📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 মিথ্যা সাক্ষী

📄 মিথ্যা সাক্ষী


বছরা শহরের এক গৃহস্থের দুই পুত্র ছিল। বড়জনের নাম হাতেম ও ছোটজনের নাম কাযেম। একবার ব্যবসায় তারা কিছু বাড়তি অর্থ লাভ করল এবং বিদেশে সফরে যাওয়ার চিন্তা করল। দিন তারিখ দেখে তারা দু'ভাই এক সাথে বেরিয়ে পড়ল। তিনদিন সফরের পর তারা এক মুসাফিরখানায় আশ্রয় নিল। সেখানে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে আবার যাত্রা শুরু করল।
কিছুদূর যেতেই তারা নদীতে একটি পুটুলি ভেসে যেতে দেখে উপরে তুলল। খুলে দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। পুটুলিতে এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা ও দু'টি হীরকখণ্ড পেয়ে তারা আল্লাহ্র প্রশংসা করল। অতঃপর তা নিজেরা সমানভাবে ভাগ করে নিল। এরপর আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু সঙ্গে এত অর্থ ও মূল্যবান হীরক নিয়ে চলা তারা নিরাপদ মনে করল না। তাই দু'জনে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিল যে, ছোট ভাই এগুলি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। আর বড় ভাই কিসরা নগরে যাবে। হাতেম বলল, এগুলি নিয়ে তুমি বাড়ি গিয়ে তোমার ভাবীর হাতে দিবে। ছোট ভাই কাযেম বাড়ি গিয়ে ভাইয়ের দেওয়া স্বর্ণমুদ্রাগুলি ভাবীর কাছে দিল। কিন্তু হীরকখণ্ড না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিল। এ সম্পর্কে হাতেমের স্ত্রী কিছুই জানতে পারল না।
এদিকে বড় ভাই হাতেম নানা দেশ ঘুরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে টাকা-পয়সা ও মালামাল নিয়ে তিন বছর পর দেশে ফিরে এলো। কয়েকদিন পর সে স্ত্রীকে স্বর্ণমুদ্রা ও হীরকখণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে, কাযেম হীরকখণ্ড দেয়নি। তখন হাতেম কাযেমকে জিজ্ঞেস করল, হীরক খণ্ডের খবর কি? তুমি তোমার ভাবীর হাতে ওটা দাওনি। কাযেম কসম করে বলল, ভাই আপনার স্ত্রী মিথ্যা বলছে। কাযেমের কথা বিশ্বাস করে হাতেম তার স্ত্রীকে তিরস্কার করল। হাতেমের স্ত্রী অপমানিত হয়ে স্বামীকে না জানিয়ে উক্ত শহরের কাযীর কাছে গেল এবং আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করে সুবিচার প্রার্থনা করল।
কাযী হাতেম ও কাযেমকে ডেকে পাঠালেন এবং তাদের কাছে ঘটনার বিবরণ জানতে চেয়ে সত্য কথা বলার জন্য অনুরোধ করলেন। কাযী কাযেমকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যখন হীরকখণ্ড হাতেমের স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর কর তখন কোন সাক্ষী ছিল কি? সে বলল, হ্যাঁ, দুইজন সাক্ষী ছিল।
কাযী সাক্ষীদ্বয়কে আদালতে হাযির করার হুকুম দিলেন। কাযেম গিয়ে দু'জন লোককে কিছু অর্থ দিয়ে বলল, ভাই তোমরা আমার সঙ্গে আস। কাযীর দরবারে তোমরা সাক্ষ্য দিবে যে, তিনবছর পূর্বে অমুক দিন তোমাদের উপস্থিতিতে আমি আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে পাঁচশত সোনার মোহর ও একখণ্ড হীরক দিয়েছিলাম। অর্থের বিনিময়ে সে দুই সাক্ষী কাযীর কাছে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল।
কাযী সাক্ষীর পরিপ্রেক্ষিতে রায় দিলেন যে, হাতেমের স্ত্রীর কাছে হীরকখণ্ড রয়েছে। হাতেমকে হুকুম দিলেন তার স্ত্রীর কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে।
এমতাবস্থায় হাতেমের স্ত্রী নিরুপায় হয়ে বাদশাহর দরবারে গিয়ে কান্নাকাটি করে বিস্তারিত ঘটনা জানিয়ে সুবিচার চাইল। বাদশাহ বললেন, তুমি কাযীর কাছে গেলে না কেন? সে বলল, হুযূর গিয়েছিলাম। কিন্তু সুবিচার পাইনি। এখন আপনার কাছেও সুবিচার না পেলে স্বামীর ঘরে থাকা আমার দায় হয়ে পড়বে।
বাদশাহ হাতেম, কাযেম ও সাক্ষীদ্বয়কে দরবারে ডাকলেন এবং তাদের কাছে সবকিছু বিস্তারিত জানলেন। কাযেম ও তার সাক্ষীরা আগের মতই সাক্ষ্য দিল।
বাদশাহ হাতেম, কাযেম, দু'সাক্ষী ও হাতেমের স্ত্রীকে জেল-হাজতে ঢোকালেন। তাদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা সেল বা কক্ষে রাখার ব্যবস্থা করলেন। আর প্রত্যেককে কিছু মোম দিয়ে হুকুম দিলেন, হীরকখণ্ডের আকৃতি তৈরী কর, তাহ'লে ছেড়ে দেওয়া হবে।
হাতেম ও কাযেম দুই ভাই মোম দ্বারা অভিন্ন আকৃতির হীরক তৈরী করল। আর সাক্ষীদ্বয়ের হীরকের আকৃতি হ'ল ভিন্ন ভিন্ন। এদিকে হাতেমের স্ত্রী কিছুই তৈরী করতে পারল না। বাদশাহ সবাইকে দরবারে ডেকে মোম নির্মিত হীরকের আকৃতি উপস্থিত করার নির্দেশ দিলেন। দুই ভাই ও সাক্ষীদ্বয়ের তৈরীকৃত হীরক আকৃতি বাদশাহ্র সম্মুখে পেশ করা হ'ল। দরবারের সবাই দেখল যে, দুই ভাইয়ের হীরকের আকৃতি এক ও অভিন্ন। কিন্তু সাক্ষীদের হীরকের আকৃতি ভিন্ন ভিন্ন।
তখন বাদশাহ ও দরবারের সকলেই বুঝতে পারলেন যে, সাক্ষীরা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে। তারা হীরক আদৌ দেখেনি। তাই তাদের তৈরী হীরকের আকৃতিতে মিল নেই। তখন বাদশাহ বললেন, হাতেমের স্ত্রীর তৈরী হীরক আকৃতি কোথায়? হাতেমের স্ত্রী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, হুযূর! আমি তো হীরক কখনই দেখিনি। আমি কিভাবে হীরক আকৃতি তৈরী করব? তাই আমি কিছুই তৈরী করতে পারিনি। বাদশাহ এবং দরবারে উপস্থিত সকলেই বুঝলেন যে, ছোট ভাই কাযেমই হীরকখণ্ড রেখে দিয়েছে এবং অর্থের বিনিময়ে দু'জন মিথ্যা সাক্ষীও হাযির করেছে।
কাযেম হীরকখণ্ডদ্বয় দরবারে হাযির করল এবং দুই হাতে দুই কান ধরে কসম করল যে, আর কোন দিন মিথ্যা কথা বলব না। আমার অন্যায় হয়েছে, আমাকে ক্ষমা করুন। বাদশাহ তাকে মাফ করে দিলেন।
বাদশাহ দু'ভাইকে দু'খণ্ড হীরক দিয়ে বিদায় দিলেন। আর হাতেমের স্ত্রীকে তার সততা ও সাহসের জন্য পুরস্কৃত করলেন। আর সাক্ষীদ্বয়কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য যথাযোগ্য শাস্তি দিয়ে কয়েদখানায় পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর কাযীকে ডেকে বললেন, আপনি সবদিক জেনে-শুনে বুদ্ধি-বিবেচনা করে বিচার করলেন না কেন? সত্য ঘটনা না জেনেই সেই মহিলার কাছ থেকে হীরকখণ্ড আদায় করতে বললেন। এরূপ রায় দেওয়া আপনার উচিত হয়নি।

শিক্ষা: সত্য কখনো চাপা থাকে না।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 বাদশাহ আমানুল্লাহর বিচক্ষণতা

📄 বাদশাহ আমানুল্লাহর বিচক্ষণতা


দুই ভাই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল শহরে দীর্ঘদিন ধরে কসাইগিরি করে প্রচুর টাকা উপার্জনের পর বাড়ী ফিরছিল। পথে এক ফকীরের সাথে তাদের দেখা হ'ল। ফকীর ও তারা এক গাছের নীচে বসে খাবার খেল। ফকীর তাদের সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল হ'ল। ফকীর বলল, তোমরা এত টাকা উপার্জন করে বাড়ী ফিরছ, টাকাগুলি আমাকে একবার দেখাও’। ফকীর টাকাগুলি নিয়ে তার থলেতে পুরে নিল। দু'ভাই তৎক্ষণাৎ ফকীরের কাছ থেকে টাকাগুলি ছিনিয়ে নিল। ফকীর তখন প্রাণপণে চিৎকার শুরু করে দিল। ফকীরের চিৎকারের বিষয় ছিল, 'আমার টাকা এরা দু'জনে ছিনিয়ে নিয়েছে’।
চিৎকারে বেশকিছু লোক সমবেত হ'ল। ফকীর বর্ণনা দিল, 'আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী শহরে থেকে ভিক্ষা করে টাকাগুলি উপার্জন করেছি। খেতে বসে গল্পে সে কথা প্রকাশ করায় ওরা দু'জনে মিলে আমার টাকাগুলি ছিনিয়ে নিয়েছে’। অপরদিকে দু'ভাইয়ের কথা তো বানিয়ে বলার দরকার নেই। তারা যা ঘটনা তাই বলল। সমবেত লোকজন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। তারা কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হ'তে পারল না। অগত্যা তারা ফকীর ও দু'ভাইকে বাদশাহ আমানুল্লাহ্র দরবারে হাযির করল।
বাদশাহ উভয়ের বক্তব্য শুনলেন। তিনি একটা পাতিলে পানি গরম করতে বললেন। পানি গরম হ'লে তিনি টাকাগুলি পানিতে ফেলে দিলেন। পানির স্বাভাবিক রং বদলে গেল। কারণ টাকাগুলিতে কসাইগিরির রক্ত লেগেছিল। বাদশাহ এবং উপস্থিত সকলে বুঝলেন, টাকাগুলির সত্যিকার মালিক দু'ভাই। টাকাগুলি তাদের দিয়ে দেওয়া হ'ল এবং ফকীরকে শাস্তি দেওয়া হ'ল।

শিক্ষা: অনেক সময় উপস্থিত বুদ্ধি বিচারের কাজে সহায়ক হয়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন

📄 আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন


কোন এক দেশে নওশের নামে এক রাজা ছিল। সৈন্য-সামন্ত, হাতি-ঘোড়া, ধন-সম্পদে তার কোন তুলনা ছিল না। অঢেল সম্পদ, বিশাল সেনাবাহিনীর অধিকারী এ রাজার মনে বেশ অহংকার ছিল। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের ছোট-খাট রাজা-বাদশাহদের সে মানুষ বলে মনেই করত না। তার ছিল এক অপরূপা সুন্দরী মেয়ে। একদিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে রাষ্ট্রীয় কাজে রাজা নওশেরের দরবারে আসে। পথিমধ্যে রাজকুমারীর সাথে মন্ত্রীর ছেলের সাক্ষাৎ হয়। দেশে ফিরে গিয়ে মন্ত্রীর ছেলে তার পিতার কাছে রাজা নওশেরের মেয়েকে বিবাহের কথা বলে। মন্ত্রী ছেলেকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, সে বাদশাহর মেয়ে। বাদশাহ নওশের তোমার মতো সাধারণ একজন মন্ত্রীর ছেলের নিকট তার মেয়ে বিয়ে দিবেন না। তাছাড়া সে সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হয়েছে। আর তুমি একজন মন্ত্রীর ছেলে মাত্র। তার চাহিদা তুমি পূরণ করতে পারবে না। ফলে সংসারে দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসবে। জীবনে কখনো সুখ পাবে না। তুমি এ মেয়ের কথা বাদ দাও। আমি তোমাকে অন্য জায়গায় ভাল ও সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করব। কিন্তু মন্ত্রীপুত্রের একই কথা- সে রাজকুমারীকেই বিয়ে করবে। অন্যথায় সে আত্মহত্যা করবে।
ছেলের কথা চিন্তা করে মন্ত্রী রাজা নওশেরের নিকটে যান। মন্ত্রী তার পুত্রের সাথে রাজার মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। মন্ত্রীর প্রস্তাব শুনে রাগে রাজার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। রাজা বলে তোমার ধৃষ্টতা তো কম নয়। সাধারণ একজন উযীর হয়ে আমার মেয়েকে তোমার ছেলের জন্য চাইতে আসলে কোন সাহসে? তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে বেরিয়ে যাও। রাজা মন্ত্রীকে যারপর নাই অপমান করে তার দরবার থেকে বের করে দিলেন।
দেশে ফিরে মন্ত্রী স্বীয় পুত্রকে ঘটনা আদ্যোপান্ত বলে তাকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিলেন। এদিকে রাজা নওশেরের অপমান সইতে না পেরে মন্ত্রী হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুতে মন্ত্রীপুত্রও শোকে মুহ্যমান। সে দেশের রাজাও প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মন্ত্রীপুত্রের নিকট থেকে মন্ত্রীর মৃত্যুর কারণ শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন, বাদশাহ নওশেরের কিসের এত অহংকার, আল্লাহ চাইলে তার রাজত্ব অন্যকে দান করতে পারেন।
এর কিছুদিন পর বাদশাহ নওশের একদা কুরআন তেলাওয়াত করতে বসে সূরা আলে ইমরানের নিম্নোক্ত আয়াত পড়লেন।
'বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও। আর যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর এবং যাকে ইচ্ছা অপমান কর। তোমার হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল' (আলে ইমরান ২৬)।
এ আয়াত পাঠ করে নওশের ভাবলেন, এটা কি করে সম্ভব? আমার এত সৈন্য-সামন্ত থাকতে কিভাবে আমার রাজ্য অন্যের করতলগত হবে? এটা হ'তে পারে না।
কিছুদিন পর রাজা নওশের পার্শ্ববর্তী রাজ্যের একটি এলাকা দখল করে নেন। একদিকে মন্ত্রীর মৃত্যু, অন্যদিকে রাজ্যের জমি অন্যায়ভাবে দখল করায় ঐ দেশের বাদশাহ নওফেল নওশেরের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। নওফেল তার বন্ধু রাজা পারভেজের সহযোগিতায় নওশেরের দেশ আক্রমণ করেন। যুদ্ধে বাদশাহ নওশের পরাজিত হন এবং সপরিবারে বন্দী হয়ে বাদশাহ নওফেলের নিকট নীত হন। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব দেখে এবং মন্ত্রীপুত্রের মনোবাসনা পূরণের জন্য রাজা নওশেরের কন্যার সাথে তার বিবাহ দেন। বিবাহে উপঢৌকন হিসাবে বাদশাহ নওফেল মন্ত্রীপুত্র আনজাসকে নওশেরের রাজ্যের প্রাদেশিক গভর্ণর নিযুক্ত করেন। আর মন্ত্রীপুত্র আনজাসের শ্বশুর হিসাবে বাদশাহ নওশেরকে মুক্ত করে দিয়ে যেখানে ইচ্ছা অবস্থানের সুযোগ দেন। রাজা নওফেলের এই মহানুভবতায় বাদশাহ নওশেরও মুগ্ধ হন। তিনি মুক্ত হয়ে আবার একদা কুরআন তেলাওয়াতের সময় সূরা আলে ইমরানের ঐ ২৬ নং আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন। তিনি এ আয়াত পড়ে কেঁদে আল্লাহ্র নিকট তওবা করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ অসীম ক্ষমতার মালিক। তিনি ইচ্ছা করলে যে কোন সময়ে বাদশাহকে ফকীর ও ফকীরকে বাদশাহ বানাতে পারেন।

শিক্ষা: আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। তেমনি ধন-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-সম্মান যাকে ইচ্ছা দান করেন। কিন্তু তা পেয়ে অন্যের প্রতি অত্যাচার, অনাচার করা অনুচিত।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 সময় মানুষের মধ্যে আবর্তিত হয়

📄 সময় মানুষের মধ্যে আবর্তিত হয়


বহুদিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক জমিদার। ধন-ঐশ্বর্য, অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে তার কোন জুড়ি ছিল না। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, রামাযানের সিয়াম পালন, ধন-মালের যাকাত প্রদান সহ ইসলামের বুনিয়াদী ফরয সমূহ তিনি যথাযথভাবে আদায় করতেন। সকাল-সন্ধ্যায় কুরআন তেলাওয়াত ছিল তার নিত্য-নৈমিত্তিক অভ্যাস। একদিন সকালে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতকালে নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়- وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ ‘আর আমি এ দিনগুলোকে মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি’ (আলে ইমরান ১৪০)। তিনি আয়াতের ব্যাখ্যা জানার জন্য মসজিদের ইমাম ছাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম ছাহেব অল্পকথায় এভাবে ব্যাখ্যা দিলেন যে, 'কোন কোন সময় ধনী মানুষ নিঃস্ব-দরিদ্র হয়, আবার কখনো দরিদ্র ব্যক্তি বিশাল সম্পদের মালিক হয়'। কিন্তু জমিদার এই ব্যাখ্যা মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারলেন না। কারণ বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষ থেকে তাদের জমিদারী বহাল আছে, এরতো কোন পরিবর্তন হয়নি! কোন অবনতি তো দূরের কথা, দিন দিন জায়গা-জমি, ধন-সম্পদ বেড়েই চলেছে। শত বিঘা জমির উপর বিশাল বাড়ি, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, আস্তাবলে ঘোড়া, সিন্দুক ভরা সোনা-চাঁদির বিশাল মজুদ, আছে হিরা-জহরত সহ মহামূল্যবান রত্ন। কোন আয়-উপার্জন না করে কোন লোক হাযার বছর ধরে বসে খেলেও তা নিঃশেষ হওয়ার নয়। সুতরাং এ সম্পদ কি নিমিষেই শেষ হয়ে একেবারে পথের ভিখেরী হওয়া সম্ভব? না, বিশ্বাস হয় না জমিদারের। প্রকারান্তরে তিনি আয়াতটি কিছুটা অস্বীকার করেন। মনে মনে ভাবেন, এটা কি করে সম্ভব?
ইবাদত-বন্দেগীতে যথেষ্ট আন্তরিক হ'লেও জমিদারের মনে কিছুটা অহংকার ছিল। কিছুটা বদ মেজাযীও ছিলেন তিনি। আবার কাজে-কর্মে ছিলেন একরোখা ও ভীষণ জেদি। যা করতে চাইতেন তা করে ফেলতেন। এজন্য তার কর্মচারী-কর্মকর্তারা যেমন তাকে যারপরনাই ভয় করত, তেমনি পরিবারের সদস্যরাও তার জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত। কারো কথায় বা পরামর্শে তিনি চলতেন না, নিজে যা বুঝতেন তাই করতেন। অনেকটা স্বৈরাচারী স্বভাবের লোক ছিলেন তিনি। লঘুদণ্ডে কাউকে গুরু শাস্তি প্রদান, আবার মহা অপরাধেও কাউকে ক্ষমা করে দিতেন সম্পূর্ণ নিজের খেয়াল-খুশিমত। ফলে তার দ্বারা অনেক সময় নিরপরাধ ও নির্দোষ মানুষও নির্যাতনের শিকার হ'ত।
একদা তার এক ছেলে তীর-ধনুক নিয়ে খেলছিল। এক দরিদ্র বৃদ্ধার একটি ছাগলের গায়ে তার নিক্ষিপ্ত তীর বিদ্ধ হয়ে ছাগলটি তৎক্ষণাৎ মারা যায়। বৃদ্ধা বিচারপ্রার্থী হয়ে জমিদারের দরবারে আসে। জমিদার ছেলেকে ডেকে ঘটনা জিজ্ঞেস করেন। ছেলে উল্টো অভিযোগ করে যে, খোলা মাঠে এভাবে ছাগল না থাকলে তো মরতো না। জমিদার ছেলের কথায় সায় দিয়ে বৃদ্ধার ছাগলের মূল্য না দিয়ে খোলা মাঠে ছাগল ছেড়ে দেয়ার অপরাধে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। বৃদ্ধা আল্লাহ্র কাছে দো'আ করে, আল্লাহ! তুমি এর বিচার করো!
একবার জমিদারের নায়েবের ছেলে ও জমিদারের ছেলের মধ্যে ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতায় নায়েবের ছেলে বিজয়ী হয়। পক্ষান্তরে জমিদারের ছেলে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়। সুস্থ হয়ে সে নায়েবের ছেলেকে বেদম প্রহার করে এবং তার ঘোড়াটাকেও মেরে ফেলে। নায়েব জমিদারের কাছে বিচার দিলে তিনি তার কোন বিচার না করে উল্টো নায়েবকে বলেন, আমার ছেলের বিরুদ্ধে আমার কাছে বিচার দিতে তোমার একটুও বাঁধল না। আমার খেয়ে, আমার পরে আমার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ? একটু মেরেছে তো কি হয়েছে? মরেতো যায়নি! চিকিৎসা করাও ভাল হয়ে যাবে। নায়েব একবুক ব্যথা নিয়ে অতিকষ্টে বাড়ি ফিরে আসে। আল্লাহ্র কাছে কেঁদে কেটে দো'আ করে, আল্লাহ! তুমিই ন্যায়বিচারক। এই যুলুমের সুষ্ঠু বিচার তোমার কাছে প্রত্যাশা করছি। তুমি এর বিচার করো!
জমিদারের ছিল শিকারের প্রবল নেশা। তিনি একদিন ঘটা করে তার লোকজন নিয়ে গভীর অরণ্যে শিকারের উদ্দেশ্যে যান। ৪/৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও তেমন কোন শিকারের সন্ধান না পেয়ে বনের আরো গভীরে চলে যান। পথিমধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়। জমিদার তার লোকজন থেকে আলাদা হয়ে পড়েন। এক একজন একেক দিকে ছুটে যায় প্রাণ বাঁচাতে। ফলে কারো সাথে কারো কোন যোগাযোগ থাকে না। সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জমিদারও দৌড়াতে দৌড়াতে অন্য রাজার দেশে চলে যান। ঘটনাক্রমে ঐদিন রাজার বাড়িতে ডাকাতি হয়। খোয়া যায় অনেক মূল্যবান জিনিস।
এদিকে রাজ্যের পাইক-পেয়াদা, সৈন্য-সামন্ত ডাকাত দলের খোঁজে প্রতিটি এলাকা ও বন-বাদাড় তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে তারা ঐ জমিদারকে বনের এক পাশে পেয়ে তাকেই ধরে নিয়ে যায়। গায়ের পোশাক-পরিচ্ছদ দামী হ'লেও তাতে ময়লা-আবর্জনা লেগে আছে। উষ্কখুষ্ক চুল, বিবর্ণ চেহারা। মুখে আভিজাত্যের ছাপ থাকলেও অন্ধকারে তা কেউ খেয়াল করেনি। তাকেই ডাকাত মনে করে ধরে নিয়ে যায়। ফেলে রাখে কয়েদখানায়। পরদিন সকালে রাজা ডাকাত বলে ধৃত জমিদারকে দেখতে আসেন। তাকে দেখে রাজার মনে ধাক্কা লাগে- এতো ডাকাত হ'তে পারে না? ঘুমিয়ে ছিল বলে তাকে রাজা ডাকতে নিষেধ করেন। ঘুম ভাঙ্গলে জমিদার ওযূর পানি চান। তিনি ওযু করে ছালাত আদায় করে ভাবতে থাকেন- আমি এখানে কেন? তিনি আস্তে আস্তে মনে করতে থাকেন। শুধু তাঁর মনে পড়ে যে, তিনি শিকারে বের হয়েছিলেন এবং ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন। তারপর আর তার কিছু মনে নেই।
জমিদার রক্ষীদের প্রশ্ন করে জানতে পারেন যে, তাকে ডাকাত হিসাবে ধরে আনা হয়েছে। তিনি তখন রাজার সাথে দেখা করতে চান। রাজার দরবারে তাকে আনা হ'লে তিনি ঘটনা খুলে বললেন। আর রক্ষীর কাছে তার ছালাত আদায়ের কথা শুনে রাজা ভাবলেন এ লোক ডাকাত হ'তে পারে না। রাজা তাকে ছেড়ে দেন। এদিকে জমিদার বাড়ি এসে দেখে তার বাড়ির অধিকাংশ নদীভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে, বাসভবন ধসে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আর কেউ বেঁচে নেই। ধন-ভাণ্ডারও নদীগর্ভে বিলীন। নায়েব, পাইক, পেয়াদা কে কোথায় আছে কারো হদিস নেই। জমিদার মসজিদে গিয়ে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করে নিজের অতীত-বর্তমানের কথা ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে কুরআনের ঐ আয়াতের কথা। জমিদার কেঁদে কেটে আল্লাহ্ নিকট তওবা করেন। নিজের ভুলের জন্য, কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান।

শিক্ষা: ক্ষমতার মোহে অনেক সময় মানুষ স্ফীত হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। সে মনে করে, তার ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি কখনোই নষ্ট হবে না। কিন্তু ক্ষমতার পট পরিবর্তনের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00