📄 নিঃসঙ্গ
নারীর জীবনে আজন্ম লালিত স্বপ্ন থাকে একটা সুন্দর সংসার, স্বামীর ভালবাসা, সন্তানের মা ডাক প্রভৃতির। একজন নারী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্বামীর সংসারকে আগলে ধরে রাখে স্বামীর নিখাদ ভালবাসার জন্য। সন্তান গর্ভ ধারণে, প্রতিপালনে সীমাহীন কষ্ট করে সন্তানের 'মা' ডাক শোনার জন্য। স্বামীর প্রেমের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নারী তার সকল কষ্ট ভুলে যায় নিমিষে, সন্তানের মা ডাকে তার সকল বেদনা দূর হয়ে যায়। কলিজা জুড়িয়ে যায়। এসব থেকে যে বঞ্চিত হয়, সে ভাবে তার জীবনটা অর্থহীন। এ বিষয়ে নিম্নের গল্পটি।
সামিয়া উচ্চবিত্ত পরিবারের উচ্ছল তরুণী। সুন্দর চেহারা, সুঠাম দেহ, টানা দু'টি ভরাট চোখ, এক কথায় অপূর্ব চেহারা তার। পিতার বিশেষ স্নেহ-মমতায় আর দশটা মেয়ের চেয়ে একটু আলাদাভাবে সে বেড়ে উঠেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-ব্যবহারে অমায়িক একটি মেয়ে সে। উচ্ছলতা থাকলেও উচ্ছৃংখলতা তার মাঝে নেই। মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় সে অনন্য। কোন ছেলের মিষ্টি কথায় মুগ্ধ হয়ে সে কখনও কারো দিকে ঝুঁকে পড়েনি। নিজের সতীত্বের প্রতি সে ছিল সর্বদা সজাগ।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, এভাবে তার জীবনের ২৩টি বসন্ত পেরিয়ে যায়। একদিন বাবা মহা ধুমধামে আদরের মেয়েকে তুলে দেন একটি ছেলের হাতে। মেয়ের সুখের কথা ভেবে সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দেন। যে সুখের জন্য বাবা এতকিছু করলেন মেয়ের কপালে সে সুখ জুটল না। হাতের মেহেদীর রং মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তার স্বামী মারা যায়। সামিয়া দু'চোখে অন্ধকার দেখে। কি করবে সে? মেয়ের এই খবরে পিতা স্ট্রোক করেন। দশ দিন মারাত্মক অসুস্থ থাকার পর অবশেষে পরপারে পাড়ি জমান তিনি। সামিয়া দু'দিক দিয়েই অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। নারীর জন্য যে দু'টি নিরাপদ আশ্রয় থাকে পিতা ও স্বামী কোনটিই তার অবশিষ্ট রইল না। একসময় সে ফিরে আসে ভাইদের সংসারে। সন্তানহীনা সামিয়া মা ডাক শোনার জন্য ও একাকীত্ব ঘুচানোর জন্য একটি কন্যা সন্তান দত্তক নেয়। এই সন্তানের পিছনেই তার সময় কেটে যায়। জীবনের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে সে ঐ সন্তানকে মানুষ করার জন্য চেষ্টা করছে। মেয়েটিও পড়ালেখায় ভাল। দিন যত যায়, সামিয়ার চিন্তা তত বাড়ে। কারণ একদিন এই মেয়েও তাকে ছেড়ে চলে যাবে পরের বাড়ী। তখন সে আবার নিঃসঙ্গ একা হয়ে যাবে। ভাইদের সংসারের শত গঞ্জনা উপেক্ষা করেও সে কেবল মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে আছে। বিবাহের বহু প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন তার একটাই চিন্তা মেয়ের জীবনেও যেন তার মত পরিণতি না আসে।
দিন গড়িয়ে যায়। সামিয়ার মেয়ে আজ পরিণত বয়সে উপনীত। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তায় সে ব্যাকুল। সে ভাবে কেমন ছেলের ঘরে তার মেয়ে গিয়ে পড়বে? তার মেয়েটি সুখী হবে তো? এসব ভাবনার মধ্যে একদিন দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত মার্জিত স্বভাবের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলের হাতে সামিয়া মেয়েকে তুলে দেয়। মেয়ের জন্য যথাসাধ্য সাংসারিক জিনিসপত্র কিনে দেয়। অনেক ধনীর দুলালরা প্রস্তাব দিলেও দ্বীনদার না হওয়ায় সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে সামিয়া।
আজ দ্বীনদার ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পেরে সামিয়া আনন্দিত, ভারমুক্ত। সে ভাবে মেয়ে আমার দ্বীনী পরিবেশে থাকবে, ছালাত-ছিয়াম পালন করবে, আমার মরার পর তারা আমার জন্য দো'আ করবে- এটাই আমার পরম পাওয়া।
এসবের মাঝেও সামিয়া আজ একা, নিঃসঙ্গ সে। ভাই-ভাবী আছে, তাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। তবুও সে আজ একা, বড় একা। একা এই পৃথিবীতে এসেছিল, আবার তাকে একাই ফিরে যেতে হবে। এজগৎ সংসারে তার যেন আপন কেউ নেই।
শিক্ষা: আখেরাতের প্রথম মনযিল কবরের একাকীত্বের সময় কেউ সঙ্গী হবে না সৎ আমল ব্যতীত। অতএব এখুনি আমাদেরকে সাবধান হয়ে পরকালের পাথেয় সঞ্চয় করতে হবে। পার্থিব জীবনে সঠিক প্রস্তুতি তথা সৎ আমল করতে না পারলে পরকালীন জীবনে কোন আপনজন কাজে আসবে না। বরং সেদিন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। একান্ত আপনজনও পরিচয় দিবে না। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!
📄 দুঃস্বপ্নের কালো টাকা
আমীন অনার্স-মাস্টার্স পাশ একজন টগবগে যুবক। অন্যান্য ছেলেদের মতো তাকে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়নি বেশী দিন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ছয় মাসের মধ্যে চাকরি জুটে গেল। খুব ভাল চাকরি। বড় অফিসার পদে। বেতনও বেশ ভাল। কিন্তু পরিশ্রমটা একটু বেশী। সেই সকাল ৮-টা থেকে রাত ৮-টা পর্যন্ত।
স্বতঃস্ফূর্ততা, কর্মচাঞ্চল্য ও সৃজনশীল চিন্তাধারা দিয়ে সে অল্প সময়ের মধ্যে অফিসের ছোট-বড় সবার মন জয় করে ফেলে। সে অফিসের কাজে খুবই যত্নশীল ও আন্তরিক। তার হাযিরা খাতায় কোনদিন লালকালির দাগ পড়েনি।
পানির স্রোতের মতো দিন বয়ে চলল। ইতিমধ্যে চাকরি জীবনে তার পঞ্চম বছরে পদার্পণ। সফলতার সাথে এ বছরটা চোখের পলকে কেটে গেল। ষষ্ঠ বছর চলছে। সেদিনটির কথা আজো তার ভাল স্মরণ আছে। ভুলে যাবে কি করে? দিনটি ছিল সোমবার। সকাল ৭-টায় ঘুম ভাঙ্গলো। জানালা দিয়ে বাইরে সোনাঝরা রোদ্দুর চারিদিকে ঝলমল করছে। দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে কোন এক অজানা আনন্দে নিজে নিজে হাসল আমীন। তারপর গোসলের জন্য বাথরুমে ঢুকে সাবান-শ্যাম্পু মেখে খুব ভাল করে গোসল করল। মিনিট দশেক ব্যয় হ'ল তাতে। এবার চিরুনি নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় চোখ পড়তেই ভীষণভাবে চমকে উঠল সে। হৃদপিণ্ডটায় যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ল। হাতুড়ী পেটানোর শব্দ যেন সে নিজের কানেও শুনতে পাচ্ছে। নিজের অজান্তেই আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে। আয়নার কাছ থেকে ২-৪ পা পিছিয়ে আসল সে। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। মনে হ'ল শরীরের শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। ভূত দেখার মত মনে হ'ল। সেকি! তাজ্জব ব্যাপার।
নির্বাক পাথরের মত কত সময় দাঁড়িয়ে ছিল সে তা বলতে পারবে না। নিজের মধ্যে শক্তি-সাহস সঞ্চয় করে এক পা দু'পা করে আয়নার খুব কাছে চলে গেল সে। হাত দিয়ে ভাল করে দেখতে লাগল। তাইতো নাক গেল কোথায়? হাওয়া হয়ে গেল নাকি? সে মনে করল, গত রাতে হয়তো কেউ তা চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে তো রক্তের দাগ থাকবে। তাও তো নেই। তাকে কত বীভৎস দেখাচ্ছে। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিল না।
এতক্ষণে নিজেকে সে আবিষ্কার করল। সমস্ত শরীরে শীতের বরফ জমা বিশাল পাহাড়। শরীর এত ভারী মনে হ'ল যে, পা তোলার ক্ষমতা নেই। অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগল। সোজা চলে গেল জানালার পাশে। রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ সবারই তো নাক ঠিক জায়গায় আছে। তাহ'লে তারটা গেল কোথায়?
মেঘাচ্ছন্ন মুখ-চোখে কষ্টের লোনা পানি নিয়ে আমীন একবার খাটের উপর বসছে আবার উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছে। নিজেকে তার খুব অসহায় মনে হ'ল। এমন ভয়ংকর ঘটনা দেখা তো দূরের কথা পত্র-পত্রিকায়ও তো কোনদিন পড়েনি সে। অস্থির ছটফটানিতে কেটে যাচ্ছে সময়। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। সকাল সাড়ে দশটা।
খাটের উপর নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। তাও অস্বস্তি লাগছে তার। হঠাৎ তার বাড়ীর কথা মনে পড়ল। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কত বন্ধু-বান্ধব ওদের সামনে সে এ অবস্থায় কিভাবে দাঁড়াবে? ঘামে সমস্ত শরীর ভিজে যাচ্ছে। হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠলো। কিছুই ভাবতে পারছে না। মাথা ঘুরছে। চিন্তায় কাতর হয়ে পড়ল আমীন।
গত দু'দিন আগে আমীনের কাছে আসাদ ছাহেব এসেছিলেন একটা যরূরী কাজে। তার সমস্ত কিছু শুনল। ঘাড় নেড়ে আসাদ ছাহেবকে বলল, ব্যাপারটা বড় গুরুতর। তিনি পাশে এসে হাত ধরে বললেন, ভাই আমাকে উদ্ধার করেন নইলে...? গম্ভীর কণ্ঠে বলল, পনের হাযার টাকা দিতে হবে। টাকার অংকটা শুনে তার চোখ ছানাবড়া। তিনি একটু কম দিতে চাইলেন। আমীন একেবারে না করল। অবশেষে কি আর করা? পুরো টাকাটাই দিয়ে গেলেন আসাদ ছাহেব। টাকাগুলি তাড়াতাড়ি নিয়ে আলমারির মধ্যে তালাবদ্ধ করল আমীন। মনের ভিতরে অনাবিল আনন্দ বয়ে যেতে লাগল তার।
সেদিনের কথা আজ শুয়ে চিন্তা করছে, এটা নিশ্চয়ই তার পাপের প্রতিফল। এমন নাজুক অবস্থায় মনুষ্য সমাজে বাস করা সম্ভব নয়। লজ্জায় মুষড়ে পড়ল সে। জীবন থেকে সে পালিয়ে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিল। আজ রাতই হবে তার জীবনের শেষ রাত। ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা ৬-টা। আবারও আয়নার কাছে গেল। সিদ্ধান্ত নিল আগে এই পাপের টাকাগুলি ফিরিয়ে দেবে, তারপর দুনিয়ার মায়াজাল ত্যাগ করবে।
তড়িৎ গতিতে উঠে হাত মুখ ধুয়ে প্যান্ট-শার্ট পরে নিল। পাপের টাকাগুলি আলমারি থেকে বের করে থলে ভর্তি করল। বড় একখানা রুমাল মুখ বরাবর চেপে ধরে বের হ'ল। একটি রিক্সা ডেকে সরাসরি আসাদ ছাহেবের বাসার দিকে ছুটল। গিয়ে টাকার ব্যাগটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে চলে আসল আমীন। আসাদ ছাহেব মূর্তির মত তাকিয়ে থাকল। কিছু বলতে গেল কিন্তু...? রিক্সায় আবার চেপে বসল আমীন। রিক্সা আপন গতিতে চলছে। মনের মধ্যে প্রশ্ন উদয় হ'ল সবাই তো বেশ সুখেই চলছে। কিন্তু আমার একি হ'ল? পৃথিবী ছেড়ে যাবার পূর্ব মুহূর্তটি চারিদিকে ভাল করে দেখে নিচ্ছে সে। আল্লাহ্র সৃষ্টি পৃথিবী কতই না সুন্দর! নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। নিজের জীবনের জন্য একটু দুঃখিত হ'ল।
সামনে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে তার বাসা। রুমালের ভিতরে শক্ত অনুভূতি টের পেল। ছলকে উঠলো বুকের রক্ত। চমকে উঠল সে। আবার কি হ'ল? ভয় পেল কিছুটা। ভয়ে চুপচাপ বসে আছে। বুকের ভিতরে কি যেন অনুভূতি জোরে জোরে লাফাচ্ছে। রিক্সা তার বাসার সামনে রাখল। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দ্বিগুণ দিল। ড্রাইভার তার দিকে করুণ নয়নে তাকিয়ে থাকল।
সোজা রুমে ঢুকে দরজার ছিটকিনী আটকে দিল আমীন। আয়নার সামনে গিয়ে ভয়ে ভয়ে রুমাল সরালো। দেখেই আনন্দে নেচে উঠল তার মন, চিৎকার দিয়ে উঠল সে। এবার নাকতো ঠিক জায়গায়ই আছে। সে নিখুঁতভাবে দেখতে লাগল। ঠিক জায়গায়ই তো নাক আছে। পরম সুখে চোখের কোণে অশ্রু এসে গেল। মনে পড়লো তার আজ সোমবার। বৃহস্পতি ও সোমবার তওবা কবুলের দিন। তাই সে তওবা করল। আর নয় পাপের পথে উপার্জিত টাকার লোভ। এখন থেকে হালাল পথে উপার্জন করব; সৎ ও সুন্দরভাবে বাঁচবো। এটা আমীনের দৃঢ় সংকল্প।
শিক্ষা: অন্যায় পথে যে অর্থ উপার্জন করে, সে অর্থবিত্তের মালিক হ'লেও মানসিকভাবে কখনই স্বস্তির মধ্যে থাকতে পারে না। সর্বদাই পাপের অনুভূতি তাকে তাড়া করে। অন্তর থেকে প্রশান্তি ও মনুষ্যত্বের ছোঁয়া লোপ পেয়ে যায়। এটা তার দুনিয়াবী শাস্তি। পরকালে তার জন্য অপেক্ষা করছে আরো মর্মান্তিক শাস্তি। তাই সময় থাকতেই তওবা করে নেয়া আবশ্যক।
📄 নাছিরুদ্দীন হোজা ও এক দুঃখবিলাসী
একবার নাছিরুদ্দীন হোজা এক লোককে পথের ওপর খুব বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই লোকটি বলল, তার অনেক ধন-সম্পত্তি। খাওয়া-পরা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। কিন্তু তার কিছুই ভালো লাগে না। জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ঘর-বাড়ী, স্ত্রী-সন্তান কোনোকিছুই আর তাকে আকর্ষণ করে না। এ অস্থিরতা সইতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে সে।
হোজা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনলেন। হঠাৎ কিছু না বলেই পাশে রাখা লোকটির কাপড়ের ব্যাগটি নিয়ে দিলেন দৌড় এবং নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেলেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই লোকটিও পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু হোজাকে পায় কে? অনেকদূর যাওয়ার পর রাস্তার ওপর এক জায়গায় ব্যাগটি রেখে গাছের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগলেন হোজা। এদিকে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত, অবসন্ন, উদ্বিগ্ন লোকটি যখন এখানে এসে তার ব্যাগটি খুঁজে পেল, আনন্দে চিৎকার করে সে বলে উঠল, পেয়েছি! পেয়েছি! এইতো আমার ব্যাগ। বহুদিন সে এত খুশি হতে পারেনি। হোজা আড়াল থেকে হেসে বললেন, দুঃখবিলাসীদের এভাবেই শায়েস্তা করতে হয়।
শিক্ষা: لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ 'সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত প্রাচুর্য নয়। বরং অন্তরের প্রাচুর্যই প্রকৃত প্রাচুর্য' (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৭০)।
📄 অতি চালাকের গলায় দড়ি
এ জগতে অনেক মানুষ আছে, যারা অন্যের ভাল দেখতে পারে না। অন্যের সুখে তাদের গা জ্বালা করে। ফলে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের চেষ্টা করে। পরের অকল্যাণ চিন্তা সদা তাদের মাথায় ঘুরপাক খায়। অনেক সময় অন্যের ক্ষতি সাধন করতে গিয়ে নিজেই সেই ক্ষতির শিকার হয়। এ সম্পর্কেই নিম্নের গল্পটির উপস্থাপনা।
অনেক দিন আগের কথা। এক গ্রামে বাস করত এক বুড়ি। বুড়ির ছিল এক নাতী। বুড়ি তার নাতিকে খুব ভালবাসত। বুড়ি একদিন তার মেয়ের বাড়ি বেড়াতে যায়। তার নাতী তার বাড়ি দেখাশুনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে শুরু করে সব কাজই করে থাকে। বুড়ি যেমন করে সবকিছু রেখে গিয়েছিল তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। পাঁচ-ছয়দিন পর বুড়ি বাড়ি আসে। তার নাতীর কাজ দেখে সে খুব খুশি হয়। নাতীকে আদর করে এবং তার জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্র দরবারে দো'আ করে।
একদিন বুড়ি বাড়ীর পাশে পাতা কুড়াতে গিয়ে দেখে একটি মেয়ে গাছের তলায় বসে কাঁদছে। বুড়ি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাঁদছ কেন? মেয়েটি বলল, আমার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই, আমি ইয়াতীম। কিন্তু মেয়েটি ছিল ভীষণ মিথ্যাবাদী। তার মা-বাবা সবাই ছিল, কিন্তু সে বাড়ি থেকে ঝগড়া করে এসে ঐ গাছতলায় বসে কাঁদছিল। বুড়িকে সে মিথ্যা কথা বলেছিল। মেয়েটিকে দেখে বুড়ির খুব দরদ হ'ল। সে মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ি গেল। পরে তার নাতীর সাথে মেয়েটির বিয়ে দিল। বিয়ের কিছুদিন পর মেয়েটি বুড়িকে সত্য কথা বলল এবং তার বাবার বাড়ি যাবার বায়না ধরল।
এরপর থেকে মেয়েটি মাঝে মাঝে তার বাবার বাড়ি যেত। তার এক ছোট ভাই তার কাছে আসা-যাওয়া করত। সে সংসারের জিনিসপত্র গোপনে বাবার বাড়ি নিয়ে যেত। কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারত না। এতে ধীরে ধীরে বুড়ির সংসার ধ্বংস হ'তে থাকে। বুড়ির সঞ্চয় সব ফুরাতে থাকে। ইতিমধ্যে তার নাতীর এক কন্যা হয়। বুড়ি খুব চিন্তিত। সে ভাবে এমনিতেই তো সব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, আবার এই শিশুর খাদ্য জুটবে কিভাবে? তার নাতী খুব কাজ করে, কিন্তু অভাব দূর হয় না? বুড়ির নাতবউ গোপনে সংসারের জিনিস তার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ায় তাদের সংসারের এ দৈন্যদশা। সে নিজের সংসার এমনকি তার কন্যার কথাও চিন্তা করত না। এদিকে তার মেয়েটি বড় হ'তে থাকে। সে অনেক চালাক-চতুর।
একদিন বুড়ি একটা কাপড় বাজার থেকে কিনে নিয়ে এনে ঘরে তুলে রাখে। বুড়ির নাতবউ তা দেখে ফেলে এবং মনে মনে ভাবে, তার ভাই আসলে তা বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু সেদিন তার ভাই আসেনি। তাই সে তার মেয়েকে বলল, মা তুমি তোমার নানার বাড়ি যাও এবং এই শাড়িটা তোমার নানীকে দিয়ে এস। মেয়ে বলল, এটাতো বড় মায়ের শাড়ি। মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নাতবউ শাড়িটি বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বুড়ি এসে দেখে তার কাপড়টি নেই। তখন সে অঝোরে কাঁদতে থাকে। মেয়েটি এসে জিজ্ঞেস করে, বড় মা তুমি কাঁদছ কেন? বুড়ি সব খুলে বলল। মেয়েটি বলে, আমাকে ক্ষমা কর। অতঃপর সে সবকথা বলে দেয়। এভাবে সংসারের বিভিন্ন জিনিস খোয়া যাওয়ার উৎস ও কারণ বুড়ির কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সে তার নাতী আসলে সব খুলে বলে। আড়ালে থেকে বুড়ির নাতবউ শুনে ফেলে। বুড়ির নাতী তখন তার বউকে মারধর করে, তাকে শাসন করে। তার এই কাজের জন্য যারপর নেই ভর্ৎসনা করে। এতে সে ক্ষেপে যায় এবং মনে মনে ভাবে বুড়িকে জব্দ করতে হবে।
একদিন বুড়ি তার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে যায়। বুড়ির নাতী কাজের সন্ধানে বাড়ী থেকে অনেক দূরে চলে যায়, ফেরে অনেক রাত করে। এসেই সে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে সুযোগ পেয়ে বুড়ির নাতবউ ঘরে বিরাট গর্ত খোড়ে। তাতে কাঁটা, কাঁচের টুকরা, গোবর, কাঁদা-পানি সহ অনেক কিছু দিয়ে রাখে। উপরে আলতোভাবে পাটি বিছিয়ে রাখে, যাতে সহজে বুঝা না যায় যে, নীচে গর্ত আছে।
বুড়ি এলে তার নাতবৌ তাকে খুব সমাদর করে, যা বুড়ি কোনদিন পায়নি। এতে বুড়ি অবাক হয়, খুশীও হয়। কিন্তু আসল মতলব বুঝতে পারে না। এবার বুড়িকে ঘরে নিয়ে যায়। তাকে ঐ স্থানে বসতে দেওয়া হয়। বুড়ি এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে। এদিকে নাতবৌ বুড়িকে ধাক্কা দিতে গিয়ে তাল সামলাতে না পেরে নিজেই ধপাস করে গর্তে পড়ে যায়। বুড়ি ভয় পেয়ে দৌড়ে বাইরে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে নাতবৌকে তুলতে যায়। কিন্তু ততক্ষণে সবশেষ। বুড়ি তাকে তুলতে পারে না। ইতিমধ্যে তার নাতী এসে পড়ে। ঘরে গিয়ে দেখে তার বউ গর্তে মরে পড়ে আছে। ঘরের মাঝে গর্ত দেখে সে বউয়ের কু-মতলব সব বুঝতে পারে।
শিক্ষা: অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়া হ'লে তাতে নিজেই পড়তে হয়।