📄 পশুর কৃতজ্ঞতাবোধ
স্নেহ-দয়া-মায়া-ভালবাসা ইত্যাদি হৃদয়ের কোমল বৃত্তিগুলি আল্লাহপাক কেবল উন্নত জীব মানুষকেই দান করেননি। ইতর প্রাণী পশু-পাখিতেও দিয়েছেন। তাই মানুষ যেমন অতি আদর-যত্নে সন্তান-সন্ততিকে লালন-পালন করে, পশু- পাখিও এদিক দিয়ে কম নয়। তারাও সহজেই মানুষের আদর-সোহাগ বুঝতে পারে।
এক ক্রীতদাস তার মনিবের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে এক বনে ঢুকে পড়ে। বনের ভিতর দিয়েই পথ চলতে চলতে সে দেখতে পেল, একটি সিংহ একস্থানে স্থির হয়ে তার দিকে একটি পা বার বার উঠিয়ে কি যেন ইশারা করছে। সে সিংহটিকে অসুস্থ মনে করল। সিংহের ইশারায় সে সাহসে বুক বেঁধে আস্তে আস্তে সিংহের কাছে গেল। সে দেখল, সিংহের পায়ে একটি বড় কাঁটা বিঁধে রয়েছে। ফলে পা-টি ফুলে গেছে। সে পা থেকে কাঁটাটি বের করল। তারপর পথ চলতে লাগল।
এর কিছুদিন পর পলাতক ক্রীতদাসটি ধরা পড়ে গেল। আর ঐ সিংহটিও ধরা পড়েছে। ধৃত সিংহটি একটি সার্কাস পার্টির হাতে এসে পড়ল। যে শহর থেকে লোকটি পালিয়েছিল, সার্কাস পার্টি ঐ শহরে এল সার্কাস দেখাতে।
শহরের বিচারকমণ্ডলী পলাতকের অপরাধের শাস্তি হিসাবে ঐ সিংহকে দিয়ে তাকে ভক্ষণ করানো স্থির করল। তাহলে এটি একটি দৃষ্টান্ত হবে, যাতে আর কোন ক্রীতদাস এভাবে পালিয়ে না যায়। বিচার ব্যবস্থা নির্মম মনে হলেও সে যুগে সেটি মোটেই নির্মম ছিল না। যাহোক তারা ঘোষণা দিল, অমুক দিন অমুক সময় পলাতককে সিংহের সামনে নিক্ষেপ করা হবে। কিভাবে সিংহ তাকে ভক্ষণ করে, এ দৃশ্য দেখতে প্রচুর উৎসুক দর্শক উপস্থিত হ'ল। চারিদিক লোকে লোকারণ্য। মাঝখানে পলাতক লোকটি। এখন সিংহটিকে শিকল লাগিয়ে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেওয়া হ'ল। সবাই ভাবছিল ছাড়া পেয়ে সিংহটি আক্রমণাত্মকভাবে দৌড়ে তাকে শেষ করে দিবে। কিন্তু একি! সবাইকে বিস্মিত করে সিংহটি তাকে খেল না। বরং পলাতককে সে সঠিকভাবেই চিনল। সে-ই তার পা থেকে কাঁটা বের করে দিয়েছিল।
শিক্ষা : একটি ইতর প্রাণী তার পা থেকে কাঁটা বের করার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। আর আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়ে কৃতজ্ঞতার বদলে যত রকম অন্যায় ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে মোটেই কার্পণ্য করি না। এটা কি আমাদের চরিত্র হওয়া উচিত?
📄 অপূর্ব প্রতিদান
এ বিশ্ব চরাচরে মানুষ এসেছে নিজেদের সুন্দর কর্ম দ্বারা এ ধরণীকে আরো সুন্দর করতে। আর তার উত্তম কর্মের বিনিময়ে পরকালীন জীবনে নাজাত লাভ করতে। কিন্তু পৃথিবীতে এসে মানুষ তার আসল কর্তব্যকে ভুলে গেছে। ফলে অধিকাংশ মানুষ হয়েছে ভোগবাদী। তবে এ জগৎ-সংসারে এমন অনেক লোক আছে যাদের জীবনটা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।
নাবীল পিতৃ-মাতৃহীন এক অনাথ বালক। শৈশবে পিতামাতা মারা যাওয়ার পর চাচার অপত্য স্নেহে সে লালিত-পালিত হয়েছে। দিনমজুর পুত্রহীন আবিদ মৃত ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ভাতিজাকে পুত্রবৎ লালন-পালন করে বড় করেছে। নিজের সহায়-সম্বল যা ছিল সব ব্যয় করে ভাতিজাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। আজ নাবীল শিক্ষিত যুবক। আবিদ ছাহেব চান নাবীল ভাল কোন চাকুরী পাক এবং তার ছোট মেয়েকে বিবাহ করুক। কিন্তু একথা তিনি সরাসরি নাবীলকে কখনও বলেননি। তবে নাবীলের কানে কথাটা যেকোন ভাবে পৌঁছেছে। এমএ পাশ করার পর কয়েক বছর কেটে গেছে। কোন চাকুরী সে পায়নি। ছাত্রদেরকে প্রাইভেট পড়িয়ে সে বেশ টাকা উপার্জন করে। এতে চার সদস্যের চাচার সংসার ভালই কেটে যাচ্ছে। নতুন ঘর করেছে। তিন বেলা খাবার জন্য আর চিন্তা করতে হয় না। সবার পরনে মানানসই পোশাক শোভা পায়। তারপরও স্থায়ী কোন চাকুরী নয় বলে সে বিয়ের কথা ভাবে না। ইতিমধ্যে তার চাচা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নাবীলকে ডেকে বলেন, বাবা! আমার দিন ফুরিয়ে এসেছে। তোমার বোন আসমাকে পাত্রস্থ করে যেতে পারলাম না। ওকে একটা যোগ্য পাত্রে তুলে দিয়ে যেতে পারলে শান্তিতে মরতে পারতাম। চাচার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে নাবীল মনে মনে রাযী হয়ে যায়। কারণ মেয়ে হিসাবে আসমা খারাপ নয়। তাছাড়া ছোট থেকে তাকে দেখে এসেছে। তাই চাচীকে সে বলে, তোমাদের কোন ইচ্ছা থাকলে তোমরা তা পূরণের ব্যবস্থা কর, আমি অমত করব না। নাবীলের ভদ্রোচিত কথায় চাচী খুশি হন। একদিন শুভক্ষণে নাবীল-আসমার বিয়ে হয়। তারা এখন সুখী দম্পতি। বিয়ের ৩ বছরের মাথায় তাদের প্রথম সন্তান হয় লাবীব। বছর দুয়েক হ'ল নাবীল একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে ভাল সম্মানীতে চাকুরীও পেয়েছে। থাকে ঢাকায়। প্রতি মাসে বাড়ী আসে। চাচা-চাচী, স্ত্রী-পুত্র সবাইকে দেখে যায়। সবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিয়ে আবার ফিরে যায় কর্মস্থলে।
নাবীলের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও কর্মস্পৃহা এবং সততায় মুগ্ধ কোম্পানীর মালিক। নাবীল আসার পর কোম্পানীর উন্নতিও হয়েছে কল্পনাতীত। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করার চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে তার মাঝে। এজন্য যামান ছাহেব নাবীলকে নিয়ে ভাবতে থাকেন। যামান ছাহেব একমাত্র মেয়ে রায়হানাকে সখ করে বিয়ে দিয়েছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ধনীর দুলালের সাথে। কিন্তু তার মাদকাসক্তি ও উচ্ছিন্নের কারণে যামান ছাহেব মেয়েকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হন। তখন থেকে তিনি মনে মনে একটি চরিত্রবান ছেলেকে খুঁজছিলেন। এক্ষেত্রে নাবীলই তার প্রথম পসন্দের পাত্র। তিনি নাবীলের সার্বিক অবস্থা জেনেও নিজের মেয়েকে তার হাতে তুলে দিতে রাযী। এ বিষয়ে স্ত্রী এবং মেয়ের সাথে কথাও বলেছেন। মেয়ের নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য কোম্পানীর কিছু বিষয় দেখার জন্য তাকে কিছু দায়িত্বও দিয়ে রেখেছেন। তাই কাজের সুবাদে নাবীলের সাথে তার কিছুটা পরিচয় আছে বৈকি। এজন্য বাবার পসন্দে রায়হানা অমত করেনি।
যামান ছাহেব এক সময় নাবীলের গ্রামের বাড়ী চলে যান। কথা বলেন নাবীলের চাচার সাথে। যামান ছাহেবের পরিচয় পেয়ে আবিদ ভাতিজার ভবিষ্যতের কথা ভেবে অমত করেন না। কিন্তু এসব নাবীল জানতে পারেনি। এক সময় যামান ছাহেব নাবীলকে ডেকে বিষয়টি বললেন। নাবীল অমত করে। বলে যে, প্রয়োজনে আমি চাকুরী ছেড়ে দিতেও রাযী। কিন্তু এই অসম বিবাহ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার স্ত্রী-সন্তান সবই আছে। যামান ছাহেব তাকে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করেন। এতে নাবীলের মন নরম হয়। সে কিছুদিন সময় চেয়ে নেয়। বাড়ি এসে চাচা-চাচীকে প্রথমে বলে। তারা বিষয়টি নাবীলের উপরে ছেড়ে দেয়। নাবীল স্ত্রীর কাছে বলে। আসমা তাকে বলে, পৃথিবীতে সবকিছুর ভাগ মানুষ দিতে পারে। কিন্তু নারী তার স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে চায় না। শরী'আতে যেহেতু একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু আমি আপনাকে নিষেধ করতে পারছি না। তবে আপনার হৃদয়ে আমার জন্য একটা জায়গা চাই; আমার সন্তানের জন্য চাই একটা নিরাপদ আশ্রয়। এসব থেকে আমরা যেন বঞ্চিত না হই।
নাবীল কর্মস্থলে ফিরে আসে। মালিক তাকে আবার ডেকে এ বিষয়ে বলেন। তখন সে বলে, আমি দরিদ্র কর্মচারী মাত্র। আপনার মেয়ের যোগ্য পাত্র আমি নই। যামান ছাহেব বলেন, তোমার সবকিছু জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি অমত কর না। তোমার স্ত্রী-ছেলে কেউ অধিকার বঞ্চিত হবে না। তবে তুমি আরো কিছু সময় ভেবে দেখ। এদিকে রায়হানা তার মাকে নিয়ে চলে যায় নাবীলের বাড়ীতে। অনেক গল্প করার পর আসমাকে কথাটা বলে। আসমা শুধু বলে, বোন হিসাবে তোমাকে আমার হৃদয়ে স্থান দেওয়ার সুযোগ পেলে এবং তোমাকে আমার পাশে পেলে নিজেকে ধন্য মনে করব। আসমার কথায় খুশিমনে রায়হানা ফিরে যায়। শুভক্ষণে যামান ছাহেব মেয়েকে তুলে দেন নাবীলের হাতে। এক সময় কোম্পানীর দায়-দায়িত্ব সব বুঝিয়ে দেন নাবীলকে। অনেক দিন হয়ে যায়। রায়হানার কোন সন্তান হয় না। অনেক চিকিৎসা করেও কোন লাভ হয়নি। সে জানতে পারে যে, তার আর সন্তান হবে না। ওদিকে আসমার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়। সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার দু'টি কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তি করতে দেরী হয়ে গেছে অনেক। যরূরী অপারেশন করাতে হবে। কিন্তু আসমার রক্তের গ্রুপের সাথে কারো মিল পাওয়া যায় না। তার বড় বোনের রক্তের গ্রুপ মিলে গেলেও সে কিডনী দিতে রাযী নয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও কিডনী পাওয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় জানা যায়, তার রক্তের গ্রুপের সাথে রায়হানার গ্রুপের মিল রয়েছে। সে একটা কিডনী দিতেও চায়। সবাই তাকে নিষেধ করে। কিন্তু কারো কথা সে মানতে নারায। সবার কথা উপেক্ষা করে সে একটা কিডনী আসমাকে দান করে। রায়হানা বলে, যে আমাকে তার স্বামীর অংশ দিয়েছে, আমার নিংসঙ্গতাকে দূর করতে সহযোগিতা করেছে, আমার নির্জীব জীবনে সজীবতা এনে দিয়েছে, আমাকে বেঁচে থাকার পথ করে দিয়েছে, আমি তাকে আমার দেহের অংশ দিয়ে তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলাম। তাছাড়া আমার চেয়ে আসমার বেঁচে থাকা বেশী দরকার। কেননা তার সন্তান আছে। আমার তো কেউ নেই।
শিক্ষা: কেউ কারো উপকার করলে সুযোগ মতো তারও উপকার করা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।
📄 বুদ্ধিমান বিচারক
আলজেরিয়ার এক বাদশাহ্ নাম বাওয়াকাস। তিনি স্থির করলেন, তাঁর দেশের বিচারকদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন। তিনি শুনেছেন রাজধানীর বাইরে একজন বিজ্ঞ ন্যায়বিচারক আছেন। যিনি ন্যায়বিচার করতে কোন দ্বিধা করেন না। কোন দুষ্কৃতকারীর কূটকৌশল কিংবা কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাব তাকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত রাখতে পারে না। এ সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে বাদশাহ ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে একটি ঘোড়ায় চড়ে সেদিকে রওনা হ'লেন। তাকে দেখে চেনার উপায় নেই যে, তিনি দেশের বাদশাহ। পথিমধ্যে এক খোঁড়া লোককে হাত তুলতে দেখে ঘোড়া থামালেন। লোকটি ভিক্ষা চাচ্ছে। তাকে কিছু টাকা দিয়ে বাদশাহ ঘোড়ায় চড়তে যাবেন ঠিক তখনি ঘটল বিপত্তি।
ভিক্ষুক বাদশাহ্ কাপড় টেনে ধরল। বাদশাহ তাজ্জব বনে গেলেন। তিনি বললেন, আর কি চাও তুমি? তোমাকে কি ভিক্ষা দেইনি? সে বলল, জি হ্যাঁ দিয়েছ, কিন্তু আমার আরেকটি উপকার করুন! আমাকে ঘোড়ায় তুলে মাইল খানেক পথ এগিয়ে দিন। এমনিতে হাঁটতে পারি না, গাড়ি-ঘোড়ার নীচে পড়ে কখন যে চ্যাপ্টা হয়ে যাই তার ঠিক নেই! বাদশাহ বড়ই দয়ালু। তিনি ভিক্ষুককে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিলেন। মাইল খানেক যাবার পর ঘোড়া থামালেন। কিন্তু ভিক্ষুকের নামার কোন লক্ষণ না দেখে বললেন, নেমে পড়ো। ভিক্ষুক বলল, নামব কেন? এটাতো আমারই ঘোড়া। বদ মতলব ছেড়ে দাও, ব্যবসায়ী ভাই! নিজ ইচ্ছায় ঘোড়া না দিলে কোর্টে চলো। বাদশাহকে নিয়ে ভিক্ষুক কোর্টে হাযির হল।
দু'জনের যবানবন্দী শুনলেন বিচারক। রায় দিলেন ভিক্ষুকের পক্ষে। বাদশাহ হ'লেন ঘোড়া চোর। অগত্যা বাদশাহ ঘোড়াটি নিয়ে এলেন সেই ন্যায়বিচারকের দরবারে। অসংখ্য বিচারপ্রার্থী ও দর্শক-শ্রোতায় আদালত ঠাসা। তখন চলছিল অন্য একটি বিচার। একজন বুদ্ধিজীবি ও একজন কৃষককে দেখা গেল কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান। দু'জনই এক সুন্দরী মহিলার স্বামী বলে দাবী করছে। কৃষক বলল, ঐ মহিলা আমার বিবাহিতা স্ত্রী। বুদ্ধিজীবি বললেন, না সে আমার স্ত্রী। সুন্দরী মহিলাটি বোবা ও অশিক্ষিত। বিচারক পড়লেন ভীষণ সমস্যায়। তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, এই মহিলা আজ আমার কাছে থাকবে, আগামীকাল এর ফায়ছালা হবে। তারা চলে গেল।
কাঠগড়ায় উঠলো আরও দু'জন বিচারপ্রার্থী। একজন কসাই অন্যজন তেল বিক্রেতা। কসাইয়ের গায়ে ছিল রক্তমাখা পোশাক আর তেল বিক্রেতার গায়ে তেল চিটচিটে কাপড়। কসাইয়ের হাতে একটা টাকার থলে, আর তেল বিক্রেতা কসাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে আছে। কসাই বলল, মাননীয় বিচারক! আমি এই লোকটির কাছ থেকে কিছু তেল কিনেছি, টাকা দেয়ার জন্য যেইনা এই থলেটি বের করেছি, অমনি এই তেল বিক্রেতা থলে সমেত টাকা ছিনতাই করার জন্য আমার হাত চেপে ধরেছে। তেল বিক্রেতা বলল, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা মহামান্য বিচারক। আমার কাছ থেকে এ কসাই তেল নেয়ার জন্য এলে আমি তাকে এক টিন তেল দেই। সে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে দেয়। তার ভাংতি চাইলে ভাংতি দেওয়ার জন্য এই থলে বের করে খুলি। তখন সে আমার হাত থেকে টাকার থলেটি নিয়ে দৌড় দেয়। ভাগ্যক্রমে আমি তাকে ধরতে পেরেছি। এর বিচার করুন। বিজ্ঞ বিচারক একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, টাকার থলে আমার কাছে রেখে যাও। আগামীকাল রায় হবে।
এবার বিচারক ব্যবসায়ী ও ভিক্ষুকের অভিযোগ শুনতে চাইলেন। যা কিছু ঘটেছে ব্যবসায়ী তার সবই বিচারককে বলল। ভিক্ষুক বলল, আমি খোঁড়া মানুষ। ঘোড়ায় চড়ে এদিক-সেদিক চলাফেরা করি। এই ব্যবসায়ী আমার ঘোড়া ছিনতাই করার মতলবে আমাকে পথিমধ্যে থামিয়ে দেয়। ঘোড়ায় চড়ে এখন উল্টো ওটা নিজের বলে দাবী করছে। একটু চিন্তা করে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিচারক বললেন, ঘোড়া আমার কাছে রেখে চলে যাও, কাল বিচার হবে।
চাঞ্চল্যকর এই মামলা তিনটির রায় শুনার জন্য পরদিন অসংখ্য লোক আদালতের সামনে ভিড় জমাল। যখন বিচারক হাতুড়ি পেটালেন, তখন উৎসুক লোকের ফিসফিস শব্দ থেমে গেল। যথারীতি ডাক পড়ল সেই মহিলার স্বামী দাবীদার বুদ্ধিজীবি এবং কৃষকের। বিচারক রায় ঘোষণা করলেন। মহিলার প্রকৃত স্বামী হচ্ছে বুদ্ধিজীবি। প্রতারক কৃষককে ৫০ ঘা বেত মারার হুকুম দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে রায় কার্যকর করা হ'ল। এবার এল কসাই আর তেল বিক্রেতার পালা। দু'জনেই কাঠগড়ায় হাযির। বিচারক আদেশ দিলেন টাকার থলেটি কসাইকে দেয়া হোক। আর ছিনতাইয়ের চেষ্টা করায় তেল বিক্রেতাকে মারা হোক ৫০টি বেত্রাঘাত। সবশেষে ডাক পড়ল ব্যবসায়ী ও ভিক্ষুকের। বিচারক ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কি আর বিশটি ঘোড়ার মধ্য থেকে তোমারটি আলাদা করতে পারবে? ব্যবসায়ী বলল, জি হ্যাঁ পারব। একই কথা বিচারক ভিক্ষুককে জিজ্ঞেস করলে সে আরও অধিক জোর দিয়ে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই পারব। ব্যবসায়ীকে সাথে নিয়ে বিচারক ঘোড়ার আস্তাবলে ঢুকলেন। সত্যি সত্যি ব্যবসায়ী ঘোড়া শনাক্ত করল।
এবার ভিক্ষুকের পালা। সেও ২০টি ঘোড়ার মধ্যে ঐ নির্দিষ্ট ঘোড়াটি চিনে ফেলল এবং হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল। বিচারক এজলাসে এসে বসলেন। রায় শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জনতা। দৃপ্তকণ্ঠে রায় দিলেন বিচারক, ঘোড়া এই ব্যবসায়ীকে দেয়া হোক এবং ভিক্ষুককে ৫০ ঘা বেত মারা হোক। যথারীতি তাই হ'ল।
সেদিনের মত বিচার শেষ হ'ল। আদালত মুলতবি করা হ'ল। বিচারক বাসায় রওয়ানা হ'লেন। ব্যবসায়ীকে পিছু পিছু অনুসরণ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? আপনি কি আমার বিচারে সন্তুষ্ট হ'তে পারেননি?
ব্যবসায়ী বলল, আমি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছি। কিন্তু দয়া করে একটু বলবেন কি, কেমন করে বুঝতে পারলেন যে, ঐ বুদ্ধিজীবিই মহিলার স্বামী, কৃষক নয়? টাকাগুলো কসাইয়ের, তেল বিক্রেতার নয়? ঘোড়াটি আমার, ভিক্ষুকের নয়?
বিচারক বললেন, আমি মহিলাকে কলমে কালি ঢুকাতে দিয়েছিলাম। মহিলা তৎক্ষণাৎ কলমটি পরিষ্কার করে দক্ষ হাতে দ্রুত কালি ভরে দিল। অবশ্যই একাজে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। কৃষকের স্ত্রী হ'লে তা সম্ভব হ'ত না।
আমি টাকাগুলো শনাক্ত করেছি এভাবে যে, একটি পাত্রে পানি ভর্তি করে তাতে টাকা ভিজিয়ে রেখে সতর্কভাবে খেয়াল করছিলাম, পানির উপর তেলের আস্তরণ পড়ে কি-না। তেল বিক্রেতার টাকা হ'লে হাতে নাড়া-চাড়ার কারণে কিছু তেল টাকায় লেগে থাকত। আর টাকা পানিতে ভিজিয়ে রাখায় তেল পানিতে ভেসে উঠত। কিন্তু তা হয়নি। অতএব কসাই সত্য বলেছিল।
কিন্তু ঘোড়ার পাল থেকে ঘোড়া শনাক্তকরণ ছিল জটিল কাজ। আপনারা দু'জনই দক্ষ। ঘোড়া চিনতে পেরেছিলেন বটে, কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি ঘোড়া কাকে চেনে। আপনি ঘোড়ার কাছে যাওয়া মাত্রই ঘোড়াটি মাথা ঘুরিয়ে আপনার দিকে এলো। কিন্তু ভিক্ষুক ঘোড়াটি স্পর্শ করার সাথে সাথে পা উঠাল। সুতরাং বুঝতে পারলাম, ঘোড়ার মালিক কে হ'তে পারে।
ব্যবসায়ী এবার নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করলেন। আমি আসলে ব্যবসায়ী নই, আলজেরিয়ার বাদশাহ বাওয়াকাস। দুর্নীতি আর আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কথা শুনে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আরো শুনেছি, দেশে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা নেই। তাই দেশের প্রকৃত অবস্থা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ছদ্মবেশে বের হয়েছি। কে বলে দেশে সুষ্ঠু বিচার উঠে গেছে?
আপনার মত একজন মহান ন্যায়বিচারককে আমি স্বচক্ষে দেখলাম। আজ আপনি কি চান? যা খুশি চাইতে পারেন। আপনাকে পুরস্কৃত করব। আবেগে আপ্লুত হয়ে বিচারক বললেন, আমার কোন পুরস্কারের প্রয়োজন নেই জাঁহাপনা, কেবল দো'আ করবেন। কিছুদিন পর বাদশাহ বাওয়াকাস প্রধান বিচারপতি হিসাবে তাকে নিয়োগ দান করলেন। বিচারব্যবস্থা আরো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হ'ল। দেশে প্রতিষ্ঠিত হ'ল আইনের শাসন। ফিরে এলো শান্তি-শৃঙ্খলা।
শিক্ষা : ন্যায়বিচারের জন্য দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতা অত্যন্ত যরূরী। একজন সৎ ও বিচক্ষণ বিচারপতির মাধ্যমে সমাজের শত অপরাধ দূরীভূত হয় এবং সমাজে শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
📄 কাযীর বিচার
অনেক দিন আগের কথা। শহর থেকে অনেক দূরে বাস করত একটি লোক। সে ছিল নেহায়েত গরীব। গায়ে খেটে ও বুদ্ধির জোরে সে বেশ টাকাকড়ি সঞ্চয় করেছিল। সে এক পরমা সুন্দরীকে বিয়ে করেছিল। একে একে তাদের তিনটি ফুটফুটে ছেলে হয়েছিল। ছেলে তিনটি খুব সুদর্শন ছিল। ক্রমে তারা হয়ে ওঠে এক একজন সুঠামদেহী জওয়ান। ছেলে তিনটি কারবারে তাদের পিতাকে সাহায্য করতে শুরু করে। কিন্তু পিতাকে সাহায্য করলে কি হবে, তারা কেউই বাবার মত বুদ্ধিমান ছিল না। সেজন্য বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লোকটির চিন্তা-ভাবনাও বাড়তে লাগল। ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে ভেবে দেখল যে, তার ধন-সম্পদ যা কিছু রয়েছে, তাতে ছেলেরা সারাজীবন সুখে কাটিয়ে দিতে পারবে। ছেলেরা যাতে ভবিষ্যতে ঝগড়া-ফাসাদ না করে সেজন্য সে ঠিক করল যে, সব সম্পদ বণ্টন করে সে অছিয়তনামা তৈরী করে দিয়ে যাবে। এই ভেবে সে একজন উকিল ও দু'জন সাক্ষী ডেকে একটি অছিয়তনামা তৈরী করে ফেলল। তার মৃত্যুর পর অছিয়তনামা বের করা হ'ল। তাতে লেখা রয়েছে, ছেলেরা সোনা-চাঁদি, স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির সমান অংশ পাবে। তবে সতেরটা হাতির মধ্যে বড় ছেলে পাবে অর্ধেক, মেজো ছেলে পাবে তিন ভাগের এক ভাগ, আর ছোট ছেলে পাবে নয় ভাগের এক ভাগ। এটা ছিল জটিল ব্যাপার। তাই সমাধানের জন্য তারা তিন ভাই শহরের কাযীর কাছে গেল। কাযী বললেন, তোমরা এখন বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম করো। আগামীকাল সকালে আমি নিজে তোমাদের বাড়িতে যাব। তোমাদের হাতীগুলো বাইরে বের করে রেখ। তোমাদের পিতার অছিয়তনামা অনুযায়ী আমি সেগুলো যথাযথভাবে ভাগ করে দেব।
পরের দিন কাযী স্বীয় হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে সেখানে এসে হাযির হ'লেন। তিনি অছিয়তনামা পড়ে সবাইকে শোনালেন। এরপর বললেন, ছেলেরা! তোমাদের বাবা রেখে গেছেন সতেরটি হাতি আর আমি দিলাম একটি। মোট হ'ল আঠারটি। বড় ছেলের অর্ধেক অর্থাৎ সে নয়টি হাতি পাবে। সে তা নিয়ে নিক। মেজো ছেলে তিন ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ সে পাবে ছয়টি হাতি, সে তা নিয়ে নিক। আর ছোট ছেলে পাবে দু'টো হাতি। কারণ নয় ভাগের এক ভাগ তার পাওনা। এখন নয়, ছয় ও দুই মিলে হ'ল সতেরটা হাতি। এখন বাকী রইল একটি হাতী এবং এ হাতীটি আমার। অতএব আমি আমার হাতীটি ফেরত নিলাম। তোমরা সবাই খুশী হ'লে তো? ছেলেরা তখন যার যার ভাগের হাতী নিয়ে খুশিতে বাগবাগ হ'ল। কাযীর বিচারে সবাই সন্তুষ্ট। এই কঠিন হিসাবের সুষ্ঠু সমাধানে সবাই কাযীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল।
শিক্ষা : উপস্থিত বুদ্ধি বিচারকের অন্যতম গুণ।