📄 নেকড়ে ও খরগোশের শান্তিচুক্তি
নেকড়েদের নেতা একদিন জঙ্গলের খরগোশদের আমন্ত্রণ করল। অতঃপর তাদেরকে সুস্বাদু ভুরিভোজে আপ্যায়িত করার পরে বলল, তোমাদের সাথে আমাদের পুরানো শত্রুতার অবসান চাই। ব্যাঘ্রনেতাদের এই সন্ধি প্রস্তাবে খরগোশের দল আনন্দে নেচে উঠলো। তারা নেকড়েদের সঙ্গে চুক্তি করল যে, এখন থেকে জঙ্গলে সবাই পারস্পরিক নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গে বসবাস করবে। ব্যাঘ্রনেতা তার দলের সদস্যদের বলে দিল, তারা যেন সবাই স্ব স্ব গর্তে বা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যাতে খরগোশেরা নির্ভয়ে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে। অতঃপর নেকড়ে নেতা এসে খরগোশ নেতাকে এই সুখবর দিল। তাতে খরগোশ নেতা আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, 'এখন থেকে আমরা সর্বদা আপনাদের সেবায় থাকব এবং অন্যান্য প্রাণী কে কোথায় গোপনে বাস করে তা বলে দেব, যাতে আপনারা সহজে তাদের ধরে খেতে পারেন'। নেকড়ে নেতা এতে ক্রুর হাসি হাসলো। যার মর্ম খরগোশ নেতার ছোট্ট মাথায় ঢোকেনি। খরগোশ নেতা তার দলকে গিয়ে এ খবর দিলে এবং সবাইকে বেরিয়ে এসে নিশ্চিন্তে বিচরণ করতে বললে তাদের একজন বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ নেতা সাবধান করে দিয়ে বলল, 'নেকড়েদের সঙ্গে তোমাদের শান্তি চুক্তি? এতো স্বপ্ন ব্যতীত কিছুই নয়'। কিন্তু কে শোনে কার কথা? স্বাধীনতার আনন্দে সবাই নাচতে নাচতে ও গান গাইতে গাইতে দলে দলে বাইরে চলে এলো।
অন্যদিকে নেকড়ে নেতার কাছে খরগোশ নেতার দেওয়া ওয়াদা এবং অন্যান্য প্রাণীদের গোপন বাসার খবর বলে দেওয়ার কথা পাখিরা সারা জঙ্গলে রটিয়ে দিল। তাতে সবাই হুঁশিয়ার হয়ে গেল এবং খরগোশদের বিশ্বাসঘাতক বলে ধিক্কার দিল ও তাদের থেকে পৃথক হয়ে গেল। ইতিমধ্যে খরগোশের দল সবাই বাইরে এসে জমা হয়েছে এবং ফুর্তিতে নাচগানে মত্ত হয়ে গেছে। এ সময় নেকড়ে নেতা তার দলকে ইঙ্গিত দিল। যার অর্থ কেবল তারাই বোঝে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা চারদিক দিয়ে এসে খরগোশ দলকে ঘিরে ফেলল এবং এক একটাকে টপাটপ ধরে ঘাড় মটকাতে লাগলো। খরগোশের দল তখন অন্যান্য প্রাণীদের সাহায্য চেয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে আর্তচিৎকার করতে লাগল। কিন্তু তাতে কেউ সাড়া দিল না। বলা হয়ে থাকে যে, সেদিন থেকেই খরগোশের দল তাদের পিতৃপুরুষদের বোকামিতে লজ্জিত হয়ে অধোবদনে হামাগুড়ি দিয়ে মাটিতে চলাফেরা করে। তারা আর কখনোই নেকড়েদের সঙ্গে শান্তি চুক্তির কল্পনাও করে না। তারা অন্যান্য প্রাণীদের সাথে সন্ধি ও মীমাংসা করতে চায়। কিন্তু তাদের কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। ফলে তাদের দুর্বিষহ একঘরে জীবন কপালের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা : মুনাফেকী ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম এমন নির্মমই হয়ে থাকে।
📄 অকৃতজ্ঞের পরিণাম
বিশাল এক বন। সে বনের পাশেই ছিল ছোট্ট একটি গ্রাম। সে গ্রামে বাস করত এক গরীব কাঠুরে। সে বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে চাল-ডাল কিনে বাড়ী ফিরত। এভাবেই দু'বেলা খেয়ে আবার কখনও উপোস থেকে তাদের দিন চলত। গরীব কাঠুরে ও তার পরিবারের লোকেরা ছিল খুবই ধার্মিক। তারা কখনও ছালাত-ছিয়াম কাযা করত না। দু'বেলা খেয়ে আবার কখনও উপোস থেকেও তারা কখনও নিজেদেরকে অসুখী মনে করত না।
প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও কাঠুরে বনে কাঠ কাটতে গেল। কিন্তু বনের মধ্যে ঢুকে নিকটে কোথাও কাটার উপযোগী কোন কাঠ পেল না। ফলে মাইল খানেক হেঁটে বনের গভীরে গিয়ে সেখানে বেশ কাঠ পেল। তা কেটে নিয়ে গ্রামের বাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূর এগোতেই ভীষণ এক গর্জন শুনতে পেল। ভয়ে কাঠুরের বুক হিম হয়ে গেল। কারণ একটা নদী এই বনকে দ্বি-খণ্ডিত করেছে। আর নদীর ওপারে রয়েছে অনেক বাঘ। অনেক সময় বাঘ নদী পার হয়ে এসে কাঠুরে ও শিকারীদের ওপর হামলা করে।
কাঠুরে শব্দটি পুনরায় শুনতে পেল। কিন্তু তার নিকট শব্দটি বড় করুণ বলে মনে হ'ল। সে লক্ষ্য করল, তার বাম পাশে গজ পনের দূরে ছোটখাট একটি ঝোপ-ঝাড়ের আড়াল থেকে শব্দটি আসছে। কাঠুরে মাথার বোঝা মাটিতে রেখে কুঠারটি সামনে বাগিয়ে এগিয়ে চলল। অতঃপর ঝোপের নিকটে পৌঁছে দেখল বিশাল একটা শিয়াল ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়ে সেখানে কাতরাচ্ছে। শিয়ালটিকে দেখে কাঠুরের বড় মায়া হ'ল। সে কিছু ওষধি গাছের ছাল ও পাতা বেটে তার ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিল এবং তার সামনে কিছু খাবার রেখে চলে আসল। পরের দিন আবার কাঠুরে বনে গেল। কিন্তু সেদিন সে শিয়ালটিকে কোথাও দেখতে পেল না।
মাস খানেক পরে একদিন সকাল বেলা কাঠুরে বনে গেল। কিন্তু এদিন বনের অনেক ভিতরে গিয়েও কাটার উপযোগী কোন কাঠ পেল না। তাই বনের গভীরে এসে যা পেল তা নিয়ে গ্রামের বাজারের দিকে এগিয়ে চলল। হঠাৎ তার সামনে বড় একটি ছোরা হাতে উপস্থিত হ'ল এক বনদস্যু।
এই বনদস্যু পাশের গ্রামে বাস করে। একদিন অসুস্থ অবস্থায় সে বনের মাঝে বেহুঁশ হয়ে পড়ে ছিল। কাঠুরে তাকে তার বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে সেবা-যত্ন করে। সুস্থ হয়ে সে কাঠুরের বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় তাদের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করে নিয়ে যায়। ফলে গরীব কাঠুরে গ্রামের সর্দারের নিকট বিচার প্রার্থনা করে। সর্দার তাকে বলল, কাঠুরে তোমাকে অসুস্থ অবস্থায় পেয়ে সেবা করে তোমার অনেক বড় উপকার করেছে। আর তুমি উপকারীর অপকার করে ভীষণ অপরাধ করেছ। তাই তোমার শাস্তি হওয়া আবশ্যক। সর্দারের হুকুমে তার একটি হাত কেটে নেওয়া হয়। সেদিন থেকেই সে কাঠুরেকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা করে এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এদিন যেহেতু কাঠুরে বনের গভীরে এসেছে, এখানে তাকে মারলে সবাই মনে করবে কাঠুরেকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। তাই সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। কাঠুরেকে বলল, কাঠুরে! তুই তোর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে নে। তোকে আজ আমার হাতে মরতেই হবে। সে কাঠুরেকে কথাগুলি বলছে আর ছুরি বাগিয়ে সামনের দিকে এক পা দুই পা করে এগিয়ে আসছে। কাঠুরেও এক পা দুই পা করে পিছাচ্ছে। এমন বিপদের সময়ও কাঠুরে সাহস হারাল না। কাঠুরে বলল, দস্যু! আল্লাহ যদি না চান তবে তুই কেন পৃথিবীর কেউ আমাকে হত্যা করতে পারবে না। একথা শুনে সে উচ্চৈঃস্বরে ক্রুর হাসি হেসে উঠে বলল, আজ তোকে আমার হাত থেকে তোর আল্লাহও বাঁচাতে পারবে না (নাউযুবিল্লাহ)। কাঠুরে মনে মনে আল্লাহ্র নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল। পিছাতে পিছাতে কাঠুরের পিঠ একটি গাছের সাথে লেগে গেল। দস্যুও কাঠুরেকে মারার জন্য ছুরি তাক করল। এমন সময় হঠাৎ গাছের আড়াল থেকে বিদ্যুৎ গতিতে একটি শিয়াল ঐ দস্যুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই সাথে আরো পাঁচ-ছ'টি শিয়াল তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাঠুরে লক্ষ্য করল, প্রথম যে শিয়ালটি ঐ দস্যুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সেটি ঐ শিয়াল, কাঠুরে যার সেবা করেছিল। অতঃপর কাঠুরে আল্লাহ্র নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল এবং মনে মনে বলল, অকৃতজ্ঞের পরিণাম আল্লাহ এমনই করেন।
শিক্ষা: আল্লাহ্ হাতেই সকল কিছুর ক্ষমতা। আল্লাহ কারো ক্ষতি করতে চাইলে এমন কেউ নেই যে তার উপকার করতে পারে। আবার আল্লাহ কারো উপকার করতে চাইলেও পৃথিবীর কোন শক্তি তার সামান্যতম ক্ষতি সাধন করতে পারে না (আন'আম ১৭-১৮; তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৩০২)। কাজেই সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপর ভরসা করা এবং বান্দার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, 'যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে তোমাদেরকে অধিক দান করব' (ইবরাহীম ৭)।
📄 পশুর কৃতজ্ঞতাবোধ
স্নেহ-দয়া-মায়া-ভালবাসা ইত্যাদি হৃদয়ের কোমল বৃত্তিগুলি আল্লাহপাক কেবল উন্নত জীব মানুষকেই দান করেননি। ইতর প্রাণী পশু-পাখিতেও দিয়েছেন। তাই মানুষ যেমন অতি আদর-যত্নে সন্তান-সন্ততিকে লালন-পালন করে, পশু- পাখিও এদিক দিয়ে কম নয়। তারাও সহজেই মানুষের আদর-সোহাগ বুঝতে পারে।
এক ক্রীতদাস তার মনিবের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে এক বনে ঢুকে পড়ে। বনের ভিতর দিয়েই পথ চলতে চলতে সে দেখতে পেল, একটি সিংহ একস্থানে স্থির হয়ে তার দিকে একটি পা বার বার উঠিয়ে কি যেন ইশারা করছে। সে সিংহটিকে অসুস্থ মনে করল। সিংহের ইশারায় সে সাহসে বুক বেঁধে আস্তে আস্তে সিংহের কাছে গেল। সে দেখল, সিংহের পায়ে একটি বড় কাঁটা বিঁধে রয়েছে। ফলে পা-টি ফুলে গেছে। সে পা থেকে কাঁটাটি বের করল। তারপর পথ চলতে লাগল।
এর কিছুদিন পর পলাতক ক্রীতদাসটি ধরা পড়ে গেল। আর ঐ সিংহটিও ধরা পড়েছে। ধৃত সিংহটি একটি সার্কাস পার্টির হাতে এসে পড়ল। যে শহর থেকে লোকটি পালিয়েছিল, সার্কাস পার্টি ঐ শহরে এল সার্কাস দেখাতে।
শহরের বিচারকমণ্ডলী পলাতকের অপরাধের শাস্তি হিসাবে ঐ সিংহকে দিয়ে তাকে ভক্ষণ করানো স্থির করল। তাহলে এটি একটি দৃষ্টান্ত হবে, যাতে আর কোন ক্রীতদাস এভাবে পালিয়ে না যায়। বিচার ব্যবস্থা নির্মম মনে হলেও সে যুগে সেটি মোটেই নির্মম ছিল না। যাহোক তারা ঘোষণা দিল, অমুক দিন অমুক সময় পলাতককে সিংহের সামনে নিক্ষেপ করা হবে। কিভাবে সিংহ তাকে ভক্ষণ করে, এ দৃশ্য দেখতে প্রচুর উৎসুক দর্শক উপস্থিত হ'ল। চারিদিক লোকে লোকারণ্য। মাঝখানে পলাতক লোকটি। এখন সিংহটিকে শিকল লাগিয়ে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেওয়া হ'ল। সবাই ভাবছিল ছাড়া পেয়ে সিংহটি আক্রমণাত্মকভাবে দৌড়ে তাকে শেষ করে দিবে। কিন্তু একি! সবাইকে বিস্মিত করে সিংহটি তাকে খেল না। বরং পলাতককে সে সঠিকভাবেই চিনল। সে-ই তার পা থেকে কাঁটা বের করে দিয়েছিল।
শিক্ষা : একটি ইতর প্রাণী তার পা থেকে কাঁটা বের করার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। আর আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়ে কৃতজ্ঞতার বদলে যত রকম অন্যায় ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে মোটেই কার্পণ্য করি না। এটা কি আমাদের চরিত্র হওয়া উচিত?
📄 অপূর্ব প্রতিদান
এ বিশ্ব চরাচরে মানুষ এসেছে নিজেদের সুন্দর কর্ম দ্বারা এ ধরণীকে আরো সুন্দর করতে। আর তার উত্তম কর্মের বিনিময়ে পরকালীন জীবনে নাজাত লাভ করতে। কিন্তু পৃথিবীতে এসে মানুষ তার আসল কর্তব্যকে ভুলে গেছে। ফলে অধিকাংশ মানুষ হয়েছে ভোগবাদী। তবে এ জগৎ-সংসারে এমন অনেক লোক আছে যাদের জীবনটা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।
নাবীল পিতৃ-মাতৃহীন এক অনাথ বালক। শৈশবে পিতামাতা মারা যাওয়ার পর চাচার অপত্য স্নেহে সে লালিত-পালিত হয়েছে। দিনমজুর পুত্রহীন আবিদ মৃত ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ভাতিজাকে পুত্রবৎ লালন-পালন করে বড় করেছে। নিজের সহায়-সম্বল যা ছিল সব ব্যয় করে ভাতিজাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। আজ নাবীল শিক্ষিত যুবক। আবিদ ছাহেব চান নাবীল ভাল কোন চাকুরী পাক এবং তার ছোট মেয়েকে বিবাহ করুক। কিন্তু একথা তিনি সরাসরি নাবীলকে কখনও বলেননি। তবে নাবীলের কানে কথাটা যেকোন ভাবে পৌঁছেছে। এমএ পাশ করার পর কয়েক বছর কেটে গেছে। কোন চাকুরী সে পায়নি। ছাত্রদেরকে প্রাইভেট পড়িয়ে সে বেশ টাকা উপার্জন করে। এতে চার সদস্যের চাচার সংসার ভালই কেটে যাচ্ছে। নতুন ঘর করেছে। তিন বেলা খাবার জন্য আর চিন্তা করতে হয় না। সবার পরনে মানানসই পোশাক শোভা পায়। তারপরও স্থায়ী কোন চাকুরী নয় বলে সে বিয়ের কথা ভাবে না। ইতিমধ্যে তার চাচা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নাবীলকে ডেকে বলেন, বাবা! আমার দিন ফুরিয়ে এসেছে। তোমার বোন আসমাকে পাত্রস্থ করে যেতে পারলাম না। ওকে একটা যোগ্য পাত্রে তুলে দিয়ে যেতে পারলে শান্তিতে মরতে পারতাম। চাচার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে নাবীল মনে মনে রাযী হয়ে যায়। কারণ মেয়ে হিসাবে আসমা খারাপ নয়। তাছাড়া ছোট থেকে তাকে দেখে এসেছে। তাই চাচীকে সে বলে, তোমাদের কোন ইচ্ছা থাকলে তোমরা তা পূরণের ব্যবস্থা কর, আমি অমত করব না। নাবীলের ভদ্রোচিত কথায় চাচী খুশি হন। একদিন শুভক্ষণে নাবীল-আসমার বিয়ে হয়। তারা এখন সুখী দম্পতি। বিয়ের ৩ বছরের মাথায় তাদের প্রথম সন্তান হয় লাবীব। বছর দুয়েক হ'ল নাবীল একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে ভাল সম্মানীতে চাকুরীও পেয়েছে। থাকে ঢাকায়। প্রতি মাসে বাড়ী আসে। চাচা-চাচী, স্ত্রী-পুত্র সবাইকে দেখে যায়। সবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিয়ে আবার ফিরে যায় কর্মস্থলে।
নাবীলের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও কর্মস্পৃহা এবং সততায় মুগ্ধ কোম্পানীর মালিক। নাবীল আসার পর কোম্পানীর উন্নতিও হয়েছে কল্পনাতীত। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করার চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে তার মাঝে। এজন্য যামান ছাহেব নাবীলকে নিয়ে ভাবতে থাকেন। যামান ছাহেব একমাত্র মেয়ে রায়হানাকে সখ করে বিয়ে দিয়েছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ধনীর দুলালের সাথে। কিন্তু তার মাদকাসক্তি ও উচ্ছিন্নের কারণে যামান ছাহেব মেয়েকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হন। তখন থেকে তিনি মনে মনে একটি চরিত্রবান ছেলেকে খুঁজছিলেন। এক্ষেত্রে নাবীলই তার প্রথম পসন্দের পাত্র। তিনি নাবীলের সার্বিক অবস্থা জেনেও নিজের মেয়েকে তার হাতে তুলে দিতে রাযী। এ বিষয়ে স্ত্রী এবং মেয়ের সাথে কথাও বলেছেন। মেয়ের নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য কোম্পানীর কিছু বিষয় দেখার জন্য তাকে কিছু দায়িত্বও দিয়ে রেখেছেন। তাই কাজের সুবাদে নাবীলের সাথে তার কিছুটা পরিচয় আছে বৈকি। এজন্য বাবার পসন্দে রায়হানা অমত করেনি।
যামান ছাহেব এক সময় নাবীলের গ্রামের বাড়ী চলে যান। কথা বলেন নাবীলের চাচার সাথে। যামান ছাহেবের পরিচয় পেয়ে আবিদ ভাতিজার ভবিষ্যতের কথা ভেবে অমত করেন না। কিন্তু এসব নাবীল জানতে পারেনি। এক সময় যামান ছাহেব নাবীলকে ডেকে বিষয়টি বললেন। নাবীল অমত করে। বলে যে, প্রয়োজনে আমি চাকুরী ছেড়ে দিতেও রাযী। কিন্তু এই অসম বিবাহ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার স্ত্রী-সন্তান সবই আছে। যামান ছাহেব তাকে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করেন। এতে নাবীলের মন নরম হয়। সে কিছুদিন সময় চেয়ে নেয়। বাড়ি এসে চাচা-চাচীকে প্রথমে বলে। তারা বিষয়টি নাবীলের উপরে ছেড়ে দেয়। নাবীল স্ত্রীর কাছে বলে। আসমা তাকে বলে, পৃথিবীতে সবকিছুর ভাগ মানুষ দিতে পারে। কিন্তু নারী তার স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে চায় না। শরী'আতে যেহেতু একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু আমি আপনাকে নিষেধ করতে পারছি না। তবে আপনার হৃদয়ে আমার জন্য একটা জায়গা চাই; আমার সন্তানের জন্য চাই একটা নিরাপদ আশ্রয়। এসব থেকে আমরা যেন বঞ্চিত না হই।
নাবীল কর্মস্থলে ফিরে আসে। মালিক তাকে আবার ডেকে এ বিষয়ে বলেন। তখন সে বলে, আমি দরিদ্র কর্মচারী মাত্র। আপনার মেয়ের যোগ্য পাত্র আমি নই। যামান ছাহেব বলেন, তোমার সবকিছু জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি অমত কর না। তোমার স্ত্রী-ছেলে কেউ অধিকার বঞ্চিত হবে না। তবে তুমি আরো কিছু সময় ভেবে দেখ। এদিকে রায়হানা তার মাকে নিয়ে চলে যায় নাবীলের বাড়ীতে। অনেক গল্প করার পর আসমাকে কথাটা বলে। আসমা শুধু বলে, বোন হিসাবে তোমাকে আমার হৃদয়ে স্থান দেওয়ার সুযোগ পেলে এবং তোমাকে আমার পাশে পেলে নিজেকে ধন্য মনে করব। আসমার কথায় খুশিমনে রায়হানা ফিরে যায়। শুভক্ষণে যামান ছাহেব মেয়েকে তুলে দেন নাবীলের হাতে। এক সময় কোম্পানীর দায়-দায়িত্ব সব বুঝিয়ে দেন নাবীলকে। অনেক দিন হয়ে যায়। রায়হানার কোন সন্তান হয় না। অনেক চিকিৎসা করেও কোন লাভ হয়নি। সে জানতে পারে যে, তার আর সন্তান হবে না। ওদিকে আসমার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়। সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার দু'টি কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তি করতে দেরী হয়ে গেছে অনেক। যরূরী অপারেশন করাতে হবে। কিন্তু আসমার রক্তের গ্রুপের সাথে কারো মিল পাওয়া যায় না। তার বড় বোনের রক্তের গ্রুপ মিলে গেলেও সে কিডনী দিতে রাযী নয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও কিডনী পাওয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় জানা যায়, তার রক্তের গ্রুপের সাথে রায়হানার গ্রুপের মিল রয়েছে। সে একটা কিডনী দিতেও চায়। সবাই তাকে নিষেধ করে। কিন্তু কারো কথা সে মানতে নারায। সবার কথা উপেক্ষা করে সে একটা কিডনী আসমাকে দান করে। রায়হানা বলে, যে আমাকে তার স্বামীর অংশ দিয়েছে, আমার নিংসঙ্গতাকে দূর করতে সহযোগিতা করেছে, আমার নির্জীব জীবনে সজীবতা এনে দিয়েছে, আমাকে বেঁচে থাকার পথ করে দিয়েছে, আমি তাকে আমার দেহের অংশ দিয়ে তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলাম। তাছাড়া আমার চেয়ে আসমার বেঁচে থাকা বেশী দরকার। কেননা তার সন্তান আছে। আমার তো কেউ নেই।
শিক্ষা: কেউ কারো উপকার করলে সুযোগ মতো তারও উপকার করা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।