📄 গুপ্তধন
জনৈক ব্যক্তি স্ত্রী, তিন পুত্র ও এক কন্যা রেখে মারা যান। ছেলেরা সবাই বিবাহিত। মেয়ের বিয়ে আগেই হয়েছে। তারা সবাই সন্তান-সন্ততির মা-বাবা হয়েছে। পিতার মৃত্যুর পরে গ্রামের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে ছেলেরা পৃথক হয়ে যায়। ছোট ছেলের মায়ের প্রতি একটু বেশি ভালবাসা বুঝে মা ছোট ছেলের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
মায়ের সোনার চুড়ি পরার খুব সখ ছিল। স্বামী তার সে সখ পূরণ করতে পারেননি। তাই ছোট ছেলে মাকে সোনার চুড়ি বানিয়ে দেয়। মা এতে ভীষণ খুশী হন। ছোট ছেলে মাকে আদর-যত্নে রাখে। এভাবে কিছুদিন যাবার পর ছোট ছেলের বউ শাশুড়ীকে বলে, 'মা তোমার বিষয়-সম্পত্তি তোমার ছোট ছেলেকে লিখে দাও, আমরা তোমাকে বরাবর এভাবে দেখব'। ছেলে ও বউ-এর ব্যবহারে মা প্রীত হয়ে তার যাবতীয় সম্পত্তি ছোট ছেলেকে লিখে দেন। তার ধারণা যে, তিনি বেশি দিন বেঁচেও থাকবে না।
মানুষের চরিত্র বড়ই জটিল ও দুর্বোধ্য। যাকে অতি সৎ লোক মনে করা হচ্ছে, সে-ই একদিন এমন এক অপকর্ম করে বসে, যার ফলে তার দীর্ঘদিনের সুনাম নিমেষে শেষ হয়ে যায়।
মা প্রতি রাতে চুড়িগুলি খুলে রেখে ঘুমান। সকালে আবার পরেন। একদিন তিনি চুড়ি পরতে ভুলে যান। যখন মনে পড়ে, তখন আর চুড়িগুলি পান না। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মা চুড়িগুলি না পেয়ে কান্না শুরু করে দেন। মা বলেন, 'বউ ছাড়া এ ঘরে তো আমি আর কাউকে কখনও আসতে দেখিনি'। শাশুড়ীর কথায় বউ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং বলে, আমিই কি তাহ'লে চুড়িগুলি চুরি করেছি। আমার কথায় স্বামী তোমাকে চুড়ি বানিয়ে দিয়েছে। আর এখন আমি চোর হ'লাম। মা বললেন, আমি তোমাকে চোর বলিনি। তুমি ছাড়া আমি তো আর কাউকে এ ঘরে আসতে দেখিনি। তুমি চুড়ি নাওনি, তবে চুড়িগুলি গেল কোথায়? ছেলে মা-বউ এর কথা কাটাকাটি থামাতে ব্যর্থ হ'ল। কথা কাটাকাটি চরমে উঠলে মা বললেন, তোমরা আমার বিষয়-আশয় হস্তগত করার কুমতলবে আমাকে আদর-যত্ন করেছ এবং চুড়িগুলিও বানিয়ে দিয়েছ। তোমরা না সরালে চুড়িগুলি কি উড়ে গেল? আমার বিষয়-আশয় আমাকে ফিরিয়ে দাও। আমি এ বাড়ীতে আর একদণ্ডও থাকব না। মা বাড়ী হ'তে বের হয়ে গেলে বউ বলে, তোমার পরামর্শে চুড়িগুলি সরিয়ে আমি ভাল কাজ করিনি। ছেলে বলে, আস্তে বল, লোকে শুনতে পাবে।
মা বাড়ী থেকে বের হয়ে বড় ছেলের বাড়ীতে গিয়ে উঠেন। বড় ছেলেকে অতি অনুনয়ের সুরে বলেন, 'বাবা! তুই আমার বড় ছেলে। তুই আমাকে একটু আশ্রয় দে বাবা। আমি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকব। তোরা যা খাবার দিবি, তাই খাব। কোন আবদার ও অভিযোগ করব না'। ছেলে ও বউ একই সাথে বলে উঠল, 'তুমি বিষয়-আশয় সব ছোট ছেলেকে দিয়ে এখন আমাদের ঘাড়ে চাপতে চাও। তা হবে না। আমরা তোমাকে রাখতে পারব না।
ছেলে ও বউয়ের কাটা জবাব পেয়ে মা কাঁদতে কাঁদতে মেজ ছেলের বাড়ীতে গিয়ে উঠেন। সেখানেও একই পরিস্থিতি। অগত্যা মা তার শেষ ভরসাস্থল মেয়ের বাড়ীতে আশ্রয়ের জন্য যান। সেখানেও তার ভাগ্যে জোটে একই বিড়ম্বনা। মেয়ে-জামাই ছোট ছেলেকে বিষয়-আশয় লিখে দেবার খবর জেনেছে। তাই তারা বলে উঠে, বিষয়-আশয় একজনকে দিয়ে আমাদের এখানে কেন এসেছ? আমরা তোমাকে রাখতে পারব না'।
মা কেঁদেকেটে পথে এসে দাঁড়ান। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে ভিক্ষা করে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে কিছুদিন কেটেও যায়। একদিন এবাড়ী ওবাড়ী ঘুরে ক্লান্ত হয়ে তিনি একটি গাছের নীচে ঘুমিয়ে পড়েন। এমন সময় এক পরিচিত কণ্ঠের চাচী ডাকে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে জেগে তিনি সামনে আব্দুল্লাহকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। স্বামীর বর্তমানে আব্দুল্লাহ তার বাড়ীর দীর্ঘদিনের কাজের ছেলে। সন্তানের স্নেহে মা তাকে নিজ সন্তানদের সাথে মানুষ করেছে। আব্দুল্লাহ বড় হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজ উপলক্ষ্যে সে বাইরে ছিল। তাই তার চাচীর বর্তমান হাল-চাল জানা ছিল না। আব্দুল্লাহ চাচীকে সান্ত্বনা দিয়ে তার বাড়ীতে নিয়ে যায় এবং আদর-যত্নে রাখে। এভাবে কিছুদিন কেটে গেলে একদিন আব্দুল্লাহ শক্ত করে বাঁধা একটি পুঁটলি এনে চাচীকে দিয়ে বলে, এই পুঁটলির মধ্যে কিছু গুপ্তধন রয়েছে। আপনি পুঁটলিটা কখনও খুলবেন না। মরার আগে এর সম্পদ ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিবেন'। আব্দুল্লাহ বুঝেছিল যে, গুপ্তধনের লোভে ছেলেরা মাকে ফিরিয়ে নিতে আসবে। তাই পুঁটলির ব্যাপারে সতর্ক করে দিল এবং তার কথামত অটল থাকতে বলল।
মায়ের হাতে গুপ্তধন আছে জেনে ছেলে-মেয়ে সবাই স্বামী-স্ত্রীতে পরামর্শ করল। অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্ত নিল যে আগে মাকে আনবে, সেই গুপ্তধন পাবে। তাই সবাই সবার আগে মাকে আনতে গেল। ফলে একই দিনে এমনকি একই সময়েই সবাই মাকে আনতে হাযির হ'ল। সবাই জোর দাবী করল সে-ই মাকে নিয়ে যাবে। সবার দাবী দেখে মা বলল, 'আমি কারো বাড়ীতে স্থায়ীভাবে থাকব না। পালাক্রমে সকলের বাড়ীতে থাকব। আর মরার আগে আব্দুল্লাহ্ দেওয়া ধন সবাইকে সমান ভাগে ভাগ করে দিব।
মায়ের কথায় সবাই রাযী হয়ে মাকে নিয়ে এল। মা তখন খুবই আদর-যত্নে রইল। কিন্তু মৃত্যু কাউকেও অবকাশ দেয় না। মায়ের ভাগ্যে এই সুখ বেশিদিন সইল না। একদিন মা মৃত্যুবরণ করলেন।
মায়ের মৃত্যুর পর ছেলেরা যখন পুঁটলিটা খুলে সম্পদ ভাগ করে নিতে যাবে, ঠিক সে সময় আব্দুল্লাহ এসে হাযির। সে বলল, ঐ পুঁটলির মধ্যে কোনই ধন নেই। তোমরা সম্পদের লোভী বুঝে আমি এই বুদ্ধি খাঁটিয়েছি। তোমরা মায়ের প্রতি মোটেই দায়িত্ব পালন করনি। তোমাদের এ পাপের ক্ষমা হবে কি-না কে জানে?
ছেলেরা বুঝল, তারা সত্যিই মায়ের প্রতি গর্হিত আচরণ করেছে। তারা এও বুঝল যে, সম্পদের লোভে তারা তো মাকে ভালই যত্ন করেছে। এরূপ আচরণ করা তাদের পূর্বেই উচিত ছিল। মায়ের প্রতি অন্যায় আচরণের জন্য তারা অনুতপ্ত হ'ল এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র দরবারে এর জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাইল।
শিক্ষা: পিতা-মাতাকে দেখাশুনা করা ও তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা সন্তানের অবশ্য কর্তব্য। পার্থিব কোন লোভের জন্য নয়; বরং জান্নাত লাভের আশায় তারা এ দায়িত্ব পালন করবে।
📄 কৃপণ ও নিঃস্ব
অনেক দিন আগের কথা। আরব দেশে ছিল এক কৃপণ ব্যক্তি। তার ধন- সম্পদ ছিল অঢেল। হঠাৎ একদিন কোথাও যাওয়ার পথে তার একটা থলে হারিয়ে গেল। পথ চলার সময় এক নিঃস্ব ব্যক্তি থলেটি পেলেন। গরীব হ'লে কি হবে লোক হিসাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও আল্লাহভীরু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি থলের প্রকৃত মালিক ঐ কৃপণ ধনাঢ্য ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়ে তার টাকা তাকে ফেরত দিলেন। টাকা পেয়ে তো সে খুশীতে আটখানা। হঠাৎ তার মাথায় চিন্তা ঢুকল যে, লোকটি যে এত কষ্ট করে থলেটি আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছে তাই তাকে অবশ্যই কিছু বখশীশ দিতে হবে। কিন্তু কৃপণতাহেতু বখশীশ না দেয়ার জন্য সে কূটবুদ্ধি আঁটল। নিঃস্ব লোকটিকে অপবাদের স্বরে বলল, 'থলেতে তো ২০২০ দিরহাম ছিল। আপনি তা থেকে ২০ দিরহাম নিয়েছেন। তাই আর কোন বখশীশ দিতে পারছি না। আপনার জন্য ঐ ২০ দিরহামই যথেষ্ট'।
লোকটি তার এ কথায় অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে কৃপণের বিরুদ্ধে কাযীর আদালতে মানহানির অভিযোগ ঠুকলেন। বিচারক কৃপণকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার থলেতে কত টাকা ছিল? উত্তরে সে বলল, ২০২০ দিরহাম। আবার জিজ্ঞেস করলেন, এখন কত আছে? সে বলল, ২০০০ দিরহাম, বাকী ২০ দিরহাম ঐ ব্যক্তি নিয়েছে। এবার বিচারক নিঃস্ব ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সত্যিই থলে থেকে ২০ দিরহাম নিয়েছেন? উত্তরে তিনি বললেন, এ ধরনের কোন ইচ্ছা যদি আমার থাকত, তাহ'লে পথে কুড়িয়ে পাওয়া থলেটি আমি তাকে কোন দুঃখে ফেরৎ দিলাম। সততার কারণেই অনেক খোঁজাখুঁজি করে থলের মালিককে তা ফিরিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ্ শপথ! থলে থেকে আমি এক দিরহামও নেইনি।
বিজ্ঞ বিচারক উভয়ের বক্তব্য শুনে দুষ্ট কৃপণ লোকটির উদ্দেশ্যে বললেন, আপনি যেহেতু বলছেন আপনার থলেতে ২০২০ দিরহাম ছিল, আর উনি থলেতে পেয়েছেন ২০০০ দিরহাম। কাজেই থলেটি আপনার নয়, অন্য কারো হয়ে থাকবে। অতঃপর তিনি নিঃস্ব সৎ লোকটিকে বললেন, আপনি যদি এক বছরের মধ্যে থলের প্রকৃত মালিককে খুঁজে পান তাহ'লে তা তাকে ফেরত দিবেন। আর না পেলে আপনি নিজেই তা গ্রহণ করবেন।
কাযী ছাহেবের কথা শুনে কৃপণ তার মিথ্যা বলার দোষ স্বীকার করে পুনরায় থলে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালালো। কিন্তু বিচারক তার কোন কথাই আর শুনলেন না।
শিক্ষা: কৃপণতা মানুষের মন্দ স্বভাব। কৃপণতা সম্পদ বাড়ায় না বরং কমায়। তাই সর্বদা কৃপণতা বর্জন করা উচিত।
📄 পান্থশালা
আল্লাহ পাক সময় সময় দুনিয়ার ধন-সম্পদে বিভোর মানুষকে ধন-সম্পদের মোহ হ'তে ফিরানোর জন্য কিছু অসীলা করে থাকেন। বলখী বাদশাহ ইবরাহীম বিন আদম প্রথম জীবনে আল্লাহওয়ালাই ছিলেন। কিন্তু পরে ধন-সম্পদের মোহে তিনি সে পথ হ'তে কিছুটা সরে যান। একদিন তাঁর রাজদরবারে এক অপরিচিত ব্যক্তির আগমন ঘটে। লোকটি রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমি এই পান্থশালায় রাত্রি যাপন করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কথার প্রতিবাদ এল- 'আপনি সম্ভবতঃ ভুল করছেন, এটা রাজদরবার, পান্থশালা নয়'। আগন্তুক ব্যক্তি বললেন, 'অবশ্যই এটা পান্থশালা'। এমন সময় বাদশাহ দরবারে এসে বিতর্ক শুনলেন। তিনি একটু ধমকের সুরে আগন্তুককে বললেন, 'এটা রাজদরবার, কস্মিনকালেও পান্থশালা নয়'।
আগন্তুক বললেন, 'আপনার আগে এখানে কে বাস করতেন'? উত্তর এল, 'আমার আব্বা'। আপনার পরে কে বাস করবে'? উত্তর এল, 'আমার ছেলে'? এবার আগন্তুক ব্যক্তি বললেন, 'তাহ'লে এখানে কেউই স্থায়ী হয়ে বাস করতে পারছেন না। আপনার আগে আপনার পিতা বাস করেছেন, এখন আপনি বাস করছেন, পরে আপনার ছেলে বাস করবে। অতএব এটা অবশ্যই পান্থশালা'। এবার বাদশাহ্ চৈতন্যোদয় হ'ল। তিনি বুঝলেন, সকলেই পান্থশালার বাসিন্দা। এরপর তিনি এক রাতে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে অজানার পথে পা বাড়ালেন।
শিক্ষা : পার্থিব জগত ক্ষণিকের নীড়। কেউ এখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে এ জগতের মায়া-মরীচিকা ছেড়ে না ফেরার দেশে। সুতরাং দুনিয়াবী শান-শওকত নিয়ে মদমত্ত থাকার কোন অর্থই হয় না। ক্ষণিকের এই সময়টুকু পরকালীন সঞ্চয়ে ব্যয় করাই আমাদের একমাত্র কর্তব্য।
📄 খাদীজার পর্দা
খাদীজা অন্যান্য দিনের মত আজও খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে। ওযূ সেরে ফজরের ছালাত আদায় করে কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করেছে। এরপর সে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। তখনও আকাশ পুরা ফর্সা হয়নি। চারিদিক থেকে পাখির কলরব ভেসে আসছে। সকালের শীতল হাওয়ায় খাদীজার মনের ব্যথা অনেকটা প্রশমিত হয়ে যায়। সে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ভাবে এই নোংরা পৃথিবীর কথা, যেখানে নিজের ভাল কাজ করার অধিকারটুকুও নেই। কী এমন অন্যায় সে করেছে, তা ভেবে পায় না। সেতো শুধু বোরকা পরে কলেজে যায়। প্রয়োজন ছাড়া কোন ছেলের সাথে কথা বলে না, ক্লাশ ছেড়ে কোথাও যায় না। আচ্ছা এগুলিই কি তার দোষ? তাহ'লে মালীহা, সুমাইয়া, আরীফা ওরা যেভাবে উচ্ছৃংখলভাবে চলাফেরা করে সেটাই কি ভাল? না, তা হবে কেন? আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, 'হে নবী! আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, তাদের মালিকানাধীন বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র নিকট তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হ'তে পার' (নূর ৩১)। আলোচ্য আয়াতে যে কথাগুলি বলা হয়েছে, তা মেনে চলা প্রত্যেক নারীর জন্য ফরয।
প্রতিদিনের মত গতকালও খাদীজা যথারীতি কলেজে গিয়েছিল। সে স্কুল জীবন থেকেই বোরকা পরত। মালীহা, সুমাইয়া, আরীফা সবাই খাদীজার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। স্কুলজীবন থেকে ওরা খুব অন্তরঙ্গ। কলেজে উঠেও সেই অন্তরঙ্গতা বিদ্যমান আছে। এদের মধ্যে একমাত্র খাদীজাই বোরকা পরে। অন্যদের মধ্যে মালীহা, আরীফা ততটা উচ্ছৃংখল নয়, যদিও বোরকা পরে না। কিন্তু সুমাইয়া খুব উচ্ছৃংখলভাবে চলাফেরা করে। ও প্রায় সময়ই বোরকা পরার জন্য খাদীজাকে তিরস্কার করে। কলেজে ওঠার পর বোরকা নিয়ে প্রায়ই খাদীজার সাথে তার কথা কাটাকাটি হ'ত। ওর এক কথা, বোরকা পরলে সামাজিক ও আধুনিক হওয়া যায় না।
টিফিন পিরিয়ডে সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়লে সুমাইয়া খাদীজাকে বলল, চল, আর সঙ সেজে বসে না থেকে একটু বাইরে ঘুরে আসি। বোরকা নিয়ে বান্ধবীদের রসিকতা সে অনেক সহ্য করেছে। আজ আর পারল না। বলে উঠল, সঙ আমি সাজি, না তোরা? ঠোঁটে লিপস্টিক, কপালে টিপ আর ফিনফিনে জামা পরে তোরাই তো প্রতিদিন সঙ সেজে কলেজে আসিস। একথা শুনে অপমানে সুমাইয়ার চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়। সে বলে, কী, এত বড় কথা! দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। এই বলে টান দিয়ে খাদীজার মুখের নেকাব খুলে ফেলল সুমাইয়া। লজ্জায়, অপমানে খাদীজার চোখ-মুখও লাল হয়ে যায়। ও শুধু বলে, কাজটা ভাল করলি না সুমাইয়া। এরপর বাকী ক্লাশের সময় আর কারো সাথে কথা না বলে বেঞ্চে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে খাদীজা। অতঃপর কলেজ ছুটি হ'লে বাড়ী চলে আসে।
ঘটনাটি বার বার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে খাদীজার। একবার মনে হচ্ছে সুমাইয়ার সাথে সে আর কোনদিন কথা বলবে না। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে তায়েফে সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তায়েফবাসীর হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের অকল্যাণ কামনা না করে তিনি কল্যাণ কামনা করেছিলেন। এ কথা মনে করে খাদীজা ভাবে, হয়ত দোষ আমারই। সুমাইয়াকে ওভাবে বলা ঠিক হয়নি। আজকে ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
কলেজের সময় হয়ে গেছে। ঝটপট তৈরী হয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল খাদীজা। কিন্তু একি? আজ তার কোন বান্ধবীই কলেজে আসেনি। এমন তো কোন দিন হয় না। তাই ও চিন্তিত হয়ে পড়ল। ভাবল, কলেজ ছুটি হ'লে সুমাইয়াদের বাসায় যাবে। ওদের বাসায় পৌঁছে কলিংবেল টিপতেই ওদের কাজের মেয়েটি দরজা খুলে দিল। খাদীজা জিজ্ঞেস করল, সুমাইয়া আছে? মেয়েটি জবাব দিল, না। খাদীজা আবার বলল, তাহ'লে খালাম্মাকে ডেকে দাও। কাজের মেয়েটি তখন কেঁদে ফেলল। খাদীজা অবাক হয়ে বলল, কি হয়েছে খুলে বল। মেয়েটি যা বলল তাতে জানা গেল, গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পথে একদল সন্ত্রাসী সুমাইয়ার মুখে এসিড নিক্ষেপ করেছে। সে এখন হাসপাতালে। একথা শুনে খাদীজা ভয়ে কেঁপে উঠল। পর্দাহীনতার পরিণামে যে কত রকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে-এ ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হয় খাদীজা। হাসপাতালে পৌঁছে নার্সের কাছ থেকে রুম নম্বর জেনে নিয়ে সেই রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুমের দরজা খুলেই চোখ পড়ে মালীহা, আরীফার দিকে। কাছে গিয়ে দেখে সুমাইয়ার মুখের এক পাশের বেশ কিছু অংশের চামড়া সম্পূর্ণ ঝলসে গেছে। খাদীজাকে দেখে সুমাইয়া কেঁদে ফেলে। খাদীজা সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না। সুমাইয়া খাদীজাকে বলে, আমি অন্যায় করেছি। সেরে উঠলে আমিও বোরকা পরেই কলেজে যাব। সাথে সাথে মালীহা আর আরীফাও বলে উঠল, শুধু তুই কেন, আমরাও যাব। আনন্দে খাদীজার চোখে পানি এসে যায়। বলে, তোদের নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। আজ তা পূরণ হ'ল। অতঃপর খাদীজা ওদের জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করল, হে আল্লাহ! ওদের তুমি হেদায়াত দান কর! ওদের সকলের চোখে আনন্দের ঝিলিক, দুর্লভ কিছু খুঁজে পাওয়ার আনন্দ আর বুকে একটি সোনালী সুন্দর সমাজ গঠনের দুর্বার আকাঙ্খা।
শিক্ষা: প্রত্যেক ঈমানদার নারীর উচিৎ হবে পর্দা সহকারে চলাফেরা করা এবং সেই সাথে পুরুষদের কাজ হবে মহিলাদেরকে পর্দা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা ও নিজেদের দৃষ্টিকে অবনমিত রাখা। ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি সামাজিক অপরাধ থেকে নারীকে বাঁচাতে হিজাব অতীব গুরুত্বপূর্ণ।