📄 খাদীজার পর্দা
খাদীজা অন্যান্য দিনের মত আজও খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে। ওযূ সেরে ফজরের ছালাত আদায় করে কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করেছে। এরপর সে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। তখনও আকাশ পুরা ফর্সা হয়নি। চারিদিক থেকে পাখির কলরব ভেসে আসছে। সকালের শীতল হাওয়ায় খাদীজার মনের ব্যথা অনেকটা প্রশমিত হয়ে যায়। সে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ভাবে এই নোংরা পৃথিবীর কথা, যেখানে নিজের ভাল কাজ করার অধিকারটুকুও নেই। কী এমন অন্যায় সে করেছে, তা ভেবে পায় না। সেতো শুধু বোরকা পরে কলেজে যায়। প্রয়োজন ছাড়া কোন ছেলের সাথে কথা বলে না, ক্লাশ ছেড়ে কোথাও যায় না। আচ্ছা এগুলিই কি তার দোষ? তাহ'লে মালীহা, সুমাইয়া, আরীফা ওরা যেভাবে উচ্ছৃংখলভাবে চলাফেরা করে সেটাই কি ভাল? না, তা হবে কেন? আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, 'হে নবী! আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, তাদের মালিকানাধীন বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র নিকট তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হ'তে পার' (নূর ৩১)। আলোচ্য আয়াতে যে কথাগুলি বলা হয়েছে, তা মেনে চলা প্রত্যেক নারীর জন্য ফরয।
প্রতিদিনের মত গতকালও খাদীজা যথারীতি কলেজে গিয়েছিল। সে স্কুল জীবন থেকেই বোরকা পরত। মালীহা, সুমাইয়া, আরীফা সবাই খাদীজার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। স্কুলজীবন থেকে ওরা খুব অন্তরঙ্গ। কলেজে উঠেও সেই অন্তরঙ্গতা বিদ্যমান আছে। এদের মধ্যে একমাত্র খাদীজাই বোরকা পরে। অন্যদের মধ্যে মালীহা, আরীফা ততটা উচ্ছৃংখল নয়, যদিও বোরকা পরে না। কিন্তু সুমাইয়া খুব উচ্ছৃংখলভাবে চলাফেরা করে। ও প্রায় সময়ই বোরকা পরার জন্য খাদীজাকে তিরস্কার করে। কলেজে ওঠার পর বোরকা নিয়ে প্রায়ই খাদীজার সাথে তার কথা কাটাকাটি হ'ত। ওর এক কথা, বোরকা পরলে সামাজিক ও আধুনিক হওয়া যায় না।
টিফিন পিরিয়ডে সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়লে সুমাইয়া খাদীজাকে বলল, চল, আর সঙ সেজে বসে না থেকে একটু বাইরে ঘুরে আসি। বোরকা নিয়ে বান্ধবীদের রসিকতা সে অনেক সহ্য করেছে। আজ আর পারল না। বলে উঠল, সঙ আমি সাজি, না তোরা? ঠোঁটে লিপস্টিক, কপালে টিপ আর ফিনফিনে জামা পরে তোরাই তো প্রতিদিন সঙ সেজে কলেজে আসিস। একথা শুনে অপমানে সুমাইয়ার চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়। সে বলে, কী, এত বড় কথা! দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। এই বলে টান দিয়ে খাদীজার মুখের নেকাব খুলে ফেলল সুমাইয়া। লজ্জায়, অপমানে খাদীজার চোখ-মুখও লাল হয়ে যায়। ও শুধু বলে, কাজটা ভাল করলি না সুমাইয়া। এরপর বাকী ক্লাশের সময় আর কারো সাথে কথা না বলে বেঞ্চে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে খাদীজা। অতঃপর কলেজ ছুটি হ'লে বাড়ী চলে আসে।
ঘটনাটি বার বার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে খাদীজার। একবার মনে হচ্ছে সুমাইয়ার সাথে সে আর কোনদিন কথা বলবে না। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে তায়েফে সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তায়েফবাসীর হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের অকল্যাণ কামনা না করে তিনি কল্যাণ কামনা করেছিলেন। এ কথা মনে করে খাদীজা ভাবে, হয়ত দোষ আমারই। সুমাইয়াকে ওভাবে বলা ঠিক হয়নি। আজকে ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
কলেজের সময় হয়ে গেছে। ঝটপট তৈরী হয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল খাদীজা। কিন্তু একি? আজ তার কোন বান্ধবীই কলেজে আসেনি। এমন তো কোন দিন হয় না। তাই ও চিন্তিত হয়ে পড়ল। ভাবল, কলেজ ছুটি হ'লে সুমাইয়াদের বাসায় যাবে। ওদের বাসায় পৌঁছে কলিংবেল টিপতেই ওদের কাজের মেয়েটি দরজা খুলে দিল। খাদীজা জিজ্ঞেস করল, সুমাইয়া আছে? মেয়েটি জবাব দিল, না। খাদীজা আবার বলল, তাহ'লে খালাম্মাকে ডেকে দাও। কাজের মেয়েটি তখন কেঁদে ফেলল। খাদীজা অবাক হয়ে বলল, কি হয়েছে খুলে বল। মেয়েটি যা বলল তাতে জানা গেল, গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পথে একদল সন্ত্রাসী সুমাইয়ার মুখে এসিড নিক্ষেপ করেছে। সে এখন হাসপাতালে। একথা শুনে খাদীজা ভয়ে কেঁপে উঠল। পর্দাহীনতার পরিণামে যে কত রকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে-এ ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হয় খাদীজা। হাসপাতালে পৌঁছে নার্সের কাছ থেকে রুম নম্বর জেনে নিয়ে সেই রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুমের দরজা খুলেই চোখ পড়ে মালীহা, আরীফার দিকে। কাছে গিয়ে দেখে সুমাইয়ার মুখের এক পাশের বেশ কিছু অংশের চামড়া সম্পূর্ণ ঝলসে গেছে। খাদীজাকে দেখে সুমাইয়া কেঁদে ফেলে। খাদীজা সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না। সুমাইয়া খাদীজাকে বলে, আমি অন্যায় করেছি। সেরে উঠলে আমিও বোরকা পরেই কলেজে যাব। সাথে সাথে মালীহা আর আরীফাও বলে উঠল, শুধু তুই কেন, আমরাও যাব। আনন্দে খাদীজার চোখে পানি এসে যায়। বলে, তোদের নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। আজ তা পূরণ হ'ল। অতঃপর খাদীজা ওদের জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করল, হে আল্লাহ! ওদের তুমি হেদায়াত দান কর! ওদের সকলের চোখে আনন্দের ঝিলিক, দুর্লভ কিছু খুঁজে পাওয়ার আনন্দ আর বুকে একটি সোনালী সুন্দর সমাজ গঠনের দুর্বার আকাঙ্খা।
শিক্ষা: প্রত্যেক ঈমানদার নারীর উচিৎ হবে পর্দা সহকারে চলাফেরা করা এবং সেই সাথে পুরুষদের কাজ হবে মহিলাদেরকে পর্দা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা ও নিজেদের দৃষ্টিকে অবনমিত রাখা। ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি সামাজিক অপরাধ থেকে নারীকে বাঁচাতে হিজাব অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
📄 পরিণামদর্শী ক্রীতদাস
জগতে যারা নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন, তারা কর্তব্যে অবহেলা করেননি। সময়ের কাজ সময়ে করেছেন। আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখেননি।
এক সময় হাটে-বাজারে গরু-ছাগলের মত মানুষ কেনাবেচা হ'ত। এক লোক ছোট্ট একটি ছেলেকে কিনে নিয়ে যায়। ছেলেটি মালিকের অধীনে কাজ করে যৌবনে পদার্পণ করেছে। একদিন মালিকের একমাত্র পুত্র পানিতে পড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। ক্রীতদাস যুবকটি নিজের জীবন বাজি রেখে মনিবের ছেলেকে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে। মনিব ক্রীতদাসের এ কাজে খুশী হয়ে তাকে দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেন।
ক্রীতদাস তার নিজের পরিচয় সম্বন্ধে অজানা। কে তার মাতা-পিতা? কোথায় তার বাড়ী? এ সম্বন্ধে সে কিছুই জানে না। তাই সে মুক্তি পেয়ে নিজেকে বিব্রত মনে করল। তবুও সে সাগরের কিনারা ধরে যাত্রা শুরু করল। কিছুদূর অগ্রসর হ'লে সমুদ্রগামী এক জাহাজ এসে তার সামনে ভিড়ল। জাহাজে কিছু লোকজন ছিল। তারা তাকে জোর করে জাহাজে উঠিয়ে গভীর সমুদ্রে জাহাজ চালনা করল। অতঃপর একটি জনবহুল দ্বীপে এসে জাহাজ ভিড়াল। সেখানে বহু লোকজন উপস্থিত ছিল। তারা যখন জানতে পারল একজনকে ধরে আনা হয়েছে, তখন তারা উল্লাসে ফেটে পড়ল। তারা উল্লাস করতে করতে ধৃত যুবককে শহরে নিয়ে গিয়ে সিংহাসনে বসাল। তারা বলতে লাগল, আজ থেকে আপনি আমাদের রাজা। আগামী পাঁচ বছর আপনি আমাদের রাজা থাকবেন। এ সময়ে আমরা আপনার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলব।
তাদের কথা শুনে ক্রীতদাস জিজ্ঞেস করল, পাঁচ বছর পর আমি কি করব? আমাকে তখন কি কাজে লাগানো হবে? জবাবে তারা বলল, পাঁচ বছর পর আপনাকে আবার জাহাজে উঠিয়ে একটি নির্জন দ্বীপে রেখে আসা হবে। আমাদের দেশের এটাই নিয়ম। যুবকটি বলল, অতীতে এভাবে কতজনকে রেখে আসা হয়েছে? জবাবে তারা বলল, বহুসংখ্যক লোককে। কিন্তু তারা কেউ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কিন্তু যখন মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে, তখন কেবল কেঁদেছে আর সময় বাড়িয়ে দিতে অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমরা আমাদের নিয়ম-নীতির কোন পরিবর্তন করি না। নিয়ম পরিবর্তন করা হ'লে নিয়মের গুরুত্ব থাকে না।
যুবকটি তাদের কথা শুনে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, শুরু থেকেই কাজ করতে হবে। তাই সে বলল, আমি যদি লোক পাঠিয়ে সে নির্জন দ্বীপ আবাদযোগ্য করে গড়ে তুলি, তাতে কি আপনারা সম্মত আছেন। সবাই এক বাক্যে বলে উঠল, অবশ্যই।
যুবকটি দেশ শাসন করার সাথে সাথে তাকে যে দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হবে, সে দ্বীপটি রাজত্বের উপযোগী করে গড়ার কাজ শুরু করে দিল। সে পাঁচ বছর ধরে এ কাজ চালিয়ে গেল। অবশেষে যখন তার পাঁচ বছর রাজত্বের মেয়াদ ফুরিয়ে এল, তখন তাকে বেশ প্রফুল্ল দেখা গেল। কেননা নির্বাসিত দ্বীপে তাকে মেয়াদ মোতাবেক রাজত্ব করতে হবে না; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে সেখানে রাজত্ব করতে পারবে।
তাকে জাহাজে উঠিয়ে নির্বাসিত দ্বীপে রাখতে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে এক বিরাট জনতা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ঘাটে সমবেত হয়েছে। সে জাহাজ হ'তে অবতরণ করলে জনতার হর্ষধ্বনিতে ঘাট মুখরিত হয়ে উঠল।
শিক্ষা: পরিণাম ভেবে কাজ করলে ফল ভাল পাওয়া যায়।
📄 মানুষকে সন্তুষ্ট করার পরিণতি
এক ব্যক্তি তার ঘোড়ায় চড়ে সফরে বের হয়েছে। সাথে স্ত্রী ও পুত্র হেঁটে যাচ্ছে। একটি গ্রাম অতিক্রম করার সময় লোকেরা বলতে লাগল, দেখ কত বড় নিষ্ঠুর ব্যক্তি। স্ত্রী-সন্তানদেরকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর নিজে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আরামে যাচ্ছে।
একথা শুনে লোকটি ভাবল, লোকেরা ঠিকই তো বলছে। এই ভেবে সে ঘোড়া থেকে নেমে গেল এবং ছেলেকে ঘোড়ায় চড়িয়ে নিজে স্ত্রী সহ হেঁটে যেতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর ছেলেকে ঘোড়ার পিঠে দেখে লোকেরা বলল, দেখ, ছেলেটা কত বড় বেআদব! নিজে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে আর মাতা-পিতাকে হাঁটিয়ে নিচ্ছে।
লোকটি ভাবল, এরা তো ঠিকই বলেছে। সুতরাং এবার স্ত্রীকে ঘোড়ায় বসিয়ে বাপ-বেটা হেঁটে যেতে লাগল। অতঃপর আরেকটি গ্রাম অতিক্রমকালে লোকেরা বলতে লাগল, একেই বলে স্ত্রীশাসিত স্বামী। লোকটি ভাবল, এরাও তো ঠিকই বলছে। এই ভেবে সে স্ত্রী-পুত্র সবাইকে নিয়ে পুনরায় ঘোড়ায় চেপে বসল। অতঃপর অপর এক গ্রাম অতিক্রমকালে লোকেরা এ দৃশ্য দেখে বলল, ঘোড়াটাকে একেবারে মেরে ফেলবে? একটা ঘোড়ায় এক সাথে কতজন মানুষ সওয়ার হয়েছে দেখ! লোকটি ভাবল, সবাই ঠিক বলছে।
এবারে তারা সকলে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল এবং ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটতে লাগল। কিছু পথ অতিক্রমের পর লোকেরা বলতে লাগল, 'অকৃতজ্ঞ বান্দা একেই বলে। আল্লাহ্ নে'মতের কোন কদর নেই। নিজের যানবাহন আছে, অথচ সবাই হেঁটে মরছে। পালাক্রমে এক একজন করে চড়লেও তো পারে। সওয়ার হওয়ার যদি ইচ্ছা না থাকত তবে ঘোড়াটি সাথে নিয়ে আসার কি দরকার ছিল। ঘরে বেঁধে রেখে আসলেই তো ভাল ছিল'।
লোকটি দেখল, ঘোড়ায় চড়ার কোন পদ্ধতিই আর বাকী নেই। সুতরাং এখন ঘোড়ায় না চড়ে এবং ঘোড়াকে শুধু হাঁটিয়ে না নিয়ে অন্য কোন পদ্ধতি আছে কি-না তাই করতে হবে।
লোকটি একটি বুদ্ধি আঁটল। একটি লম্বা বাঁশ নিয়ে আসা হ'ল। বাঁশে ঘোড়ার চার পা বেঁধে ঘোড়াকে ঝুলিয়ে বাঁশের দুই দিক থেকে বাপ-বেটা ঘাড়ে করে চলতে লাগল। ঘোড়ার মাথা নীচের দিকে আর পা উপরের দিকে। একটি নদী পার হওয়ার জন্য তারা যখন সাঁকো পার হচ্ছিল, তখন এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে পাড়ার ছেলেরা সব 'হো হো' করে হাসতে লাগল এবং চিৎকার করে উঠল। তাদের চিৎকারে ঘোড়া ভয় পেয়ে এক ঝাঁকুনি মেরে ছিটকে নদীতে পড়ে গেল। ওদিকে বাঁশের বাড়ি খেয়ে দুই বাপ-বেটা উপুড় হয়ে পড়ে কারো মাথা কাটল, কারো থুতনি কেটে রক্ত বের হ'তে লাগল।
লোকটি দেখল, মানুষকে সন্তুষ্ট করার বিপদ কত মারাত্মক। এত চেষ্টা করেও মানুষকে সন্তুষ্ট করা গেল না। অবশেষে ঘোড়াও হারাল, মাথাও কাটল। আমও গেল, ছালাও গেল।
শিক্ষা: আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্যই সব কিছু করা অপরিহার্য। লোকে কি বলবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা সমীচীন নয়। কেননা একসাথে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়।
📄 সাড়ে তিন হাত মাটি
সুদীর্ঘ পথেরও শেষ আছে, আছে এই মোহনীয় বসুন্ধরার। শুধু শেষ নেই বনু আদমের আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া ও লোভ-লালসার। তারই আলোকে এই ছোট্ট গল্প।-
এক গ্রামে রিয়াযুদ্দীন নামে জনৈক ধনী ব্যক্তি বাস করতেন। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে আরমান ওকালতি পাশ করে শহরেই থাকে। ছোট ছেলে আনোয়ার গ্রামে বাস করে। আনোয়ার পেশায় কৃষক। গ্রামের মাদরাসা থেকে সে অষ্টম শ্রেণী পাশ করেছে। সে গভীর অনুরাগী। গ্রামেই সে বিয়ে করেছে। হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করে ইন্তেকাল করেন রিয়াযুদ্দীন। বাবার দাফন-কাফন শেষে দু'ভাই একত্রে বসে আলোচনা করছে।
বড় ভাই বলছেন, শোন আনোয়ার, বাবা মৃত্যুর সময় সম্পত্তি আমাদের দু'ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। গ্রামের জমিজমা সব তোমার। আর শহরেরগুলি আমার। আর বাবা যেহেতু জমি বণ্টন করে দিয়েছেন, সেহেতু আর কোন প্রশ্নই ওঠে না।
আরমান ছিল ছোটবেলা থেকেই লোভী প্রকৃতির। আর মিথ্যা বলায় পারঙ্গম। ছালাত-ছিয়াম সহ ধর্মীয় কার্যাদি পালনে ছিল তার চরম অনীহা। তবুও মাঝে-মধ্যে শুক্রবারে মসজিদে গেলেও বলত, এই দিনে সব লোক যায় তাই আমিও যাই। আরমানের গ্রামের বাড়ীতে জমি তেমন ছিল না। শহরেই সব। ব্যাংক ব্যালেন্স সহ বেশ কয়েকটি বাসা।
আরমান ছাহেবের দুই ছেলে হেলাল আর বেলালকে প্রয়োজনমত লেখাপড়া শিখিয়ে তার ব্যবসার দায়িত্ব দিয়েছেন।
আরমান ছাহেব বৃদ্ধ বয়সে উপনীত। আগেই সম্পত্তি দু'ছেলের মাঝে ভাগ করে দিয়েছেন। শরীরে তেমন জোর নেই বললেই চলে। সব সময় ঘরে তাসবীহ-তাহলীল করে সময় কাটান। মাঝে মাঝে ওয়ায-মাহফিলে যান এবং অনেক পাপ-পুণ্যের কথা শুনেন। মনে মনে ভাবেন কিছু অর্থ-সম্পদ দিয়ে ইয়াতীমখানা, মাদরাসা, মসজিদ তৈরী করে দিবেন। কিন্তু আশা সেখানেই শেষ। অর্থ-সম্পদতো ছেলেদের হাতে।
আর ইদানীং ছেলেরা কাজে এতটা ব্যস্ত যে, পিতার খোঁজ-খবর নেয়ারও সময় নেই। আরমান ছাহেব শুধু অন্ধকার ঘরে বসে পাপ-পুণ্যের হিসাব কষেই সময় কাটান।
একদিন দুই ছেলের জোরালো কণ্ঠের আওয়ায পিতার কানে প্রবেশ করে। তাদের মাঝে দ্বন্দ্ব পিতাকে নিয়েই। সারমর্ম হ'ল-
হেলাল বলছে, দেখ বেলাল। বাবার শরীর খারাপ। কখন মারা যায় বলা যায় না। কবর দেয়ার কথা তো ভাবতে হবে। উত্তরায় তোর যে খালি জায়গা পড়ে আছে, সেখানে দেওয়া যায় বলে ভাবছি। কথার মাঝে বাধা দিয়ে বেলাল বলে, না, এটা সম্ভব নয়। গতকাল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা হয়েছে, ওখানে একটা ফ্ল্যাট তুলব। বরং বিশ্বাসপাড়ায় তোর জায়গা আছে, সে জায়গায় দাফনের চিন্তা করা যায়। না না, ওখানে আমার ভিন্ন পরিকল্পনা আছে। দু'ভাইয়ের মাঝে তর্ক ঝগড়ায় রূপ নিল। পরিশেষে তারা বলল, আমাদের আর কি দোষ বল, বাবা যদি গ্রামের সব জমি চাচাকে লিখে না দিত, তবে সেখানে বাবার কবরের ব্যবস্থা করা যেত।
আরমান ছাহেব ছেলেদের কথা শুনছেন আর নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। জীবনের এতটা বছর অতিক্রম করেছেন লোভ-লালসা আর অর্থের মোহে। কখনও পরকালের কথা ভাবেননি। অথচ ছোট ভাইকে ঠকিয়ে এত সম্পদ দখল করার পরও সাড়ে তিন হাত জায়গা তার ভাগ্যে জুটছে না। হায়রে নিয়তি, হায়রে জীবন, হায়রে সাড়ে তিন হাত জমি। আজ সবাই আমার পর।
শিক্ষা: অন্যকে ঠকানোর পরিণতি কখনো ভাল হয় না।