📄 ঈমান হরণ
অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে লাবীব। বছর পনের হ'ল গ্রামের মায়া-মমতা ত্যাগ করে দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের জন্য তার বাইরে যাওয়া। গ্রামে কোন ভাল আলেম ছিল না, যার কাছ থেকে গ্রামবাসী দ্বীনী ইলম শিক্ষা করবে। এতদিন পরে লাবীব যোগ্য আলেম হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে এসেছে। গ্রামের লোকেরা এতে দারুণ খুশি।
আগামীকাল ২১শে ফেব্রুয়ারী, শহীদ দিবস। এটা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিদ্যালয়সমূহে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবে। তাই বিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা ফুল সংগ্রহে মেতে উঠেছে। বিভিন্ন প্রকার ফুল সংগ্রহ করে তারা পুষ্পাঞ্জলি তৈরী করছে। লাবীব এ দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল এবং মনে মনে ভাবল, আমিও এক সময় এমনটিই করতাম। এটা ভেবেই সে খুব মানসিক কষ্ট অনুভব করল। অতঃপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, হায়! এভাবেই রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে বিদ্যালয় সমূহের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের ঈমান হরণ করছেন। এরপর সে ঐ ছেলে-মেয়েদের নিকটে আসল এবং তাদেরকে ২১শে ফেব্রুয়ারীর করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বুঝাল। হাসান নামের একটি ছেলে ব্যতীত সবাই তার কথাকে উপেক্ষা করে চলে গেল।
পরদিন সকাল বেলা হাসান সিদ্ধান্ত নিল যে, সে ২১শে ফেব্রুয়ারী উদযাপন অনুষ্ঠানে যাবে না। কিন্তু বন্ধুদের চাপের মুখে অবশেষে তাকে যেতেই হ'ল। ছাত্র-ছাত্রীরা নগ্নপায়ে শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করল। তাদের পিছু পিছু হাসান জুতা পরে খালি হাতে নীরবে শহীদ মিনারে গেল। একজন শিক্ষক তাকে জুতা পরে শহীদ মিনারে আসতে দেখে দ্রুত তার কাছে এলেন। হাসানের ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে শহীদ মিনার থেকে নামালেন এবং একজন ছাত্রকে একটি লাঠি আনার হুকুম দিলেন। এরপর তাকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ না করেই বেদম প্রহার করলেন। আর বেয়াদব, অসভ্য, মূর্খ ইত্যাদি বলে গালি-গালাজ করলেন। শিক্ষকের বেধড়ক লাঠির আঘাতে হাসান অসুস্থ হয়ে পড়ল।
বন্ধুরা ধরে তাকে বাড়িতে নিয়ে এল। বাবা-মা ছেলের এ অবস্থা দেখে অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। হাসানকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আদ্যোপান্ত ঘটনা শুনে হাসানের বাবা তাকে নিয়ে লাবীবের নিকটে আসলেন এবং তাকে সবকিছু খুলে বললেন। গ্রামের কতিপয় গণ্যমান্য লোককে সাথে নিয়ে লাবীব ও হাসানের বাবা পরদিন স্কুলে গেলেন। যে শিক্ষক হাসানকে মেরেছিল লাবীব ঐ শিক্ষককে মারার কারণ জিজ্ঞেস করল। শিক্ষক বললেন, হাসান জুতা পরে শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের অপমান করেছে, এটিই তার অপরাধ। লাবীব বলল, বলুনতো পৃথিবীতে উত্তম জায়গা কোনটি, মসজিদ নাকি শহীদ মিনার? তিনি বললেন, মসজিদ। লাবীব বলল, মসজিদ উত্তম জায়গা হওয়া সত্ত্বেও পরিষ্কার জুতা পরে সেখানে ঢোকার ও ছালাত আদায়ের অনুমতি রয়েছে। আল্লাহ্ ঘর মসজিদে জুতা পরে প্রবেশ করলে অপমান করা হয় না, আর শহীদ মিনারে জুতা পরে উঠলে অপমান করা হয়? এই শিক্ষা আপনারা কোথা থেকে পেলেন? আপনারা ভাষা শহীদের জন্য ভক্তি গদগদ চিত্তে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে এসব করছেন, কিসে শহীদদের প্রকৃত মঙ্গল ও কল্যাণ হবে তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? ভাষা শহীদদের জন্য আপনারা কয়দিন দো'আ করেছেন? কয়দিন তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেছেন? কয়দিন তাদের নাজাতের জন্য আল্লাহ্র কাছে কেঁদেছেন। তাদের জন্য কয় টাকা নিজে ছাদাক্বা করেছেন? এসব না করে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে, নীরবতা পালন করে নিজে যেমন শিরক করছেন, তেমনি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে শিরক করাচ্ছেন। এভাবে আপনারা প্রতিনিয়ত ছাত্র-ছাত্রীদের ঈমান বিনষ্ট করে চলেছেন। এজন্য অবশ্যই আপনাদেরকে আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। লাবীবের কথায় একজন অভিভাবক বললেন, বাবা তুমি হাছা কইতাছো? তাইলে আমি আর আমার পোলারে এইহানে পড়ামু না। ওরে মাদ্রাসায় দিমু। তার কথায় সবাই সমস্বরে বলল, হ আমরাও আমাদের পোলা-মাইয়ারে মাদ্রাসায় দিমু। হাসানের বাবা বললেন, আপনে ওর শিক্ষক না অইলে আইজ আমিও বুঝাইতাম আমারে কতখানি কষ্ট দিছেন।
লাবীব সবাইকে থামিয়ে বলল, পিতারাও সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকে শিরক শিক্ষা দিয়ে থাকেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেমনে বাবা? লাবীব বলল, আমরা সন্তানদের কপালে কাল টিপ দেই এই বিশ্বাসে যে, তার প্রতি বদনযর লাগবে না। সন্তানদের কোমরে কালো সুতা বেঁধে দেই। অনেকে তাতে বিভিন্ন কড়ি গেঁথে দেই। একটু কিছু হ'লেই তাদের গলায় তাবীয ঝুলিয়ে দেই। এসব করি রোগ প্রতিরোধ কিংবা তাদের মঙ্গলের জন্য। অথচ এতে তাদের কোন উপকার হয় না; বরং ক্ষতি হয়। কারণ এসব শিরকী কাজ। এসবের জন্য আমাদেরকেও আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। লাবীবের কথায় সবাই সিদ্ধান্ত নিল যে, ভবিষ্যতে তারা এসব করবে না। শিক্ষকও লজ্জিত হয়ে হাসানের বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল এবং বলল, না জেনে প্রশাসনের চাপে আমাদেরকে এসব করতে হয়। তবে যতদূর পারি আগামীতে এসব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। লাবীবকে বললেন, আপনি আমাদেরকে অনেক শিরকী বিষয়ে সতর্ক করলেন। এ ব্যাপারে আমরা নিজেরা সাবধান হব এবং অন্যদেরকেও সাবধান করার চেষ্টা করব। আপনার মত দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজন সমাজে আরো দরকার।
শিক্ষা: শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, নীরবতা পালন করা এসবই শিরক। এগুলি থেকে বিরত থাকতে হবে।
📄 একজন কৃষকের আত্মবিশ্বাস
একজন কৃষক কৃষিকাজের মাধ্যমে তার অভাব-অনটন দূর করতে না পেরে ছালাত আদায় কালে আল্লাহ্র কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে কিছু ধন-দৌলত তার চুলার কাছে পাবার আবেদন-নিবেদন করে। একদিন সে মাঠে চাষ করতে গেলে তার লাংগল একটি গাছের শিকড়ের সাথে বেঁধে যায়। সে তখন লাংগল বের করার জন্য শিকড় খুঁড়তে গিয়ে একটি কলস দেখতে পায়। কলসের মুখে ঢাকনা আঁটা। ঢাকনা খুললে সে কলস ভরা ধন-দৌলত দেখতে পায়। এতে সে মহা আনন্দিত হয়। কলসটি বাড়ী আনার সিদ্ধান্ত নেবার সাথে সাথে তার মনে পড়ে যায়, সে ধন-দৌলত পেতে চেয়েছিল তার চুলার কাছে, এখানে নয়। তাই সে ভাবল আল্লাহপাক সম্ভবতঃ তাকে পরীক্ষা করছেন। একারণে কলসটি পূর্বের অবস্থায় রেখে সে বাড়ী চলে আসে।
বাড়ী এসে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে তার স্ত্রীকে ঘটনাটি বলে। স্ত্রী তখন তাকে ঐ ধন-দৌলত আনতে অনুরোধ করে নিরাশ হয়। সে কিছুতেই ঐ ধন-দৌলত আনতে রাযী হ'ল না। তার বিশ্বাস, আল্লাহ তাকে ধন-দৌলত দিলে তার চুলার কাছেই দিবেন। স্ত্রী তাকে অনেক ভর্ৎসনা ও গালমন্দ করে। তাকে রাযী করাতে না পেরে তার এক প্রতিবেশীকে সম্পদের খবর বলে এবং কোথায় কিভাবে আছে তাও স্বামীর বর্ণনা মোতাবেক বলে দেয়।
প্রতিবেশী লোকটি উৎসাহে বুক বেঁধে কোদাল হাতে নির্দিষ্ট স্থানে ছুটে যায়। অল্প মেহনতেই সে কলসটি দেখতে পায়। কিন্তু কি আশ্চর্য! কলসে তো কোন ধন নেই, আছে শুধু কলস ভরা বিষধর সাপ। লোকটির রাগ হ'ল। সে মনে করল, কৃষকের স্ত্রী তাকে বিপদে ফেলার জন্য মিথ্যা কথা বলেছে। তাই এর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কলসের মুখটি ভালভাবে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে কলসটি বাড়ী নিয়ে এল। উদ্দেশ্য, রাতের অন্ধকারে সে কলসটি কৃষকের চুলার কাছে রেখে মুখটি খুলে দিবে। যাতে কৃষকের স্ত্রী চুলার কাছে গেলে তাকে সাপে দংশন করে।
রাত ভোর হ'ল। কৃষকের স্ত্রী রান্না-বান্না করার জন্য চুলার কাছে গেল। সে আশ্চর্য হয়ে দেখল, চুলার চার পাশে অনেক ধন-দৌলত রয়েছে। সে তার স্বামীকে ডেকে আনল। স্বামী বলল, আমার মনে এ বিশ্বাস ছিল। আল্লাহপাক আমাকে ধন-দৌলত দিলে আমার চুলার কাছেই দিবেন। আমি আল্লাহ্র কাছে সে প্রার্থনাই করেছিলাম। স্ত্রী স্বামীকে ভর্ৎসনা ও গালমন্দের জন্য তার নিকট ক্ষমা চাইল। এখন থেকে পরম সুখে স্বামী-স্ত্রীর দিন কাটতে লাগল।
শিক্ষা: নিজের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা নিবেদন করতে হবে। দেওয়ার মালিক তিনিই।
📄 নিঃসঙ্গ
নারীর জীবনে আজন্ম লালিত স্বপ্ন থাকে একটা সুন্দর সংসার, স্বামীর ভালবাসা, সন্তানের মা ডাক প্রভৃতির। একজন নারী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্বামীর সংসারকে আগলে ধরে রাখে স্বামীর নিখাদ ভালবাসার জন্য। সন্তান গর্ভ ধারণে, প্রতিপালনে সীমাহীন কষ্ট করে সন্তানের 'মা' ডাক শোনার জন্য। স্বামীর প্রেমের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নারী তার সকল কষ্ট ভুলে যায় নিমিষে, সন্তানের মা ডাকে তার সকল বেদনা দূর হয়ে যায়। কলিজা জুড়িয়ে যায়। এসব থেকে যে বঞ্চিত হয়, সে ভাবে তার জীবনটা অর্থহীন। এ বিষয়ে নিম্নের গল্পটি।
সামিয়া উচ্চবিত্ত পরিবারের উচ্ছল তরুণী। সুন্দর চেহারা, সুঠাম দেহ, টানা দু'টি ভরাট চোখ, এক কথায় অপূর্ব চেহারা তার। পিতার বিশেষ স্নেহ-মমতায় আর দশটা মেয়ের চেয়ে একটু আলাদাভাবে সে বেড়ে উঠেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-ব্যবহারে অমায়িক একটি মেয়ে সে। উচ্ছলতা থাকলেও উচ্ছৃংখলতা তার মাঝে নেই। মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় সে অনন্য। কোন ছেলের মিষ্টি কথায় মুগ্ধ হয়ে সে কখনও কারো দিকে ঝুঁকে পড়েনি। নিজের সতীত্বের প্রতি সে ছিল সর্বদা সজাগ।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, এভাবে তার জীবনের ২৩টি বসন্ত পেরিয়ে যায়। একদিন বাবা মহা ধুমধামে আদরের মেয়েকে তুলে দেন একটি ছেলের হাতে। মেয়ের সুখের কথা ভেবে সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দেন। যে সুখের জন্য বাবা এতকিছু করলেন মেয়ের কপালে সে সুখ জুটল না। হাতের মেহেদীর রং মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তার স্বামী মারা যায়। সামিয়া দু'চোখে অন্ধকার দেখে। কি করবে সে? মেয়ের এই খবরে পিতা স্ট্রোক করেন। দশ দিন মারাত্মক অসুস্থ থাকার পর অবশেষে পরপারে পাড়ি জমান তিনি। সামিয়া দু'দিক দিয়েই অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। নারীর জন্য যে দু'টি নিরাপদ আশ্রয় থাকে পিতা ও স্বামী কোনটিই তার অবশিষ্ট রইল না। একসময় সে ফিরে আসে ভাইদের সংসারে। সন্তানহীনা সামিয়া মা ডাক শোনার জন্য ও একাকীত্ব ঘুচানোর জন্য একটি কন্যা সন্তান দত্তক নেয়। এই সন্তানের পিছনেই তার সময় কেটে যায়। জীবনের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে সে ঐ সন্তানকে মানুষ করার জন্য চেষ্টা করছে। মেয়েটিও পড়ালেখায় ভাল। দিন যত যায়, সামিয়ার চিন্তা তত বাড়ে। কারণ একদিন এই মেয়েও তাকে ছেড়ে চলে যাবে পরের বাড়ী। তখন সে আবার নিঃসঙ্গ একা হয়ে যাবে। ভাইদের সংসারের শত গঞ্জনা উপেক্ষা করেও সে কেবল মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে আছে। বিবাহের বহু প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন তার একটাই চিন্তা মেয়ের জীবনেও যেন তার মত পরিণতি না আসে।
দিন গড়িয়ে যায়। সামিয়ার মেয়ে আজ পরিণত বয়সে উপনীত। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তায় সে ব্যাকুল। সে ভাবে কেমন ছেলের ঘরে তার মেয়ে গিয়ে পড়বে? তার মেয়েটি সুখী হবে তো? এসব ভাবনার মধ্যে একদিন দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত মার্জিত স্বভাবের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলের হাতে সামিয়া মেয়েকে তুলে দেয়। মেয়ের জন্য যথাসাধ্য সাংসারিক জিনিসপত্র কিনে দেয়। অনেক ধনীর দুলালরা প্রস্তাব দিলেও দ্বীনদার না হওয়ায় সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে সামিয়া।
আজ দ্বীনদার ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পেরে সামিয়া আনন্দিত, ভারমুক্ত। সে ভাবে মেয়ে আমার দ্বীনী পরিবেশে থাকবে, ছালাত-ছিয়াম পালন করবে, আমার মরার পর তারা আমার জন্য দো'আ করবে- এটাই আমার পরম পাওয়া।
এসবের মাঝেও সামিয়া আজ একা, নিঃসঙ্গ সে। ভাই-ভাবী আছে, তাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। তবুও সে আজ একা, বড় একা। একা এই পৃথিবীতে এসেছিল, আবার তাকে একাই ফিরে যেতে হবে। এজগৎ সংসারে তার যেন আপন কেউ নেই।
শিক্ষা: আখেরাতের প্রথম মনযিল কবরের একাকীত্বের সময় কেউ সঙ্গী হবে না সৎ আমল ব্যতীত। অতএব এখুনি আমাদেরকে সাবধান হয়ে পরকালের পাথেয় সঞ্চয় করতে হবে। পার্থিব জীবনে সঠিক প্রস্তুতি তথা সৎ আমল করতে না পারলে পরকালীন জীবনে কোন আপনজন কাজে আসবে না। বরং সেদিন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। একান্ত আপনজনও পরিচয় দিবে না। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!
📄 দুঃস্বপ্নের কালো টাকা
আমীন অনার্স-মাস্টার্স পাশ একজন টগবগে যুবক। অন্যান্য ছেলেদের মতো তাকে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়নি বেশী দিন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ছয় মাসের মধ্যে চাকরি জুটে গেল। খুব ভাল চাকরি। বড় অফিসার পদে। বেতনও বেশ ভাল। কিন্তু পরিশ্রমটা একটু বেশী। সেই সকাল ৮-টা থেকে রাত ৮-টা পর্যন্ত।
স্বতঃস্ফূর্ততা, কর্মচাঞ্চল্য ও সৃজনশীল চিন্তাধারা দিয়ে সে অল্প সময়ের মধ্যে অফিসের ছোট-বড় সবার মন জয় করে ফেলে। সে অফিসের কাজে খুবই যত্নশীল ও আন্তরিক। তার হাযিরা খাতায় কোনদিন লালকালির দাগ পড়েনি।
পানির স্রোতের মতো দিন বয়ে চলল। ইতিমধ্যে চাকরি জীবনে তার পঞ্চম বছরে পদার্পণ। সফলতার সাথে এ বছরটা চোখের পলকে কেটে গেল। ষষ্ঠ বছর চলছে। সেদিনটির কথা আজো তার ভাল স্মরণ আছে। ভুলে যাবে কি করে? দিনটি ছিল সোমবার। সকাল ৭-টায় ঘুম ভাঙ্গলো। জানালা দিয়ে বাইরে সোনাঝরা রোদ্দুর চারিদিকে ঝলমল করছে। দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে কোন এক অজানা আনন্দে নিজে নিজে হাসল আমীন। তারপর গোসলের জন্য বাথরুমে ঢুকে সাবান-শ্যাম্পু মেখে খুব ভাল করে গোসল করল। মিনিট দশেক ব্যয় হ'ল তাতে। এবার চিরুনি নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় চোখ পড়তেই ভীষণভাবে চমকে উঠল সে। হৃদপিণ্ডটায় যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ল। হাতুড়ী পেটানোর শব্দ যেন সে নিজের কানেও শুনতে পাচ্ছে। নিজের অজান্তেই আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে। আয়নার কাছ থেকে ২-৪ পা পিছিয়ে আসল সে। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। মনে হ'ল শরীরের শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। ভূত দেখার মত মনে হ'ল। সেকি! তাজ্জব ব্যাপার।
নির্বাক পাথরের মত কত সময় দাঁড়িয়ে ছিল সে তা বলতে পারবে না। নিজের মধ্যে শক্তি-সাহস সঞ্চয় করে এক পা দু'পা করে আয়নার খুব কাছে চলে গেল সে। হাত দিয়ে ভাল করে দেখতে লাগল। তাইতো নাক গেল কোথায়? হাওয়া হয়ে গেল নাকি? সে মনে করল, গত রাতে হয়তো কেউ তা চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে তো রক্তের দাগ থাকবে। তাও তো নেই। তাকে কত বীভৎস দেখাচ্ছে। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিল না।
এতক্ষণে নিজেকে সে আবিষ্কার করল। সমস্ত শরীরে শীতের বরফ জমা বিশাল পাহাড়। শরীর এত ভারী মনে হ'ল যে, পা তোলার ক্ষমতা নেই। অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগল। সোজা চলে গেল জানালার পাশে। রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ সবারই তো নাক ঠিক জায়গায় আছে। তাহ'লে তারটা গেল কোথায়?
মেঘাচ্ছন্ন মুখ-চোখে কষ্টের লোনা পানি নিয়ে আমীন একবার খাটের উপর বসছে আবার উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছে। নিজেকে তার খুব অসহায় মনে হ'ল। এমন ভয়ংকর ঘটনা দেখা তো দূরের কথা পত্র-পত্রিকায়ও তো কোনদিন পড়েনি সে। অস্থির ছটফটানিতে কেটে যাচ্ছে সময়। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। সকাল সাড়ে দশটা।
খাটের উপর নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। তাও অস্বস্তি লাগছে তার। হঠাৎ তার বাড়ীর কথা মনে পড়ল। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কত বন্ধু-বান্ধব ওদের সামনে সে এ অবস্থায় কিভাবে দাঁড়াবে? ঘামে সমস্ত শরীর ভিজে যাচ্ছে। হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠলো। কিছুই ভাবতে পারছে না। মাথা ঘুরছে। চিন্তায় কাতর হয়ে পড়ল আমীন।
গত দু'দিন আগে আমীনের কাছে আসাদ ছাহেব এসেছিলেন একটা যরূরী কাজে। তার সমস্ত কিছু শুনল। ঘাড় নেড়ে আসাদ ছাহেবকে বলল, ব্যাপারটা বড় গুরুতর। তিনি পাশে এসে হাত ধরে বললেন, ভাই আমাকে উদ্ধার করেন নইলে...? গম্ভীর কণ্ঠে বলল, পনের হাযার টাকা দিতে হবে। টাকার অংকটা শুনে তার চোখ ছানাবড়া। তিনি একটু কম দিতে চাইলেন। আমীন একেবারে না করল। অবশেষে কি আর করা? পুরো টাকাটাই দিয়ে গেলেন আসাদ ছাহেব। টাকাগুলি তাড়াতাড়ি নিয়ে আলমারির মধ্যে তালাবদ্ধ করল আমীন। মনের ভিতরে অনাবিল আনন্দ বয়ে যেতে লাগল তার।
সেদিনের কথা আজ শুয়ে চিন্তা করছে, এটা নিশ্চয়ই তার পাপের প্রতিফল। এমন নাজুক অবস্থায় মনুষ্য সমাজে বাস করা সম্ভব নয়। লজ্জায় মুষড়ে পড়ল সে। জীবন থেকে সে পালিয়ে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিল। আজ রাতই হবে তার জীবনের শেষ রাত। ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা ৬-টা। আবারও আয়নার কাছে গেল। সিদ্ধান্ত নিল আগে এই পাপের টাকাগুলি ফিরিয়ে দেবে, তারপর দুনিয়ার মায়াজাল ত্যাগ করবে।
তড়িৎ গতিতে উঠে হাত মুখ ধুয়ে প্যান্ট-শার্ট পরে নিল। পাপের টাকাগুলি আলমারি থেকে বের করে থলে ভর্তি করল। বড় একখানা রুমাল মুখ বরাবর চেপে ধরে বের হ'ল। একটি রিক্সা ডেকে সরাসরি আসাদ ছাহেবের বাসার দিকে ছুটল। গিয়ে টাকার ব্যাগটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে চলে আসল আমীন। আসাদ ছাহেব মূর্তির মত তাকিয়ে থাকল। কিছু বলতে গেল কিন্তু...? রিক্সায় আবার চেপে বসল আমীন। রিক্সা আপন গতিতে চলছে। মনের মধ্যে প্রশ্ন উদয় হ'ল সবাই তো বেশ সুখেই চলছে। কিন্তু আমার একি হ'ল? পৃথিবী ছেড়ে যাবার পূর্ব মুহূর্তটি চারিদিকে ভাল করে দেখে নিচ্ছে সে। আল্লাহ্র সৃষ্টি পৃথিবী কতই না সুন্দর! নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। নিজের জীবনের জন্য একটু দুঃখিত হ'ল।
সামনে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে তার বাসা। রুমালের ভিতরে শক্ত অনুভূতি টের পেল। ছলকে উঠলো বুকের রক্ত। চমকে উঠল সে। আবার কি হ'ল? ভয় পেল কিছুটা। ভয়ে চুপচাপ বসে আছে। বুকের ভিতরে কি যেন অনুভূতি জোরে জোরে লাফাচ্ছে। রিক্সা তার বাসার সামনে রাখল। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দ্বিগুণ দিল। ড্রাইভার তার দিকে করুণ নয়নে তাকিয়ে থাকল।
সোজা রুমে ঢুকে দরজার ছিটকিনী আটকে দিল আমীন। আয়নার সামনে গিয়ে ভয়ে ভয়ে রুমাল সরালো। দেখেই আনন্দে নেচে উঠল তার মন, চিৎকার দিয়ে উঠল সে। এবার নাকতো ঠিক জায়গায়ই আছে। সে নিখুঁতভাবে দেখতে লাগল। ঠিক জায়গায়ই তো নাক আছে। পরম সুখে চোখের কোণে অশ্রু এসে গেল। মনে পড়লো তার আজ সোমবার। বৃহস্পতি ও সোমবার তওবা কবুলের দিন। তাই সে তওবা করল। আর নয় পাপের পথে উপার্জিত টাকার লোভ। এখন থেকে হালাল পথে উপার্জন করব; সৎ ও সুন্দরভাবে বাঁচবো। এটা আমীনের দৃঢ় সংকল্প।
শিক্ষা: অন্যায় পথে যে অর্থ উপার্জন করে, সে অর্থবিত্তের মালিক হ'লেও মানসিকভাবে কখনই স্বস্তির মধ্যে থাকতে পারে না। সর্বদাই পাপের অনুভূতি তাকে তাড়া করে। অন্তর থেকে প্রশান্তি ও মনুষ্যত্বের ছোঁয়া লোপ পেয়ে যায়। এটা তার দুনিয়াবী শাস্তি। পরকালে তার জন্য অপেক্ষা করছে আরো মর্মান্তিক শাস্তি। তাই সময় থাকতেই তওবা করে নেয়া আবশ্যক।