📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 কুরআন-হাদীছের বিধান পরিবর্তনযোগ্য নয়

📄 কুরআন-হাদীছের বিধান পরিবর্তনযোগ্য নয়


জনৈক ব্যক্তির চোখের সমস্যা ছিল। সে একদিন ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার একটা টেস্ট করার জন্য লিখে দিয়ে বললেন, টেস্টটি করে রিপোর্ট নিয়ে আগামীকাল দেখা করবেন। পরের দিন রিপোর্ট দেখে ডাক্তার একটা চশমা ও কিছু ঔষধ লিখে দিলেন। লোকটি চশমার দোকানে গিয়ে চশমার দাম ঠিক করল। দোকানদার বলল, চশমার ফ্রেমের দাম ২৫০ টাকা ও পাওয়ার গ্লাসের দাম ২৫০ টাকা মোট ৫০০ টাকা লাগবে। লোকটি জিজ্ঞেস করল, ৫০০ পাওয়ারের গ্লাসের দাম কত? দোকানদার বলল, ২৫০ টাকা। লোকটি বলল, ২৫০ পাওয়ার ও ৫০০ পাওয়ারের কাঁচের একই দাম? দোকানদার বলল, হ্যাঁ। তখন লোকটি ৫০০ পাওয়ারের চশমাটি নিলো। পরের দিন বাজারে গিয়ে সে বড় বড় কৈ মাছ দেখে তা কিনে নিয়ে বাড়ি আসল। স্ত্রীকে বলল, কৈ মাছ সুন্দর করে রান্না করবে। কৈ মাছ রান্না করে স্ত্রী তার প্লেটে দিল। লোকটি বলল, কৈ মাছের মাথা কোথায় গেল? স্ত্রী বলল, মাছতো খুব ছোট ছোট, তার মাথা রাখা গেল না। তখন লোকটি স্ত্রীকে মারধর করল।

এরপর সে মাছওয়ালার কাছে এসে বলল, তোমার জন্য আমি আমার স্ত্রীকে মেরেছি। মাছওয়ালা বলল, কেন? লোকটি বলল, আমি বড় বড় দেখে কৈ মাছ কিনে নিয়ে গেলাম, অথচ বাড়ি গিয়ে দেখি তা খুবই ছোট। মাছওয়ালা বলল, আপনার চোখে সমস্যা আছে। আমি তো ছোট কৈ মাছই বিক্রি করছি। লোকটি বলল, চোখে সমস্যার কারণেই তো চশমা নিয়েছি। তখন মাছওয়ালা বলল, তাহ'লে আপনার চশমায় সমস্যা। লোকটি বলল, চশমায় সমস্যা নেই, কারণ আমি ৫০০ পাওয়ারের চশমা নিয়েছি। তুমিই আমাকে ঠকিয়েছ।

এরপর সে বাড়ি এসে স্ত্রীকে বলল, তোমার বাপের বাড়ীতে যাবে? স্ত্রী বলল, চল যাই। পথে এক বন্ধুর সাথে দেখা। স্ত্রীকে বলল, তুমি হাঁটতে থাক, আমি আসছি। কথা বলতে বলতে দেরী হয়ে গেল। স্ত্রী হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি পৌঁছে গেল। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পথে ছিল একটা খাল। চশমাতে দেখা যাচ্ছে খুব ছোট। সে লাফ দিয়ে পার হ'তে গিয়ে খালের মধ্যে পড়ে গেল। খরস্রোতা খালে পড়ে তার অবস্থা কাহিল। কারণ সে সাঁতার জানে না। পানি খেয়ে খেয়ে পেট ফুলে গেছে। কোনমতে ভেসে ভেসে কূলে আসল। বাড়ীতে পৌছুলে স্ত্রী বলল, তোমার এমন দশা হ'ল কি করে? তোমার সারা শরীর ভেজা কেন? লোকটি বলল, খালে পড়ে গিয়েছিলাম। স্ত্রী বলল, তুমি কি চোখে দেখতে পাওনি? লোকটি বলল, চশমাতে দেখলাম, ছোট খাল। তাই লাফিয়ে পার হ'তে গিয়ে খালেই পড়ে গেলাম। স্ত্রী বলল, ডাক্তারের কাছে গিয়ে চশমার পাওয়ার ঠিক করে আন। লোকটি পরের দিন ডাক্তারের কাছে গিয়ে দু'টি ঘটনাই বলল। ডাক্তার চশমা পরীক্ষা করে পাওয়ার দেখে বললেন, আমিতো আপনাকে ২৫০ পাওয়ারের চশমা দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি ৫০০ পাওয়ারের চশমা কেন কিনেছেন? ডাক্তারের পরামর্শ মত চশমা না নেওয়ায় এই পরিণতি। যান চশমার পাওয়ার ঠিক করে নিন।

শিক্ষা : মুমিনকেও কেবল কুরআন ও হাদীছ অনুযায়ী আমল করতে হবে। কুরআন ও হাদীছের বিধান কস্মিনকালেও পরিবর্তনযোগ্য নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যেভাবে দেখিয়ে গেছেন ঠিক সেভাবে আমল করতে হবে। ইচ্ছামত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার কোন সুযোগ নাই। অন্যথা সামাজিকভাবে যেমন বিপর্যস্ত হতে হবে, তেমনি পরকালে অবস্থা হবে বেগতিক। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন- আমীন!

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 ঈমান হরণ

📄 ঈমান হরণ


অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে লাবীব। বছর পনের হ'ল গ্রামের মায়া-মমতা ত্যাগ করে দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের জন্য তার বাইরে যাওয়া। গ্রামে কোন ভাল আলেম ছিল না, যার কাছ থেকে গ্রামবাসী দ্বীনী ইলম শিক্ষা করবে। এতদিন পরে লাবীব যোগ্য আলেম হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে এসেছে। গ্রামের লোকেরা এতে দারুণ খুশি।

আগামীকাল ২১শে ফেব্রুয়ারী, শহীদ দিবস। এটা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিদ্যালয়সমূহে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবে। তাই বিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা ফুল সংগ্রহে মেতে উঠেছে। বিভিন্ন প্রকার ফুল সংগ্রহ করে তারা পুষ্পাঞ্জলি তৈরী করছে। লাবীব এ দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল এবং মনে মনে ভাবল, আমিও এক সময় এমনটিই করতাম। এটা ভেবেই সে খুব মানসিক কষ্ট অনুভব করল। অতঃপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, হায়! এভাবেই রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে বিদ্যালয় সমূহের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের ঈমান হরণ করছেন। এরপর সে ঐ ছেলে-মেয়েদের নিকটে আসল এবং তাদেরকে ২১শে ফেব্রুয়ারীর করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বুঝাল। হাসান নামের একটি ছেলে ব্যতীত সবাই তার কথাকে উপেক্ষা করে চলে গেল।

পরদিন সকাল বেলা হাসান সিদ্ধান্ত নিল যে, সে ২১শে ফেব্রুয়ারী উদযাপন অনুষ্ঠানে যাবে না। কিন্তু বন্ধুদের চাপের মুখে অবশেষে তাকে যেতেই হ'ল। ছাত্র-ছাত্রীরা নগ্নপায়ে শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করল। তাদের পিছু পিছু হাসান জুতা পরে খালি হাতে নীরবে শহীদ মিনারে গেল। একজন শিক্ষক তাকে জুতা পরে শহীদ মিনারে আসতে দেখে দ্রুত তার কাছে এলেন। হাসানের ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে শহীদ মিনার থেকে নামালেন এবং একজন ছাত্রকে একটি লাঠি আনার হুকুম দিলেন। এরপর তাকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ না করেই বেদম প্রহার করলেন। আর বেয়াদব, অসভ্য, মূর্খ ইত্যাদি বলে গালি-গালাজ করলেন। শিক্ষকের বেধড়ক লাঠির আঘাতে হাসান অসুস্থ হয়ে পড়ল।

বন্ধুরা ধরে তাকে বাড়িতে নিয়ে এল। বাবা-মা ছেলের এ অবস্থা দেখে অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। হাসানকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আদ্যোপান্ত ঘটনা শুনে হাসানের বাবা তাকে নিয়ে লাবীবের নিকটে আসলেন এবং তাকে সবকিছু খুলে বললেন। গ্রামের কতিপয় গণ্যমান্য লোককে সাথে নিয়ে লাবীব ও হাসানের বাবা পরদিন স্কুলে গেলেন। যে শিক্ষক হাসানকে মেরেছিল লাবীব ঐ শিক্ষককে মারার কারণ জিজ্ঞেস করল। শিক্ষক বললেন, হাসান জুতা পরে শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের অপমান করেছে, এটিই তার অপরাধ। লাবীব বলল, বলুনতো পৃথিবীতে উত্তম জায়গা কোনটি, মসজিদ নাকি শহীদ মিনার? তিনি বললেন, মসজিদ। লাবীব বলল, মসজিদ উত্তম জায়গা হওয়া সত্ত্বেও পরিষ্কার জুতা পরে সেখানে ঢোকার ও ছালাত আদায়ের অনুমতি রয়েছে। আল্লাহ্ ঘর মসজিদে জুতা পরে প্রবেশ করলে অপমান করা হয় না, আর শহীদ মিনারে জুতা পরে উঠলে অপমান করা হয়? এই শিক্ষা আপনারা কোথা থেকে পেলেন? আপনারা ভাষা শহীদের জন্য ভক্তি গদগদ চিত্তে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে এসব করছেন, কিসে শহীদদের প্রকৃত মঙ্গল ও কল্যাণ হবে তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? ভাষা শহীদদের জন্য আপনারা কয়দিন দো'আ করেছেন? কয়দিন তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেছেন? কয়দিন তাদের নাজাতের জন্য আল্লাহ্র কাছে কেঁদেছেন। তাদের জন্য কয় টাকা নিজে ছাদাক্বা করেছেন? এসব না করে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে, নীরবতা পালন করে নিজে যেমন শিরক করছেন, তেমনি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে শিরক করাচ্ছেন। এভাবে আপনারা প্রতিনিয়ত ছাত্র-ছাত্রীদের ঈমান বিনষ্ট করে চলেছেন। এজন্য অবশ্যই আপনাদেরকে আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। লাবীবের কথায় একজন অভিভাবক বললেন, বাবা তুমি হাছা কইতাছো? তাইলে আমি আর আমার পোলারে এইহানে পড়ামু না। ওরে মাদ্রাসায় দিমু। তার কথায় সবাই সমস্বরে বলল, হ আমরাও আমাদের পোলা-মাইয়ারে মাদ্রাসায় দিমু। হাসানের বাবা বললেন, আপনে ওর শিক্ষক না অইলে আইজ আমিও বুঝাইতাম আমারে কতখানি কষ্ট দিছেন।

লাবীব সবাইকে থামিয়ে বলল, পিতারাও সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকে শিরক শিক্ষা দিয়ে থাকেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেমনে বাবা? লাবীব বলল, আমরা সন্তানদের কপালে কাল টিপ দেই এই বিশ্বাসে যে, তার প্রতি বদনযর লাগবে না। সন্তানদের কোমরে কালো সুতা বেঁধে দেই। অনেকে তাতে বিভিন্ন কড়ি গেঁথে দেই। একটু কিছু হ'লেই তাদের গলায় তাবীয ঝুলিয়ে দেই। এসব করি রোগ প্রতিরোধ কিংবা তাদের মঙ্গলের জন্য। অথচ এতে তাদের কোন উপকার হয় না; বরং ক্ষতি হয়। কারণ এসব শিরকী কাজ। এসবের জন্য আমাদেরকেও আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। লাবীবের কথায় সবাই সিদ্ধান্ত নিল যে, ভবিষ্যতে তারা এসব করবে না। শিক্ষকও লজ্জিত হয়ে হাসানের বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল এবং বলল, না জেনে প্রশাসনের চাপে আমাদেরকে এসব করতে হয়। তবে যতদূর পারি আগামীতে এসব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। লাবীবকে বললেন, আপনি আমাদেরকে অনেক শিরকী বিষয়ে সতর্ক করলেন। এ ব্যাপারে আমরা নিজেরা সাবধান হব এবং অন্যদেরকেও সাবধান করার চেষ্টা করব। আপনার মত দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজন সমাজে আরো দরকার।

শিক্ষা: শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, নীরবতা পালন করা এসবই শিরক। এগুলি থেকে বিরত থাকতে হবে।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 একজন কৃষকের আত্মবিশ্বাস

📄 একজন কৃষকের আত্মবিশ্বাস


একজন কৃষক কৃষিকাজের মাধ্যমে তার অভাব-অনটন দূর করতে না পেরে ছালাত আদায় কালে আল্লাহ্র কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে কিছু ধন-দৌলত তার চুলার কাছে পাবার আবেদন-নিবেদন করে। একদিন সে মাঠে চাষ করতে গেলে তার লাংগল একটি গাছের শিকড়ের সাথে বেঁধে যায়। সে তখন লাংগল বের করার জন্য শিকড় খুঁড়তে গিয়ে একটি কলস দেখতে পায়। কলসের মুখে ঢাকনা আঁটা। ঢাকনা খুললে সে কলস ভরা ধন-দৌলত দেখতে পায়। এতে সে মহা আনন্দিত হয়। কলসটি বাড়ী আনার সিদ্ধান্ত নেবার সাথে সাথে তার মনে পড়ে যায়, সে ধন-দৌলত পেতে চেয়েছিল তার চুলার কাছে, এখানে নয়। তাই সে ভাবল আল্লাহপাক সম্ভবতঃ তাকে পরীক্ষা করছেন। একারণে কলসটি পূর্বের অবস্থায় রেখে সে বাড়ী চলে আসে।

বাড়ী এসে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে তার স্ত্রীকে ঘটনাটি বলে। স্ত্রী তখন তাকে ঐ ধন-দৌলত আনতে অনুরোধ করে নিরাশ হয়। সে কিছুতেই ঐ ধন-দৌলত আনতে রাযী হ'ল না। তার বিশ্বাস, আল্লাহ তাকে ধন-দৌলত দিলে তার চুলার কাছেই দিবেন। স্ত্রী তাকে অনেক ভর্ৎসনা ও গালমন্দ করে। তাকে রাযী করাতে না পেরে তার এক প্রতিবেশীকে সম্পদের খবর বলে এবং কোথায় কিভাবে আছে তাও স্বামীর বর্ণনা মোতাবেক বলে দেয়।

প্রতিবেশী লোকটি উৎসাহে বুক বেঁধে কোদাল হাতে নির্দিষ্ট স্থানে ছুটে যায়। অল্প মেহনতেই সে কলসটি দেখতে পায়। কিন্তু কি আশ্চর্য! কলসে তো কোন ধন নেই, আছে শুধু কলস ভরা বিষধর সাপ। লোকটির রাগ হ'ল। সে মনে করল, কৃষকের স্ত্রী তাকে বিপদে ফেলার জন্য মিথ্যা কথা বলেছে। তাই এর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কলসের মুখটি ভালভাবে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে কলসটি বাড়ী নিয়ে এল। উদ্দেশ্য, রাতের অন্ধকারে সে কলসটি কৃষকের চুলার কাছে রেখে মুখটি খুলে দিবে। যাতে কৃষকের স্ত্রী চুলার কাছে গেলে তাকে সাপে দংশন করে।

রাত ভোর হ'ল। কৃষকের স্ত্রী রান্না-বান্না করার জন্য চুলার কাছে গেল। সে আশ্চর্য হয়ে দেখল, চুলার চার পাশে অনেক ধন-দৌলত রয়েছে। সে তার স্বামীকে ডেকে আনল। স্বামী বলল, আমার মনে এ বিশ্বাস ছিল। আল্লাহপাক আমাকে ধন-দৌলত দিলে আমার চুলার কাছেই দিবেন। আমি আল্লাহ্র কাছে সে প্রার্থনাই করেছিলাম। স্ত্রী স্বামীকে ভর্ৎসনা ও গালমন্দের জন্য তার নিকট ক্ষমা চাইল। এখন থেকে পরম সুখে স্বামী-স্ত্রীর দিন কাটতে লাগল।

শিক্ষা: নিজের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা নিবেদন করতে হবে। দেওয়ার মালিক তিনিই।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 নিঃসঙ্গ

📄 নিঃসঙ্গ


নারীর জীবনে আজন্ম লালিত স্বপ্ন থাকে একটা সুন্দর সংসার, স্বামীর ভালবাসা, সন্তানের মা ডাক প্রভৃতির। একজন নারী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্বামীর সংসারকে আগলে ধরে রাখে স্বামীর নিখাদ ভালবাসার জন্য। সন্তান গর্ভ ধারণে, প্রতিপালনে সীমাহীন কষ্ট করে সন্তানের 'মা' ডাক শোনার জন্য। স্বামীর প্রেমের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নারী তার সকল কষ্ট ভুলে যায় নিমিষে, সন্তানের মা ডাকে তার সকল বেদনা দূর হয়ে যায়। কলিজা জুড়িয়ে যায়। এসব থেকে যে বঞ্চিত হয়, সে ভাবে তার জীবনটা অর্থহীন। এ বিষয়ে নিম্নের গল্পটি।

সামিয়া উচ্চবিত্ত পরিবারের উচ্ছল তরুণী। সুন্দর চেহারা, সুঠাম দেহ, টানা দু'টি ভরাট চোখ, এক কথায় অপূর্ব চেহারা তার। পিতার বিশেষ স্নেহ-মমতায় আর দশটা মেয়ের চেয়ে একটু আলাদাভাবে সে বেড়ে উঠেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-ব্যবহারে অমায়িক একটি মেয়ে সে। উচ্ছলতা থাকলেও উচ্ছৃংখলতা তার মাঝে নেই। মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় সে অনন্য। কোন ছেলের মিষ্টি কথায় মুগ্ধ হয়ে সে কখনও কারো দিকে ঝুঁকে পড়েনি। নিজের সতীত্বের প্রতি সে ছিল সর্বদা সজাগ।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, এভাবে তার জীবনের ২৩টি বসন্ত পেরিয়ে যায়। একদিন বাবা মহা ধুমধামে আদরের মেয়েকে তুলে দেন একটি ছেলের হাতে। মেয়ের সুখের কথা ভেবে সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দেন। যে সুখের জন্য বাবা এতকিছু করলেন মেয়ের কপালে সে সুখ জুটল না। হাতের মেহেদীর রং মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তার স্বামী মারা যায়। সামিয়া দু'চোখে অন্ধকার দেখে। কি করবে সে? মেয়ের এই খবরে পিতা স্ট্রোক করেন। দশ দিন মারাত্মক অসুস্থ থাকার পর অবশেষে পরপারে পাড়ি জমান তিনি। সামিয়া দু'দিক দিয়েই অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। নারীর জন্য যে দু'টি নিরাপদ আশ্রয় থাকে পিতা ও স্বামী কোনটিই তার অবশিষ্ট রইল না। একসময় সে ফিরে আসে ভাইদের সংসারে। সন্তানহীনা সামিয়া মা ডাক শোনার জন্য ও একাকীত্ব ঘুচানোর জন্য একটি কন্যা সন্তান দত্তক নেয়। এই সন্তানের পিছনেই তার সময় কেটে যায়। জীবনের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে সে ঐ সন্তানকে মানুষ করার জন্য চেষ্টা করছে। মেয়েটিও পড়ালেখায় ভাল। দিন যত যায়, সামিয়ার চিন্তা তত বাড়ে। কারণ একদিন এই মেয়েও তাকে ছেড়ে চলে যাবে পরের বাড়ী। তখন সে আবার নিঃসঙ্গ একা হয়ে যাবে। ভাইদের সংসারের শত গঞ্জনা উপেক্ষা করেও সে কেবল মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে আছে। বিবাহের বহু প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন তার একটাই চিন্তা মেয়ের জীবনেও যেন তার মত পরিণতি না আসে।

দিন গড়িয়ে যায়। সামিয়ার মেয়ে আজ পরিণত বয়সে উপনীত। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তায় সে ব্যাকুল। সে ভাবে কেমন ছেলের ঘরে তার মেয়ে গিয়ে পড়বে? তার মেয়েটি সুখী হবে তো? এসব ভাবনার মধ্যে একদিন দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত মার্জিত স্বভাবের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলের হাতে সামিয়া মেয়েকে তুলে দেয়। মেয়ের জন্য যথাসাধ্য সাংসারিক জিনিসপত্র কিনে দেয়। অনেক ধনীর দুলালরা প্রস্তাব দিলেও দ্বীনদার না হওয়ায় সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে সামিয়া।

আজ দ্বীনদার ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পেরে সামিয়া আনন্দিত, ভারমুক্ত। সে ভাবে মেয়ে আমার দ্বীনী পরিবেশে থাকবে, ছালাত-ছিয়াম পালন করবে, আমার মরার পর তারা আমার জন্য দো'আ করবে- এটাই আমার পরম পাওয়া।

এসবের মাঝেও সামিয়া আজ একা, নিঃসঙ্গ সে। ভাই-ভাবী আছে, তাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। তবুও সে আজ একা, বড় একা। একা এই পৃথিবীতে এসেছিল, আবার তাকে একাই ফিরে যেতে হবে। এজগৎ সংসারে তার যেন আপন কেউ নেই।

শিক্ষা: আখেরাতের প্রথম মনযিল কবরের একাকীত্বের সময় কেউ সঙ্গী হবে না সৎ আমল ব্যতীত। অতএব এখুনি আমাদেরকে সাবধান হয়ে পরকালের পাথেয় সঞ্চয় করতে হবে। পার্থিব জীবনে সঠিক প্রস্তুতি তথা সৎ আমল করতে না পারলে পরকালীন জীবনে কোন আপনজন কাজে আসবে না। বরং সেদিন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। একান্ত আপনজনও পরিচয় দিবে না। ক্বিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00