📄 সম্পদের মোহ
সম্পদের মোহ মানুষের জন্মগত। সম্পদের প্রতি মানুষের মোহ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কেননা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপনের জন্য সম্পদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আবার সম্পদের অত্যধিক মোহ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ও অশান্তির কারণও বটে। সম্পদের মোহ মানুষকে ধ্বংসের চোরাগলিতে নিয়ে যায়। সম্পদ সংগ্রহে কখনো কখনো মানুষ অন্যায় পথে পা বাড়ায়। মানুষের সম্পদ প্রাপ্তির আকাংখার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। সে যতই পায়, ততই চায়। ক্ষুধা নিবারণের পর অতি লোভনীয় খাবার গ্রহণে মানুষের অনিচ্ছা প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু যদি কোন মানুষের সামনে অগণিত সম্পদ রেখে দিয়ে বলা হয়, এ থেকে তোমার প্রয়োজন মতো গ্রহণ কর। তাহলে দেখা যাবে, সে তখন তার বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত সম্পদ আগলে নিয়ে বসে রয়েছে।
এক বাদশাহ অফুরন্ত সম্পদের মালিক। তিনি তার সে সম্পদ একটি ঘরে সংগোপনে সংরক্ষিত রেখেছেন। মাঝে মাঝে সে সম্পদ দেখার জন্য একাকী তিনি সেখানে যান। সম্পদ দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যায়, মনও ভরে যায়। তিনি সব ঠিকঠাক দেখে প্রশান্তি অনুভব করেন এবং মনে মনে বলেন, তিনি যদি একাধারে এ সম্পদ ব্যয় করেন তাহলে বিশ হাযার বছরেও ফুরাবে না। তিনি মনে মনে এও আশা করেন, এ সম্পদ তাকে বিশ হাযার বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
এক রাতে তিনি সম্পদ দেখে মনে প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে গোপন ঘরের তালা খুলে সেটি বাইরে রেখে দরজাটি ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে ঘরের ভিতরে পায়চারি করছেন আনমনে। এমন সময় তার একমাত্র শাহযাদা কি প্রয়োজনে যেন সেখানে উপস্থিত হ'ল। সে তালাটি বাইরে দেখে ভাবল, তার বাবা হয়তো তালাটি খুলে লাগাতে ভুলে গেছেন। তখন সে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর বাদশাহ বাইরে আসার জন্য দরজার কাছে এলেন। কিন্তু তিনি আর বের হ'তে পারলেন না। ঘরটি এমন গোপনীয় ও সুরক্ষিত যে, ভিতর থেকে শত ডাকাডাকি করলেও কোন শব্দ বাইরে বের হয় না। তিনি বুঝতে পারলেন, এ ঘরেই তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সম্পদ মানুষকে বাঁচায়, কিন্তু সরাসরি বাঁচায় না। ঘরে সম্পদের ছড়াছড়ি অথচ একটুও খাদ্য নেই। অনাহারে তাকে মরতে হ'ল।
এদিকে রাজবাড়ীতে বাদশাহকে না পেয়ে স্ত্রী-পুত্র মনে করল, তিনি হয়তো কোথাও গিয়েছেন। তারা সম্ভাব্য স্থানসমূহে খোঁজাখুঁজি করল, কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। রাজকার্য পরিচালনা করতে মন্ত্রীবর্গ শাহযাদাকে রাজমুকুট পরিয়ে সসম্মানে সিংহাসনে বসালেন। রাজকার্য পরিচালনা করতে সম্পদের প্রয়োজন দেখা দিল। বাদশাহ নিখোঁজ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। ধন-ভাণ্ডারের তালা খোলার সাথে সাথে এক বীভৎস গন্ধে চারিদিক ভরে গেল। দেখা গেল, বাদশাহ-ই স্বয়ং মরে পচে রয়েছেন। ধুলা ধূসরিত তার নিথর-নিস্তব্ধ-অসাড় দেহ।
শিক্ষা: মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের নেশা মানুষকে বিবেক-বোধহীন পশুতে পরিণত করে। ফলে সে হালাল-হারাম বিবেচনা না করে শুধু দু'হাতে সম্পদ উপার্জন করতে থাকে। অথচ সে চিন্তা করে না যে, মৃত্যু বরণের সাথে সাথে সেই সম্পদ একটি মুহূর্তের জন্যও তার কোন কাজে আসবে না।
📄 তিন লোভী ডাকাত
একবার একদল লোক বিপুল স্বর্ণমুদ্রা ও অর্থ-সম্পদ নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে তিন জন ডাকাতের খপ্পরে পড়ে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে তারা রিক্ত হস্তে বাড়ী ফেরে। ডাকাত তিন জন বিপুল স্বর্ণমুদ্রা ও টাকা-কড়ি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। চলতে থাকে নানা পরিকল্পনা। সম্পদ বণ্টনের নীলনকশা।
এমন সময় ডাকাত সর্দার বলল, আমরা ক্ষুধার্ত। আগে ক্ষুধা নিবারণ করি। তারপর সম্পদ বণ্টন হবে। অতএব সর্বাগ্রে বাজার থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসা হৌক। ডাকাতের একজন তখন খাদ্য ক্রয়ের অনুমতি চাইলে সর্দার তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে সে বাজারে রওয়ানা হ'ল। পথে যেতে যেতে সে ঐ ছিনতাইকৃত স্বর্ণমুদ্রা ও অর্থ-কড়ি কি করে একাই ভোগ করা যায় সে পরিকল্পনা আঁটতে লাগল। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর স্থির করল যে, খাদ্যের সাথে বিষ মিশিয়ে দুই বন্ধুকে হত্যা করব। তখন সব সম্পদই আমার হয়ে যাবে। বাকী জীবন এই সম্পদ দিয়ে সানন্দে কেটে যাবে। মুছে যাবে দুঃখ-দুর্দশা। বউ-বাচ্চা নিয়ে খেয়ে পরে ভালভাবেই দিনাতিপাত করতে পারব। সম্পদের এই মোহে পড়ে সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে বাজার থেকে ফিরে আসছে।
অপরদিকে ঐ দুইজন চিন্তা করল যে, এতগুলো সম্পদ দুই বন্ধুর মধ্যে বণ্টন করতে পারলে পরিমাণে বেশী হবে। তারা স্থির করল যে, খাদ্য নিয়ে আসা মাত্রই তাকে হত্যা করব। তখন সমস্ত সম্পদ দুই বন্ধু ভাগ করে নিব। কথামতো অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকল তারা। খাদ্য নিয়ে সে ফিরা মাত্রই অপেক্ষমাণ দুই বন্ধু অস্ত্রাঘাত করে তাকে শেষ করে ফেলল।
এবারে অবশিষ্ট দুই ডাকাতের মধ্যে যে অধিক শক্তিশালী ছিল সে চিন্তা করল, যদি আমি একাই এই বিশাল ধন ভাণ্ডারের মালিক হই তবে আমার চেয়ে আর কে ধনবান হতে পারে? আমার জীবন ধন্য হবে। সমস্যা দূরীভূত হবে। দারিদ্র্য বিমোচিত হবে। জীবনে আর কোন সমস্যা থাকবে না। এই দুরভিসন্ধি অনুযায়ী অপর সাথীকে সে হত্যা করে ফেলল। পর পর দুই সাথীকে হত্যা করে সে আনন্দে উদ্বেলিত। তার লোলুপ দু'চোখ অপলক নেত্রে তাকিয়ে আছে ছিনতাইকৃত সম্পদের দিকে। একাই এত সম্পদের মালিক, এই আনন্দে সে পাগলপারা। সাথীদ্বয়কে হত্যা করে স্বভাবতই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল সে। সামনে খাবার মওজুদ। ভাবল, আগে ক্ষুধা মিটিয়ে নেই, তারপর সম্পদ নিয়ে বাড়ী ফিরব। অতঃপর প্রত্যাশার পরিসমাপ্তি ঘটল, যখন সে বিষ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণ করে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাল।
শিক্ষা: অত্যধিক সম্পদের লোভ মানুষকে ধ্বংস করে।
📄 জনৈক মহিলা ও সোনার ডিম
এক মহিলার একটি মুরগী প্রতিদিন একটি করে সোনার ডিম পাড়ত। মহিলা মনে মনে বুদ্ধি আঁটল, আমি যদি তার খাবার বেশি করে দেই তাহলে সে প্রতিদিন দু'টি করে ডিম পাড়বে। অতঃপর সে যখন তার খাবার বৃদ্ধি করে দিল, তখন পাকস্থলী ফেটে মুরগীটি মরে গেল।
শিক্ষা: অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।
📄 সবল ও দুর্বল বিড়াল
এক গরীব বুড়ির একটি দুর্বল বিড়াল ছিল। বুড়ির আহারের দু'লোকমা খেয়ে সে বেঁচে থাকতো। একদিন কষ্ট করে ঘরের চালে উঠে পাশের বাড়ির এক মোটা-তাজা বিড়ালকে চলাফেরা করতে দেখে বলল, ও ভাই! তুমি এত মোটা-তাজা হলে কী করে? মোটা বিড়ালটি জবাব দিল, এই বান্দা প্রতিদিন শাহী মহলে যাতায়াত করে। সেখানে চুরি করে পোলাও কোরমাতে ভাগ বসায়, আর কিছুটা অন্য সময়ের জন্য নিয়েও আসে। দুর্বল বিড়ালটি শাহী দস্তরখানের মজাদার খাবারের কথা শুনে অস্থির হয়ে পড়ল। খুব বিনয়ের সুরে সবল বিড়ালকে বলল, ভাই প্রতিবেশীর হক আদায় করা তোমার কর্তব্য। তুমি নিজে প্রত্যেকদিন শাহী দস্তরখানের স্বাদ লুটবে আর আমি কিছুই পাব না- একি ইনছাফের কথা!
সবল বিড়ালটি বলল, ভাই আমাকে এত কৃপণ মনে কর না। তোমাকে আমার খাবারে অংশীদার করতে কোন আপত্তি নেই। আমার সাথে আগামীকাল যেও। পরদিন সবল বিড়ালের সাথে দুর্বল বিড়ালটি শাহী মহলে গেল। ওদিকে এরই মধ্যে দস্তরখানের আশপাশে বিড়ালের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় বাদশাহ তীরন্দায নিযুক্ত করে বিড়াল আসামাত্রই তীর ছুড়ে মারার নির্দেশ দিলেন। দুর্বল বিড়ালটি যখন শাহী মহলের কাছে আসল এবং রাজকীয় খাবারের ঘ্রাণ পেয়ে জিভ বের করল, অমনি রক্ষীরা তাকে তীর মেরে জীবনলীলা সাঙ্গ করে দিলো।
শিক্ষা: অতি লোভে তাঁতী নষ্ট।