📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 পরিণামদর্শী ক্রীতদাস

📄 পরিণামদর্শী ক্রীতদাস


জগতে যারা নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন, তারা কর্তব্যে অবহেলা করেননি। সময়ের কাজ সময়ে করেছেন। আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখেননি।
এক সময় হাটে-বাজারে গরু-ছাগলের মত মানুষ কেনাবেচা হ'ত। এক লোক ছোট্ট একটি ছেলেকে কিনে নিয়ে যায়। ছেলেটি মালিকের অধীনে কাজ করে যৌবনে পদার্পণ করেছে। একদিন মালিকের একমাত্র পুত্র পানিতে পড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। ক্রীতদাস যুবকটি নিজের জীবন বাজি রেখে মনিবের ছেলেকে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে। মনিব ক্রীতদাসের এ কাজে খুশী হয়ে তাকে দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেন।
ক্রীতদাস তার নিজের পরিচয় সম্বন্ধে অজানা। কে তার মাতা-পিতা? কোথায় তার বাড়ী? এ সম্বন্ধে সে কিছুই জানে না। তাই সে মুক্তি পেয়ে নিজেকে বিব্রত মনে করল। তবুও সে সাগরের কিনারা ধরে যাত্রা শুরু করল। কিছুদূর অগ্রসর হ'লে সমুদ্রগামী এক জাহাজ এসে তার সামনে ভিড়ল। জাহাজে কিছু লোকজন ছিল। তারা তাকে জোর করে জাহাজে উঠিয়ে গভীর সমুদ্রে জাহাজ চালনা করল। অতঃপর একটি জনবহুল দ্বীপে এসে জাহাজ ভিড়াল। সেখানে বহু লোকজন উপস্থিত ছিল। তারা যখন জানতে পারল একজনকে ধরে আনা হয়েছে, তখন তারা উল্লাসে ফেটে পড়ল। তারা উল্লাস করতে করতে ধৃত যুবককে শহরে নিয়ে গিয়ে সিংহাসনে বসাল। তারা বলতে লাগল, আজ থেকে আপনি আমাদের রাজা। আগামী পাঁচ বছর আপনি আমাদের রাজা থাকবেন। এ সময়ে আমরা আপনার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলব।
তাদের কথা শুনে ক্রীতদাস জিজ্ঞেস করল, পাঁচ বছর পর আমি কি করব? আমাকে তখন কি কাজে লাগানো হবে? জবাবে তারা বলল, পাঁচ বছর পর আপনাকে আবার জাহাজে উঠিয়ে একটি নির্জন দ্বীপে রেখে আসা হবে। আমাদের দেশের এটাই নিয়ম। যুবকটি বলল, অতীতে এভাবে কতজনকে রেখে আসা হয়েছে? জবাবে তারা বলল, বহুসংখ্যক লোককে। কিন্তু তারা কেউ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কিন্তু যখন মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে, তখন কেবল কেঁদেছে আর সময় বাড়িয়ে দিতে অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমরা আমাদের নিয়ম-নীতির কোন পরিবর্তন করি না। নিয়ম পরিবর্তন করা হ'লে নিয়মের গুরুত্ব থাকে না।
যুবকটি তাদের কথা শুনে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, শুরু থেকেই কাজ করতে হবে। তাই সে বলল, আমি যদি লোক পাঠিয়ে সে নির্জন দ্বীপ আবাদযোগ্য করে গড়ে তুলি, তাতে কি আপনারা সম্মত আছেন। সবাই এক বাক্যে বলে উঠল, অবশ্যই।
যুবকটি দেশ শাসন করার সাথে সাথে তাকে যে দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হবে, সে দ্বীপটি রাজত্বের উপযোগী করে গড়ার কাজ শুরু করে দিল। সে পাঁচ বছর ধরে এ কাজ চালিয়ে গেল। অবশেষে যখন তার পাঁচ বছর রাজত্বের মেয়াদ ফুরিয়ে এল, তখন তাকে বেশ প্রফুল্ল দেখা গেল। কেননা নির্বাসিত দ্বীপে তাকে মেয়াদ মোতাবেক রাজত্ব করতে হবে না; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে সেখানে রাজত্ব করতে পারবে।
তাকে জাহাজে উঠিয়ে নির্বাসিত দ্বীপে রাখতে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে এক বিরাট জনতা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ঘাটে সমবেত হয়েছে। সে জাহাজ হ'তে অবতরণ করলে জনতার হর্ষধ্বনিতে ঘাট মুখরিত হয়ে উঠল।

শিক্ষা: পরিণাম ভেবে কাজ করলে ফল ভাল পাওয়া যায়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 মানুষকে সন্তুষ্ট করার পরিণতি

📄 মানুষকে সন্তুষ্ট করার পরিণতি


এক ব্যক্তি তার ঘোড়ায় চড়ে সফরে বের হয়েছে। সাথে স্ত্রী ও পুত্র হেঁটে যাচ্ছে। একটি গ্রাম অতিক্রম করার সময় লোকেরা বলতে লাগল, দেখ কত বড় নিষ্ঠুর ব্যক্তি। স্ত্রী-সন্তানদেরকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর নিজে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আরামে যাচ্ছে।
একথা শুনে লোকটি ভাবল, লোকেরা ঠিকই তো বলছে। এই ভেবে সে ঘোড়া থেকে নেমে গেল এবং ছেলেকে ঘোড়ায় চড়িয়ে নিজে স্ত্রী সহ হেঁটে যেতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর ছেলেকে ঘোড়ার পিঠে দেখে লোকেরা বলল, দেখ, ছেলেটা কত বড় বেআদব! নিজে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে আর মাতা-পিতাকে হাঁটিয়ে নিচ্ছে।
লোকটি ভাবল, এরা তো ঠিকই বলেছে। সুতরাং এবার স্ত্রীকে ঘোড়ায় বসিয়ে বাপ-বেটা হেঁটে যেতে লাগল। অতঃপর আরেকটি গ্রাম অতিক্রমকালে লোকেরা বলতে লাগল, একেই বলে স্ত্রীশাসিত স্বামী। লোকটি ভাবল, এরাও তো ঠিকই বলছে। এই ভেবে সে স্ত্রী-পুত্র সবাইকে নিয়ে পুনরায় ঘোড়ায় চেপে বসল। অতঃপর অপর এক গ্রাম অতিক্রমকালে লোকেরা এ দৃশ্য দেখে বলল, ঘোড়াটাকে একেবারে মেরে ফেলবে? একটা ঘোড়ায় এক সাথে কতজন মানুষ সওয়ার হয়েছে দেখ! লোকটি ভাবল, সবাই ঠিক বলছে।
এবারে তারা সকলে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল এবং ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটতে লাগল। কিছু পথ অতিক্রমের পর লোকেরা বলতে লাগল, 'অকৃতজ্ঞ বান্দা একেই বলে। আল্লাহ্ নে'মতের কোন কদর নেই। নিজের যানবাহন আছে, অথচ সবাই হেঁটে মরছে। পালাক্রমে এক একজন করে চড়লেও তো পারে। সওয়ার হওয়ার যদি ইচ্ছা না থাকত তবে ঘোড়াটি সাথে নিয়ে আসার কি দরকার ছিল। ঘরে বেঁধে রেখে আসলেই তো ভাল ছিল'।
লোকটি দেখল, ঘোড়ায় চড়ার কোন পদ্ধতিই আর বাকী নেই। সুতরাং এখন ঘোড়ায় না চড়ে এবং ঘোড়াকে শুধু হাঁটিয়ে না নিয়ে অন্য কোন পদ্ধতি আছে কি-না তাই করতে হবে।
লোকটি একটি বুদ্ধি আঁটল। একটি লম্বা বাঁশ নিয়ে আসা হ'ল। বাঁশে ঘোড়ার চার পা বেঁধে ঘোড়াকে ঝুলিয়ে বাঁশের দুই দিক থেকে বাপ-বেটা ঘাড়ে করে চলতে লাগল। ঘোড়ার মাথা নীচের দিকে আর পা উপরের দিকে। একটি নদী পার হওয়ার জন্য তারা যখন সাঁকো পার হচ্ছিল, তখন এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে পাড়ার ছেলেরা সব 'হো হো' করে হাসতে লাগল এবং চিৎকার করে উঠল। তাদের চিৎকারে ঘোড়া ভয় পেয়ে এক ঝাঁকুনি মেরে ছিটকে নদীতে পড়ে গেল। ওদিকে বাঁশের বাড়ি খেয়ে দুই বাপ-বেটা উপুড় হয়ে পড়ে কারো মাথা কাটল, কারো থুতনি কেটে রক্ত বের হ'তে লাগল।
লোকটি দেখল, মানুষকে সন্তুষ্ট করার বিপদ কত মারাত্মক। এত চেষ্টা করেও মানুষকে সন্তুষ্ট করা গেল না। অবশেষে ঘোড়াও হারাল, মাথাও কাটল। আমও গেল, ছালাও গেল।

শিক্ষা: আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্যই সব কিছু করা অপরিহার্য। লোকে কি বলবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা সমীচীন নয়। কেননা একসাথে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 সাড়ে তিন হাত মাটি

📄 সাড়ে তিন হাত মাটি


সুদীর্ঘ পথেরও শেষ আছে, আছে এই মোহনীয় বসুন্ধরার। শুধু শেষ নেই বনু আদমের আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া ও লোভ-লালসার। তারই আলোকে এই ছোট্ট গল্প।-
এক গ্রামে রিয়াযুদ্দীন নামে জনৈক ধনী ব্যক্তি বাস করতেন। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে আরমান ওকালতি পাশ করে শহরেই থাকে। ছোট ছেলে আনোয়ার গ্রামে বাস করে। আনোয়ার পেশায় কৃষক। গ্রামের মাদরাসা থেকে সে অষ্টম শ্রেণী পাশ করেছে। সে গভীর অনুরাগী। গ্রামেই সে বিয়ে করেছে। হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করে ইন্তেকাল করেন রিয়াযুদ্দীন। বাবার দাফন-কাফন শেষে দু'ভাই একত্রে বসে আলোচনা করছে।
বড় ভাই বলছেন, শোন আনোয়ার, বাবা মৃত্যুর সময় সম্পত্তি আমাদের দু'ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। গ্রামের জমিজমা সব তোমার। আর শহরেরগুলি আমার। আর বাবা যেহেতু জমি বণ্টন করে দিয়েছেন, সেহেতু আর কোন প্রশ্নই ওঠে না।
আরমান ছিল ছোটবেলা থেকেই লোভী প্রকৃতির। আর মিথ্যা বলায় পারঙ্গম। ছালাত-ছিয়াম সহ ধর্মীয় কার্যাদি পালনে ছিল তার চরম অনীহা। তবুও মাঝে-মধ্যে শুক্রবারে মসজিদে গেলেও বলত, এই দিনে সব লোক যায় তাই আমিও যাই। আরমানের গ্রামের বাড়ীতে জমি তেমন ছিল না। শহরেই সব। ব্যাংক ব্যালেন্স সহ বেশ কয়েকটি বাসা।
আরমান ছাহেবের দুই ছেলে হেলাল আর বেলালকে প্রয়োজনমত লেখাপড়া শিখিয়ে তার ব্যবসার দায়িত্ব দিয়েছেন।
আরমান ছাহেব বৃদ্ধ বয়সে উপনীত। আগেই সম্পত্তি দু'ছেলের মাঝে ভাগ করে দিয়েছেন। শরীরে তেমন জোর নেই বললেই চলে। সব সময় ঘরে তাসবীহ-তাহলীল করে সময় কাটান। মাঝে মাঝে ওয়ায-মাহফিলে যান এবং অনেক পাপ-পুণ্যের কথা শুনেন। মনে মনে ভাবেন কিছু অর্থ-সম্পদ দিয়ে ইয়াতীমখানা, মাদরাসা, মসজিদ তৈরী করে দিবেন। কিন্তু আশা সেখানেই শেষ। অর্থ-সম্পদতো ছেলেদের হাতে।
আর ইদানীং ছেলেরা কাজে এতটা ব্যস্ত যে, পিতার খোঁজ-খবর নেয়ারও সময় নেই। আরমান ছাহেব শুধু অন্ধকার ঘরে বসে পাপ-পুণ্যের হিসাব কষেই সময় কাটান।
একদিন দুই ছেলের জোরালো কণ্ঠের আওয়ায পিতার কানে প্রবেশ করে। তাদের মাঝে দ্বন্দ্ব পিতাকে নিয়েই। সারমর্ম হ'ল-
হেলাল বলছে, দেখ বেলাল। বাবার শরীর খারাপ। কখন মারা যায় বলা যায় না। কবর দেয়ার কথা তো ভাবতে হবে। উত্তরায় তোর যে খালি জায়গা পড়ে আছে, সেখানে দেওয়া যায় বলে ভাবছি। কথার মাঝে বাধা দিয়ে বেলাল বলে, না, এটা সম্ভব নয়। গতকাল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা হয়েছে, ওখানে একটা ফ্ল্যাট তুলব। বরং বিশ্বাসপাড়ায় তোর জায়গা আছে, সে জায়গায় দাফনের চিন্তা করা যায়। না না, ওখানে আমার ভিন্ন পরিকল্পনা আছে। দু'ভাইয়ের মাঝে তর্ক ঝগড়ায় রূপ নিল। পরিশেষে তারা বলল, আমাদের আর কি দোষ বল, বাবা যদি গ্রামের সব জমি চাচাকে লিখে না দিত, তবে সেখানে বাবার কবরের ব্যবস্থা করা যেত।
আরমান ছাহেব ছেলেদের কথা শুনছেন আর নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। জীবনের এতটা বছর অতিক্রম করেছেন লোভ-লালসা আর অর্থের মোহে। কখনও পরকালের কথা ভাবেননি। অথচ ছোট ভাইকে ঠকিয়ে এত সম্পদ দখল করার পরও সাড়ে তিন হাত জায়গা তার ভাগ্যে জুটছে না। হায়রে নিয়তি, হায়রে জীবন, হায়রে সাড়ে তিন হাত জমি। আজ সবাই আমার পর।

শিক্ষা: অন্যকে ঠকানোর পরিণতি কখনো ভাল হয় না।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 কচ্ছপ ও খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতা

📄 কচ্ছপ ও খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতা


কচ্ছপ ও খরগোশ একবার পাহাড়কে সীমানা নির্ধারণ করে দৌড় প্রতিযোগিতা করল। খরগোশ তার দ্রুতগামিতার কারণে রাস্তায় অলসতা করল ও ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু কচ্ছপ তার মন্থরগতির কারণে রাস্তায় বিশ্রাম না নিয়ে অবিরাম চলতে থাকল। ফলে যথাসময়ে সে গন্তব্যে পৌঁছে গেল। যখন খরগোশ ঘুম থেকে জাগ্রত হ'ল তখন কচ্ছপকে বিজয়ী অবস্থায় দেখতে পেল। অতঃপর সে লজ্জিত হ'ল। কিন্তু তার লজ্জা তাকে কোন ফায়দা দিল না।

শিক্ষা : ছোট বলে কাউকে অবহেলা-অবজ্ঞা করতে নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00