বানে সাড়া না দিলে তোমার সন্তানকে আমি পানিতে ডুবিয়ে মারব। তখন সে কেঁদে উঠল। হাত জোড় করে মিনতি জানাতে লাগল। কিন্তু আমি এমনই অমানুষে পরিণত হ'লাম যে, নারীর অশ্রু ও কান্না কিছুই আমার প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার চেয়ে মূল্যবান মনে হ'ল না। আমি নিষ্ঠুরভাবে শিশু কন্যাটির মাথা পানিতে চেপে ধরলাম। মরার উপক্রম হ'তেই আবার বের করে আনলাম। বললাম, জলদি রাযী হও, নইলে একটু পরই এর লাশ দেখবে। কিন্তু সে যুগপৎ সন্তানের মায়ায় এবং সতীত্বের ভালবাসায় বিলাপ করে কাঁদতে লাগল, যা আমার কাছে ছিল অর্থহীন, মূল্যহীন।

আমি আবার মেয়েটিকে পানিতে চেপে ধরলাম। শিশুটি হাত-পা নাড়ছিল। জীবনের বেলাভূমিতে আরো অনেক দিন হাঁটার স্বপ্নে দ্রুত হাত-পা ছুঁড়ছিল। কিন্তু ওর জানা ছিল না কেমন হিংস্রের হাতে সে পড়েছে। এবার আমি তার মাথাটা তুলে আনলাম না। ফল যা হবার তাই হ'ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটির প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।

আমি এবার তাকালাম তার দিকে। কিন্তু মেয়ের করুণ মৃত্যুও তাকে নরম করতে পারল না। সে তার সিদ্ধান্তে অনড়, অবিচল। তার দৃষ্টি যেন বলছিল 'সন্তান গেছে, প্রয়োজনে আমিও যাব। জান দেব। তবু মান দেব না'। কিন্তু আমার মনুষ্য সত্তা হারিয়ে গিয়েছিল। আমার মাঝে রাজত্ব করছিল শুধু আমার পশু-সত্তা। আমি ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো তার দিকে এগিয়ে গেলাম। চুলকে মুষ্টিবদ্ধ করলাম। তারপর তাকেও পানিতে চেপে ধরলাম। বললাম, ভেবে দেখ জলদি; জীবনের মায়া যদি কর তবে আবার ভাব'। সে ঘৃণাভরে না বলে দিল। আমিও তাকে চেপে ধরে রাখলাম। এক সময় আমার হাত ক্লান্ত হয়ে এল। সাথে সাথে তার দেহটাও নিথর হয়ে গেল। আমি ওকে পানিতে ফেলে দিয়ে ফিরে এলাম। খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানল না। মহান সেই সত্তা, যিনি বান্দাকে সুযোগ দেন। কিন্তু ছুঁড়ে ফেলে দেন না। এই করুণ কাহিনী শুনে উপস্থিত সবার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। এরপর তার শিরোশ্ছেদ করা হ'ল।

শিক্ষা : সতীত্ব নারীর অমূল্য সম্পদ। সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষায় ঐ সতী-সাধ্বী নারী নিজের মেয়েকে নিজের চোখের সামনে মরতে দেখেও আপোষ করল না। নিজের জীবন দিল। তবুও নিজের মান সে বিলিয়ে দিল না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00