📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 বক ও কাঁকড়া

📄 বক ও কাঁকড়া


একটি বক কোনো এক জলাশয়ের ধারে বাস করতো আর জলাশয়ের মাছ খেয়ে দিন কাটাতো। বৃদ্ধ বয়সে যখন তার মাছ শিকারের শক্তি থাকল না, তখন মনে মনে ভাবল, এবার কৌশলে মাছ শিকার করতে হবে। একদিন খুব বুকভরা দরদ নিয়ে জলাশয়ের ধারে গিয়ে বসল। তার মুখ দেখে এক কাঁকড়ার দয়ার উদ্রেক হ'ল। সে জিজ্ঞেস করল, কি ভাই তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?
বক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, কী বলব ভাই, আজ দু'জন শিকারীকে আলাপ- আলোচনা করতে দেখলাম। তাদের একজন বলল, জলাশয়টিতে অনেক মাছ আছে, চলো আমরা জাল দিয়ে মাছগুলো ধরে নিয়ে যাই। অন্যজন বলল, না। তার আগে চারদিকে জাল দিয়ে ঘিরে ফেলতে হবে; পরে সুযোগ মতো ধীরে ধীরে নিলেই চলবে। এসব কথা শুনে আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। যদি সব মাছ ধরে নিয়ে যায়, তাহলে আমার কি উপায় হবে? এদের উপরই আমার জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। এতদিন এখানে থাকতাম, এখন বাকি জীবনে বুড়া বয়সে কোথায় যাব। কাঁকড়া এ কথা শুনে সব মাছকে খবর দিল। ওরা শুনে হায়! হায়! করতে শুরু করল এবং বকের নিকট এসে এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানতে চাইল। বক বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, কাছেই খুব বড় একটি নদী আছে। আমি তোমাদেরকে এতটুকু সাহায্য করতে পারি যে, প্রতিদিন কিছু কিছু মাছকে সেখানে পৌঁছে দিব। মাছেরা পরামর্শ শুনে খুব খুশি হল। এমনি করে বক কৌশলে মাছ ধরে খেতে আরম্ভ করল। এভাবে কিছুদিন খাওয়ার পর কাঁকড়ার একদিন সে নদী দেখার সাধ জাগল। বকের পিঠে চড়ে সে নদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। দূর থেকে মাছের হাড়ের স্তূপ দেখেই সে বকের কৌশল বুঝতে পারল। তখন তার মনে পড়ল- জ্ঞানীরা বলেছেন, শত্রু যখন তোমার অধীনে থাকে তখনি তাকে শেষ করে দাও।
তাতে যদি সফল হও ক্বিয়ামত পর্যন্ত তোমার নাম থাকবে, আর মারা গেলেও বেইয্যতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। কাঁকড়া বুদ্ধি করে বকের গলা চেপে ধরল। বৃদ্ধ বক কিছুক্ষণ ছটফট করে মারা গেল।

শিক্ষা: যে অন্যের জন্য কূপ খনন করে, সেই তাতে নিপতিত হয়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম ও ঐক্যের শক্তি

📄 বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম ও ঐক্যের শক্তি


অনেকদিন আগের কথা। গভীর বনে বাস করত এক শিয়াল এবং তার পাশে বাস করত এক গরু। গরু সহ অন্যান্য প্রাণীর জীবনের কোন নিশ্চয়তা ছিল না। তারা প্রতিনিয়ত বনের হিংস্র প্রাণীদের দ্বারা আক্রান্ত হ'ত। তাই শিয়াল ও গরু মিলে চিন্তা করল বনের নিরীহ প্রাণীদের নিরাপত্তার একটি ব্যবস্থা করা দরকার। তারা দু'জন একমত হ'ল যে, বনের সকল নিরীহ প্রাণীদের নিয়ে একটি সমাজ গঠন করা হবে। তাদের এই সিদ্ধান্তে বনের নিরীহ প্রাণীরা খুশীতে বাগবাগ হয়ে উঠল এবং তারা বনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে এই সমাজের আওতাভুক্ত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করল। বনের নিরীহ প্রাণীদের নিয়ে গঠিত এই সমাজকে গরু ও শিয়াল মিলে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পারস্পরিক সহমর্মিতার মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। এভাবে তারা হিংস্র প্রাণীদের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করার পথ সুগম করল।
এভাবে চলতে চলতে একদিন শিয়াল ও গরু দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে নিজেদের সীমানা অতিক্রম করে গভীর বনে ঢুকে পড়ে। হঠাৎ তাদের সামনে উপস্থিত হয় বিশালদেহী ভয়ংকর এক সিংহ। তার চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিংগ ছিটকে পড়ছে এবং রাগের প্রচণ্ডতায় সে থরথর করে কাঁপছে। কেননা তাদের দু'জনের কারণেই তার শিকার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। সাথে সাথে বনে তার আধিপত্যও আগের চেয়ে কমে গেছে।
সিংহের এই রাগ দেখে শিয়াল ভড়কে যায় এবং সে মাথায় কুটিল বুদ্ধি আঁটে। সে গরুকে বলল, বন্ধু! তুমি এখানে থাক। আমি সিংহকে গিয়ে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে নিয়ন্ত্রণ করছি। এই বলে সে সিংহের কাছে গিয়ে বলল, মামা! আমি চিরজীবন তোমার সাথেই ছিলাম, এখনো তোমার সাথেই আছি। এইতো দেখছ বনের নিরীহ প্রাণীদের নব জাগরণের অগ্রদূত তোমার চির শত্রু শয়তান গরুটাকে তোমার জন্যই এনেছি। তুমি ওকে খেয়ে তোমার কলিজা ঠাণ্ডা কর।
জবাবে সিংহ বলল, আচ্ছা ঠিক আছে তুমি আগে গরুটাকে বনের পাশের একটা গোপন গর্তে নিয়ে যাও। কেননা গরুকে প্রকাশ্যে খেলে তার অনুগত জন্তুদের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। শিয়াল হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে গরুর কাছে এসে তাকে বলল, সিংহ আমাদের পাশের গর্তে যেতে বলল, তাহ'লে আমরা রক্ষা পাব। গরু শিয়ালের কথা সরল মনে বিশ্বাস করে পাশের গর্তে চলে গেল। এদিকে শিয়াল এসে সিংহকে বলল, সে যেতে চাইছিল না। অনেক বুঝিয়ে ওকে নিয়ে গেছি। যান এবার আপনার দিলটা জুড়িয়ে আসেন।
সিংহ সে কথার দিকে কর্ণপাত না করে শিয়ালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শিয়াল চিৎকার করে বলল, হুযূর আমাকে কেন? আপনার জন্যে তো গরুকে গর্তে রেখে এসেছি। দয়া করে আমাকে খাবেন না। জবাবে সিংহ বলল, 'ওরে দুষ্ট শিয়াল তুই যদি তোর চিরদিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং বিপদ-আপদ ও তোদের সমাজ গঠনের অন্যতম সাথী গরুর সাথে শুধুমাত্র তোর নিজ স্বার্থের জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিস, তাহ'লে তুই যে পরে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবি না- এর কি নিশ্চয়তা আছে?
ওরে মুনাফিক! এজন্য আগে তোকেই খাব। আর গরু তো গর্তে ধরাই আছে, ওকে পরে খেয়ে নেব। এই বলে সে শিয়ালের ঘাড় মটকাল। অন্যদিকে বনের প্রাণীরা এই অবস্থা জেনে ফেলে এবং তারা সবাই গর্তে আটকা পড়া তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার কাছে সমবেত হয়ে ঘটনা কি তা জানতে চায়। গরু শিয়ালের বিশ্বাসঘাতকতা সহ তার বিপদের ঘটনা পুরো খুলে বলে। বনের প্রাণীরা ঘটনা শুনে শিয়ালের উপর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তার করুণ পরিণতিতে আনন্দ প্রকাশ করে।
এদিকে সিংহ শিয়ালকে শেষ করে গরুকে খাওয়ার জন্য সামনে অগ্রসর হয়। বনের প্রাণীরা তার এই আগমনের কথা জানতে পেরে অত্যন্ত সুসংঘবদ্ধভাবে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় গরুকে ঘিরে এক নযীরবিহীন নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি করে এবং সকলেই একসাথে নিজ নিজ কণ্ঠে ভীষণ আওয়াযে হুংকার দিতে থাকে। তাদের এই সমবেত হুংকার বনের চারিদিকে এক রণতরঙ্গ সৃষ্টি করে। তাদের এই রণতরঙ্গে হিংস্র সিংহের হুংকার দিগন্তে বিলীন হয়ে যায়।
সিংহ তাদের এই অবিচ্ছেদ্য অটুট ঐক্য ও হুংকারে ভড়কে যায়। গরুকে খাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সে পিছুটান দেয় এবং পালিয়ে বনের ভিতর চলে যায়।
অন্যদিকে নিরীহ হাযার হাযার প্রাণীর সমবেত উচ্চারণ বনের দিগ-দিগন্তে পৌঁছে যায় এবং সবাই তাদের একতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতার কথা জানতে পারে। ফলে হিংস্র প্রাণীরা ছাড়া সমস্ত বনে আরো যত প্রাণী ছিল সবাই গরুর নেতৃত্বে সমবেত হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একই সমাজভুক্ত হয়। এইভাবে পুরো বন নিরীহ প্রাণীদের আওতাধীন হয় এবং সমস্ত বনের নেতা হয় গরু।

শিক্ষা: যুগে যুগে স্বজাতির সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের পরিণতি হয়েছে ঠিক ঐ শিয়ালের মতোই। পক্ষান্তরে ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোন শক্তিই হার মানতে বাধ্য।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 কূটকৌশলের পরিণাম

📄 কূটকৌশলের পরিণাম


একজনের অধিকারে অন্যজনের অন্যায় হস্তক্ষেপের ফলেই জগতে অশান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। জগতের অধিকাংশ যুদ্ধ-বিগ্রহ এ অন্যায় হস্তক্ষেপের কারণেই সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এ অশান্তি দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। তবুও এ অশান্তির শিকার হয় অগণিত মানুষ। এ সম্পর্কে নিম্নের কাহিনী-
অনেক দিন আগের কথা। পাশাপাশি দু'টি মুসলিম রাজ্য। রাজ্য দু'টির মধ্যে সখ্যতা বিদ্যমান। এক রাজ্যের বড় শাহজাদার নাম হারূণ। ছোট শাহজাদা ইমরান। সে বাদশাহর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। বড় শাহজাদা হারূণ বাদশাহর মত সৎ এবং রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণে উপযুক্ত। বাদশাহর ইচ্ছা, তিনি বড় শাহজাদার উপর রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পণ করে বাকী জীবনটা আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিবেন। কিন্তু তাঁর সে ইচ্ছার চরম অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালেন তাঁর বেগম। বেগমের ছেলে ইমরানও বেশ বড় হয়েছে। বেগমের ইচ্ছা, ইমরানই সিংহাসনের অধিকার লাভ করুক। কিন্তু বেগম জানেন, বাদশাহর কাছে তাঁর ছেলেকে রাজ্যভার অর্পণের কথা জানালে তাতে বাদশাহর সম্মতি পাওয়া যাবে না। তাই এ ব্যাপারে তিনি কিছু কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন।
বাদশাহ ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর রাজ্যে কোথাও কোন গোলমাল-গোলযোগ নেই। রাজ্যের সর্বত্রই শান্তি বিরাজিত। এমন দিনে এক প্রজা বাদশাহর দরবারে এসে অভিযোগ দায়ের করল যে, কে একজন তার কন্যাকে অপহরণ করেছে। সে এর উপযুক্ত বিচার চায়। বাদশাহ অভিযোগ শুনে একেবারে বিস্মিত হয়ে গেলেন। এত বড় অনাচার কার দ্বারা সাধিত হ'ল? অতি সত্বর তদন্ত করে আসামীকে রাজ দরবারে উপস্থিত করার জন্য বাদশাহ প্রধান সেনাপতিকে নির্দেশ দিলেন। তদন্তে পাওয়া গেল, বাদশাহর দ্বিতীয় ছেলে ইমরানই এ অপকর্ম করেছে। বাদশাহর কর্ণগোচর হওয়ার পূর্বেই বিষয়টি বেগম জানলেন। তিনি ছেলেকে এ কাজের জন্য খুব তিরস্কার করলেন। কেননা বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে তাঁর উদ্দেশ্য সাধনে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। তাই তিনি অন্দর মহলের ঝি দ্বারা প্রধান সেনাপতিকে গোপনে ডাকলেন। তিনি সেনাপতিকে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে বশীভূত করে ফেললেন। বিষয়টি যাতে কোনক্রমেই ফাঁস না হয় সেজন্য তাকে বিশেষভাবে বললেন। এমনকি বাদশাহও যাতে এটা জানতে না পারে তার ব্যবস্থাও করতে বললেন। উপঢৌকন গ্রহণ করে সেনাপতি বাদশাহকে জানালেন, তদন্তেকাউকে দোষী সাব্যস্ত করা গেল না। অভিযোগটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হ'ল। কাউকে আসামী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হ'ল না।
শিকারে বের হওয়া রাজা-বাদশাহদের প্রিয় শখ। এতে নাকি তাঁদের মানসিক অশান্তি দূরীভূত হয়। বড় ছেলেকে কোন অজ্ঞাত কারণে একটু বিমর্ষ বলে মনে হ'ল বাদশাহর। তাই তিনি তাকে শিকারে যেতে আদেশ করলেন। পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজকন্যা জাহানারাও সঙ্গী-সাথী সহ একই বনে শিকারে উপস্থিত। একটি পাখীকে উভয়েই তীর নিক্ষেপ করল। দু'টি তীরই পাখীর দেহে বিদ্ধ হয়ে পাখীটি মাটিতে পড়ে গেল। শাহজাদা বলল, আপনার তীরের আঘাতে পাখীটি ধরাশায়ী হয়েছে। অতএব পাখীটি আপনার। রাজকন্যাও অনুরূপ বলল। উভয়ের মধ্যে পরিচয়-পরিচিতি হ'ল। শাহজাদা মনে মনে তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজবাড়ীতে ফিরে এসে পিতাকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। আগে থেকে পার্শ্ববর্তী ঐ রাজ্যের সাথে সখ্যতা ছিল। বাদশাহ তাই সানন্দে শাহজাদার প্রস্তাবে রাযী হয়ে শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাজ সম্পাদন করে দিলেন।
এখন বাদশাহর একটি কাজ বাকী। তা হ'ল শাহজাদাকে রাজ্যভার অর্পণ করা। বাদশাহ এজন্য পূর্ব প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। বেগম দেখলেন, তাঁর উদ্দেশ্য সফল করতে আর দেরি করা চলে না। তাই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, শাহজাদাকে কিছু পান করিয়ে সাময়িক উন্মাদ করে দিবেন। এজন্য তিনি শরবত তৈরী করে ঝি দ্বারা বড় শাহজাদাকে ডাকলেন। শাহজাদা সৎমাকে আপন মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে। মায়ের ডাক পেয়ে ছেলে এলে মা বললেন, তোমার জন্য আমি এ শরবত তৈরী করে রেখেছি, পান কর। বেগমের বাহ্যিক আচরণে কোন সন্দেহের কারণ ছিল না। কিন্তু তিনি অন্তরে শাহজাদার প্রতি চরম বৈরিতা পোষণ করেন। শাহজাদা কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ে না পড়ে সরল মনে শরবত পান করল। সাথে সাথে তার পাগলামি শুরু হয়ে গেল। বেগম বাদশাহকে তাঁর কক্ষে ডাকলেন। স্বচক্ষে তার এরূপ আচরণ লক্ষ্য করে তার প্রতি তাঁর ধারণা পাল্টে গেল। তিনি ছেলেকে রাজবাড়ী হ'তে বের করে বনবাসে পাঠালেন। শাহজাদার স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে বনবাসে যেয়ে এক লোকের আশ্রয়ে উঠল।
এরপর বেগম গোপনে প্রধান সেনাপতিকে ডাকলেন। তিনি সেনাপতিকে আগে থেকে আরো বেশী পুরস্কার প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে বাদশাহকে বন্দী করে কারাগারে পাঠাতে বললেন। সেনাপতি বাদশাহকে কারাগারে আবদ্ধ করলেন। বেগম এবার তাঁর ছেলেকে সিংহাসনে বসালেন। ইমরান এখন বাদশাহ, রাজ্যের সর্বেসর্বা। বাদশাহ হয়েই সে নিত্য নতুন আইন জারী করে প্রজাদের উপর নির্যাতন শুরু করে দিল। বেগম এতে বাধা দিলেন। কিন্তু সে তার মায়ের কথায় কান দিল না। প্রজারা ক্ষিপ্ত হ'তে লাগল।
নতুন বাদশাহ তার মায়ের মতই ধূর্ত। সে জানে, এবার সেনাপতি প্রতিশ্রুত উপঢৌকন দাবী করবে। তাই সে সেনাপতিকে পুরস্কার প্রদানের জন্য ডাকল। সেনাপতি আসলে তরবারী উঁচিয়ে বলল, পুরস্কারের লোভে যে ব্যক্তি একজন সৎ বাদশাহকে কারাগারে পাঠাতে পারে, পুরস্কারের লোভে সে আমারও চরম ক্ষতি করতে পারে। এ বলেই তাকে শেষ করে দিল।
বাদশাহর বিয়াই বাদশাহ সমস্ত সংবাদ অবগত হওয়ার পর প্রথমে জামাই ও মেয়েকে নিজ প্রাসাদে আনলেন। এরপর তিনি জামাই সহ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে বন্দী দশা হ'তে বাদশাহকে উদ্ধার করলেন। নতুন বাদশাহ ও বেগমকে বন্দী করা হল। বেগম বুঝলেন, এখন তাদের মৃত্যু অবধারিত। তিনি বার বার বলতে লাগলেন, সব অপকর্মের জন্য আমিই দায়ী। আমাকে মেরে ফেলুন। আমার ছেলেকে মুক্তি দিন। তার কোন দোষ নেই। কিন্তু উভয়কেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হ'ল। বড় শাহজাদা কণ্টকমুক্ত হয়ে সিংহাসনে আরোহণ করল। রাজ্যে আগের মত শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হ'তে লাগল।

শিক্ষা: কুচক্রীদের শেষ পরিণতি সর্বদাই মন্দ হয়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 আদর্শ পিতা-মাতার যোগ্য সন্তান

📄 আদর্শ পিতা-মাতার যোগ্য সন্তান


এক সৈনিক একবার তার স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যুদ্ধে গেল। তখন তার স্ত্রী গর্ভবতী। যাবার সময় সে স্ত্রীর কাছে ত্রিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা রেখে গেল। এরপর বহু বছর কেটে যায়। যোদ্ধার ফেরার নাম নেই। অবশেষে দীর্ঘ ঊনত্রিশ বছর পর সে বাড়ি ফিরে আসে। ঘোড়া থেকে নেমে সৈনিক বর্শা নিয়ে ঘরের দরজায় আঘাত করলে এক টগবগে যুবক বেরিয়ে আসে। যুবক আগন্তুকের হাতে বর্শা দেখে বলল, হে আল্লাহ্র দুশমন! তুমি আমার বাড়িতে হামলা করতে এসেছ? লোকটি একথা শুনে তাজ্জব বনে গেল। বলে কি এই যুবক! আমার বাড়ি এটা, অথচ সে কিনা আমাকেই ডাকাত বলে অভিহিত করছে? বীর সৈনিক গর্জে উঠে বলল, কে তুমি? তোমার সাহস তো কম নয়? আমার বাড়ির অন্দরে ঢুকে আমাকেই ডাকাত বলছ? একথা শুনে যুবকের চোখ ছানাবড়া হওয়ার জো। এই অচেনা-অজানা বুড়ো দেখি উড়ে এসে জুড়ে বসার মত কথা বলছে। এভাবে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে একজন আরেকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেঁধে গেল তুমুল লড়াই। কেউ কাউকে ছাড়ার পাত্র নয়। তাদের লড়াই ও হুংকারে পাড়ার সব লোক এসে জড়ো হ'ল এবং কোনমতে তাদের থামাতে সক্ষম হ'ল। এবার সবাই যুবকের পক্ষ নিল। যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, একে কাযীর দরবারে সোপর্দ না করে কিছুতেই ছাড়ছি না। লোকটিও হুংকার ছেড়ে বলল, এই দুশ্চরিত্র ছেলেকে আমি বিচারালয়ে নিয়ে যাব। সেখানে যা হবার তাই হবে।
প্রতিবেশীরা লোকটির দৃঢ়তা দেখে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল। তারা বলল, ভাই আপনি বোধ হয় বাড়ি চিনতে ভুল করেছেন। এই বাড়ি ওদেরই। ওরা বহুদিন ধরে এখানে আছে। লোকটি বলল, হ'তেই পারে না। আমি ঠিক চিনেছি, এ বাড়ি আমার। আমি তো অমুক গোত্রের সর্দার। তখন বাড়ি থেকে এক মহিলা বেরিয়ে এসে বলল, রাবী'আহ চুপ কর। উনি তোর বাবা, আমার স্বামী।
মুহূর্তেই উত্তপ্ত পরিবেশ পাল্টে গেল। সন্তান পিতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলল, আব্বা আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। লোকটিও ছেলেকে না চিনে নানা কথা বলায় লজ্জা পেল। ছেলে বলল, ঘরে চল বাবা, কিছু মনে কর না। ঘরে ঢুকে লোকটি স্ত্রীকে বলল, আমার ছেলে এত বড় হয়েছে? স্ত্রী বলল, হবে না। সেই কবে আপনি যুদ্ধে গিয়েছেন, ফিরলেন এতদিন পরে। লোকটি বলল, আমার সেই ত্রিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা কোথায় রেখেছ? এবার লোকটি একটি থলে এগিয়ে দিয়ে বলল, এখানে আরো চল্লিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা আছে, একসাথে রাখ। স্ত্রী বলল, সেগুলো আমি পুঁতে রেখেছি। কিছুদিন পর বের করব। যুবক মসজিদে গেলে স্ত্রী স্বামীকে ছালাত আদায় করতে মসজিদে পাঠিয়ে দিল। ছালাত শেষে লোকটি দেখল, মসজিদ চত্বরে বহু লোকের সমাগম। পাঠচক্র চলছে। কাছে গিয়ে দেখল, এক অল্প বয়সী যুবক জড়সড় হয়ে অধোমুখে দরস দিচ্ছে। আর বহু গণ্যমান্য আলেম-ওলামা একান্ত মনোযোগের সাথে তার দরস শুনছেন। লোকটি আশ্চর্য হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল, কে এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি? লোকটি বলল, তিনি হলেন মদীনা নগরীর সবচেয়ে বড় ফক্বীহ ইমাম রাবী'আতুর রায়। বাবা ছেলের পরিচয় পেয়ে যারপর নাই খুশি হ'লেন। হৃদয়ের দুকূল ছাপিয়ে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। তিনি প্রাণভরে ছেলের জন্য দো'আ করলেন ও আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করলেন। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, আজ আমি তোমার ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখেছি, যে অবস্থায় কেউ তার ছেলেকে দেখেনি। সত্যিই আমি সৌভাগ্যবান। স্ত্রী তখন হেসে বলল, আপনি এই ত্রিশ হাযার মুদ্রা চান, না এই ছেলেকে চান? আপনার রেখে যাওয়া ত্রিশ হাযার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে আমি এই সোনার ছেলে গড়েছি। আপনি খুশী হয়েছেন? তিনি বললেন, আজ আমার খুশির সীমা নেই। তোমার মত মহীয়সী মা যার আছে, তার এমনটি হওয়া্ইতো স্বাভাবিক। আমার কষ্টে অর্জিত অর্থ তুমি হকের পথেই ব্যয় করেছ। আল্লাহ তোমাকে এর উত্তম বিনিময় দান করুন!

শিক্ষা: আদর্শ জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন আদর্শ মা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00