📄 যোগ্য পাত্র নির্বাচন
সুলতান ইবরাহীম বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বয়সের ভারে ন্যুজ। ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়লেন তিনি। সুলতান বুঝতে পারলেন, তাঁর দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাঁর চিন্তা যে, একমাত্র কন্যা জাহানারার এখনও বিয়ে হয়নি। রাজকন্যা সুন্দরী, তার বিয়ের বয়স হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকেই তাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু তার যোগ্য বর আজও খুঁজে পাননি সুলতান। একদিন সুলতান কন্যা জাহানারাকে ডেকে বললেন, মা, এবার আমি তোমার বিয়ে দেব। রাজকন্যা বললেন, কিন্তু তুমি কিভাবে বর নির্বাচন করবে বাবা?
সুলতান বললেন, আমার কোন পুত্রসন্তান নেই। তোমার স্বামীই হবে আমার এই রাজ্যের ভাবী সুলতান। যে ভালভাবে রাজ্য শাসন করতে পারবে এবং প্রজাপালন করতে পারবে আমি তার সঙ্গেই তোমার বিয়ে দেব।
রাজকন্যা বললেন, কিন্তু তুমি কিভাবে যোগ্য বরকে নির্বাচন করবে?
সুলতান বললেন, সে ব্যবস্থা আমি করব। আগে যারা রাজকন্যার বিয়ের জন্য এসেছিল, তাদের মধ্যে তিনজনকে যোগ্য বর হিসাবে মনে মনে বাছাই করেছিলেন সুলতান। তিনি একদিন দূত পাঠিয়ে তিনজন যুবরাজকে ডেকে আনলেন রাজসভায়। তিনজন যুবরাজই ছিলেন বয়সে যুবক এবং বীর। তাদের নাম ছিল খালিদ, যুবায়ের ও ছাবিত। তিনজনই ছিল দেখতে সুদর্শন এবং আচরণ ও কথা-বার্তায় ভদ্র।
রাজকন্যা বুঝে উঠতে পারল না, সে কিভাবে এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে তার স্বামী হিসাবে বাছাই করবে। তাই সে তার বাবার উপর বর নির্বাচনের ভারটা ছেড়ে দিল।
যুবরাজ তিনজন সুলতানের সামনে হাযির হ'লে সুলতান বললেন, আমি তোমাদের ডেকে পাঠিয়েছি। কারণ, আমি এবার আমার কন্যাকে পাত্রস্থ করতে চাই।
যুবরাজ তিনজন হাসিমুখে মাথা নত করল।
সুলতান বললেন, তোমরা তিনজন আমার রাজ্য শাসনের উপযুক্ত। ভবিষ্যতে তোমরা সুলতান হ'তে পার। কিন্তু তোমাদের মধ্যে একজনের হাতে আমার কন্যাকে অর্পণ করতে হবে। তাই আমি তোমাদের তিনজনের মধ্যে একজনকে নির্বাচন করার জন্য একটি পরিকল্পনা করেছি। আজ পূর্ণিমা। আজই তোমাদের এক মাসের জন্য দেশ ভ্রমণে পাঠাতে চাই। আজ হ'তে ঠিক এক মাস পরে পূর্ণিমায় তোমরা সফর শেষে ফিরে আসবে এই রাজসভায়। তোমরা প্রত্যেকেই রাজকন্যার উপযুক্ত বিবেচনা করে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার নিয়ে আসবে। সে উপহারের গুণাগুণ বিচার করেই তোমাদের যোগ্যতা নির্ণয় করা হবে। যুবরাজ তিনজন আশান্বিত হয়ে সেদিনই দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল।
চোখের পলকে একটি মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। পরের মাসে আবার পূর্ণিমা এল। পূর্ণিমার দিন সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ উঠতেই সুলতানের প্রাসাদ দ্বারে যুবরাজদের আগমন বার্তা ঘোষণা করা হ'ল। আলোকমালা ও ফুল দিয়ে সজ্জিত করা হ'ল সমস্ত প্রাসাদ।
সুলতান প্রথমে যুবরাজ খালিদকে ডেকে বললেন, তুমি আমার কন্যার জন্য কি উপহার এনেছ? যুবরাজ খালিদ নতজানু হয়ে একটি বড় থলে থেকে অনেক বড় বড় মূল্যবান জিনিস বের করল। তারপর সুলতানকে বলল, এগুলি সবচেয়ে দামী হীরা, মুক্তা, পান্না ও চুন্নি। এগুলি বিভিন্ন দেশ ঘুরে বাছাই করে এনেছি। এগুলি দিয়ে রাজকন্যার জন্য একটি মুকুট, গলার হার, হাতের বালা আর আংটি বানাতে চাই। হাসিমুখে খুশি হয়ে মাথা নত করল রাজকন্যা জাহানারা। কিন্তু সুলতান কোন কথা বললেন না।
এবার সুলতান যুবরাজ যুবায়েরকে ডেকে বললেন, তুমি কি উপহার এনেছ? যুবায়ের বলল, 'আমি একটি বন্দুক এনেছি। এটি এক শক্তিশালী অস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়ে অনায়াসে এবং অব্যর্থভাবে লোক মারা যায়। এই অস্ত্র কাছে থাকলে বাইরের কোন শত্রু ভয়ে পা দেবে না আপনার রাজ্যের ত্রিসীমানায়। আপনি এর দ্বারা অনেক দেশ জয় করতেও পারেন। আপনি হয়ে উঠতে পারেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিজয়ী রাজা।
যুবরাজ যুবায়েরের কথা শুনে রাজকন্যা কেঁপে উঠলেন ভয়ে। সুলতান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নীরবে। কিন্তু রাজসভায় উপস্থিত লোকদের মুখগুলি উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এবার যুবরাজ ছাবিতকে ডাকলেন সুলতান। লজ্জাবনত মুখে সুলতানের সামনে খালি হাতে এসে দাঁড়াল যুবরাজ ছাবিত। সে বলল, ক্ষমা করবেন সুলতান, আমি রাজকন্যার জন্য কোন উপহার আনতে পারিনি।
সুলতান আশ্চর্য হয়ে বললেন, সে কি? কোন উপহারই আননি?
ছাবিত বলল, আমি রাজকন্যাকে বিয়ে করতে চাই। অথচ তার জন্য কোন উপহার না আনতে পারায় সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু এই একটি মাস আমি কাজে এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, কোন উপহার যোগাড় করার ফুরসৎ পাইনি। একথার অর্থ বুঝতে না পেরে সুলতান বললেন, কি কাজে তুমি এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে?
ছাবিত বলল, আমি আপনার রাজসভা থেকে বেরিয়ে দেশ ভ্রমণে যাবার সময় পথে এক মুমূর্ষু পথিককে দেখতে পাই। তার গা থেকে রক্ত ঝরছিল। সর্বাঙ্গ ছিল ক্ষত-বিক্ষত। আমি তা দেখে চলে যেতে পারলাম না। তার সেবা-শুশ্রুষা করলাম। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে দু-একদিন পর আবার পথ চলতে শুরু করলাম। কিন্তু কিছুদূর যেতেই দেখলাম, একদল নারী ও শিশু ভয়ার্ত অবস্থায় গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। কারণ জিজ্ঞেস করে জানলাম, একদল জলদস্যু নদী পথে এসে তাদের গ্রাম লুণ্ঠন করেছে, গ্রামের বেশির ভাগ পুরুষকে হত্যা করেছে, তাদের ধন-সম্পদ সব ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এবং আবার আসবে বলে ভয় দেখিয়ে গেছে। আমি তাদের বুঝিয়ে গ্রামে ফেরত নিয়ে গেলাম। দেখলাম গ্রামের অল্পসংখ্যক লোক যারা বেঁচে আছে তারা জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াই করতে চায়। কিন্তু কোন যোগ্য নেতা না থাকায় মনোবল পাচ্ছে না। আমি সে সব নিঃস্ব অসহায় ও ভীত-সন্ত্রস্ত লোকদের ফেলে চলে আসতে পারলাম না। তাদের সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ করে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলাম। জোর লড়াই করে জলদস্যুদের ঘায়েল করে গ্রাম থেকে চিরদিনের মত বিতাড়ন করলাম।
তারপরও অনেক কাজ ছিল। আহতদের চিকিৎসা, বিধবা ও শিশুদের পুনর্বাসন প্রভৃতি কাজগুলি সারতে আমার বেশ কিছুদিন দেরি হয়ে গেল। কাজের চাপে আমি উপহারের কথা, রাজকন্যার কথা সব ভুলে গেলাম। হঠাৎ একদিন আকাশে চাঁদ দেখে পূর্ণিমার কথা মনে পড়ে গেল। তাই ক্ষমা চাইতে এলাম। আমাকে ক্ষমা করবেন সুলতান।
যুবরাজ ছাবিতের কথা শুনতে শুনতে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন বৃদ্ধ সুলতান। তিনি যখন চোখ তুললেন তখন দেখা গেল, চোখের পানিতে ঝাপসা হয়ে গেছে তার দৃষ্টি। রাজকন্যার চোখও পানিতে ছলছল।
সুলতান যুবরাজ ছাবিতকে তার কাছে ডাকলেন। যুবরাজের একটি হাত ধরে হাসিমুখে বললেন, এই মহান যুবরাজ রাজকন্যার জন্য উপহার না নিয়ে এলেও এ হাতে ফুটে আছে জনসেবার অনেক অমূল্য নিদর্শন। আমি তারই হাতে তুলে দেব আমার কন্যাকে। এই মহানহৃদয় পরোপকারী যুবরাজই হবে আমার রাজ্যের উপযুক্ত শাসক।
শিক্ষা: অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা-প্রভাব দেখে নয়, চরিত্রবান পাত্র দেখে কন্যাকে বিয়ে দিতে হবে।
📄 একজন পরোপকারী অফিস প্রধান
আব্দুল হালীমের স্ত্রী রাবেয়া একজন বিদুষী, পতিপরায়ণা এবং অন্যান্য সদগুণে গুণান্বিতা নারী। আব্দুল হালীমও একজন চরিত্রবান যুবক। সে যে অফিসে কাজ করে সে অফিসের অন্যান্য ব্যক্তি ও কর্মচারীরাও সৎ এবং মানবদরদী। কর্তব্যে তাকে কোন দিন অবহেলা করতে দেখা যায় না। এজন্য অফিস প্রধান তার প্রতি অতি প্রসন্ন।
আব্দুল হালীমের বিবাহিত জীবনের ছ'বছর পর তাদের ঘরে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। ফলে তাদের নিরাশার জীবনে আশার সঞ্চার হয়।
সদা প্রফুল্ল এবং কাজে একনিষ্ঠ আব্দুল হালীমকে সন্তান লাভের পর আর পূর্বের মতো দেখা যায় না। তার হাসিমুখে বিষাদের ছায়া বিরাজমান। সে যেন বড় রকমের কোন এক দুর্বিষহ যন্ত্রণায় ভুগছে। সে সত্যি সত্যি একটি যন্ত্রণার শিকার। তার সন্তানটি হার্টে একটি ছিদ্র নিয়ে জন্মেছে। ফলে সে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না। হার্ট অপারেশন ছাড়া এর কোন বিকল্প নেই। আর এ কাজে অন্ততঃ ৩/৪ লাখ টাকা প্রয়োজন। এ অপারেশন দেশেও হবে না। এতো টাকা আব্দুল হালীমের নেই এবং এতো টাকার সম্পদও নেই। তাই তার মুখমণ্ডলে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।
স্ত্রী রাবেয়া এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, এতো টাকা সংগ্রহ করা তাদের সামর্থ্যের বাইরে। তাই চিকিৎসার অভাবে তাদের বহুদিনের প্রত্যাশিত ধনকে ধুকে ধুকে তার চোখের সামনে মৃত্যুবরণ করতে হবে ভেবে সে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়।
আব্দুল হালীমের বোন তাসনীম ভাইয়ের বাসায় থেকে লেখাপড়া করে। ভাইয়ের আশা বোন উচ্চশিক্ষিতা হ'লে তাকে একজন ভাল পাত্রের হাতে তুলে দিবে। তাসনীম শিশুটির অবস্থা প্রত্যহ প্রত্যক্ষ করছে। তাই সে একদিন ভাবীকে ডেকে বলল, 'ভাবী, আমি আর পড়াশুনা করব না। বাড়ী চলে যাব'। হঠাৎ করে ভাবী তার এরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলে, 'আমি তোমাদের আর খরচ বাড়াতে চাই না। তোমরা আমার জন্য যে খরচ কর, তা বাঁচিয়ে শিশুটির চিকিৎসা করে তাকে সুস্থ করে তোল'।
ভাবী তাকে তার এ সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করতে বলে এবং বলে, 'তুমি এ সিদ্ধান্ত তোমার ভাইকে কখনো বলো না। তাহলে তিনি দারুণ কষ্ট পাবেন। আমরা নিশ্চিত ধরে নিয়েছি, আমরা তাকে সুস্থ করে তুলতে পারব না। তার মৃত্যু অবধারিত। কারণ চিকিৎসার অত টাকা আমরা কোথায় পাব'?
রাবেয়ার শাশুড়ীর নামে কিছু সম্পত্তি আছে। নাতির চিকিৎসার জন্য তিনি তা বিক্রি করে দিতে চান। কিন্তু আব্দুল হালীম তাতে সম্মত নয়। কারণ সে সম্পত্তির উৎপন্ন ফসলে মাতা-পিতার কোনমতে দিন কাটে। তাছাড়া সে সম্পত্তি বিক্রি করেও চিকিৎসার পুরো খরচ জোগাড় হবে না।
একদিন অফিসের প্রধান কর্মকর্তা আব্দুল হালীমকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে তার এ মানসিক পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। আব্দুল হালীম অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সন্তানের বিষয়টি তাঁকে অবহিত করেন। তার বস তাকে বলেন, 'আমরা সকলে মিলে তোমার সন্তানের চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্য করব এবং প্রয়োজনে ভিক্ষা চাইব। একটি নিষ্পাপ শিশুকে বাঁচিয়ে তুলতে পারি কিনা চেষ্টা করে দেখব। আব্দুল হালীম এতে আপত্তি করে। সে বলে, 'আমার জন্য আপনি অন্যের কাছে হাত পাতবেন, এটা হ'তে পারে না। আমি আমার স্বার্থে আপনাকে এভাবে মানুষের কাছে ছোট হ'তে দিতে পারি না'।
প্রধান কর্মকর্তা বলেন, 'আমি যদি তোমার এ বিপদে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী তোমার পাশে না দাঁড়াই, তাহ'লে এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ্র কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব আমি তোমার কোন আপত্তি মানতে রাযী নই। একাজ আমার দায়িত্ব বলে মনে করি'।
একদিন বিকেলে অফিসের প্রধান কবীর ছাহেব আব্দুল হালীমের বাসায় এসে আব্দুল হালীমের সন্তানকে দেখলেন। তিনি শিশুর ফটোর একটি নেগেটিভ কপি নিয়ে চলে গেলেন। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় শিশুটির ছবি ছাপিয়ে তার অসুখের বিবরণ দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে তুলতে সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে আবেদন জানালেন। এতে কাজ হ'ল।
আব্দুল হালীম শিশুর চিকিৎসার জন্য স্ত্রীসহ বিদেশ যাত্রা করতে বিমানবন্দরে উপস্থিত হ'লে তাদের বিদায় জানাতে আসলেন অফিসের প্রধান কবীর ছাহেব, সহকর্মী আবিদ হাসান এবং অন্যান্য দাতা ব্যক্তিরা। সবাই আল্লাহ্র কাছে শিশুটির আরোগ্য কামনা করে তাদের বিদায় জানালেন।
শিক্ষা : অসহায়-দুঃস্থ মানুষকে সাধ্যমত সহযোগিতা করা আমাদের প্রত্যেকেরই ইমানী ও নৈতিক দায়িত্ব।
📄 আল্লাহ যা করেন, বান্দার মঙ্গলের জন্য করেন
প্রাচীন কালে পারস্যে এক বদমেযাযী রাজা ছিলেন। একদিন চেরী কাটতে গিয়ে তাঁর হাতের আঙ্গুলের ডগা কেটে গেল। প্রচুর রক্তক্ষরণে রাজা শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। উযীরে আ'যম সংবাদ পেয়ে রাজাকে দেখতে গেলেন। উযীরে আ'যম ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ণ। রাজার এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, 'ইন্না লিল্লা-হ; আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন'। এতে রাজা উযীরের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হ'লেন। ভাবলেন, ভীষণ ব্যথা ও প্রচুর রক্তক্ষরণে আমি শয্যাশায়ী, আর সে বলে 'আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন'। বেটাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। কিন্তু রাজ্যের অধিকাংশ প্রজা উযীরের ধর্মপরায়ণতায় মুগ্ধ ছিল। তাই সরাসরি তাঁকে শাস্তি দিলে ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিতে পারে ভেবে রাজা মনে মনে অন্য ফন্দি আঁটলেন।
রাজা সুস্থ হয়ে মন্ত্রী পরিষদের সাথে পরামর্শ করে একদিন শিকারে বের হ'লেন। সাথে উযীরে আ'যমকেও নিলেন। গভীর অরণ্যে প্রবেশ করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী উযীরে আ'যমকে এক অন্ধকার কূপে ফেলে দিয়ে তাঁরা শিকারে মনোনিবেশ করলেন। অতঃপর রাজা এক মায়া হরিণের মায়ায় পড়ে হরিণটি শিকার করার জন্য ঘোড়া নিয়ে ছুটলেন। রাজার ঘোড়া এমন দ্রুত দৌড়াচ্ছিল যে, সাথীরা তাঁকে অনুসরণ করতে পারছিল না। দৌড়াতে দৌড়াতে রাজা রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে অন্য রাজ্যে ঢুকে পড়লেন। এদিকে ঐ রাজ্যের রাজার খুবই প্রিয় একটি ঘোড়া ছিল। কয়েকদিন আগে জনৈক চোর ঘোড়াটি চুরি করে পারসিক এই রাজার নিকট বহুমূল্যে বিক্রি করেছিল। আর সেই ঘোড়াটি নিয়েই পারস্যের রাজা শিকারে বের হয়েছিলেন। এদিকে ঐ রাজার সৈন্যবাহিনীও ঘোড়ায় সওয়ার রাজাকে চিনতে পেরে তাকে বন্দী করে কয়েদখানায় প্রেরণ করে।
ঐ দেশের রাজা ছিল প্রতিমা পূজারী। সেদেশের প্রথা ছিল প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে সুদর্শন, সুঠামদেহী, নিখুঁত একজন লোককে তাদের দেবতার নামে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বলি' দেয়া। অধিকাংশ সময় সে লোক সরবরাহ করা হ'ত কয়েদখানা হ'তে। আর এ সময়টি ছিল তাদের সেই বলি অনুষ্ঠানের সময়। তাই সুদর্শন, সুঠামদেহী কয়েদী রাজাকে মনোনীত করা হ'ল 'বলি' দেয়ার জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে কয়েদী রাজাকে বলির মঞ্চে হাযির করা হ'লে সেদেশের রাজা কয়েদীর সারা শরীর অনুসন্ধান করতে লাগলেন কোন খুঁত আছে কি-না তা দেখার জন্য। অতঃপর কয়েদীর হাতের আঙ্গুল কাটার দাগ দেখতে পেয়ে রাজা বললেন, এটা বলি দেয়ার উপযুক্ত নয়। অন্য একজনকে খুঁজে আন।
এমন সময় কয়েদী (পারস্যের রাজা) বললেন, উযীরের কথাই সত্যি হ'ল, 'আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন'। এ কথা শুনে ঐ দেশের রাজা জিজ্ঞেস করল, কি বললে তুমি? একথার মর্মার্থ কি? তখন পারস্যের রাজা তাঁর পরিচয়সহ সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। কয়েদীর পরিচয় ও ঘটনা শুনে সে দেশের রাজা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে বললেন, 'আপনার উযীর ঠিকই বলেছে'। অতঃপর সসম্মানে পারস্যের রাজাকে মুক্তি দেয়া হ'ল এবং ঘোড়াটিও তাঁকে উপহার দেয়া হ'ল।
মুক্তি পেয়ে পারস্যের রাজা রাজ্যে ফিরে এসে প্রথমেই উযীরে আ'যমের খোঁজে সেই অন্ধকার কূপের নিকট গিয়ে দেখলেন, উযীর এখনও বেঁচে আছে এবং পাশেই বসবাস করছে। রাজা উযীরে আ'যমকে আবেগে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি তোমাকে ভুল বুঝে তোমার প্রতি অন্যায় করেছি, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও ভাই। তুমি সত্যিই বলেছিলে, আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন'। যদি আমার আঙ্গুলে কাটার দাগ না থাকত তবে আজ আমি মৃত্যুর রাজ্যে চলে যেতাম'। তখন উযীরে আ'যম বললেন, আপনার দেয়া শাস্তিকে আমি হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলাম এজন্য যে, আমি বিশ্বাস করি 'আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন'। ভেবে দেখুন, আপনি যদি আমাকে কূপের মধ্যে না ফেলতেন তবে আমি কিছুতেই আপনার পিছু ছাড়তাম না। ফলে সে দেশের সৈন্যবাহিনীর হাতে আপনার সাথে আমিও বন্দী হ'তাম এবং আমাকেই তাদের প্রথানুযায়ী 'বলি' দেয়া হ'ত। কারণ আমার শরীরে কোন খুঁত নেই।
শিক্ষা: সকল বিপদ-আপদ ও বালা-মুছীবতে আল্লাহ্র প্রতি ভরসা রেখে ধৈর্যের সাথে বিপদ-মুছীবতকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে হবে এবং সর্বদা বিশ্বাস রাখতে হবে যে, 'আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন'।
📄 প্রত্যেক বস্তু তার মূলের দিকেই ফিরে যায়
আরবের কোন এক পাহাড়ী অঞ্চলে একদল দস্যু একটি পাহাড়ের শীর্ষদেশে বসবাস করত। কোন কাফেলা ঐ পথে যাত্রা করলেই তারা তাদের উপর চড়াও হ'ত। লুট করে নিত তাদের সমুদয় সম্পদ। আক্রমণ করত পথচারীদের উপর। এদের ভয়ে শহরের জনসাধারণ সর্বদা তটস্থ থাকত। কারণ তারা পর্বতশৃঙ্গে নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছিল। আর এজন্যই রাজার সেনাবাহিনীও এদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। ঐ অঞ্চলীয় রাষ্ট্র প্রশাসন দস্যুদের কবল থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য পরামর্শ করল। কেউ কেউ বলল, দস্যুদল এভাবে যদি আর কিছুকাল অবস্থান করে তবে এদের সঙ্গে যুদ্ধ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কবি বলেন,
'যে বৃক্ষ সবেমাত্র গেড়েছে শিকড়
উপড়াতে পারবে কেহ দিয়ে স্বল্প জোর।
ঐ অবস্থায় রাখে যদি আর কিছুকাল
জন্মেও পারবে না তুলতে, হবে বিফল।
অল্প পানির গতি বন্ধ কর থোড়া চীযে
পূর্ণ জোরে চললে হস্তিও ভেসে যাবে নিজে'।
অতঃপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের অনুসন্ধান করার জন্য একজন গুপ্তচর ঠিক করা হ'ল। যে সব সময় তাদের দিকে নযর রাখত। একদা দস্যুদল কোন এক কাফেলার উপর আক্রমণ করতে গেলে তাদের আস্তানা সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায়। এ সংবাদ অবহিত হয়ে যুদ্ধে পারদর্শী কয়েকজন বীরপুরুষকে তথায় পাঠানো হয়। তারা পাহাড়ের বিভিন্ন গুহায় আত্মগোপন করে ওঁৎ পেতে থাকে। গভীর রাতে দস্যুদল লুট করে মালামাল নিয়ে ফিরে এসে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে। আর এ নিন্দ্রাই হয় তাদের কাল।
যখন রাত্রি আরো গভীর হ'ল। দস্যুদলও ঘুমে বিভোর। তখন বীর সিপাহীগণ তাদের গুপ্তঘাঁটি আক্রমণ করল এবং এক এক করে সকল দস্যুর হস্ত কাঁধে বেঁধে ফেলল। সকাল বেলা তাদের সবাইকে রাজদরবারে উপস্থিত করা হ'ল। রাজা বিনাদ্বিধায় তাদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিলেন।
দেখা গেল তাদের মধ্যে একজন সুন্দর যুবক রয়েছে, যে কেবলমাত্র নব যৌবনে পদার্পণ করেছে। তার গণ্ডদেশ কানন কেবলমাত্র নতুন সবুজ মেলায় ভরে উঠেছে। জনৈক মন্ত্রী উক্ত যুবকের জন্য সুফারিশ করে বললেন, হে সম্রাট! এই সুন্দর ছেলেটি তার জীবন কানন হ'তে এখনও কোনরূপ ফল ভোগ করেনি। তার নব যৌবন হ'তে উপকৃত হয়নি। সম্রাটের উন্নত স্বভাব ও দানশীলতায় আমি আশাবাদী, অনুগ্রহ করে তার খুন মাফ করে দিয়ে অধমের উপর অনুকম্পা করবেন। বাদশাহ মন্ত্রীর কথা শুনে বিমুখ হ'লেন এবং তাঁর রায়ের অনুকূল না হওয়ায় বললেন,
'কু-জাত লভেনা কভু সুজনের শিক্ষা
গোলের উপর গোল যেন অযোগ্যের দীক্ষা'।
এদের বংশ-বুনিয়াদ নির্মূল করাই উত্তম। কেননা অগ্নি নির্বাপিত করে আংটা রাখা, সাপ মেরে উহার বাচ্চা পালন করার ন্যায়, যা জ্ঞানীদের কাজ নয়।
'মেঘে যদি দেয় ঢেলে হায়াতের পানি
ঝাউ গাছে ফুল কভু পাবে নাকো জানি।
দুষ্টের সাথে কাল কর না ক্ষেপণ
নলখাগড়া হ'তে চিনি পাবে না কখন'।
মন্ত্রী বাদশার এসব কথা শ্রবণ করলেন। সুন্দর অভিমতের জন্য বাদশাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং বললেন, বাদশাহ যা বলেছেন সম্পূর্ণ সত্য। তবে ছেলেটি এখনও ছোট। যদি সে ঐসব দস্যুদের শিক্ষা পেত তবে তাদের আচরণ গ্রহণ করতো এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত হ'ত। অধম বান্দার অভিলাষ এই যে, সে সৎ লোকদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। চরিত্রবান হবে। কারণ দস্যুদের সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহী আচরণ এখনো হয়ত তার অন্তরে প্রোথিত হয়নি। হাদীছে বর্ণিত আছে, 'প্রতিটি সন্তান ইসলামী ফিরাতের উপর জন্ম লাভ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী-নাছারা বা অগ্নিপূজক বানায়'। মন্ত্রী তার উক্তির পিছনে এই সব যুক্তি পেশ করলেন।
'নূহ (আঃ) পুত্র যখন বদের সঙ্গী হ'ল
নবুঅতী বংশ তাঁর ধ্বংস হয়ে গেল।
গুহাবাসীদের কুকুর দেখ মাত্র কয়েকটি দিন
পুণ্যবানদের অনুসরণে হইল মানবাধীন'।
মন্ত্রী একথা বলার পর বাদশাহ্র নিকটজনদের মধ্য হ'তে আরো কিছু লোক মন্ত্রীর সাথে সুফারিশে শরীক হ'লেন। তখন বাদশা এই বলে তার খুন মাফ করে দিলেন যে, ক্ষমা করে দিলাম, কিন্তু ভাল মনে করলাম না।
'জান না কি বলেছিল মহিলাটি বীর রোস্তমকে
নিরুপায় নিকৃষ্ট জান না কভু শত্রুকে।
বহু দেখেছি অল্প পানির স্বল্প স্রোতের টানে
প্রবল হ'লে উট বোঝা ভেসে গেছে বানে'।
অতঃপর মন্ত্রী তার দলবলসহ ছেলেটিকে মহাআনন্দ ও পুরস্কারের সাথে বের করে নিয়ে এলেন। তার শিক্ষার জন্য একজন উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করা হ'ল। সুন্দর বক্তব্য, প্রশ্নের জবাব, বাদশাহ্ খেদমতে আদব ইত্যাদি বিষয় তাকে বিশেষভাবে শিক্ষা দেয়া হ'ল। সকলের দৃষ্টিতে ছেলেটি আদরের পাত্রে পরিণত হ'ল। একদা মন্ত্রী বাদশাহর খেদমতে তার সৎ চরিত্র বিষয়ে বলতে গিয়ে বললেন, জাঁহাপনা! জ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তার জন্মগত পুরাতন অজ্ঞতা বিদূরিত হয়েছে। বাদশাহ এটা শুনে মুচকি হেসে বললেন,
'সিংহ শাবক পরিশেষে সিংহ হয়ে যায়
যদিও মানুষের সাথে বুযরগী সে পায়'।
দু'বৎসর এভাবেই কেটে গেল। ইতিমধ্যেই মহল্লার একদল দুর্বৃত্ত তার সাথে মিলিত হয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন এঁটে নিল। তাদের প্ররোচনায় ছেলেটি বাপ- চাচাদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সংকল্পবদ্ধ হ'ল। একদা সুযোগ বুঝে মন্ত্রী ও তার দুই পুত্রকে হত্যা করল এবং বহু সম্পদ লুটে নিয়ে সেই পুরাতন পর্বত গুহায় গিয়ে পিতার স্থলাভিষিক্ত হ'ল। এ সংবাদ পেয়ে বাদশাহ পরিতাপের সাথে দাঁত দিয়ে আঙ্গুল কামড়াতে কামড়াতে বললেন,
'কাঁচা লোহায় পাকা অস্ত্র বানায়না কেউ কভু
অমানুষকে শিক্ষা দিলেই হয়না মানব তবু
পাক বৃষ্টির পানিতে ভাই নাইকো কোন নাশ
ফুল বাগানে ফুল ফোটে আর পতিত যমীনে ঘাস'।
'কু-লোকের ভাল করা জানিবে কেমন
সু-লোকের মন্দ করার পরিণাম যেমন'।
শিক্ষা: ইল্লত যায় না ধুলে, আর খাছলত যায় না মলে।