📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 কাযীর বিচার

📄 কাযীর বিচার


অনেক দিন আগের কথা। শহর থেকে অনেক দূরে বাস করত একটি লোক। সে ছিল নেহায়েত গরীব। গায়ে খেটে ও বুদ্ধির জোরে সে বেশ টাকাকড়ি সঞ্চয় করেছিল। সে এক পরমা সুন্দরীকে বিয়ে করেছিল। একে একে তাদের তিনটি ফুটফুটে ছেলে হয়েছিল। ছেলে তিনটি খুব সুদর্শন ছিল। ক্রমে তারা হয়ে ওঠে এক একজন সুঠামদেহী জওয়ান। ছেলে তিনটি কারবারে তাদের পিতাকে সাহায্য করতে শুরু করে। কিন্তু পিতাকে সাহায্য করলে কি হবে, তারা কেউই বাবার মত বুদ্ধিমান ছিল না। সেজন্য বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লোকটির চিন্তা-ভাবনাও বাড়তে লাগল। ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে ভেবে দেখল যে, তার ধন-সম্পদ যা কিছু রয়েছে, তাতে ছেলেরা সারাজীবন সুখে কাটিয়ে দিতে পারবে। ছেলেরা যাতে ভবিষ্যতে ঝগড়া-ফাসাদ না করে সেজন্য সে ঠিক করল যে, সব সম্পদ বণ্টন করে সে অছিয়তনামা তৈরী করে দিয়ে যাবে। এই ভেবে সে একজন উকিল ও দু'জন সাক্ষী ডেকে একটি অছিয়তনামা তৈরী করে ফেলল। তার মৃত্যুর পর অছিয়তনামা বের করা হ'ল। তাতে লেখা রয়েছে, ছেলেরা সোনা-চাঁদি, স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির সমান অংশ পাবে। তবে সতেরটা হাতির মধ্যে বড় ছেলে পাবে অর্ধেক, মেজো ছেলে পাবে তিন ভাগের এক ভাগ, আর ছোট ছেলে পাবে নয় ভাগের এক ভাগ। এটা ছিল জটিল ব্যাপার। তাই সমাধানের জন্য তারা তিন ভাই শহরের কাযীর কাছে গেল। কাযী বললেন, তোমরা এখন বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম করো। আগামীকাল সকালে আমি নিজে তোমাদের বাড়িতে যাব। তোমাদের হাতীগুলো বাইরে বের করে রেখ। তোমাদের পিতার অছিয়তনামা অনুযায়ী আমি সেগুলো যথাযথভাবে ভাগ করে দেব।
পরের দিন কাযী স্বীয় হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে সেখানে এসে হাযির হ'লেন। তিনি অছিয়তনামা পড়ে সবাইকে শোনালেন। এরপর বললেন, ছেলেরা! তোমাদের বাবা রেখে গেছেন সতেরটি হাতি আর আমি দিলাম একটি। মোট হ'ল আঠারটি। বড় ছেলের অর্ধেক অর্থাৎ সে নয়টি হাতি পাবে। সে তা নিয়ে নিক। মেজো ছেলে তিন ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ সে পাবে ছয়টি হাতি, সে তা নিয়ে নিক। আর ছোট ছেলে পাবে দু'টো হাতি। কারণ নয় ভাগের এক ভাগ তার পাওনা। এখন নয়, ছয় ও দুই মিলে হ'ল সতেরটা হাতি। এখন বাকী রইল একটি হাতী এবং এ হাতীটি আমার। অতএব আমি আমার হাতীটি ফেরত নিলাম। তোমরা সবাই খুশী হ'লে তো? ছেলেরা তখন যার যার ভাগের হাতী নিয়ে খুশিতে বাগবাগ হ'ল। কাযীর বিচারে সবাই সন্তুষ্ট। এই কঠিন হিসাবের সুষ্ঠু সমাধানে সবাই কাযীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল।

শিক্ষা : উপস্থিত বুদ্ধি বিচারকের অন্যতম গুণ।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 মিথ্যা সাক্ষী

📄 মিথ্যা সাক্ষী


বছরা শহরের এক গৃহস্থের দুই পুত্র ছিল। বড়জনের নাম হাতেম ও ছোটজনের নাম কাযেম। একবার ব্যবসায় তারা কিছু বাড়তি অর্থ লাভ করল এবং বিদেশে সফরে যাওয়ার চিন্তা করল। দিন তারিখ দেখে তারা দু'ভাই এক সাথে বেরিয়ে পড়ল। তিনদিন সফরের পর তারা এক মুসাফিরখানায় আশ্রয় নিল। সেখানে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে আবার যাত্রা শুরু করল।
কিছুদূর যেতেই তারা নদীতে একটি পুটুলি ভেসে যেতে দেখে উপরে তুলল। খুলে দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। পুটুলিতে এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা ও দু'টি হীরকখণ্ড পেয়ে তারা আল্লাহ্র প্রশংসা করল। অতঃপর তা নিজেরা সমানভাবে ভাগ করে নিল। এরপর আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু সঙ্গে এত অর্থ ও মূল্যবান হীরক নিয়ে চলা তারা নিরাপদ মনে করল না। তাই দু'জনে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিল যে, ছোট ভাই এগুলি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। আর বড় ভাই কিসরা নগরে যাবে। হাতেম বলল, এগুলি নিয়ে তুমি বাড়ি গিয়ে তোমার ভাবীর হাতে দিবে। ছোট ভাই কাযেম বাড়ি গিয়ে ভাইয়ের দেওয়া স্বর্ণমুদ্রাগুলি ভাবীর কাছে দিল। কিন্তু হীরকখণ্ড না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিল। এ সম্পর্কে হাতেমের স্ত্রী কিছুই জানতে পারল না।
এদিকে বড় ভাই হাতেম নানা দেশ ঘুরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে টাকা-পয়সা ও মালামাল নিয়ে তিন বছর পর দেশে ফিরে এলো। কয়েকদিন পর সে স্ত্রীকে স্বর্ণমুদ্রা ও হীরকখণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে, কাযেম হীরকখণ্ড দেয়নি। তখন হাতেম কাযেমকে জিজ্ঞেস করল, হীরক খণ্ডের খবর কি? তুমি তোমার ভাবীর হাতে ওটা দাওনি। কাযেম কসম করে বলল, ভাই আপনার স্ত্রী মিথ্যা বলছে। কাযেমের কথা বিশ্বাস করে হাতেম তার স্ত্রীকে তিরস্কার করল। হাতেমের স্ত্রী অপমানিত হয়ে স্বামীকে না জানিয়ে উক্ত শহরের কাযীর কাছে গেল এবং আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করে সুবিচার প্রার্থনা করল।
কাযী হাতেম ও কাযেমকে ডেকে পাঠালেন এবং তাদের কাছে ঘটনার বিবরণ জানতে চেয়ে সত্য কথা বলার জন্য অনুরোধ করলেন। কাযী কাযেমকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যখন হীরকখণ্ড হাতেমের স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর কর তখন কোন সাক্ষী ছিল কি? সে বলল, হ্যাঁ, দুইজন সাক্ষী ছিল।
কাযী সাক্ষীদ্বয়কে আদালতে হাযির করার হুকুম দিলেন। কাযেম গিয়ে দু'জন লোককে কিছু অর্থ দিয়ে বলল, ভাই তোমরা আমার সঙ্গে আস। কাযীর দরবারে তোমরা সাক্ষ্য দিবে যে, তিনবছর পূর্বে অমুক দিন তোমাদের উপস্থিতিতে আমি আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে পাঁচশত সোনার মোহর ও একখণ্ড হীরক দিয়েছিলাম। অর্থের বিনিময়ে সে দুই সাক্ষী কাযীর কাছে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল।
কাযী সাক্ষীর পরিপ্রেক্ষিতে রায় দিলেন যে, হাতেমের স্ত্রীর কাছে হীরকখণ্ড রয়েছে। হাতেমকে হুকুম দিলেন তার স্ত্রীর কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে।
এমতাবস্থায় হাতেমের স্ত্রী নিরুপায় হয়ে বাদশাহর দরবারে গিয়ে কান্নাকাটি করে বিস্তারিত ঘটনা জানিয়ে সুবিচার চাইল। বাদশাহ বললেন, তুমি কাযীর কাছে গেলে না কেন? সে বলল, হুযূর গিয়েছিলাম। কিন্তু সুবিচার পাইনি। এখন আপনার কাছেও সুবিচার না পেলে স্বামীর ঘরে থাকা আমার দায় হয়ে পড়বে।
বাদশাহ হাতেম, কাযেম ও সাক্ষীদ্বয়কে দরবারে ডাকলেন এবং তাদের কাছে সবকিছু বিস্তারিত জানলেন। কাযেম ও তার সাক্ষীরা আগের মতই সাক্ষ্য দিল।
বাদশাহ হাতেম, কাযেম, দু'সাক্ষী ও হাতেমের স্ত্রীকে জেল-হাজতে ঢোকালেন। তাদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা সেল বা কক্ষে রাখার ব্যবস্থা করলেন। আর প্রত্যেককে কিছু মোম দিয়ে হুকুম দিলেন, হীরকখণ্ডের আকৃতি তৈরী কর, তাহ'লে ছেড়ে দেওয়া হবে।
হাতেম ও কাযেম দুই ভাই মোম দ্বারা অভিন্ন আকৃতির হীরক তৈরী করল। আর সাক্ষীদ্বয়ের হীরকের আকৃতি হ'ল ভিন্ন ভিন্ন। এদিকে হাতেমের স্ত্রী কিছুই তৈরী করতে পারল না। বাদশাহ সবাইকে দরবারে ডেকে মোম নির্মিত হীরকের আকৃতি উপস্থিত করার নির্দেশ দিলেন। দুই ভাই ও সাক্ষীদ্বয়ের তৈরীকৃত হীরক আকৃতি বাদশাহ্র সম্মুখে পেশ করা হ'ল। দরবারের সবাই দেখল যে, দুই ভাইয়ের হীরকের আকৃতি এক ও অভিন্ন। কিন্তু সাক্ষীদের হীরকের আকৃতি ভিন্ন ভিন্ন।
তখন বাদশাহ ও দরবারের সকলেই বুঝতে পারলেন যে, সাক্ষীরা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে। তারা হীরক আদৌ দেখেনি। তাই তাদের তৈরী হীরকের আকৃতিতে মিল নেই। তখন বাদশাহ বললেন, হাতেমের স্ত্রীর তৈরী হীরক আকৃতি কোথায়? হাতেমের স্ত্রী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, হুযূর! আমি তো হীরক কখনই দেখিনি। আমি কিভাবে হীরক আকৃতি তৈরী করব? তাই আমি কিছুই তৈরী করতে পারিনি। বাদশাহ এবং দরবারে উপস্থিত সকলেই বুঝলেন যে, ছোট ভাই কাযেমই হীরকখণ্ড রেখে দিয়েছে এবং অর্থের বিনিময়ে দু'জন মিথ্যা সাক্ষীও হাযির করেছে।
কাযেম হীরকখণ্ডদ্বয় দরবারে হাযির করল এবং দুই হাতে দুই কান ধরে কসম করল যে, আর কোন দিন মিথ্যা কথা বলব না। আমার অন্যায় হয়েছে, আমাকে ক্ষমা করুন। বাদশাহ তাকে মাফ করে দিলেন।
বাদশাহ দু'ভাইকে দু'খণ্ড হীরক দিয়ে বিদায় দিলেন। আর হাতেমের স্ত্রীকে তার সততা ও সাহসের জন্য পুরস্কৃত করলেন। আর সাক্ষীদ্বয়কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য যথাযোগ্য শাস্তি দিয়ে কয়েদখানায় পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর কাযীকে ডেকে বললেন, আপনি সবদিক জেনে-শুনে বুদ্ধি-বিবেচনা করে বিচার করলেন না কেন? সত্য ঘটনা না জেনেই সেই মহিলার কাছ থেকে হীরকখণ্ড আদায় করতে বললেন। এরূপ রায় দেওয়া আপনার উচিত হয়নি।

শিক্ষা: সত্য কখনো চাপা থাকে না।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 বাদশাহ আমানুল্লাহর বিচক্ষণতা

📄 বাদশাহ আমানুল্লাহর বিচক্ষণতা


দুই ভাই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল শহরে দীর্ঘদিন ধরে কসাইগিরি করে প্রচুর টাকা উপার্জনের পর বাড়ী ফিরছিল। পথে এক ফকীরের সাথে তাদের দেখা হ'ল। ফকীর ও তারা এক গাছের নীচে বসে খাবার খেল। ফকীর তাদের সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল হ'ল। ফকীর বলল, তোমরা এত টাকা উপার্জন করে বাড়ী ফিরছ, টাকাগুলি আমাকে একবার দেখাও’। ফকীর টাকাগুলি নিয়ে তার থলেতে পুরে নিল। দু'ভাই তৎক্ষণাৎ ফকীরের কাছ থেকে টাকাগুলি ছিনিয়ে নিল। ফকীর তখন প্রাণপণে চিৎকার শুরু করে দিল। ফকীরের চিৎকারের বিষয় ছিল, 'আমার টাকা এরা দু'জনে ছিনিয়ে নিয়েছে’।
চিৎকারে বেশকিছু লোক সমবেত হ'ল। ফকীর বর্ণনা দিল, 'আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী শহরে থেকে ভিক্ষা করে টাকাগুলি উপার্জন করেছি। খেতে বসে গল্পে সে কথা প্রকাশ করায় ওরা দু'জনে মিলে আমার টাকাগুলি ছিনিয়ে নিয়েছে’। অপরদিকে দু'ভাইয়ের কথা তো বানিয়ে বলার দরকার নেই। তারা যা ঘটনা তাই বলল। সমবেত লোকজন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। তারা কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হ'তে পারল না। অগত্যা তারা ফকীর ও দু'ভাইকে বাদশাহ আমানুল্লাহ্র দরবারে হাযির করল।
বাদশাহ উভয়ের বক্তব্য শুনলেন। তিনি একটা পাতিলে পানি গরম করতে বললেন। পানি গরম হ'লে তিনি টাকাগুলি পানিতে ফেলে দিলেন। পানির স্বাভাবিক রং বদলে গেল। কারণ টাকাগুলিতে কসাইগিরির রক্ত লেগেছিল। বাদশাহ এবং উপস্থিত সকলে বুঝলেন, টাকাগুলির সত্যিকার মালিক দু'ভাই। টাকাগুলি তাদের দিয়ে দেওয়া হ'ল এবং ফকীরকে শাস্তি দেওয়া হ'ল।

শিক্ষা: অনেক সময় উপস্থিত বুদ্ধি বিচারের কাজে সহায়ক হয়।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন

📄 আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন


কোন এক দেশে নওশের নামে এক রাজা ছিল। সৈন্য-সামন্ত, হাতি-ঘোড়া, ধন-সম্পদে তার কোন তুলনা ছিল না। অঢেল সম্পদ, বিশাল সেনাবাহিনীর অধিকারী এ রাজার মনে বেশ অহংকার ছিল। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের ছোট-খাট রাজা-বাদশাহদের সে মানুষ বলে মনেই করত না। তার ছিল এক অপরূপা সুন্দরী মেয়ে। একদিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে রাষ্ট্রীয় কাজে রাজা নওশেরের দরবারে আসে। পথিমধ্যে রাজকুমারীর সাথে মন্ত্রীর ছেলের সাক্ষাৎ হয়। দেশে ফিরে গিয়ে মন্ত্রীর ছেলে তার পিতার কাছে রাজা নওশেরের মেয়েকে বিবাহের কথা বলে। মন্ত্রী ছেলেকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, সে বাদশাহর মেয়ে। বাদশাহ নওশের তোমার মতো সাধারণ একজন মন্ত্রীর ছেলের নিকট তার মেয়ে বিয়ে দিবেন না। তাছাড়া সে সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হয়েছে। আর তুমি একজন মন্ত্রীর ছেলে মাত্র। তার চাহিদা তুমি পূরণ করতে পারবে না। ফলে সংসারে দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসবে। জীবনে কখনো সুখ পাবে না। তুমি এ মেয়ের কথা বাদ দাও। আমি তোমাকে অন্য জায়গায় ভাল ও সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করব। কিন্তু মন্ত্রীপুত্রের একই কথা- সে রাজকুমারীকেই বিয়ে করবে। অন্যথায় সে আত্মহত্যা করবে।
ছেলের কথা চিন্তা করে মন্ত্রী রাজা নওশেরের নিকটে যান। মন্ত্রী তার পুত্রের সাথে রাজার মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। মন্ত্রীর প্রস্তাব শুনে রাগে রাজার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। রাজা বলে তোমার ধৃষ্টতা তো কম নয়। সাধারণ একজন উযীর হয়ে আমার মেয়েকে তোমার ছেলের জন্য চাইতে আসলে কোন সাহসে? তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে বেরিয়ে যাও। রাজা মন্ত্রীকে যারপর নাই অপমান করে তার দরবার থেকে বের করে দিলেন।
দেশে ফিরে মন্ত্রী স্বীয় পুত্রকে ঘটনা আদ্যোপান্ত বলে তাকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিলেন। এদিকে রাজা নওশেরের অপমান সইতে না পেরে মন্ত্রী হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুতে মন্ত্রীপুত্রও শোকে মুহ্যমান। সে দেশের রাজাও প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মন্ত্রীপুত্রের নিকট থেকে মন্ত্রীর মৃত্যুর কারণ শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন, বাদশাহ নওশেরের কিসের এত অহংকার, আল্লাহ চাইলে তার রাজত্ব অন্যকে দান করতে পারেন।
এর কিছুদিন পর বাদশাহ নওশের একদা কুরআন তেলাওয়াত করতে বসে সূরা আলে ইমরানের নিম্নোক্ত আয়াত পড়লেন।
'বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও। আর যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর এবং যাকে ইচ্ছা অপমান কর। তোমার হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল' (আলে ইমরান ২৬)।
এ আয়াত পাঠ করে নওশের ভাবলেন, এটা কি করে সম্ভব? আমার এত সৈন্য-সামন্ত থাকতে কিভাবে আমার রাজ্য অন্যের করতলগত হবে? এটা হ'তে পারে না।
কিছুদিন পর রাজা নওশের পার্শ্ববর্তী রাজ্যের একটি এলাকা দখল করে নেন। একদিকে মন্ত্রীর মৃত্যু, অন্যদিকে রাজ্যের জমি অন্যায়ভাবে দখল করায় ঐ দেশের বাদশাহ নওফেল নওশেরের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। নওফেল তার বন্ধু রাজা পারভেজের সহযোগিতায় নওশেরের দেশ আক্রমণ করেন। যুদ্ধে বাদশাহ নওশের পরাজিত হন এবং সপরিবারে বন্দী হয়ে বাদশাহ নওফেলের নিকট নীত হন। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব দেখে এবং মন্ত্রীপুত্রের মনোবাসনা পূরণের জন্য রাজা নওশেরের কন্যার সাথে তার বিবাহ দেন। বিবাহে উপঢৌকন হিসাবে বাদশাহ নওফেল মন্ত্রীপুত্র আনজাসকে নওশেরের রাজ্যের প্রাদেশিক গভর্ণর নিযুক্ত করেন। আর মন্ত্রীপুত্র আনজাসের শ্বশুর হিসাবে বাদশাহ নওশেরকে মুক্ত করে দিয়ে যেখানে ইচ্ছা অবস্থানের সুযোগ দেন। রাজা নওফেলের এই মহানুভবতায় বাদশাহ নওশেরও মুগ্ধ হন। তিনি মুক্ত হয়ে আবার একদা কুরআন তেলাওয়াতের সময় সূরা আলে ইমরানের ঐ ২৬ নং আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন। তিনি এ আয়াত পড়ে কেঁদে আল্লাহ্র নিকট তওবা করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ অসীম ক্ষমতার মালিক। তিনি ইচ্ছা করলে যে কোন সময়ে বাদশাহকে ফকীর ও ফকীরকে বাদশাহ বানাতে পারেন।

শিক্ষা: আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। তেমনি ধন-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-সম্মান যাকে ইচ্ছা দান করেন। কিন্তু তা পেয়ে অন্যের প্রতি অত্যাচার, অনাচার করা অনুচিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00