📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 প্রত্যেক বস্তু তার মূলের দিকেই ফিরে যায়

📄 প্রত্যেক বস্তু তার মূলের দিকেই ফিরে যায়


আরবের কোন এক পাহাড়ী অঞ্চলে একদল দস্যু একটি পাহাড়ের শীর্ষদেশে বসবাস করত। কোন কাফেলা ঐ পথে যাত্রা করলেই তারা তাদের উপর চড়াও হ'ত। লুট করে নিত তাদের সমুদয় সম্পদ। আক্রমণ করত পথচারীদের উপর। এদের ভয়ে শহরের জনসাধারণ সর্বদা তটস্থ থাকত। কারণ তারা পর্বতশৃঙ্গে নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছিল। আর এজন্যই রাজার সেনাবাহিনীও এদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। ঐ অঞ্চলীয় রাষ্ট্র প্রশাসন দস্যুদের কবল থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য পরামর্শ করল। কেউ কেউ বলল, দস্যুদল এভাবে যদি আর কিছুকাল অবস্থান করে তবে এদের সঙ্গে যুদ্ধ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কবি বলেন,
'যে বৃক্ষ সবেমাত্র গেড়েছে শিকড়
উপড়াতে পারবে কেহ দিয়ে স্বল্প জোর।
ঐ অবস্থায় রাখে যদি আর কিছুকাল
জন্মেও পারবে না তুলতে, হবে বিফল।
অল্প পানির গতি বন্ধ কর থোড়া চীযে
পূর্ণ জোরে চললে হস্তিও ভেসে যাবে নিজে'।
অতঃপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের অনুসন্ধান করার জন্য একজন গুপ্তচর ঠিক করা হ'ল। যে সব সময় তাদের দিকে নযর রাখত। একদা দস্যুদল কোন এক কাফেলার উপর আক্রমণ করতে গেলে তাদের আস্তানা সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায়। এ সংবাদ অবহিত হয়ে যুদ্ধে পারদর্শী কয়েকজন বীরপুরুষকে তথায় পাঠানো হয়। তারা পাহাড়ের বিভিন্ন গুহায় আত্মগোপন করে ওঁৎ পেতে থাকে। গভীর রাতে দস্যুদল লুট করে মালামাল নিয়ে ফিরে এসে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে। আর এ নিন্দ্রাই হয় তাদের কাল।
যখন রাত্রি আরো গভীর হ'ল। দস্যুদলও ঘুমে বিভোর। তখন বীর সিপাহীগণ তাদের গুপ্তঘাঁটি আক্রমণ করল এবং এক এক করে সকল দস্যুর হস্ত কাঁধে বেঁধে ফেলল। সকাল বেলা তাদের সবাইকে রাজদরবারে উপস্থিত করা হ'ল। রাজা বিনাদ্বিধায় তাদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিলেন।
দেখা গেল তাদের মধ্যে একজন সুন্দর যুবক রয়েছে, যে কেবলমাত্র নব যৌবনে পদার্পণ করেছে। তার গণ্ডদেশ কানন কেবলমাত্র নতুন সবুজ মেলায় ভরে উঠেছে। জনৈক মন্ত্রী উক্ত যুবকের জন্য সুফারিশ করে বললেন, হে সম্রাট! এই সুন্দর ছেলেটি তার জীবন কানন হ'তে এখনও কোনরূপ ফল ভোগ করেনি। তার নব যৌবন হ'তে উপকৃত হয়নি। সম্রাটের উন্নত স্বভাব ও দানশীলতায় আমি আশাবাদী, অনুগ্রহ করে তার খুন মাফ করে দিয়ে অধমের উপর অনুকম্পা করবেন। বাদশাহ মন্ত্রীর কথা শুনে বিমুখ হ'লেন এবং তাঁর রায়ের অনুকূল না হওয়ায় বললেন,
'কু-জাত লভেনা কভু সুজনের শিক্ষা
গোলের উপর গোল যেন অযোগ্যের দীক্ষা'।
এদের বংশ-বুনিয়াদ নির্মূল করাই উত্তম। কেননা অগ্নি নির্বাপিত করে আংটা রাখা, সাপ মেরে উহার বাচ্চা পালন করার ন্যায়, যা জ্ঞানীদের কাজ নয়।
'মেঘে যদি দেয় ঢেলে হায়াতের পানি
ঝাউ গাছে ফুল কভু পাবে নাকো জানি।
দুষ্টের সাথে কাল কর না ক্ষেপণ
নলখাগড়া হ'তে চিনি পাবে না কখন'।
মন্ত্রী বাদশার এসব কথা শ্রবণ করলেন। সুন্দর অভিমতের জন্য বাদশাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং বললেন, বাদশাহ যা বলেছেন সম্পূর্ণ সত্য। তবে ছেলেটি এখনও ছোট। যদি সে ঐসব দস্যুদের শিক্ষা পেত তবে তাদের আচরণ গ্রহণ করতো এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত হ'ত। অধম বান্দার অভিলাষ এই যে, সে সৎ লোকদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। চরিত্রবান হবে। কারণ দস্যুদের সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহী আচরণ এখনো হয়ত তার অন্তরে প্রোথিত হয়নি। হাদীছে বর্ণিত আছে, 'প্রতিটি সন্তান ইসলামী ফিরাতের উপর জন্ম লাভ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী-নাছারা বা অগ্নিপূজক বানায়'। মন্ত্রী তার উক্তির পিছনে এই সব যুক্তি পেশ করলেন।
'নূহ (আঃ) পুত্র যখন বদের সঙ্গী হ'ল
নবুঅতী বংশ তাঁর ধ্বংস হয়ে গেল।
গুহাবাসীদের কুকুর দেখ মাত্র কয়েকটি দিন
পুণ্যবানদের অনুসরণে হইল মানবাধীন'।
মন্ত্রী একথা বলার পর বাদশাহ্র নিকটজনদের মধ্য হ'তে আরো কিছু লোক মন্ত্রীর সাথে সুফারিশে শরীক হ'লেন। তখন বাদশা এই বলে তার খুন মাফ করে দিলেন যে, ক্ষমা করে দিলাম, কিন্তু ভাল মনে করলাম না।
'জান না কি বলেছিল মহিলাটি বীর রোস্তমকে
নিরুপায় নিকৃষ্ট জান না কভু শত্রুকে।
বহু দেখেছি অল্প পানির স্বল্প স্রোতের টানে
প্রবল হ'লে উট বোঝা ভেসে গেছে বানে'।
অতঃপর মন্ত্রী তার দলবলসহ ছেলেটিকে মহাআনন্দ ও পুরস্কারের সাথে বের করে নিয়ে এলেন। তার শিক্ষার জন্য একজন উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করা হ'ল। সুন্দর বক্তব্য, প্রশ্নের জবাব, বাদশাহ্ খেদমতে আদব ইত্যাদি বিষয় তাকে বিশেষভাবে শিক্ষা দেয়া হ'ল। সকলের দৃষ্টিতে ছেলেটি আদরের পাত্রে পরিণত হ'ল। একদা মন্ত্রী বাদশাহর খেদমতে তার সৎ চরিত্র বিষয়ে বলতে গিয়ে বললেন, জাঁহাপনা! জ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তার জন্মগত পুরাতন অজ্ঞতা বিদূরিত হয়েছে। বাদশাহ এটা শুনে মুচকি হেসে বললেন,
'সিংহ শাবক পরিশেষে সিংহ হয়ে যায়
যদিও মানুষের সাথে বুযরগী সে পায়'।
দু'বৎসর এভাবেই কেটে গেল। ইতিমধ্যেই মহল্লার একদল দুর্বৃত্ত তার সাথে মিলিত হয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন এঁটে নিল। তাদের প্ররোচনায় ছেলেটি বাপ- চাচাদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সংকল্পবদ্ধ হ'ল। একদা সুযোগ বুঝে মন্ত্রী ও তার দুই পুত্রকে হত্যা করল এবং বহু সম্পদ লুটে নিয়ে সেই পুরাতন পর্বত গুহায় গিয়ে পিতার স্থলাভিষিক্ত হ'ল। এ সংবাদ পেয়ে বাদশাহ পরিতাপের সাথে দাঁত দিয়ে আঙ্গুল কামড়াতে কামড়াতে বললেন,
'কাঁচা লোহায় পাকা অস্ত্র বানায়না কেউ কভু
অমানুষকে শিক্ষা দিলেই হয়না মানব তবু
পাক বৃষ্টির পানিতে ভাই নাইকো কোন নাশ
ফুল বাগানে ফুল ফোটে আর পতিত যমীনে ঘাস'।
'কু-লোকের ভাল করা জানিবে কেমন
সু-লোকের মন্দ করার পরিণাম যেমন'।

শিক্ষা: ইল্লত যায় না ধুলে, আর খাছলত যায় না মলে।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 গুপ্তধন

📄 গুপ্তধন


জনৈক ব্যক্তি স্ত্রী, তিন পুত্র ও এক কন্যা রেখে মারা যান। ছেলেরা সবাই বিবাহিত। মেয়ের বিয়ে আগেই হয়েছে। তারা সবাই সন্তান-সন্ততির মা-বাবা হয়েছে। পিতার মৃত্যুর পরে গ্রামের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে ছেলেরা পৃথক হয়ে যায়। ছোট ছেলের মায়ের প্রতি একটু বেশি ভালবাসা বুঝে মা ছোট ছেলের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
মায়ের সোনার চুড়ি পরার খুব সখ ছিল। স্বামী তার সে সখ পূরণ করতে পারেননি। তাই ছোট ছেলে মাকে সোনার চুড়ি বানিয়ে দেয়। মা এতে ভীষণ খুশী হন। ছোট ছেলে মাকে আদর-যত্নে রাখে। এভাবে কিছুদিন যাবার পর ছোট ছেলের বউ শাশুড়ীকে বলে, 'মা তোমার বিষয়-সম্পত্তি তোমার ছোট ছেলেকে লিখে দাও, আমরা তোমাকে বরাবর এভাবে দেখব'। ছেলে ও বউ-এর ব্যবহারে মা প্রীত হয়ে তার যাবতীয় সম্পত্তি ছোট ছেলেকে লিখে দেন। তার ধারণা যে, তিনি বেশি দিন বেঁচেও থাকবে না।
মানুষের চরিত্র বড়ই জটিল ও দুর্বোধ্য। যাকে অতি সৎ লোক মনে করা হচ্ছে, সে-ই একদিন এমন এক অপকর্ম করে বসে, যার ফলে তার দীর্ঘদিনের সুনাম নিমেষে শেষ হয়ে যায়।
মা প্রতি রাতে চুড়িগুলি খুলে রেখে ঘুমান। সকালে আবার পরেন। একদিন তিনি চুড়ি পরতে ভুলে যান। যখন মনে পড়ে, তখন আর চুড়িগুলি পান না। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মা চুড়িগুলি না পেয়ে কান্না শুরু করে দেন। মা বলেন, 'বউ ছাড়া এ ঘরে তো আমি আর কাউকে কখনও আসতে দেখিনি'। শাশুড়ীর কথায় বউ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং বলে, আমিই কি তাহ'লে চুড়িগুলি চুরি করেছি। আমার কথায় স্বামী তোমাকে চুড়ি বানিয়ে দিয়েছে। আর এখন আমি চোর হ'লাম। মা বললেন, আমি তোমাকে চোর বলিনি। তুমি ছাড়া আমি তো আর কাউকে এ ঘরে আসতে দেখিনি। তুমি চুড়ি নাওনি, তবে চুড়িগুলি গেল কোথায়? ছেলে মা-বউ এর কথা কাটাকাটি থামাতে ব্যর্থ হ'ল। কথা কাটাকাটি চরমে উঠলে মা বললেন, তোমরা আমার বিষয়-আশয় হস্তগত করার কুমতলবে আমাকে আদর-যত্ন করেছ এবং চুড়িগুলিও বানিয়ে দিয়েছ। তোমরা না সরালে চুড়িগুলি কি উড়ে গেল? আমার বিষয়-আশয় আমাকে ফিরিয়ে দাও। আমি এ বাড়ীতে আর একদণ্ডও থাকব না। মা বাড়ী হ'তে বের হয়ে গেলে বউ বলে, তোমার পরামর্শে চুড়িগুলি সরিয়ে আমি ভাল কাজ করিনি। ছেলে বলে, আস্তে বল, লোকে শুনতে পাবে।
মা বাড়ী থেকে বের হয়ে বড় ছেলের বাড়ীতে গিয়ে উঠেন। বড় ছেলেকে অতি অনুনয়ের সুরে বলেন, 'বাবা! তুই আমার বড় ছেলে। তুই আমাকে একটু আশ্রয় দে বাবা। আমি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকব। তোরা যা খাবার দিবি, তাই খাব। কোন আবদার ও অভিযোগ করব না'। ছেলে ও বউ একই সাথে বলে উঠল, 'তুমি বিষয়-আশয় সব ছোট ছেলেকে দিয়ে এখন আমাদের ঘাড়ে চাপতে চাও। তা হবে না। আমরা তোমাকে রাখতে পারব না।
ছেলে ও বউয়ের কাটা জবাব পেয়ে মা কাঁদতে কাঁদতে মেজ ছেলের বাড়ীতে গিয়ে উঠেন। সেখানেও একই পরিস্থিতি। অগত্যা মা তার শেষ ভরসাস্থল মেয়ের বাড়ীতে আশ্রয়ের জন্য যান। সেখানেও তার ভাগ্যে জোটে একই বিড়ম্বনা। মেয়ে-জামাই ছোট ছেলেকে বিষয়-আশয় লিখে দেবার খবর জেনেছে। তাই তারা বলে উঠে, বিষয়-আশয় একজনকে দিয়ে আমাদের এখানে কেন এসেছ? আমরা তোমাকে রাখতে পারব না'।
মা কেঁদেকেটে পথে এসে দাঁড়ান। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে ভিক্ষা করে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে কিছুদিন কেটেও যায়। একদিন এবাড়ী ওবাড়ী ঘুরে ক্লান্ত হয়ে তিনি একটি গাছের নীচে ঘুমিয়ে পড়েন। এমন সময় এক পরিচিত কণ্ঠের চাচী ডাকে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে জেগে তিনি সামনে আব্দুল্লাহকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। স্বামীর বর্তমানে আব্দুল্লাহ তার বাড়ীর দীর্ঘদিনের কাজের ছেলে। সন্তানের স্নেহে মা তাকে নিজ সন্তানদের সাথে মানুষ করেছে। আব্দুল্লাহ বড় হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজ উপলক্ষ্যে সে বাইরে ছিল। তাই তার চাচীর বর্তমান হাল-চাল জানা ছিল না। আব্দুল্লাহ চাচীকে সান্ত্বনা দিয়ে তার বাড়ীতে নিয়ে যায় এবং আদর-যত্নে রাখে। এভাবে কিছুদিন কেটে গেলে একদিন আব্দুল্লাহ শক্ত করে বাঁধা একটি পুঁটলি এনে চাচীকে দিয়ে বলে, এই পুঁটলির মধ্যে কিছু গুপ্তধন রয়েছে। আপনি পুঁটলিটা কখনও খুলবেন না। মরার আগে এর সম্পদ ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিবেন'। আব্দুল্লাহ বুঝেছিল যে, গুপ্তধনের লোভে ছেলেরা মাকে ফিরিয়ে নিতে আসবে। তাই পুঁটলির ব্যাপারে সতর্ক করে দিল এবং তার কথামত অটল থাকতে বলল।
মায়ের হাতে গুপ্তধন আছে জেনে ছেলে-মেয়ে সবাই স্বামী-স্ত্রীতে পরামর্শ করল। অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্ত নিল যে আগে মাকে আনবে, সেই গুপ্তধন পাবে। তাই সবাই সবার আগে মাকে আনতে গেল। ফলে একই দিনে এমনকি একই সময়েই সবাই মাকে আনতে হাযির হ'ল। সবাই জোর দাবী করল সে-ই মাকে নিয়ে যাবে। সবার দাবী দেখে মা বলল, 'আমি কারো বাড়ীতে স্থায়ীভাবে থাকব না। পালাক্রমে সকলের বাড়ীতে থাকব। আর মরার আগে আব্দুল্লাহ্ দেওয়া ধন সবাইকে সমান ভাগে ভাগ করে দিব।
মায়ের কথায় সবাই রাযী হয়ে মাকে নিয়ে এল। মা তখন খুবই আদর-যত্নে রইল। কিন্তু মৃত্যু কাউকেও অবকাশ দেয় না। মায়ের ভাগ্যে এই সুখ বেশিদিন সইল না। একদিন মা মৃত্যুবরণ করলেন।
মায়ের মৃত্যুর পর ছেলেরা যখন পুঁটলিটা খুলে সম্পদ ভাগ করে নিতে যাবে, ঠিক সে সময় আব্দুল্লাহ এসে হাযির। সে বলল, ঐ পুঁটলির মধ্যে কোনই ধন নেই। তোমরা সম্পদের লোভী বুঝে আমি এই বুদ্ধি খাঁটিয়েছি। তোমরা মায়ের প্রতি মোটেই দায়িত্ব পালন করনি। তোমাদের এ পাপের ক্ষমা হবে কি-না কে জানে?
ছেলেরা বুঝল, তারা সত্যিই মায়ের প্রতি গর্হিত আচরণ করেছে। তারা এও বুঝল যে, সম্পদের লোভে তারা তো মাকে ভালই যত্ন করেছে। এরূপ আচরণ করা তাদের পূর্বেই উচিত ছিল। মায়ের প্রতি অন্যায় আচরণের জন্য তারা অনুতপ্ত হ'ল এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র দরবারে এর জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাইল।

শিক্ষা: পিতা-মাতাকে দেখাশুনা করা ও তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা সন্তানের অবশ্য কর্তব্য। পার্থিব কোন লোভের জন্য নয়; বরং জান্নাত লাভের আশায় তারা এ দায়িত্ব পালন করবে।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 কৃপণ ও নিঃস্ব

📄 কৃপণ ও নিঃস্ব


অনেক দিন আগের কথা। আরব দেশে ছিল এক কৃপণ ব্যক্তি। তার ধন- সম্পদ ছিল অঢেল। হঠাৎ একদিন কোথাও যাওয়ার পথে তার একটা থলে হারিয়ে গেল। পথ চলার সময় এক নিঃস্ব ব্যক্তি থলেটি পেলেন। গরীব হ'লে কি হবে লোক হিসাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও আল্লাহভীরু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি থলের প্রকৃত মালিক ঐ কৃপণ ধনাঢ্য ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়ে তার টাকা তাকে ফেরত দিলেন। টাকা পেয়ে তো সে খুশীতে আটখানা। হঠাৎ তার মাথায় চিন্তা ঢুকল যে, লোকটি যে এত কষ্ট করে থলেটি আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছে তাই তাকে অবশ্যই কিছু বখশীশ দিতে হবে। কিন্তু কৃপণতাহেতু বখশীশ না দেয়ার জন্য সে কূটবুদ্ধি আঁটল। নিঃস্ব লোকটিকে অপবাদের স্বরে বলল, 'থলেতে তো ২০২০ দিরহাম ছিল। আপনি তা থেকে ২০ দিরহাম নিয়েছেন। তাই আর কোন বখশীশ দিতে পারছি না। আপনার জন্য ঐ ২০ দিরহামই যথেষ্ট'।
লোকটি তার এ কথায় অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে কৃপণের বিরুদ্ধে কাযীর আদালতে মানহানির অভিযোগ ঠুকলেন। বিচারক কৃপণকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার থলেতে কত টাকা ছিল? উত্তরে সে বলল, ২০২০ দিরহাম। আবার জিজ্ঞেস করলেন, এখন কত আছে? সে বলল, ২০০০ দিরহাম, বাকী ২০ দিরহাম ঐ ব্যক্তি নিয়েছে। এবার বিচারক নিঃস্ব ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সত্যিই থলে থেকে ২০ দিরহাম নিয়েছেন? উত্তরে তিনি বললেন, এ ধরনের কোন ইচ্ছা যদি আমার থাকত, তাহ'লে পথে কুড়িয়ে পাওয়া থলেটি আমি তাকে কোন দুঃখে ফেরৎ দিলাম। সততার কারণেই অনেক খোঁজাখুঁজি করে থলের মালিককে তা ফিরিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ্ শপথ! থলে থেকে আমি এক দিরহামও নেইনি।
বিজ্ঞ বিচারক উভয়ের বক্তব্য শুনে দুষ্ট কৃপণ লোকটির উদ্দেশ্যে বললেন, আপনি যেহেতু বলছেন আপনার থলেতে ২০২০ দিরহাম ছিল, আর উনি থলেতে পেয়েছেন ২০০০ দিরহাম। কাজেই থলেটি আপনার নয়, অন্য কারো হয়ে থাকবে। অতঃপর তিনি নিঃস্ব সৎ লোকটিকে বললেন, আপনি যদি এক বছরের মধ্যে থলের প্রকৃত মালিককে খুঁজে পান তাহ'লে তা তাকে ফেরত দিবেন। আর না পেলে আপনি নিজেই তা গ্রহণ করবেন।
কাযী ছাহেবের কথা শুনে কৃপণ তার মিথ্যা বলার দোষ স্বীকার করে পুনরায় থলে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালালো। কিন্তু বিচারক তার কোন কথাই আর শুনলেন না।

শিক্ষা: কৃপণতা মানুষের মন্দ স্বভাব। কৃপণতা সম্পদ বাড়ায় না বরং কমায়। তাই সর্বদা কৃপণতা বর্জন করা উচিত।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 পান্থশালা

📄 পান্থশালা


আল্লাহ পাক সময় সময় দুনিয়ার ধন-সম্পদে বিভোর মানুষকে ধন-সম্পদের মোহ হ'তে ফিরানোর জন্য কিছু অসীলা করে থাকেন। বলখী বাদশাহ ইবরাহীম বিন আদম প্রথম জীবনে আল্লাহওয়ালাই ছিলেন। কিন্তু পরে ধন-সম্পদের মোহে তিনি সে পথ হ'তে কিছুটা সরে যান। একদিন তাঁর রাজদরবারে এক অপরিচিত ব্যক্তির আগমন ঘটে। লোকটি রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমি এই পান্থশালায় রাত্রি যাপন করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কথার প্রতিবাদ এল- 'আপনি সম্ভবতঃ ভুল করছেন, এটা রাজদরবার, পান্থশালা নয়'। আগন্তুক ব্যক্তি বললেন, 'অবশ্যই এটা পান্থশালা'। এমন সময় বাদশাহ দরবারে এসে বিতর্ক শুনলেন। তিনি একটু ধমকের সুরে আগন্তুককে বললেন, 'এটা রাজদরবার, কস্মিনকালেও পান্থশালা নয়'।
আগন্তুক বললেন, 'আপনার আগে এখানে কে বাস করতেন'? উত্তর এল, 'আমার আব্বা'। আপনার পরে কে বাস করবে'? উত্তর এল, 'আমার ছেলে'? এবার আগন্তুক ব্যক্তি বললেন, 'তাহ'লে এখানে কেউই স্থায়ী হয়ে বাস করতে পারছেন না। আপনার আগে আপনার পিতা বাস করেছেন, এখন আপনি বাস করছেন, পরে আপনার ছেলে বাস করবে। অতএব এটা অবশ্যই পান্থশালা'। এবার বাদশাহ্ চৈতন্যোদয় হ'ল। তিনি বুঝলেন, সকলেই পান্থশালার বাসিন্দা। এরপর তিনি এক রাতে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে অজানার পথে পা বাড়ালেন।

শিক্ষা : পার্থিব জগত ক্ষণিকের নীড়। কেউ এখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে এ জগতের মায়া-মরীচিকা ছেড়ে না ফেরার দেশে। সুতরাং দুনিয়াবী শান-শওকত নিয়ে মদমত্ত থাকার কোন অর্থই হয় না। ক্ষণিকের এই সময়টুকু পরকালীন সঞ্চয়ে ব্যয় করাই আমাদের একমাত্র কর্তব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00