📄 কূটকৌশলের পরিণাম
একজনের অধিকারে অন্যজনের অন্যায় হস্তক্ষেপের ফলেই জগতে অশান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। জগতের অধিকাংশ যুদ্ধ-বিগ্রহ এ অন্যায় হস্তক্ষেপের কারণেই সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এ অশান্তি দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। তবুও এ অশান্তির শিকার হয় অগণিত মানুষ। এ সম্পর্কে নিম্নের কাহিনী-
অনেক দিন আগের কথা। পাশাপাশি দু'টি মুসলিম রাজ্য। রাজ্য দু'টির মধ্যে সখ্যতা বিদ্যমান। এক রাজ্যের বড় শাহজাদার নাম হারূণ। ছোট শাহজাদা ইমরান। সে বাদশাহর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। বড় শাহজাদা হারূণ বাদশাহর মত সৎ এবং রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণে উপযুক্ত। বাদশাহর ইচ্ছা, তিনি বড় শাহজাদার উপর রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পণ করে বাকী জীবনটা আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিবেন। কিন্তু তাঁর সে ইচ্ছার চরম অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালেন তাঁর বেগম। বেগমের ছেলে ইমরানও বেশ বড় হয়েছে। বেগমের ইচ্ছা, ইমরানই সিংহাসনের অধিকার লাভ করুক। কিন্তু বেগম জানেন, বাদশাহর কাছে তাঁর ছেলেকে রাজ্যভার অর্পণের কথা জানালে তাতে বাদশাহর সম্মতি পাওয়া যাবে না। তাই এ ব্যাপারে তিনি কিছু কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন।
বাদশাহ ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর রাজ্যে কোথাও কোন গোলমাল-গোলযোগ নেই। রাজ্যের সর্বত্রই শান্তি বিরাজিত। এমন দিনে এক প্রজা বাদশাহর দরবারে এসে অভিযোগ দায়ের করল যে, কে একজন তার কন্যাকে অপহরণ করেছে। সে এর উপযুক্ত বিচার চায়। বাদশাহ অভিযোগ শুনে একেবারে বিস্মিত হয়ে গেলেন। এত বড় অনাচার কার দ্বারা সাধিত হ'ল? অতি সত্বর তদন্ত করে আসামীকে রাজ দরবারে উপস্থিত করার জন্য বাদশাহ প্রধান সেনাপতিকে নির্দেশ দিলেন। তদন্তে পাওয়া গেল, বাদশাহর দ্বিতীয় ছেলে ইমরানই এ অপকর্ম করেছে। বাদশাহর কর্ণগোচর হওয়ার পূর্বেই বিষয়টি বেগম জানলেন। তিনি ছেলেকে এ কাজের জন্য খুব তিরস্কার করলেন। কেননা বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে তাঁর উদ্দেশ্য সাধনে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। তাই তিনি অন্দর মহলের ঝি দ্বারা প্রধান সেনাপতিকে গোপনে ডাকলেন। তিনি সেনাপতিকে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে বশীভূত করে ফেললেন। বিষয়টি যাতে কোনক্রমেই ফাঁস না হয় সেজন্য তাকে বিশেষভাবে বললেন। এমনকি বাদশাহও যাতে এটা জানতে না পারে তার ব্যবস্থাও করতে বললেন। উপঢৌকন গ্রহণ করে সেনাপতি বাদশাহকে জানালেন, তদন্তেকাউকে দোষী সাব্যস্ত করা গেল না। অভিযোগটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হ'ল। কাউকে আসামী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হ'ল না।
শিকারে বের হওয়া রাজা-বাদশাহদের প্রিয় শখ। এতে নাকি তাঁদের মানসিক অশান্তি দূরীভূত হয়। বড় ছেলেকে কোন অজ্ঞাত কারণে একটু বিমর্ষ বলে মনে হ'ল বাদশাহর। তাই তিনি তাকে শিকারে যেতে আদেশ করলেন। পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজকন্যা জাহানারাও সঙ্গী-সাথী সহ একই বনে শিকারে উপস্থিত। একটি পাখীকে উভয়েই তীর নিক্ষেপ করল। দু'টি তীরই পাখীর দেহে বিদ্ধ হয়ে পাখীটি মাটিতে পড়ে গেল। শাহজাদা বলল, আপনার তীরের আঘাতে পাখীটি ধরাশায়ী হয়েছে। অতএব পাখীটি আপনার। রাজকন্যাও অনুরূপ বলল। উভয়ের মধ্যে পরিচয়-পরিচিতি হ'ল। শাহজাদা মনে মনে তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজবাড়ীতে ফিরে এসে পিতাকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। আগে থেকে পার্শ্ববর্তী ঐ রাজ্যের সাথে সখ্যতা ছিল। বাদশাহ তাই সানন্দে শাহজাদার প্রস্তাবে রাযী হয়ে শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাজ সম্পাদন করে দিলেন।
এখন বাদশাহর একটি কাজ বাকী। তা হ'ল শাহজাদাকে রাজ্যভার অর্পণ করা। বাদশাহ এজন্য পূর্ব প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। বেগম দেখলেন, তাঁর উদ্দেশ্য সফল করতে আর দেরি করা চলে না। তাই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, শাহজাদাকে কিছু পান করিয়ে সাময়িক উন্মাদ করে দিবেন। এজন্য তিনি শরবত তৈরী করে ঝি দ্বারা বড় শাহজাদাকে ডাকলেন। শাহজাদা সৎমাকে আপন মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে। মায়ের ডাক পেয়ে ছেলে এলে মা বললেন, তোমার জন্য আমি এ শরবত তৈরী করে রেখেছি, পান কর। বেগমের বাহ্যিক আচরণে কোন সন্দেহের কারণ ছিল না। কিন্তু তিনি অন্তরে শাহজাদার প্রতি চরম বৈরিতা পোষণ করেন। শাহজাদা কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ে না পড়ে সরল মনে শরবত পান করল। সাথে সাথে তার পাগলামি শুরু হয়ে গেল। বেগম বাদশাহকে তাঁর কক্ষে ডাকলেন। স্বচক্ষে তার এরূপ আচরণ লক্ষ্য করে তার প্রতি তাঁর ধারণা পাল্টে গেল। তিনি ছেলেকে রাজবাড়ী হ'তে বের করে বনবাসে পাঠালেন। শাহজাদার স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে বনবাসে যেয়ে এক লোকের আশ্রয়ে উঠল।
এরপর বেগম গোপনে প্রধান সেনাপতিকে ডাকলেন। তিনি সেনাপতিকে আগে থেকে আরো বেশী পুরস্কার প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে বাদশাহকে বন্দী করে কারাগারে পাঠাতে বললেন। সেনাপতি বাদশাহকে কারাগারে আবদ্ধ করলেন। বেগম এবার তাঁর ছেলেকে সিংহাসনে বসালেন। ইমরান এখন বাদশাহ, রাজ্যের সর্বেসর্বা। বাদশাহ হয়েই সে নিত্য নতুন আইন জারী করে প্রজাদের উপর নির্যাতন শুরু করে দিল। বেগম এতে বাধা দিলেন। কিন্তু সে তার মায়ের কথায় কান দিল না। প্রজারা ক্ষিপ্ত হ'তে লাগল।
নতুন বাদশাহ তার মায়ের মতই ধূর্ত। সে জানে, এবার সেনাপতি প্রতিশ্রুত উপঢৌকন দাবী করবে। তাই সে সেনাপতিকে পুরস্কার প্রদানের জন্য ডাকল। সেনাপতি আসলে তরবারী উঁচিয়ে বলল, পুরস্কারের লোভে যে ব্যক্তি একজন সৎ বাদশাহকে কারাগারে পাঠাতে পারে, পুরস্কারের লোভে সে আমারও চরম ক্ষতি করতে পারে। এ বলেই তাকে শেষ করে দিল।
বাদশাহর বিয়াই বাদশাহ সমস্ত সংবাদ অবগত হওয়ার পর প্রথমে জামাই ও মেয়েকে নিজ প্রাসাদে আনলেন। এরপর তিনি জামাই সহ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে বন্দী দশা হ'তে বাদশাহকে উদ্ধার করলেন। নতুন বাদশাহ ও বেগমকে বন্দী করা হল। বেগম বুঝলেন, এখন তাদের মৃত্যু অবধারিত। তিনি বার বার বলতে লাগলেন, সব অপকর্মের জন্য আমিই দায়ী। আমাকে মেরে ফেলুন। আমার ছেলেকে মুক্তি দিন। তার কোন দোষ নেই। কিন্তু উভয়কেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হ'ল। বড় শাহজাদা কণ্টকমুক্ত হয়ে সিংহাসনে আরোহণ করল। রাজ্যে আগের মত শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হ'তে লাগল।
শিক্ষা: কুচক্রীদের শেষ পরিণতি সর্বদাই মন্দ হয়।
📄 আদর্শ পিতা-মাতার যোগ্য সন্তান
এক সৈনিক একবার তার স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যুদ্ধে গেল। তখন তার স্ত্রী গর্ভবতী। যাবার সময় সে স্ত্রীর কাছে ত্রিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা রেখে গেল। এরপর বহু বছর কেটে যায়। যোদ্ধার ফেরার নাম নেই। অবশেষে দীর্ঘ ঊনত্রিশ বছর পর সে বাড়ি ফিরে আসে। ঘোড়া থেকে নেমে সৈনিক বর্শা নিয়ে ঘরের দরজায় আঘাত করলে এক টগবগে যুবক বেরিয়ে আসে। যুবক আগন্তুকের হাতে বর্শা দেখে বলল, হে আল্লাহ্র দুশমন! তুমি আমার বাড়িতে হামলা করতে এসেছ? লোকটি একথা শুনে তাজ্জব বনে গেল। বলে কি এই যুবক! আমার বাড়ি এটা, অথচ সে কিনা আমাকেই ডাকাত বলে অভিহিত করছে? বীর সৈনিক গর্জে উঠে বলল, কে তুমি? তোমার সাহস তো কম নয়? আমার বাড়ির অন্দরে ঢুকে আমাকেই ডাকাত বলছ? একথা শুনে যুবকের চোখ ছানাবড়া হওয়ার জো। এই অচেনা-অজানা বুড়ো দেখি উড়ে এসে জুড়ে বসার মত কথা বলছে। এভাবে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে একজন আরেকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেঁধে গেল তুমুল লড়াই। কেউ কাউকে ছাড়ার পাত্র নয়। তাদের লড়াই ও হুংকারে পাড়ার সব লোক এসে জড়ো হ'ল এবং কোনমতে তাদের থামাতে সক্ষম হ'ল। এবার সবাই যুবকের পক্ষ নিল। যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, একে কাযীর দরবারে সোপর্দ না করে কিছুতেই ছাড়ছি না। লোকটিও হুংকার ছেড়ে বলল, এই দুশ্চরিত্র ছেলেকে আমি বিচারালয়ে নিয়ে যাব। সেখানে যা হবার তাই হবে।
প্রতিবেশীরা লোকটির দৃঢ়তা দেখে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল। তারা বলল, ভাই আপনি বোধ হয় বাড়ি চিনতে ভুল করেছেন। এই বাড়ি ওদেরই। ওরা বহুদিন ধরে এখানে আছে। লোকটি বলল, হ'তেই পারে না। আমি ঠিক চিনেছি, এ বাড়ি আমার। আমি তো অমুক গোত্রের সর্দার। তখন বাড়ি থেকে এক মহিলা বেরিয়ে এসে বলল, রাবী'আহ চুপ কর। উনি তোর বাবা, আমার স্বামী।
মুহূর্তেই উত্তপ্ত পরিবেশ পাল্টে গেল। সন্তান পিতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলল, আব্বা আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। লোকটিও ছেলেকে না চিনে নানা কথা বলায় লজ্জা পেল। ছেলে বলল, ঘরে চল বাবা, কিছু মনে কর না। ঘরে ঢুকে লোকটি স্ত্রীকে বলল, আমার ছেলে এত বড় হয়েছে? স্ত্রী বলল, হবে না। সেই কবে আপনি যুদ্ধে গিয়েছেন, ফিরলেন এতদিন পরে। লোকটি বলল, আমার সেই ত্রিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা কোথায় রেখেছ? এবার লোকটি একটি থলে এগিয়ে দিয়ে বলল, এখানে আরো চল্লিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা আছে, একসাথে রাখ। স্ত্রী বলল, সেগুলো আমি পুঁতে রেখেছি। কিছুদিন পর বের করব। যুবক মসজিদে গেলে স্ত্রী স্বামীকে ছালাত আদায় করতে মসজিদে পাঠিয়ে দিল। ছালাত শেষে লোকটি দেখল, মসজিদ চত্বরে বহু লোকের সমাগম। পাঠচক্র চলছে। কাছে গিয়ে দেখল, এক অল্প বয়সী যুবক জড়সড় হয়ে অধোমুখে দরস দিচ্ছে। আর বহু গণ্যমান্য আলেম-ওলামা একান্ত মনোযোগের সাথে তার দরস শুনছেন। লোকটি আশ্চর্য হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল, কে এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি? লোকটি বলল, তিনি হলেন মদীনা নগরীর সবচেয়ে বড় ফক্বীহ ইমাম রাবী'আতুর রায়। বাবা ছেলের পরিচয় পেয়ে যারপর নাই খুশি হ'লেন। হৃদয়ের দুকূল ছাপিয়ে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। তিনি প্রাণভরে ছেলের জন্য দো'আ করলেন ও আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করলেন। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, আজ আমি তোমার ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখেছি, যে অবস্থায় কেউ তার ছেলেকে দেখেনি। সত্যিই আমি সৌভাগ্যবান। স্ত্রী তখন হেসে বলল, আপনি এই ত্রিশ হাযার মুদ্রা চান, না এই ছেলেকে চান? আপনার রেখে যাওয়া ত্রিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে আমি এই সোনার ছেলে গড়েছি। আপনি খুশী হয়েছেন? তিনি বললেন, আজ আমার খুশির সীমা নেই। তোমার মত মহীয়সী মা যার আছে, তার এমনটি হওয়া্ইতো স্বাভাবিক। আমার কষ্টে অর্জিত অর্থ তুমি হকের পথেই ব্যয় করেছ। আল্লাহ তোমাকে এর উত্তম বিনিময় দান করুন!
শিক্ষা: আদর্শ জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন আদর্শ মা।
📄 হাতেম তাঈর মহত্ত্ব
হাতেম তাঈ দানশীলতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর দানশীলতার সুনামে বাদশাহ নওফেল ক্রোধান্বিত হলেন। কারণ তিনিও একজন দাতা ছিলেন। কিন্তু হাতেমের দানের সুখ্যাতি লোকের মুখে মুখে। বাদশাহর দান হাতেমের দানের কাছে ম্লান ও নিষ্প্রভ। যেন চাঁদের আলোর কাছে তারার আলো। বাদশাহ শুধু এ কারণেই ক্রোধান্বিত হয়ে ফরমান জারী করলেন, 'যে কেউ হাতেমকে ধরিয়ে দিতে পারবে, তাকে প্রচুর পুরস্কার দেওয়া হবে'।
ঘোষণাটি হাতেমও শুনতে পেলেন। তিনি তাঁর অবস্থানে থাকাটা নিরাপদ মনে করলেন না। তিনি এক গভীর জংগলে আত্মগোপন করে রইলেন।
পুরস্কারের লোভে অনেকেই হাতেমকে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল। এক কাঠুরে ও তার স্ত্রী হাতেমের লুকিয়ে থাকা জংগলে কাঠ কাটতে এলো। স্ত্রী বাদশাহর ঘোষণার কথা স্বামীকে শুনিয়ে বলল, 'আমরা যদি হাতেমকে পেতাম, তাহ'লে তাঁকে বাদশাহর নিকট হাযির করলে আমাদেরকে আর কাঠ কেটে খেতে হত না'। স্ত্রীর কথা শুনে স্বামী মর্মাহত হ'ল এবং স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করল। কাঠুরে বলল, 'আমি এভাবে ধনী হ'তে চাই না। একজন সৎ ব্যক্তিকে বিপদে ফেলে আমি বড় হওয়াকে ঘৃণা করি'। স্বামীর কথা শুনে স্ত্রী নীরব হয়ে রইল।
হাতেম স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি ভাবলেন, 'আমার এভাবে লুকিয়ে থাকায় সার্থকতা কি? বরং আমি কাঠুরেকে ধরা দিলে তারা আমাকে বাদশাহর নিকট হাযির করে পুরস্কৃত হয়ে উপকৃত হ'তে পারবে'। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি গোপন আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এসে কাঠুরেকে ধরা দিলেন। কাঠুরে তাঁকে নিয়ে বাদশাহর নিকট যেতে অস্বীকৃতি জানালো।
এরই মধ্যে কতিপয় লোক হাতেমকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে উপস্থিত হ'ল। তারা হাতেমকে দড়ি দিয়ে বেঁধে বাদশাহর নিকট উপস্থিত করল এবং পুরস্কার দাবী করল। কি ঘটে তা জানার জন্য কাঠুরে ও তার স্ত্রী তাদের সাথে গেল। হাতেম বললেন, এই কাঠুরেই প্রথমে আমাকে ধরেছে। অতএব, পুরস্কার সেই পাবে। কাঠুরে বলল, 'না, আমি তাঁকে মোটেই ধরিনি। তিনি স্বেচ্ছায় আমাদের ধরা দিয়েছেন। যাতে আমরা তাঁকে আপনার নিকট হাযির করে পুরস্কার পেয়ে উপকৃত হই'। বাদশাহ কাঠুরের কথা শুনে বুঝলেন, হাতেম যথার্থই একজন পরোপকারী ব্যক্তি। তাই তাঁকে ছেড়ে দিলেন এবং কাঠুরেকে পুরস্কৃত করলেন।
শিক্ষা: দানশীলতা অতি উত্তম মানবিক গুণ। এর মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াতে মর্যাদার পাত্র হয়। এটি পরকালীন পাথেয় সঞ্চয়ের অন্যতম মাধ্যম।
📄 গণ্য-মান্য-নগণ্য-জঘন্য
আরব দেশের জনৈক সাহিত্যিক বর্ণনা করেন যে, আমি বাগদাদ নগরীর দেশবরেণ্য এক ধনী ব্যক্তির মজলিসে আমন্ত্রিত হ'লাম। আমি যাওয়ার পূর্বে শতাধিক ওলামায়ে কেরাম উক্ত মজলিসে উপস্থিত হয়েছিলেন। উপস্থিতিদের অনেকেই আমার পরিচিত ছিলেন, আবার অনেকে ছিলেন অপরিচিত। দাওয়াতদাতা দশ বস্তা 'আখরোট' মঞ্চের সামনে উপস্থিত করলেন। উদ্দেশ্য ছিল, দাওয়াতী মেহমানদেরকে 'আখরোট' দিয়ে বিদায় জানাবেন। ইতিমধ্যে উষ্কখুষ্ক চুলবিবিষ্ট আলখেল্লা পরিহিত এক পাগল এসে সভাপতির সামনে হাযির হ'ল। সে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে অভিনব কৌশলে সভাপতিকে লম্বা সালাম ঠুকে বলল, 'মারহাবান বিকা ইয়া রাঈসাল হাফলাহ, মা হাযিহি'? 'মহামান্য সভাপতি! আপনাকে ধন্যবাদ। এগুলি কি'? সভাপতি তার বাক্যালাপের ভাব বুঝতে পেরে তাকে একটা আখরোট দিলেন। ফলটি পেয়ে পাগল খুশীতে বাগবাগ হয়ে একবার ফলের দিকে আর একবার সভাপতির দিকে তাকাতে লাগল।
অতঃপর সে আরেকটি ফল পাবার আশায় বেশ সুর-তাল দিয়ে দু'সংখ্যা বিশিষ্ট কুরআন মাজীদের এই আয়াতাংশ পাঠ করল, ثَانِيَ اثْنَيْنِ 'তিনি ছিলেন দু'জনের দ্বিতীয়জন' (তওবা ৪০)।
সভাপতি পাগলের তেলাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে তাকে দ্বিতীয় ফলটি দান করলেন।
পাগল আরেকটি ফল পাবার প্রত্যাশায় গুরুগম্ভীর সুরে فَعَزَّزْنَا بَثَالث 'অতঃপর আমি তাদেরকে শক্তিশালী করলাম তৃতীয় একজনের মাধ্যমে' (ইয়াসীন ১৪) এই আয়াতাংশ পাঠ করল। সভাপতি তার তেলাওয়াত শুনে খুশী হয়ে তাকে তৃতীয় ফলটি দান করলেন। পাগল আরেকটি ফল গ্রহণের জন্য আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় কুরআন মাজীদের ‘চার’ সংখ্যা বিশিষ্ট একটি আয়াতাংশ তেলাওয়াত করল- فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ ‘তাহলে চারটি পাখিকে ধর’ (বাক্বারাহ ২৬০)।
সভাপতিসহ মজলিসের সকলেই তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে ৪র্থ ফলটি দান করলেন। এমনি করে সে পঞ্চম ফলটি পাবার লক্ষ্যে ‘পাঁচ’ উল্লেখ আছে এমন আয়াতাংশ পাঠ করল, هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلائِكَةِ ‘তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে পাঁচ হাযার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করবেন’ (আলে ইমরান ১২৫)। সভাপতি তাকে ৫ম ফলটি প্রদান করলেন।
এবার পাগল পঞ্চম ফলটি পেয়ে খুশীতে আটখানা হয়ে আরেকটি ফল গ্রহণের উদ্দেশ্যে ‘ছয়' সংখ্যা আছে এমন দু'টি আয়াতাংশ পাঠ করল, وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ ‘পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ’ (নিসা ১১)।
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ যিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন' (সাজদাহ ৪)। সভাপতি তার আয়াত পাঠে মুগ্ধ হয়ে তাকে ৬ষ্ঠ ফলটি প্রদান করলেন।
লোভী পাগল লোভ সামলাতে না পেরে আরেকটি ফল পাবার উদ্দেশ্যে এক অভিনব সুরে কুরআন মাজীদের ঐসব আয়াত পাঠ করল, যার মধ্যে ‘সাত’ উল্লেখ আছে। যেমন- (১) سَخَّرَهَا عَلَيْهِمْ سَبْعَ لَيَالٍ ‘যা তিনি তাদের উপর প্রবাহিত করেছিলেন সাত রাত্রি' (হা-ক্বাহ ৭)। (২) الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا 'তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন' (মুলক ৩)। অতঃপর সভাপতি তাকে ৭ম ফলটি প্রদান করলেন।
পাগল তো পাগলই, সে আরেকটি ফল পাবার প্রত্যাশায় এমন কতগুলি আয়াত পাঠ করতে লাগল যার মাধ্যে ‘আট’ উল্লেখ আছে। যেমন- (১) ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجِ 'সৃষ্টি করেছেন আটটি নর ও মাদী' (আন'আম ১৪৩)। (২) وَثَامِنُهُمْ كُلْبُهُمْ ‘তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর' (কাহফ ২২)। সামান্য একজন পাগলের মুখ থেকে কুরআনের এতসব আয়াত শুনে সভাপতি তাকে ৮ম ফলটি প্রদান করলেন। পাগল আবারো আরেকটি ফল প্রাপ্তির আশায় 'নয়' উল্লেখ আছে এমন সব আয়াত তেলাওয়াত করতে লাগল। যেমন- (১) وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوْسَى تِسْعَ آيَاتِ بَيِّنَاتٍ 'আমি মূসাকে নয়টি সুস্পষ্ট নিদর্শন দান করেছি' (বনী ইসরাঈল ১০১)। (২) فِي تِسْعِ آيَاتٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِه 'এগুলি ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত' (নামল ১২)। সভাপতিসহ উপস্থিত সকলেই তার তেলাওয়াতে অভিভূত হয়ে তাকে নবম ফলটি দান করলেন।
পাগল এবারে কুরআন মাজীদের ঐ সব আয়াত পাঠ করতে লাগল, যেগুলিতে 'দশ' উল্লেখ আছে। যেমন- (১) تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ 'এভাবে দশটি ছিয়াম পূর্ণ হয়ে যাবে' (বাক্বারাহ ১৯৬)। (২) مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ‘যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ ছওয়াব পাবে' (আন'আম ১৬০) ইত্যাদি। সভাপতি মুগ্ধ হয়ে তাকে 'দশম' ফলটি দিলেন। এতদসত্ত্বেও পাগলের লোভ থামল না। সে আরেকটি ফল পাবার আশায় 'এগার' উল্লেখ আছে এমন আয়াত পড়ল, إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا 'আমি এগারটি তারা দেখেছি' (ইউসুফ ৪)। সভাপতি তাকে একাদশ ফলটি দান করলেন। পাগল আরেকটি ফল পাবার আশায় 'বার' সংখ্যা উল্লেখ আছে এমন একটি আয়াত পাঠ করল। যেমন, وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيْبًا 'আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন সর্দার নিযুক্ত করেছিলাম' (মায়েদা ১২)। সভাপতি পাগলকে দ্বাদশ ফলটি প্রদান করলেন।
এরপর পাগল চিন্তা করল এভাবে ১-২-৩ করে হবে না; বরং আরো বেশী করে নিতে হবে। এরপর সে আরো বেশী ফল প্রাপ্তির আশায় এমন এক আয়াত পাঠ করল যার মধ্যে 'বিশ'-এর উল্লেখ আছে। যেমন - إِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُوْنَ তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন ধৈর্যশীল ব্যক্তি থাকে' (আনফাল ৬৫)। সভাপতি তাকে বিশটি ফল দান করলেন।
পাগল আবারও অধিক ফল গ্রহণের জন্য সভার সমস্ত লোককে বিমোহিত করে এমন একটি আয়াত পাঠ করল, যেখানে ৫০ সংখ্যা উল্লেখ আছে। যেমন- إِلَّا خَمْسِيْنَ عَامًا তবে ৫০ বছর ছাড়া' (আনকাবূত ১৪)। সভাপতি আয়াত শুনে ৫০টি ফল প্রদান করলেন। পাগল এর চেয়ে বেশী নেওয়ার জন্য আরো কিছু আয়াত পাঠ করল, যাতে ১০০ সংখ্যার উল্লেখ আছে। যেমন- (১( فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ‘অতঃপর আল্লাহ তাকে একশ' বছর মৃত অবস্থায় রাখলেন' (বাক্বারাহ ২৫৯) । (২( فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ 'প্রত্যেক শীষে একশ' করে দানা থাকে' (বাক্বারাহ ২৬১)। সভাপতি পাগলের মতলব বুঝে ১০০টি ফল দান করলেন।
পাগল এবার ২০০ সংখ্যা বিশিষ্ট কুরআনের আয়াত পাঠ করল, يَغْلِبُوا مَائَتَيْنِ 'তবে তারা জয়ী হবে দু'শ ব্যক্তির উপর' (আনফাল ৬৬)। সভাপতি আয়াত শুনে ২০০ ফল প্রদান করলেন। পাগল আবারো অধিক পরিমাণে ফল লাভ করার জন্য ৫০ হাযার সংখ্যার আয়াত পাঠ করে বিমোহিত করল। যেমন- كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِيْنَ أَلْفَ سَنَةِ 'যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাযার বছর' (মা'আরিজ ৪)। সভাপতি তাকে সবশেষে আখরোটের দশ বস্তা ফল দিয়ে বললেন, নাও পেটুক, তুমি একাই সব খাও।
পাগল জবাবে বলল, মাননীয় সভাপতি! আপনি আমাকে বদদো'আ দিচ্ছেন কেন? আমি তো কুরআনের আয়াত পাঠ করেই আপনাদের উপকার করছিলাম। আপনি যদি বিরক্ত না হ'তেন, তাহলে আপনার নিকট থেকে এভাবে পবিত্র কুরআনের আয়াতাংশ পাঠ করে লক্ষাধিক ফল গ্রহণ করতাম (ছাফফাত ৩৭/১৪৭)।
অতঃপর পাগল সভাপতিকে লক্ষ্য করে বলল, মহামান্য সভাপতি! আমি সম্বলহীন একজন পবিত্র কুরআনের হাফেয ও নিঃস্ব গরীব। এইভাবে পাগলের বেশে আমি নিজের জীবিকা অন্বেষণ করে থাকি। এই ভরা মজলিসে আপনারা সকলেই গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। আর আমি নগণ্য-জঘন্য। আমার পরিচয় আপনারা কেউ নিলেন না। এই বলে সে মজলিস ত্যাগ করে বিদায় নিল।
শিক্ষা : প্রতিভা আল্লাহ্র দান। বাহ্যিক বেশ-ভূষায় অনেক সময় জ্ঞানী ব্যক্তিকে চেনা যায় না।