📄 সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ
এক গ্রামে ত্বাইয়েব ও তাহের নামে দুই বন্ধু ছিল। তাদের মধ্যে ছিল দারুণ বন্ধুত্ব। যাকে বলে গলায় গলায় ভাব। এদের মধ্যে ত্বাইয়েব এলাকায় ভাল ছেলে হিসাবে পরিচিত ছিল। লেখা-পড়া, চাল-চলন, আচার-আচরণে আর পাঁচটা ছেলের চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। পক্ষান্তরে তাহের ছিল দুষ্ট প্রকৃতির। দুষ্টুমিতে তার কোন জুড়ি ছিল না। গ্রামে কারো গাছের পেয়ারা, কারো পেঁপে, কারো তাল, কারো নারিকেল চুরি করে খাওয়াই ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। কাউকে গালি দেওয়া, কাউকে অযথা চড়-থাপ্পড় মারা ছিল তার মজ্জাগত দোষ। গ্রামের প্রভাবশালী মোড়লের ছেলে বলে তার গায়ে কেউ হাত তোলার সাহস পেত না। কিন্তু গ্রামবাসী তাকে কখনো ভাল চোখে দেখত না। কোন লোক তার ছেলে বা ভাই-ভাতিজাকে তাহেরের সঙ্গে মিশতে দিত না।
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে ত্বাইয়েব দুর্ঘটনায় পতিত হয়। ত্বাইয়েবের এ বিপদ মুহূর্তে তাহের এগিয়ে আসে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তাদের বাড়িতে খবর দেয়। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে ত্বাইয়েব তাহেরের বাড়িতে যায়। এ থেকে দু'জন দু'জনের বাড়িতে আসা-যাওয়া শুরু করে। ফলে তাদের মধ্যে সখ্যতা আরো বাড়ে। কালক্রমে তাহেরের দুষ্ট চরিত্রের অসৎ গুণাবলী ত্বাইয়েবের মাঝে সঞ্চারিত হয়। সেও লিপ্ত হয় নানা গর্হিত কাজে। ফলে তার লেখাপড়ায় দুর্বলতা চলে আসে। বন্ধুরা তার ধারে কাছে ঘেঁষে না, শিক্ষকরাও তাকে আর ভাল চোখে দেখেন না। গ্রামের লোকেরা পরস্পর বলাবলি করতে থাকে, দুষ্ট তাহেরের খপ্পরে পড়ে সোনার টুকরা ত্বাইয়েব ছেলেটাও দিন দিন গোল্লায় যেতে বসেছে।
একদিন ত্বাইয়েবের কানেও এসব কথা চলে আসে। তখন সে ভাবতে থাকে, তার এই অধঃপতনের মূল কারণ কি? সে চিন্তা করতে থাকে এক সময় আমি ক্লাসে প্রথম হ'তাম, এখন আমার রোল নম্বর দশের নীচে। এক সময় ক্লাসের ছেলেরা আমার পিছে পিছে ঘুরত অংক, ইংরেজী বুঝে নেওয়ার জন্য। অথচ আজ আমি সবার চোখে খারাপ হয়ে গেছি। অন্তরঙ্গ বন্ধু আব্দুল্লাহও আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেছে। লেখাপড়ায় সে ব্যাপক উন্নতি ও ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেছে। চরিত্র-মাধুর্যেও সে সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। আজ সে গ্রামের ভাল ছেলে বলে পরিচিত। এর মূল কারণ খুঁজতে গিয়ে সে রহস্য উদঘাটন করে যে, স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা আব্দুর রহমান স্যারের সাথে আব্দুল্লাহ্র সম্পর্ক। তাঁর কথামত সে চলে। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে। নিয়মিত পড়াশুনা করে। খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে না। পড়ালেখার ফাঁকে অবসর সময়ে ধর্মীয় বই-পুস্তক পড়ে এবং কুরআন- হাদীছ অধ্যয়ন করেই তার সময় কাটে। তাই তার এত সুনাম, লোকের মুখে মুখে তার প্রশংসা। ত্বাইয়েব মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, তাকেও আব্দুল্লাহ্র মত হ'তে হবে। ত্বাইয়েব তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মাওলানা আব্দুর রহমান ছাহেবের নিকট গিয়ে বলল, স্যার! আমি খারাপ হয়ে গেছি, শেষ হয়ে গেছে আমার ক্যারিয়ার। এ থেকে উত্তরণের উপায় কি? কিভাবে আমি ভাল হ'তে পারি স্যার? মাওলানা আব্দুর রহমান বললেন, তুমি আগে এরূপ ছিলে না। সঙ্গদোষে তোমার এ অবস্থা? তোমাকে আমি একটি হাদীছ শুনাব,
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَثَلُ الْجَلِيْسِ الصَّالِحِ وَالسُّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكَيْرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ وَ إِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الْكِيْرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً
আবূ মূসা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'সৎ সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মিশকে আম্বরওয়ালা ও হাপরওয়ালার ন্যায়। মিশকে আম্বরওয়ালা তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে কিছু সুগন্ধি ক্রয় করবে অথবা তার নিকট থেকে তুমি সুগন্ধি লাভ করবে। আর হাপরওয়ালা তোমার জামা-কাপড় জ্বালিয়ে দেবে কিংবা তার নিকট থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে' (বুখারী হা/৫৫৩৪; মিশকাত হা/৫০১০)।
এ হাদীছ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হ'ল, চরিত্রবান, সৎ ও ভদ্র দেখে বন্ধু নির্বাচন করতে হবে। পাশাপাশি তোমাকে নিয়মিত ছালাত আদায়, অবসরে কুরআন-হাদীছ অধ্যয়ন এবং প্রতিদিন নিয়মিত ৫/৬ ঘণ্টা পড়ালেখা করতে হবে। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ পরিহার করে চলতে হবে। আড্ডা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এসব যদি মেনে চলতে পার, তাহ'লে অতি অল্প সময়ের মধ্যে তুমি সকলের প্রিয়পাত্রে পরিণত হ'তে পারবে।
অতঃপর ত্বাইয়েব তার শিক্ষকের পরামর্শমত চলতে শুরু করে। অল্পদিনের মধ্যে লেখাপড়ায় তার যথেষ্ট উন্নতি হয়। বিনা প্রয়োজনে সে বাড়ির বাইরে যায় না। খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে না। অবসরে সাহিত্যচর্চা করে, ধর্মীয় বই পড়ে। এভাবে চলতে চলতে অল্পদিনের মধ্যেই ত্বাইয়েব সবার মন জয় করতে সক্ষম হয়। সবাই তাকে দেখলে পূর্বের মত আদর করে। বাবা-মা তাকে নিয়ে গর্ব করেন। সামনে তার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা। শিক্ষক-অভিভাবক সবার প্রত্যাশা ত্বাইয়েব এবার আরো ভাল করবে।
শিক্ষা: সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। অসৎসঙ্গ সর্বদা পরিহার করতে হবে। ছেলে-মেয়ের বন্ধু-বান্ধব সম্পর্কে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। কোনক্রমেই যাতে চরিত্রহীনদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব না হয়, সে বিষয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিতে হবে।
📄 ষড়যন্ত্রের পরিণতি
যে সময় সারা দুনিয়া অগণিত ছোট-বড় রাজ্যে বিভক্ত ছিল এবং রাজা-বাদশাহ দ্বারা দেশ শাসিত হ'ত, সে সময়ের একটি কাহিনী। এক রাজা একদিন অত্যন্ত চিন্তিত মনে রাজদরবারে বসে আছেন। এ সময় উযীর তাঁর মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, রাজা চিন্তায় বিভোর। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মনে হয় কোন বিষয়ে চিন্তা করছেন? রাজা বললেন, আপনার অনুমান সঠিক। আমার বিবাহিত জীবনের বার বছর কেটে গেল, অথচ আমার কোন সন্তান হ'ল না। এত বড় একটি রাজ্য, এর উত্তরাধিকার নেই। আমার অনুপস্থিতিতে রাজ্যটির অবস্থা কী হবে? এ চিন্তায় আমি মুষড়ে পড়েছি। আমার স্ত্রী সম্ভবত আর সন্তান জন্ম দিতে পারবে না। আমি আমার স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালবাসি। তাই আমি দ্বিতীয় বিয়ে করতেও অনিচ্ছুক।
উযীর বললেন, আপনার এত বড় রাজ্য একজন উত্তরাধিকারের অভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে- এটা তো হ'তে দেওয়া যায় না। তাই আমি আপনাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে অনুরোধ করছি এবং এটা রাজ্যের জন্য মঙ্গলজনকও বটে। অনুমতি পেলে আমি আপনার জন্য অতিসত্বর একজন উপযুক্ত পাত্রী নির্বাচন করতে পারি।
রাজা বললেন, পাত্রী আমার নির্বাচন করাই আছে। তবে আমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছি। কেননা এতে আমার প্রথম স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা কমে যেতে পারে। এ ব্যাপারে সম্ভবত স্ত্রীরও সম্মতি পাব না। কেননা নারীরা সতিন চায় না। তারা স্বামীকে একান্ত আপন করে নিতে চায়। আর আমার নির্বাচিত পাত্রীটি হচ্ছে আপনারই মেয়ে।
রাজার দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সময় একদিন অচেনা এক ফকীর এসে রাণীর নিকট খাবার চাইল। ফকীরের সারা দেহ ঘায়ে ভরা, সে ঘা হ'তে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে। রাণী তাকে পেট পুরে খাওয়ালেন। ফকীর খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে দো'আ করল, 'হে আল্লাহ! তুমি রাণীমাকে অতি সত্বর একটি পুত্রসন্তান দান কর'। দো'আ করার কিছুক্ষণ পরেই ফকীরকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। আল্লাহ পাক ফকীরের দো'আ কবুল করেছেন। রাণীমা সন্তানসম্ভবা হয়েছেন।
উযীরের যুক্তি ও পরামর্শে রাজা বিয়ে করতে স্থির সংকল্প করেছেন। বিয়ের দিন-তারিখও ধার্য হয়েছে। বিয়ের কথা জানতে পেরে রাণীমা রাজাকে বললেন, আপনি এ বিয়ে বাতিল করুন। আল্লাহ পাকের অশেষ দয়াতে আমি সন্তানসম্ভবা হয়েছি। অন্ততঃ কিছুদিন ছবর করুন! উযীর রাণীর কথা শুনে বললেন আর ভাবলেন, বিয়ে বানচাল করতে রাণীমার এটি একটি কৌশল মাত্র। কারণ বারো বছর যার সন্তান হয়নি, দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনে তার গর্ভে সন্তান কিভাবে আসতে পারে? উযীরের নিজ কন্যার সাথে রাজার বিয়ে হবে, এতে তিনি গড়িমসি করতে পারেন না। তাই তিনি রাণীর কথায় কান না দিতে রাজাকে বিয়েতে প্ররোচিত করলেন।
রাজার দ্বিতীয় বিয়ে হয়ে গেল। দ্বিতীয় স্ত্রীই এখন রাজার হৃদয়মন জয় করে ফেলেছে। তার যে কোন কথাই এখন রাজার শিরোধার্য। সে যখন বুঝতে পারল, রাণী সত্যি সত্যিই সন্তানসম্ভবা, তখন সে এক চাল চালল। সে সঠিকভাবে বুঝেছিল যে, রাণীর সন্তান হ'লে রাজার সমুদয় ভালবাসা তার প্রতি নিবেদিত হবে। তাই সে রাণী সম্বন্ধে রাজার নিকট অপবাদ দিল। বলল, যেদিন আপনি শিকার করতে গেছেন, ঐদিন আমি তাকে সেনাপতির সাথে গোপনে কথা বলতে দেখেছি। একথা শুনামাত্র রাজা একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ সেনাপতিকে তলব করতে চাইলেন। উযীর কন্যা বলল, আপনি একাজ না করে রাণীকে নির্বাসনে পাঠান। সেনাপতিকে ক্ষেপিয়ে কাজ নেই। রাজা বুঝলেন যে, উযীর কন্যার কথা উযীরের মতই। তাই তিনি তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন।
রাজা এক রক্ষীকে দিয়ে রাণীকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিলেন। দুই রাজ্যের সীমানা দিয়ে এক নদী প্রবাহিত। রক্ষী তাকে নদী তীরের এক বনভূমিতে রেখে ফিরছে। রাণী রাজাকে তার গর্ভবতী হওয়ার সংবাদ দিতে রক্ষীকে অনুরোধ জানান। রক্ষী রাণীকে বনবাস দেওয়ায় রাণীর নিকট ক্ষমা চাইল। সে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, আমাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একাজ করতে হয়েছে। আমরা হুকুমের দাস। হুকুম অমান্য করলে আমাদের গর্দান যাবে। রক্ষী রাজাকে সংবাদ দেবার অঙ্গীকার করল।
রাণী নির্বাসিত হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহ্র নিকট আবেদন-নিবেদন করছিলেন। এমন সময় নদী পথে এক সওদাগর যাচ্ছিলেন। নারীর কান্না শুনে তিনি নৌকা ভিড়িয়ে তীরে নামলেন। দেখলেন, এক পরমা সুন্দরী নারী ক্রন্দন করছে। তাকে ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করলে রাণী সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। রাণী বললেন, আপনি আমার প্রতি দয়া করুন ভাই! আমাকে আশ্রয় দিলে আল্লাহ আপনার প্রতি খুশী হবেন। আমি একজন গর্ভবতী নারী।
সওদাগর লোকটি একটু বয়সী ছিলেন। তাঁর কোন বোন ছিল না। রাণীর ভাই ডাকে তিনি খুশী হ'লেন। তিনি রাণীকে উপযুক্ত আশ্রয় দিলেন। যথাসময়ে রাণী একটি সুদর্শন পুত্রসন্তান প্রসব করলেন। সন্তানের নাম রাখলেন আব্দুল্লাহ। সে ঐ আশ্রয়ে থেকেই বড় হ'তে লাগল।
এদিকে রক্ষী রাজাকে রাণীর সন্তানসম্ভবা হওয়ার সংবাদ দিলেন এবং কোন সূত্রে দ্বিতীয় রাণীর চক্রান্তও রাজার নিকট প্রকাশিত হ'ল। রাজা এর যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে দৃঢ়চিত্ত হ'লেন। সেনাপতি পালিয়ে যেতে উদ্যত হল। দ্বিতীয় রাণী তাকে বলল, তুমি নাকি সেনাপতি? তুমি একজন কাপুরুষ! একা তুমিই এ রাজ্যের সর্বেসর্বা হ'তে পার, প্রয়োজন কেবল বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করা। প্রথমতঃ তুমি তোমার সৈন্যদেরকে হাত কর। এরপর প্রজাদেরকে অধিকহারে খাজনা প্রদানের ঘোষণা দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোল। তারপর রাজাকে বন্দী করে প্রজাদের জানিয়ে দাও, রাজার ঘোষণা অনুযায়ী খাজনা দিতে হবে না। এখন থেকে অর্ধেক খাজনা গ্রহণ করা হবে।
যে পুরুষ বা নারী অন্যের নামে অপবাদ দেয়, সে নারী বা পুরুষ চরিত্রবান হয় না। এ নারীও তাই। রাজাকে বাদ দিয়ে তার মনোরাজ্যে এখন সেনাপতিই আসন গেড়েছে। উযীর কন্যার পরামর্শ মোতাবেকই সেনাপতি কাজ করে চলেছে। রাজাকে বন্দী করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এদিকে যে রক্ষী রাণীকে নির্বাসনে দিয়ে এসেছিল, সে-ই রাতের অন্ধকারে রাজাকে বন্দীশালা হ'তে উদ্ধার করে যেখানে রাণীকে নির্বাসন দিয়ে এসেছিল সেখানে রেখে এল।
ভাগ্য যখন প্রসন্ন হয়, তখন বিপদ আপনাআপনি কেটে যায়। তাই রাজা ঘুরতে ঘুরতে রাণীর আশ্রিত স্থানে এসে পৌঁছলেন। রাজা-রাণীর সাক্ষাৎ হ'ল। উভয়ে তখন পুনর্মিলন আনন্দে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। রাণী ছেলেকে পিতার সাথে পরিচয় করে দিলেন। রাজা ছেলেকে বুকে তুলে নিলেন।
রাজা লোক মারফত গোপনে নিজ রাজ্যের লোকদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখলেন। এ রাজ্যের রাজার সহায়তায় অতি সহজেই রাজা নিজ রাজ্য ফিরে পেলেন। কারণ তিন ব্যক্তি ছাড়া সবাই রাজার প্রতি আনুগত্যশীল ছিল। সেনাপতি, উযীর ও উযীর কন্যা। অবশেষে তারা ধৃত হয়ে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হ'ল।
শিক্ষা: যে অন্যের জন্য ষড়যন্ত্র করে সে নিজেই সেই ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়ে। ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণতি সর্বদা এমনই হয়ে থাকে। আরবী প্রবাদে আছে, مَنْ حَفَرَ بَتْراً لَأَخِيْهِ؛ وَقَعَ فِيْهِ 'যে তার ভাইয়ের জন্য কূপ খনন করে, সে নিজেই তাতে পতিত হয়'।
📄 বক ও কাঁকড়া
একটি বক কোনো এক জলাশয়ের ধারে বাস করতো আর জলাশয়ের মাছ খেয়ে দিন কাটাতো। বৃদ্ধ বয়সে যখন তার মাছ শিকারের শক্তি থাকল না, তখন মনে মনে ভাবল, এবার কৌশলে মাছ শিকার করতে হবে। একদিন খুব বুকভরা দরদ নিয়ে জলাশয়ের ধারে গিয়ে বসল। তার মুখ দেখে এক কাঁকড়ার দয়ার উদ্রেক হ'ল। সে জিজ্ঞেস করল, কি ভাই তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?
বক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, কী বলব ভাই, আজ দু'জন শিকারীকে আলাপ- আলোচনা করতে দেখলাম। তাদের একজন বলল, জলাশয়টিতে অনেক মাছ আছে, চলো আমরা জাল দিয়ে মাছগুলো ধরে নিয়ে যাই। অন্যজন বলল, না। তার আগে চারদিকে জাল দিয়ে ঘিরে ফেলতে হবে; পরে সুযোগ মতো ধীরে ধীরে নিলেই চলবে। এসব কথা শুনে আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। যদি সব মাছ ধরে নিয়ে যায়, তাহলে আমার কি উপায় হবে? এদের উপরই আমার জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। এতদিন এখানে থাকতাম, এখন বাকি জীবনে বুড়া বয়সে কোথায় যাব। কাঁকড়া এ কথা শুনে সব মাছকে খবর দিল। ওরা শুনে হায়! হায়! করতে শুরু করল এবং বকের নিকট এসে এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানতে চাইল। বক বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, কাছেই খুব বড় একটি নদী আছে। আমি তোমাদেরকে এতটুকু সাহায্য করতে পারি যে, প্রতিদিন কিছু কিছু মাছকে সেখানে পৌঁছে দিব। মাছেরা পরামর্শ শুনে খুব খুশি হল। এমনি করে বক কৌশলে মাছ ধরে খেতে আরম্ভ করল। এভাবে কিছুদিন খাওয়ার পর কাঁকড়ার একদিন সে নদী দেখার সাধ জাগল। বকের পিঠে চড়ে সে নদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। দূর থেকে মাছের হাড়ের স্তূপ দেখেই সে বকের কৌশল বুঝতে পারল। তখন তার মনে পড়ল- জ্ঞানীরা বলেছেন, শত্রু যখন তোমার অধীনে থাকে তখনি তাকে শেষ করে দাও।
তাতে যদি সফল হও ক্বিয়ামত পর্যন্ত তোমার নাম থাকবে, আর মারা গেলেও বেইয্যতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। কাঁকড়া বুদ্ধি করে বকের গলা চেপে ধরল। বৃদ্ধ বক কিছুক্ষণ ছটফট করে মারা গেল।
শিক্ষা: যে অন্যের জন্য কূপ খনন করে, সেই তাতে নিপতিত হয়।
📄 বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম ও ঐক্যের শক্তি
অনেকদিন আগের কথা। গভীর বনে বাস করত এক শিয়াল এবং তার পাশে বাস করত এক গরু। গরু সহ অন্যান্য প্রাণীর জীবনের কোন নিশ্চয়তা ছিল না। তারা প্রতিনিয়ত বনের হিংস্র প্রাণীদের দ্বারা আক্রান্ত হ'ত। তাই শিয়াল ও গরু মিলে চিন্তা করল বনের নিরীহ প্রাণীদের নিরাপত্তার একটি ব্যবস্থা করা দরকার। তারা দু'জন একমত হ'ল যে, বনের সকল নিরীহ প্রাণীদের নিয়ে একটি সমাজ গঠন করা হবে। তাদের এই সিদ্ধান্তে বনের নিরীহ প্রাণীরা খুশীতে বাগবাগ হয়ে উঠল এবং তারা বনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে এই সমাজের আওতাভুক্ত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করল। বনের নিরীহ প্রাণীদের নিয়ে গঠিত এই সমাজকে গরু ও শিয়াল মিলে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পারস্পরিক সহমর্মিতার মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। এভাবে তারা হিংস্র প্রাণীদের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করার পথ সুগম করল।
এভাবে চলতে চলতে একদিন শিয়াল ও গরু দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে নিজেদের সীমানা অতিক্রম করে গভীর বনে ঢুকে পড়ে। হঠাৎ তাদের সামনে উপস্থিত হয় বিশালদেহী ভয়ংকর এক সিংহ। তার চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিংগ ছিটকে পড়ছে এবং রাগের প্রচণ্ডতায় সে থরথর করে কাঁপছে। কেননা তাদের দু'জনের কারণেই তার শিকার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। সাথে সাথে বনে তার আধিপত্যও আগের চেয়ে কমে গেছে।
সিংহের এই রাগ দেখে শিয়াল ভড়কে যায় এবং সে মাথায় কুটিল বুদ্ধি আঁটে। সে গরুকে বলল, বন্ধু! তুমি এখানে থাক। আমি সিংহকে গিয়ে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে নিয়ন্ত্রণ করছি। এই বলে সে সিংহের কাছে গিয়ে বলল, মামা! আমি চিরজীবন তোমার সাথেই ছিলাম, এখনো তোমার সাথেই আছি। এইতো দেখছ বনের নিরীহ প্রাণীদের নব জাগরণের অগ্রদূত তোমার চির শত্রু শয়তান গরুটাকে তোমার জন্যই এনেছি। তুমি ওকে খেয়ে তোমার কলিজা ঠাণ্ডা কর।
জবাবে সিংহ বলল, আচ্ছা ঠিক আছে তুমি আগে গরুটাকে বনের পাশের একটা গোপন গর্তে নিয়ে যাও। কেননা গরুকে প্রকাশ্যে খেলে তার অনুগত জন্তুদের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। শিয়াল হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে গরুর কাছে এসে তাকে বলল, সিংহ আমাদের পাশের গর্তে যেতে বলল, তাহ'লে আমরা রক্ষা পাব। গরু শিয়ালের কথা সরল মনে বিশ্বাস করে পাশের গর্তে চলে গেল। এদিকে শিয়াল এসে সিংহকে বলল, সে যেতে চাইছিল না। অনেক বুঝিয়ে ওকে নিয়ে গেছি। যান এবার আপনার দিলটা জুড়িয়ে আসেন।
সিংহ সে কথার দিকে কর্ণপাত না করে শিয়ালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শিয়াল চিৎকার করে বলল, হুযূর আমাকে কেন? আপনার জন্যে তো গরুকে গর্তে রেখে এসেছি। দয়া করে আমাকে খাবেন না। জবাবে সিংহ বলল, 'ওরে দুষ্ট শিয়াল তুই যদি তোর চিরদিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং বিপদ-আপদ ও তোদের সমাজ গঠনের অন্যতম সাথী গরুর সাথে শুধুমাত্র তোর নিজ স্বার্থের জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিস, তাহ'লে তুই যে পরে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবি না- এর কি নিশ্চয়তা আছে?
ওরে মুনাফিক! এজন্য আগে তোকেই খাব। আর গরু তো গর্তে ধরাই আছে, ওকে পরে খেয়ে নেব। এই বলে সে শিয়ালের ঘাড় মটকাল। অন্যদিকে বনের প্রাণীরা এই অবস্থা জেনে ফেলে এবং তারা সবাই গর্তে আটকা পড়া তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার কাছে সমবেত হয়ে ঘটনা কি তা জানতে চায়। গরু শিয়ালের বিশ্বাসঘাতকতা সহ তার বিপদের ঘটনা পুরো খুলে বলে। বনের প্রাণীরা ঘটনা শুনে শিয়ালের উপর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তার করুণ পরিণতিতে আনন্দ প্রকাশ করে।
এদিকে সিংহ শিয়ালকে শেষ করে গরুকে খাওয়ার জন্য সামনে অগ্রসর হয়। বনের প্রাণীরা তার এই আগমনের কথা জানতে পেরে অত্যন্ত সুসংঘবদ্ধভাবে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় গরুকে ঘিরে এক নযীরবিহীন নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি করে এবং সকলেই একসাথে নিজ নিজ কণ্ঠে ভীষণ আওয়াযে হুংকার দিতে থাকে। তাদের এই সমবেত হুংকার বনের চারিদিকে এক রণতরঙ্গ সৃষ্টি করে। তাদের এই রণতরঙ্গে হিংস্র সিংহের হুংকার দিগন্তে বিলীন হয়ে যায়।
সিংহ তাদের এই অবিচ্ছেদ্য অটুট ঐক্য ও হুংকারে ভড়কে যায়। গরুকে খাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সে পিছুটান দেয় এবং পালিয়ে বনের ভিতর চলে যায়।
অন্যদিকে নিরীহ হাযার হাযার প্রাণীর সমবেত উচ্চারণ বনের দিগ-দিগন্তে পৌঁছে যায় এবং সবাই তাদের একতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতার কথা জানতে পারে। ফলে হিংস্র প্রাণীরা ছাড়া সমস্ত বনে আরো যত প্রাণী ছিল সবাই গরুর নেতৃত্বে সমবেত হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একই সমাজভুক্ত হয়। এইভাবে পুরো বন নিরীহ প্রাণীদের আওতাধীন হয় এবং সমস্ত বনের নেতা হয় গরু।
শিক্ষা: যুগে যুগে স্বজাতির সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের পরিণতি হয়েছে ঠিক ঐ শিয়ালের মতোই। পক্ষান্তরে ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোন শক্তিই হার মানতে বাধ্য।