📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 লোভী বণিক

📄 লোভী বণিক


বাদশাহ হারূণুর রশীদ নগর ভ্রমণে বেরিয়েছেন। এক অন্ধ ফকীর তাঁর কাছে ভিক্ষা চাইল। তিনি ফকীরকে ভিক্ষা দিলেন। ফকীর ভিক্ষা পাবার পর স্বীয় কপালে সজোরে আঘাত করতে বলল। বাদশাহ আঘাত করতে ইতস্ততঃ করলে ফকীর বলল, কপালে আঘাত না করলে দান ফিরিয়ে নিন। বাদশাহ অগত্যা তার কপালে মৃদু আঘাত করলেন। বাদশাহ বুঝলেন, এ ফকীরের নিশ্চয়ই কিছু জীবনেতিহাস আছে। তাই তিনি দরবারে এসে ফকীরকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি ভিক্ষা পাবার পর কপালে আঘাত করতে বললে কেন?'
ফকীর তখন তার জীবনের ঘটনা বলতে শুরু করল। ফকীর বলল, 'আমি এই বাগদাদ শহরের একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলাম। ব্যবসা পরিচালনার জন্য আমার ৪০টি উট ছিল। একদিন আমি ৪০টি উটে মাল বোঝাই করে দূরের এক শহরে মাল বিক্রি করে ফিরছিলাম। দেখলাম, পথে একটি গাছের ছায়ায় একজন ফকীর বসে আছে। আমিও খাবার জন্য ঐ গাছের নীচে বসলাম। আমরা দু'জনে মিলে খাওয়া-দাওয়া করলাম। ফকীরের সাথে আমার কিছুটা হৃদ্যতা সৃষ্টি হল। ফকীর বলল, সামনের ঐ পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রচুর গুপ্তধন রয়েছে। আমি ছাড়া আর কোন ব্যক্তি এর সন্ধান জানে না। ফকীরের সাথে চুক্তি হ'ল যে, সে ২০টি উটে মাল বোঝাই করবে আর আমি ২০টি উটে মাল বোঝাই করব। অতঃপর আমরা দু'জনে উটগুলি নিয়ে পাহাড়ের কাছে পৌঁছলাম এবং সুড়ঙ্গ পথে উটগুলি প্রবেশ করিয়ে কিছুদূর অগ্রসর হলাম। ইত্যবসরে সেখানে এত সম্পদ স্তূপীকৃত অবস্থায় দেখতে পেলাম যে, ২০টি কেন ১০০টি উটও তা বহন করে নিয়ে যেতে পারবে না।
অতঃপর আমি ২০টি উটে মাল বোঝাই করলাম। ফকীরও ২০টি উটে মাল বোঝাই করল। হঠাৎ দেখলাম, ফকীর কৌটার মত কি যেন একটা কুড়িয়ে নিল। আমরা বের হয়ে এলাম। পথ চলতে চলতে আমার মনে হ'তে লাগল, এ ভাগ ঠিক হয়নি। তাই আমি ফকীরকে বললাম, তুমি ফকীর মানুষ, এত সম্পদ দিয়ে তুমি কি করবে? আমাকে ১০টি উট ফিরিয়ে দাও। ফকীর তৎক্ষণাৎ ১০টি উট দিল। একটু পরে আবার আমার মনে হ'তে লাগল, ফকীরের অর্থের কি প্রয়োজন আছে? তাই পুনরায় তাকে বললাম, তুমি সংসারত্যাগী ফকীর। তোমার অর্থের কি দরকার? অবশিষ্ট ১০টি উট আমাকে দিয়ে দাও। ফকীর মোটেও আপত্তি করল না। আমি ৪০টি উট নিয়ে পথ চলতে লাগলাম। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে আমার মনে সন্দেহ দেখা দিল। ফকীর এত সহজেই আমাকে সবগুলি উট ফিরিয়ে দিল কেন? আমার মনে হ'ল, ফকীর যে কৌটাটা কুড়িয়ে পেয়েছে নিশ্চয়ই এর কিছু তাৎপর্য আছে। আমি ঐ কৌটার বিষয় জানতে ফকীরের নিকট ফিরে আসলাম এবং এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাস করলাম। ফকীর বলল, এই কৌটায় এক প্রকার মলম রয়েছে। যা ডান চোখে লাগালে মাটির অভ্যন্তরে কোথায় কি সম্পদ লুক্কায়িত আছে তা স্পষ্ট দেখা যাবে। আবার বাম চোখে লাগালে সাথে সাথে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। কোন কিছুতেই তাকে আর ভাল করা যাবে না।
পরীক্ষা স্বরূপ আমি ফকীরকে আমার ডান চোখে মলম লাগিয়ে দিতে বললাম। মলম লাগানোর পর মাটির অভ্যন্তরে লুক্কায়িত সম্পদ আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। এখন আমার মনে হ'ল, বাম চোখে মলম লাগালে ফল আরো ভাল হবে। তাই আমি আমার বাম চোখেও মলম লাগাতে বললাম। ফকীর রাযী হচ্ছিল না। কিন্তু কেন যেন আমার যিদ চেপে বসল। আমার পীড়াপীড়িতে ফকীর বাম চোখে মলম লাগিয়ে দিল। সাথে সাথে আমি দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললাম। আমি অন্ধ হয়ে পথে বসে রইলাম। এদিকে ফকীর আমার সব উট নিয়ে চলে গেল। এই বাগদাদেরই কতিপয় বণিক ঐ পথে ফিরছিল। আমার এই অবস্থার কারণ জানতে পেরে তারা আমাকে শহরে পৌঁছে দিল।
অতঃপর আমার জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এল। কিন্তু আত্মহত্যা করতেও পারলাম না। আমার এই পরিণতির জন্য নিজকে ধিক্কার দিতে লাগলাম। নিজ কৃতকর্মের শাস্তি হিসাবে কপালে আঘাত গ্রহণ সাব্যস্ত করলাম। আঘাত না করলে কারো দান আমি গ্রহণ না করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হ'লাম।

শিক্ষা: লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 নেকড়ে ও খরগোশের শান্তিচুক্তি

📄 নেকড়ে ও খরগোশের শান্তিচুক্তি


নেকড়েদের নেতা একদিন জঙ্গলের খরগোশদের আমন্ত্রণ করল। অতঃপর তাদেরকে সুস্বাদু ভুরিভোজে আপ্যায়িত করার পরে বলল, তোমাদের সাথে আমাদের পুরানো শত্রুতার অবসান চাই। ব্যাঘ্রনেতাদের এই সন্ধি প্রস্তাবে খরগোশের দল আনন্দে নেচে উঠলো। তারা নেকড়েদের সঙ্গে চুক্তি করল যে, এখন থেকে জঙ্গলে সবাই পারস্পরিক নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গে বসবাস করবে। ব্যাঘ্রনেতা তার দলের সদস্যদের বলে দিল, তারা যেন সবাই স্ব স্ব গর্তে বা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যাতে খরগোশেরা নির্ভয়ে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে। অতঃপর নেকড়ে নেতা এসে খরগোশ নেতাকে এই সুখবর দিল। তাতে খরগোশ নেতা আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, 'এখন থেকে আমরা সর্বদা আপনাদের সেবায় থাকব এবং অন্যান্য প্রাণী কে কোথায় গোপনে বাস করে তা বলে দেব, যাতে আপনারা সহজে তাদের ধরে খেতে পারেন'। নেকড়ে নেতা এতে ক্রুর হাসি হাসলো। যার মর্ম খরগোশ নেতার ছোট্ট মাথায় ঢোকেনি। খরগোশ নেতা তার দলকে গিয়ে এ খবর দিলে এবং সবাইকে বেরিয়ে এসে নিশ্চিন্তে বিচরণ করতে বললে তাদের একজন বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ নেতা সাবধান করে দিয়ে বলল, 'নেকড়েদের সঙ্গে তোমাদের শান্তি চুক্তি? এতো স্বপ্ন ব্যতীত কিছুই নয়'। কিন্তু কে শোনে কার কথা? স্বাধীনতার আনন্দে সবাই নাচতে নাচতে ও গান গাইতে গাইতে দলে দলে বাইরে চলে এলো।
অন্যদিকে নেকড়ে নেতার কাছে খরগোশ নেতার দেওয়া ওয়াদা এবং অন্যান্য প্রাণীদের গোপন বাসার খবর বলে দেওয়ার কথা পাখিরা সারা জঙ্গলে রটিয়ে দিল। তাতে সবাই হুঁশিয়ার হয়ে গেল এবং খরগোশদের বিশ্বাসঘাতক বলে ধিক্কার দিল ও তাদের থেকে পৃথক হয়ে গেল। ইতিমধ্যে খরগোশের দল সবাই বাইরে এসে জমা হয়েছে এবং ফুর্তিতে নাচগানে মত্ত হয়ে গেছে। এ সময় নেকড়ে নেতা তার দলকে ইঙ্গিত দিল। যার অর্থ কেবল তারাই বোঝে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা চারদিক দিয়ে এসে খরগোশ দলকে ঘিরে ফেলল এবং এক একটাকে টপাটপ ধরে ঘাড় মটকাতে লাগলো। খরগোশের দল তখন অন্যান্য প্রাণীদের সাহায্য চেয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে আর্তচিৎকার করতে লাগল। কিন্তু তাতে কেউ সাড়া দিল না। বলা হয়ে থাকে যে, সেদিন থেকেই খরগোশের দল তাদের পিতৃপুরুষদের বোকামিতে লজ্জিত হয়ে অধোবদনে হামাগুড়ি দিয়ে মাটিতে চলাফেরা করে। তারা আর কখনোই নেকড়েদের সঙ্গে শান্তি চুক্তির কল্পনাও করে না। তারা অন্যান্য প্রাণীদের সাথে সন্ধি ও মীমাংসা করতে চায়। কিন্তু তাদের কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। ফলে তাদের দুর্বিষহ একঘরে জীবন কপালের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষা : মুনাফেকী ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম এমন নির্মমই হয়ে থাকে।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 অকৃতজ্ঞের পরিণাম

📄 অকৃতজ্ঞের পরিণাম


বিশাল এক বন। সে বনের পাশেই ছিল ছোট্ট একটি গ্রাম। সে গ্রামে বাস করত এক গরীব কাঠুরে। সে বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে চাল-ডাল কিনে বাড়ী ফিরত। এভাবেই দু'বেলা খেয়ে আবার কখনও উপোস থেকে তাদের দিন চলত। গরীব কাঠুরে ও তার পরিবারের লোকেরা ছিল খুবই ধার্মিক। তারা কখনও ছালাত-ছিয়াম কাযা করত না। দু'বেলা খেয়ে আবার কখনও উপোস থেকেও তারা কখনও নিজেদেরকে অসুখী মনে করত না।
প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও কাঠুরে বনে কাঠ কাটতে গেল। কিন্তু বনের মধ্যে ঢুকে নিকটে কোথাও কাটার উপযোগী কোন কাঠ পেল না। ফলে মাইল খানেক হেঁটে বনের গভীরে গিয়ে সেখানে বেশ কাঠ পেল। তা কেটে নিয়ে গ্রামের বাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূর এগোতেই ভীষণ এক গর্জন শুনতে পেল। ভয়ে কাঠুরের বুক হিম হয়ে গেল। কারণ একটা নদী এই বনকে দ্বি-খণ্ডিত করেছে। আর নদীর ওপারে রয়েছে অনেক বাঘ। অনেক সময় বাঘ নদী পার হয়ে এসে কাঠুরে ও শিকারীদের ওপর হামলা করে।
কাঠুরে শব্দটি পুনরায় শুনতে পেল। কিন্তু তার নিকট শব্দটি বড় করুণ বলে মনে হ'ল। সে লক্ষ্য করল, তার বাম পাশে গজ পনের দূরে ছোটখাট একটি ঝোপ-ঝাড়ের আড়াল থেকে শব্দটি আসছে। কাঠুরে মাথার বোঝা মাটিতে রেখে কুঠারটি সামনে বাগিয়ে এগিয়ে চলল। অতঃপর ঝোপের নিকটে পৌঁছে দেখল বিশাল একটা শিয়াল ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়ে সেখানে কাতরাচ্ছে। শিয়ালটিকে দেখে কাঠুরের বড় মায়া হ'ল। সে কিছু ওষধি গাছের ছাল ও পাতা বেটে তার ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিল এবং তার সামনে কিছু খাবার রেখে চলে আসল। পরের দিন আবার কাঠুরে বনে গেল। কিন্তু সেদিন সে শিয়ালটিকে কোথাও দেখতে পেল না।
মাস খানেক পরে একদিন সকাল বেলা কাঠুরে বনে গেল। কিন্তু এদিন বনের অনেক ভিতরে গিয়েও কাটার উপযোগী কোন কাঠ পেল না। তাই বনের গভীরে এসে যা পেল তা নিয়ে গ্রামের বাজারের দিকে এগিয়ে চলল। হঠাৎ তার সামনে বড় একটি ছোরা হাতে উপস্থিত হ'ল এক বনদস্যু।
এই বনদস্যু পাশের গ্রামে বাস করে। একদিন অসুস্থ অবস্থায় সে বনের মাঝে বেহুঁশ হয়ে পড়ে ছিল। কাঠুরে তাকে তার বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে সেবা-যত্ন করে। সুস্থ হয়ে সে কাঠুরের বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় তাদের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করে নিয়ে যায়। ফলে গরীব কাঠুরে গ্রামের সর্দারের নিকট বিচার প্রার্থনা করে। সর্দার তাকে বলল, কাঠুরে তোমাকে অসুস্থ অবস্থায় পেয়ে সেবা করে তোমার অনেক বড় উপকার করেছে। আর তুমি উপকারীর অপকার করে ভীষণ অপরাধ করেছ। তাই তোমার শাস্তি হওয়া আবশ্যক। সর্দারের হুকুমে তার একটি হাত কেটে নেওয়া হয়। সেদিন থেকেই সে কাঠুরেকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা করে এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এদিন যেহেতু কাঠুরে বনের গভীরে এসেছে, এখানে তাকে মারলে সবাই মনে করবে কাঠুরেকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। তাই সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। কাঠুরেকে বলল, কাঠুরে! তুই তোর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে নে। তোকে আজ আমার হাতে মরতেই হবে। সে কাঠুরেকে কথাগুলি বলছে আর ছুরি বাগিয়ে সামনের দিকে এক পা দুই পা করে এগিয়ে আসছে। কাঠুরেও এক পা দুই পা করে পিছাচ্ছে। এমন বিপদের সময়ও কাঠুরে সাহস হারাল না। কাঠুরে বলল, দস্যু! আল্লাহ যদি না চান তবে তুই কেন পৃথিবীর কেউ আমাকে হত্যা করতে পারবে না। একথা শুনে সে উচ্চৈঃস্বরে ক্রুর হাসি হেসে উঠে বলল, আজ তোকে আমার হাত থেকে তোর আল্লাহও বাঁচাতে পারবে না (নাউযুবিল্লাহ)। কাঠুরে মনে মনে আল্লাহ্র নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল। পিছাতে পিছাতে কাঠুরের পিঠ একটি গাছের সাথে লেগে গেল। দস্যুও কাঠুরেকে মারার জন্য ছুরি তাক করল। এমন সময় হঠাৎ গাছের আড়াল থেকে বিদ্যুৎ গতিতে একটি শিয়াল ঐ দস্যুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই সাথে আরো পাঁচ-ছ'টি শিয়াল তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাঠুরে লক্ষ্য করল, প্রথম যে শিয়ালটি ঐ দস্যুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সেটি ঐ শিয়াল, কাঠুরে যার সেবা করেছিল। অতঃপর কাঠুরে আল্লাহ্র নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল এবং মনে মনে বলল, অকৃতজ্ঞের পরিণাম আল্লাহ এমনই করেন।

শিক্ষা: আল্লাহ্ হাতেই সকল কিছুর ক্ষমতা। আল্লাহ কারো ক্ষতি করতে চাইলে এমন কেউ নেই যে তার উপকার করতে পারে। আবার আল্লাহ কারো উপকার করতে চাইলেও পৃথিবীর কোন শক্তি তার সামান্যতম ক্ষতি সাধন করতে পারে না (আন'আম ১৭-১৮; তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৩০২)। কাজেই সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপর ভরসা করা এবং বান্দার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, 'যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে তোমাদেরকে অধিক দান করব' (ইবরাহীম ৭)।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 পশুর কৃতজ্ঞতাবোধ

📄 পশুর কৃতজ্ঞতাবোধ


স্নেহ-দয়া-মায়া-ভালবাসা ইত্যাদি হৃদয়ের কোমল বৃত্তিগুলি আল্লাহপাক কেবল উন্নত জীব মানুষকেই দান করেননি। ইতর প্রাণী পশু-পাখিতেও দিয়েছেন। তাই মানুষ যেমন অতি আদর-যত্নে সন্তান-সন্ততিকে লালন-পালন করে, পশু- পাখিও এদিক দিয়ে কম নয়। তারাও সহজেই মানুষের আদর-সোহাগ বুঝতে পারে।
এক ক্রীতদাস তার মনিবের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে এক বনে ঢুকে পড়ে। বনের ভিতর দিয়েই পথ চলতে চলতে সে দেখতে পেল, একটি সিংহ একস্থানে স্থির হয়ে তার দিকে একটি পা বার বার উঠিয়ে কি যেন ইশারা করছে। সে সিংহটিকে অসুস্থ মনে করল। সিংহের ইশারায় সে সাহসে বুক বেঁধে আস্তে আস্তে সিংহের কাছে গেল। সে দেখল, সিংহের পায়ে একটি বড় কাঁটা বিঁধে রয়েছে। ফলে পা-টি ফুলে গেছে। সে পা থেকে কাঁটাটি বের করল। তারপর পথ চলতে লাগল।
এর কিছুদিন পর পলাতক ক্রীতদাসটি ধরা পড়ে গেল। আর ঐ সিংহটিও ধরা পড়েছে। ধৃত সিংহটি একটি সার্কাস পার্টির হাতে এসে পড়ল। যে শহর থেকে লোকটি পালিয়েছিল, সার্কাস পার্টি ঐ শহরে এল সার্কাস দেখাতে।
শহরের বিচারকমণ্ডলী পলাতকের অপরাধের শাস্তি হিসাবে ঐ সিংহকে দিয়ে তাকে ভক্ষণ করানো স্থির করল। তাহলে এটি একটি দৃষ্টান্ত হবে, যাতে আর কোন ক্রীতদাস এভাবে পালিয়ে না যায়। বিচার ব্যবস্থা নির্মম মনে হলেও সে যুগে সেটি মোটেই নির্মম ছিল না। যাহোক তারা ঘোষণা দিল, অমুক দিন অমুক সময় পলাতককে সিংহের সামনে নিক্ষেপ করা হবে। কিভাবে সিংহ তাকে ভক্ষণ করে, এ দৃশ্য দেখতে প্রচুর উৎসুক দর্শক উপস্থিত হ'ল। চারিদিক লোকে লোকারণ্য। মাঝখানে পলাতক লোকটি। এখন সিংহটিকে শিকল লাগিয়ে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেওয়া হ'ল। সবাই ভাবছিল ছাড়া পেয়ে সিংহটি আক্রমণাত্মকভাবে দৌড়ে তাকে শেষ করে দিবে। কিন্তু একি! সবাইকে বিস্মিত করে সিংহটি তাকে খেল না। বরং পলাতককে সে সঠিকভাবেই চিনল। সে-ই তার পা থেকে কাঁটা বের করে দিয়েছিল।

শিক্ষা : একটি ইতর প্রাণী তার পা থেকে কাঁটা বের করার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। আর আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়ে কৃতজ্ঞতার বদলে যত রকম অন্যায় ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে মোটেই কার্পণ্য করি না। এটা কি আমাদের চরিত্র হওয়া উচিত?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00